Advertisement
  • ব | ই | চ | র্যা রোব-e-বর্ণ
  • সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬

বাস্তবের ভিতরে যে-স্বপ্ন থাকে

জিয়া হক
বাস্তবের ভিতরে যে-স্বপ্ন থাকে

হারুকি মুরাকামির ‘কাফকা অন দ্য শোর’ পড়ে প্রথম যে অনুভূতিটা হয়, সেটাকে ঠিক ‘আনন্দ’ বলা যায় না; দুঃখও নয়। বরং এক ধরনের ‘অস্বস্তি’। বইটা শেষ হয়েও হয় না। চরিত্রগুলি সরে সরে যায়। তাদের অনন্ত ও শাশ্বত প্রশ্নগুলি থেকেই যায়। এই উপন্যাসের সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার সম্ভবত এটাই। মুরাকামি আমাদের কোনো স্পষ্ট, রেখাবিহীন, ‘পরিষ্কার’ পৃথিবী উপহার দেন না। দেন একটা দরজা। তার এক দিকে বাস্তব। অন্য দিকে স্বপ্ন। মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষ। কখন যে কোন দিকে পা পড়ছে, সে নিজেও জানে না। এটাই যেন ভবিতব্য।

কাহিনির কেন্দ্রে দু-টি জীবন। পনেরো বছরের কাফকা তামুরা। আর বৃদ্ধ নাকাতা। দু-জনের বয়স আলাদা। অভিজ্ঞতা আলাদা। ভাষা আলাদা। অথচ দু-জনেই কোনো না কোনো ভাবে শূন্যতার মধ্যে বাস করে। কাফকা বাড়ি থেকে পালায়। নাকাতা যেন নিজের স্মৃতি থেকেই পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। তাঁদের দু-টি কাহিনি আলাদা পথে এগোয়। পরে সেই পথগুলি অদৃশ্য ভাবে জুড়ে যায়। আমার কাছে উপন্যাসটির আসল বিষয় এই সংযোগ নয়; বরং বিচ্ছিন্নতা। আধুনিক মানুষ এত মানুষের মধ্যে থেকেও কেন একা ? ‘সলিটারি’ আর ‘লোনলি’র পার্থক্য এখন অনেকেরই জানা।

মুরাকামির জাপান এখানে অদ্ভুত ভাবে পরিচিত ও রূপায়িত। শহর, বাস, লাইব্রেরি, রাস্তা, গান আছে। আছে বই — দৈনন্দিন জীবনের একেবারে সাধারণ জিনিস। তার মধ্যেই হঠাৎ আকাশ থেকে মাছ পড়ে। বিড়াল মানুষের সঙ্গে কথা বলে। মৃত মানুষ অন্য বয়সে ফিরে আসে। সময়ের নিয়ম ভেঙে যায়। বাস্তবের সঙ্গে অসম্ভব এমন ভাবে মিশে যায় যে শেষ পর্যন্ত কোনটাকে ‘স্বাভাবিক’ বলা যাবে, সেটাই বোঝা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই কৌশলকে শুধু ‘যাদুবাস্তবতা’ বললে কম বলা হয়। মুরাকামি আসলে মনস্তত্ত্বের ভাষাকেই বদলে দেন। আমাদের অবচেতন মন তো এমনই। সেখানে যুক্তির দরজা সব সময় খোলা থাকে না। স্মৃতি, ভয়, আকাঙ্ক্ষা, অপরাধবোধ—সব একসঙ্গে ঘাপটি মেরে এসে বসে। বাস্তবে যাকে অসম্ভব মনে হয়, স্বপ্নে তা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। ‘কাফকা অন দ্য শোর’ সেই স্বপ্নের যুক্তিই অনুসরণ করে।

কাফকার সমস্যাটি তাই শুধু বাবার ভবিষ্যদ্বাণী নয়। তাঁর আসল সমস্যা নিজের আত্মপরিচয়। মা তাঁকে ছেড়ে চলে গিয়েছেন। বোনের স্মৃতি অস্পষ্ট। বাবার সঙ্গে সম্পর্ক বিষাক্ত। তারপর আসে সেই ভয়ংকর ভবিষ্যদ্বাণী। সে বাবাকে হত্যা করবে। মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হবে। বোনের সঙ্গেও। গ্রিক পুরাণের ‘ইডিপাস’ যেন আধুনিক টোকিওতে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু মুরাকামি নিয়তির প্রশ্নটিকে স্রেফ পৌরাণিক করে রাখেন না। তিনি প্রশ্ন করেন, আমরা কি সত্যিই ভাগ্য থেকে পালিয়ে বেড়াই? নাকি ভাগ্য সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাসই আমাদের আচরণকে সেই দিকে ঠেলে দেয় ?

