- ব | ই | চ | র্যা রোব-e-বর্ণ
- আগস্ট ৩০, ২০২৬
বৈদিক যুগ, এক পরিবর্তনের সময়
ইরফান হাবিব ও বিজয় কুমার ঠাকুরের ‘দ্য বেদিক এজ’ পড়তে গিয়ে আমার প্রথমেই মনে হয়েছে, এ বইয়ের আসল ‘লড়াই’ বা ‘মোকাবেলা’ বৈদিক যুগের সঙ্গে নয়। লড়াই ইতিহাস লেখার পদ্ধতি নিয়ে । বইটি খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ১৫০০ থেকে ৭০০ অব্দের সময়কে ধারণ করেছে । ঋগ্বেদ, পরবর্তী বৈদিক সাহিত্য এবং প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানকে পাশাপাশি রেখে লেখকেরা সমাজ, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, ধর্ম এবং ক্ষমতার কাঠামো বুঝতে চান । বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে সাধারণ মানুষ, শ্রেণি এবং নারী । এ পদ্ধতিই বইটির সবচেয়ে বড়ো শক্তি । কারণ বৈদিক অতীত নিয়ে আজ যে সব ‘গল্প’ বলা হয়, তার অনেকগুলিই ইতিহাসের চেয়ে পরিচয়-রাজনীতির কাছে বেশি দায়বদ্ধ । সেসব ‘গপ্পে’ বৈদিক যুগ সম্পূর্ণ, অভিন্ন, মহিমান্বিত ‘স্বর্ণযুগ’। সব জ্ঞান তখনই ছিল, সব বিজ্ঞান তখনই ছিল, সব সামাজিক প্রতিষ্ঠান তখনই পরিণত । এমনকি আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারেরও বীজ নাকি সেই যুগেই পাওয়া যায় । হাবিবের বই সেসব আষাঢ়ে গল্পে জল ঢেলে দেয় । শান্ত ভাবে । যুক্তি দিয়ে । প্রমাণ দিয়ে ।
কোনো সভ্যতাকে ছোটো করার প্রচেষ্টা নেই । আবার তাকে পৌরাণিক মহিমায় ঢেকে দেওয়ারও চেষ্টা নেই । এই ভারসাম্যটিই গুরুত্বপূর্ণ । মার্ক্সবাদী ইতিহাসচর্চার মূল প্রশ্ন হলো — মানুষ কী ভাবে বেঁচে থাকত ? কী উৎপাদন করত ? উৎপাদনের উপায় কার হাতে ছিল ? উদ্বৃত্ত কে ভোগ করত ? সামাজিক ক্ষমতা কী ভাবে তৈরি হতো ? ‘দ্য বেদিক এজ’ সেসব প্রশ্নই সামনে নিয়ে এসেছে। প্রকাশিত বিবরণেও দেখা যায়, বইটি অর্থনীতি, প্রযুক্তি, সমাজ, শ্রেণি ও লিঙ্গকে কেবল আনুষঙ্গিক বিষয় হিসেবে নেয়নি। বরং বৈদিক সমাজ বোঝার কেন্দ্রেই রেখেছে । এখানেই ‘বৈদিক সভ্যতা’কে একটিমাত্র সংস্কৃতি হিসেবে দেখার প্রবণতা ভেঙে যায় ।
প্রথম বৈদিক পর্যায়ের অর্থনীতি মূলত পশুপালন, কৃষি এবং সীমিত উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত । পরে কৃষির বিস্তার ঘটে । লাঙলের ব্যবহার বাড়ে । লৌহ প্রযুক্তির আবির্ভাব নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে । গঙ্গা-যমুনা অববাহিকার দিকে বিস্তারের সঙ্গে সমাজের কাঠামোও বদলে যায় । অর্থাৎ প্রযুক্তি এখানে শুধু প্রযুক্তি নয় । প্রযুক্তি সামাজিক পরিবর্তনের চালিকাশক্তি । লোহা তাই বইটিতে বিশেষ তাৎপর্য পায় । এখানে মার্ক্সীয় বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি সবচেয়ে স্পষ্ট । নতুন প্রযুক্তি মানে শুধু নতুন অস্ত্র নয় । নতুন কৃষি-সম্ভাবনা । নতুন জমি চাষের সুযোগ । উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা । উদ্বৃত্তের সম্ভাবনা । আর উদ্বৃত্ত মানেই ক্ষমতার নতুন সম্পর্ক। সেখান থেকেই আসে শ্রেণি ।