এ প্রশ্নটি মনস্তাত্ত্বিক ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভয়ও কখনো ভবিষ্যৎকে নিজের ছাঁচে তৈরি করে নেয়। একটি সম্ভাবনাকে নিয়ে ক্রমাগত ভাবতে ভাবতে মানুষ সেটিকে নিজের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে ফেলে। কাফকার ক্ষেত্রেও তাই। সে ভবিষ্যদ্বাণী এড়াতে চায়। অথচ প্রতিটি পদক্ষেপে তার চারপাশে সেই ভবিষ্যদ্বাণীর ছায়া ঘন হয়। নাকাতা আরও জটিল। শৈশবের এক রহস্যময় ঘটনার পরে তাঁর স্মৃতি প্রায় মুছে যায়। তিনি পড়তে পারেন না। সাধারণ সামাজিক দক্ষতার অনেকটাই তাঁর নেই। কিন্তু তিনি বিড়ালের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। এই অদ্ভুত ক্ষমতাকে নিছক ‘কৌতুক’ হিসেবে পড়লে ভুল হবে। নাকাতা যেন এমন এক মানুষ, যার কাছ থেকে সমাজ ‘স্বাভাবিক’ হওয়ার দাবি করতে পারে না। তাঁর ভিতরে যুক্তির বদলে অন্য ধরনের অনুভব কাজ করে। আর সেখানেই তিনি উপন্যাসটির অন্যতম মানবিক চরিত্র। নাকাতা পৃথিবীকে খুব সরল ভাবে দেখেন। তাই হয়তো পৃথিবীর জটিলতা তাঁকে অন্যদের মতো ভেঙে দিতে পারে না। আবার তাঁর স্মৃতিহীনতাই তাঁর পরিচয়ের সংকট। এই উপন্যাসে স্মৃতি যে শুধু অতীত নয়, পরিচয়েরও ভিত্তি — তা বারবার ফিরে আসে। নাকাতার ক্ষেত্রে স্মৃতি হারানো মানে নিজের একটা অংশ হারানো। অন্যদের ক্ষেত্রে স্মৃতি হয়ে ওঠে দুর্বহ ‘বোঝা’।

এটি রহস্য সমাধানের বই নয়; বরং রহস্যের সঙ্গে বসবাসের বই। জীবনের সব প্রশ্নের উত্তর থাকে না। সব ক্ষত সারে না। সব স্মৃতি ফিরে আসে না। সব সম্পর্কের নাম দেওয়া যায় না। তবু মানুষ এগিয়ে যায়। সমুদ্রের ধারে দাঁড়ানো কাফকার মতো। পেছনে তার অতীত। সামনে অজানা পৃথিবী। মাঝখানে সে নিজে। আর তার ভিতরে এমন কিছু দরজা আছে, যার চাবি হয়ত তার নিজের কাছেও নেই। মুরাকামির সবচেয়ে বড়ো সাফল্য এখানেই। তিনি বলেন না, স্বপ্নের অর্থ কী। বরং মনে করিয়ে দেন — জেগে থাকা জীবনটাও অনেক সময় স্বপ্নের মতোই অস্পষ্ট

মিস সায়েকির চরিত্রে সে বোঝা আরও তীব্র। একটি পুরনো প্রেম। একটি হারানো সময়। একটি গান। আর সেই স্মৃতির মধ্যে আটকে থাকা জীবন। তিনি বর্তমানের মানুষ হয়েও যেন অতীতের একটিই মুহূর্তে বসবাস করেন। মুরাকামি এখানে প্রেমকে রোম্যান্টিক করে তোলেননি; বরং দেখান, স্মৃতি কখনো কখনো বর্তমানকে খেয়ে ফেলতে পারে। এই জায়গায় বইটির সামাজিক পাঠও জরুরি। কাফকা একা। নাকাতা একা। মিস সায়েকি একা। ওশিমা একা। প্রত্যেকের বিচ্ছিন্নতার কারণ আলাদা। কিন্তু তাদের একাকিত্ব একই সামাজিক বাস্তবতার বিভিন্ন মুখ। আধুনিক সমাজ মানুষকে ‘স্বাধীন’ করেছে। একই সঙ্গে বিচ্ছিন্নও করেছে। পরিবার ভেঙেছে। ঐতিহ্য দুর্বল হয়েছে। কিন্তু তার বদলে সব সময় নতুন কোনো কৌম বা গোষ্ঠী তৈরি হয়নি। ফলে ব্যক্তি স্বাধীন। আবার অসহায়ও। মুরাকামির চরিত্ররা সেই মধ্যবর্তী জায়গায় বাস করে। লাইব্রেরিটি তাই শুধু বই রাখার জায়গা নয়। আমার কাছে সেটি আশ্রয়। এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষ নিজের পরিচয় সাময়িকভাবে বদলে নিতে পারে। কিশোর কাফকা সেখানে গিয়ে নিজেকে নতুন করে ‘বানানো’র চেষ্টা করে। বই এবং সংগীত তার কাছে কেবল সংস্কৃতি নয়। আত্মরক্ষার উপায়। সংগীতের ভূমিকাও তাই আলাদা করে মনে রাখার মতো। উপন্যাসের শিরোনামই এসেছে একটি গানের নাম থেকে। সঙ্গীত এখানে ভাষার বিকল্প। মানুষ যা বলতে পারে না, গান কখনো তা বলে দেয়।

মুরাকামি রহস্য তৈরি করতে এতটাই পছন্দ করেন যে অনেক প্রশ্নের উত্তর তিনি দেন না। পাঠককে অপেক্ষা করতে হয়। কখনো সেই অনিশ্চয়তা মুগ্ধ করে। কখনো ‘বিরক্ত’ করে। কিছু প্রতীক যেন ব্যাখ্যার চেয়ে ধাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। সমালোচকেরাও এই অস্পষ্টতাকে বইটির একই সঙ্গে শক্তি এবং সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখেছেন। আর নারীচরিত্রগুলির ক্ষেত্রেও অস্বস্তি আছে। তাঁদের অনেক সময় পুরুষ চরিত্রের আত্মপরিচয়ের সংকটের আয়না হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যৌনতা ও আকাঙ্ক্ষার বর্ণনাও সব পাঠকের কাছে সমান স্বস্তিদায়ক নাও হতে পারে। ফলে মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার সঙ্গে একটি পুরুষকেন্দ্রিক দৃষ্টিও পাশাপাশি থাকে। তবু এই বই আমাকে শেষ পর্যন্ত টানে অন্য কারণে। এটি রহস্য সমাধানের বই নয়; বরং রহস্যের সঙ্গে বসবাসের বই। জীবনের সব প্রশ্নের উত্তর থাকে না। সব ক্ষত সারে না। সব স্মৃতি ফিরে আসে না। সব সম্পর্কের নাম দেওয়া যায় না। তবু মানুষ এগিয়ে যায়। সমুদ্রের ধারে দাঁড়ানো কাফকার মতো। পেছনে তার অতীত। সামনে অজানা পৃথিবী। মাঝখানে সে নিজে। আর তার ভিতরে এমন কিছু দরজা আছে, যার চাবি হয়ত তার নিজের কাছেও নেই। মুরাকামির সবচেয়ে বড়ো সাফল্য এখানেই। তিনি আমাদের বলেন না, স্বপ্নের অর্থ কী। বরং মনে করিয়ে দেন — জেগে থাকা জীবনটাও অনেক সময় স্বপ্নের মতোই অস্পষ্ট। সে অস্পষ্টতার মধ্যেই মানুষ নিজেকে খুঁজে নেয়। ‘কাফকা অন দ্য শোর’ তাই আমার কাছে কিশোরের পালিয়ে যাওয়ার গল্প নয়। এটি নিজের ভিতর থেকে পালিয়ে গিয়ে আবার নিজের কাছেই ফিরে আসার গল্প। আর সেই ফেরার পথটাই সবচেয়ে দীর্ঘ।

 

 

 

 

কাফকা অন দ্য শোর
হারুকি মুরাকামি
ভিন্টেজ
দাম: ৩৮৯ টাকা

 

♦–♦•♦–♦  ♦–♦•♦–♦


  • Tags:
❤ Support Us
কৃষ্ণগহ্বর গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
বিবর্ণ এপিটাফের সজল বৃত্তান্ত পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
মহা-ভারতে খণ্ডচিহ্ন পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
error: Content is protected !!