ইতিহাস শুধু গবেষণার বিষয় নয় এখন তা রাজনৈতিক অস্ত্র। অতীতের নির্বাচিত সংস্করণ দিয়ে বর্তমানের নাগরিকত্ব, ধর্ম, জাতি এবং জাতীয়তার ধারণা তৈরি করা হচ্ছে । এ পরিস্থিতিতে ‘দ্য বেদিক এজ’ আমাদের একটি মৌলিক কথা মনে করিয়ে দেয় । অতীত কারও সম্পত্তি নয় । বৈদিক যুগ ছিল পরিবর্তনের সময়। সংঘাতের সময় । উৎপাদনের পরিবর্তনের সময় । সামাজিক স্তরবিন্যাসের সময় । প্রযুক্তির পরিবর্তনের সময় । বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংস্পর্শের সময়
বৈদিক সমাজে পুরোহিত ও যোদ্ধা-অভিজাতের অবস্থান শক্তিশালী । অন্যদিকে, উৎপাদক মানুষের উপর নানা ধরনের শাসন ও শোষণ । বৈশ্য ও শূদ্রের অবস্থান ক্রমে পৃথক হয়ে পড়ে । বর্ণব্যবস্থার শিকড় যে, এ সময়ের মধ্যেই দৃশ্যমান হতে শুরু করে, বইটি সে প্রক্রিয়াকে ঐতিহাসিক ভাবে দেখতে চায় । এ জায়গাটি আজকের ভারতের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । বর্তমানের উগ্র সংকীর্ণ ইতিহাসচর্চা অনেক সময় বর্ণব্যবস্থার ইতিহাসকে প্রাচীনতার গৌরবের সঙ্গে মিশিয়ে দেয় । ‘চিরন্তন’ অলীক সমাজের ধারণা তৈরি করার চেষ্টা করা হয় । যেন সামাজিক বিভাজন ছিল স্বাভাবিক । চিরস্থায়ী । ঈশ্বরনির্দিষ্ট ।
হাবিব-ঠাকুরের ইতিহাস-লিখন পদ্ধতি এর বিপরীত স্বর ও বয়ানকেই খনন করে এনেছে । তাঁরা বলেন, সামাজিক প্রতিষ্ঠানও ইতিহাসের মধ্যে তৈরি হয় । বদলায় । শক্তিশালী হয়। নতুন ‘অর্থ’ পায় । বর্ণ কোনো আকাশ থেকে নামা অপরিবর্তনীয় ব্যবস্থা নয়। তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস আছে । ভুয়ো ইতিহাসের বিরুদ্ধে এ এক কার্যকর ‘কাউন্টার ন্যারেটিভ’ । তবে ‘ভুয়ো ইতিহাস’ বললেই তো কাজ শেষ হয় না । পাল্টা ইতিহাসকেও প্রমাণের উপর দাঁড়াতে হয় । এই বইয়ের শক্তি এখানেই । লেখকেরা শুধু বৈদিক সাহিত্যর উদাহরণ টানেননি । যথাযত প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানও ব্যবহার করেছেন । বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্কৃতির বস্তুগত প্রমাণকে আলোচনায় এনেছেন । বইটির তৃতীয় অধ্যায় এই প্রত্নতাত্ত্বিক চিত্র নিয়েই ।
এ পদ্ধতি অত্যন্ত জরুরি । সাহিত্যিক উৎস সাধারণত সমাজের সব মানুষের কথা বলে না । ক্ষমতাবানরা বেশি কথা বলে । পুরোহিতরা বেশি কথা বলে । রাজারা বেশি দৃশ্যমান । শ্রমজীবী মানুষের জীবন অনেক সময় নীরব । প্রত্নতত্ত্ব সেই নীরবতার কিছু অংশ উদ্ধার করতে পারে । একটি লাঙলের চিহ্ন । একটি মাটির পাত্র । একটি সমাধি । একটি বসতির বিন্যাস । একটি লোহার বস্তু। ইতিহাসের কাছে এগুলিও দলিল ।
হাবিবের মার্ক্সবাদ কোনো স্লোগান নয় । গবেষণার পদ্ধতি । ধর্মের প্রশ্নেও একই সতর্কতা । বৈদিক ধর্মকে কেবল আধ্যাত্মিকতার ইতিহাস হিসেবে দেখা হয়নি । যজ্ঞের সঙ্গে সম্পদ ও সামাজিক ক্ষমতার সম্পর্কও বিবেচনায় এসেছে । পুরোহিতের ভূমিকা তাই ধর্মীয় মাত্রায় সীমাবদ্ধ নয় । তাঁর সামাজিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ । এখানে আবার উৎপাদন ও উদ্বৃত্তের প্রশ্ন ফিরে আসে । বড়ো ধরনের যজ্ঞ মানে সম্পদের বড়ো সংগঠন । সম্পদের সংগঠন মানে সামাজিক ক্ষমতা। ফলে ধর্ম এবং অর্থনীতি আলাদা কোনো জগৎ নয় । তারা পরস্পরকে শক্তিশালী করতে পারে ।
নারীর প্রশ্নটিও বইটির গুরুত্বপূর্ণ দিক । বৈদিক সমাজকে একক ‘নারী-সম্মান’-এর গল্পে পরিণত করা যায় না । সময়ের সঙ্গে নারীর অবস্থানের পরিবর্তনকেও দেখতে হয় । সম্পত্তি, পরিবার, বিবাহ এবং সামাজিক কর্তৃত্বের পরিবর্তনের সঙ্গে নারীর অবস্থানও বদলায় । এই ঐতিহাসিকতা আজ বিশেষ প্রয়োজন । কারণ বর্তমানের রাজনৈতিক ইতিহাসচর্চা অতীতকে প্রায়ই বর্তমানের মূল্যবোধ দিয়ে পুনর্লিখন করতে চায় । কোনো একটি শ্লোক বা কাহিনি তুলে নিয়ে গোটা বৈদিক সমাজের ছবি আঁকে । ইতিহাসবিদের কাজ তার বিপরীত । একটি সূত্রকে আরও অনেক সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা । অনিশ্চয়তাকে স্বীকার করা । প্রমাণ যেখানে অসম্পূর্ণ, সেখানে সিদ্ধান্তকে সীমিত রাখা ।
এ বই সেই সতর্কতাই শেখায় । তবে বইটির সীমাবদ্ধতাও আছে । একশো পাতার কাছাকাছি সংক্ষিপ্ত গ্রন্থে এত বিশাল সময়কে ধরার ফলে অনেক প্রশ্নের বিস্তারিত অনুসন্ধান সম্ভব হয়নি । বইটির উদ্দেশ্যও পূর্ণাঙ্গ বিশ্বকোষ লেখা নয় । ‘আ পিপল’স হিস্টরি অফ ইন্ডিয়া’ সিরিজের অংশ হিসেবে এর লক্ষ্য ছিল সাধারণ পাঠককে প্রমাণনির্ভর ইতিহাসের বৃহত্তর সমস্যার সঙ্গে পরিচিত করানো । সিরিজটির ঘোষিত উদ্দেশ্যই ছিল বৈজ্ঞানিক ইতিহাসচর্চা এবং সাম্প্রদায়িক ও ‘ক্ষমতাবাদী’ ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো । আজ, সম্ভবত এটি অত্যন্ত জরুরি । ইতিহাস এখন শুধু গবেষণার বিষয় নয় । ইতিহাস এখন রাজনৈতিক অস্ত্র। অতীতের নির্বাচিত সংস্করণ দিয়ে বর্তমানের নাগরিকত্ব, ধর্ম, জাতি এবং জাতীয়তার ধারণা তৈরি করা হচ্ছে । এ পরিস্থিতিতে ‘দ্য বেদিক এজ’ আমাদের একটি মৌলিক কথা মনে করিয়ে দেয় । অতীত কারও সম্পত্তি নয় । বৈদিক যুগ কোনও একরঙা ‘হিন্দু স্বর্ণযুগ’ ছিল না । ছিল পরিবর্তনের সময়। সংঘাতের সময় । উৎপাদনের পরিবর্তনের সময় । সামাজিক স্তরবিন্যাসের সময় । প্রযুক্তির পরিবর্তনের সময় । বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংস্পর্শের সময় ।
ইতিহাসের কাজ জটিলতম সময়কে বিশ্লেষণ করা । মিথকে অপমান করে নয় । মিথকে ইতিহাস বলে চালিয়ে দিয়ে নয় । আমার কাছে এটাই এই বইয়ের সবচেয়ে বড়ো রাজনৈতিক শিক্ষা । আজ যখন অতীতকে গৌরবের স্লোগানে সংকুচিত করার চেষ্টা চলছে, তখন ইরফান হাবিব ও বিজয় কুমার ঠাকুর অতীতকে ফিরিয়ে দেন মানুষের হাতে । রাজা ও ঋষির পাশাপাশি কৃষককে রাখেন । যজ্ঞের পাশে শ্রমকে রাখেন । বর্ণের পাশে উৎপাদনকে রাখেন। সংস্কৃতির পাশে প্রত্নতত্ত্বকে রাখেন । আর সেখানেই ইতিহাস আবার ‘ইতিহাস’ হয়ে ওঠে। কল্পিত শ্রেষ্ঠত্বের গল্প নয় । মানুষের পরিবর্তনশীল জীবনের দলিল ।

দ্য বেদিক এজ
ইরফান হাবিব, বিজয় কুমার ঠাকুর
তুলিকা বুকস, ১৫০০ টাকা
♦—♦•♦—♦
❤ Support Us








