Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • আগস্ট ৩০, ২০২৬

ইরফান হাবিবের ইতিহাস চিন্তা

দেবদত্ত চক্রবর্তী
ইরফান হাবিবের ইতিহাস চিন্তা

ইতিহাসবেত্তা ইরফান হাবিবের বয়স এখন ৯৫। শতবর্ষের দিকে এগোচ্ছেন শক্ত পায়ে, মেরুদণ্ড খাড়া রেখে। লেখাপড়া, স্বচ্ছ ইতিহাস-চিন্তা অব্যহত। এরকম আপসহীন ইতিহাসবেত্তা বিশ্বে বিরল। টয়েনবি, হবসন-এর চাইতে অনেকাংশে শাণিত আরও ঊর্ধারোহী তাঁর উচ্চতা। টয়েনবি ছিলেন খ্রিস্ট বিশ্বাসে কিছুটা বন্দী। আর হবসনের বনেদিয়ানা শ্রেনী চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইরফান এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ আলাদা, মার্ক্সবাদী হলেও বিশ্বাস তাঁর উন্মুক্ত, তরঙ্গায়িত। জীবনবোধের ভারতীয় দূতকে সেলাম জানিয়ে পরিবেশিত হলো আমাদের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন

সম্পাদক

মোহাম্মদ হাবিবের (১৮৯৫-১৯৭১) ইতিহাস চিন্তা, তাঁর পুত্র ইরফান হাবিবের প্রবাহমান ঐতিহ্য এই  দুই প্রজন্ম জুড়ে বিস্তৃত বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার— এরকম তিন দিককে একত্রে দেখলে বোঝা যায়, ‘হাবিব’ নামটি নিছক পারিবারিক পরিচয় নয়, ভারতীয় ইতিহাসচর্চার প্রায় শতাব্দীব্যাপী মননেরই বিস্তার। উত্তরাধিকার নিছক রক্তসম্পর্কের নয়; আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের একই আর্কাইভ, একই অধ্যাপকের চেয়ার, পিতা থেকে পুত্রে সঞ্চারিত হয়েছিল পদ্ধতিগত বিশ্বাসও— ইতিহাস রাজায়-রাজায় যুদ্ধের কাহিনি নয়, বরং উৎপাদন, শ্রেণিসংঘাত ও মতাদর্শের নিরন্তর দ্বন্দ্বের বিজ্ঞান। ইরফান হাবিবের কাজে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, তিনি ইতিহাসকে কেবল রাজবংশ, যুদ্ধ ও শাসকের কাহিনি হিসেবে নয়, ভূমি রাজস্ব, কৃষি উৎপাদন, প্রযুক্তি, শ্রেণি, ধর্ম ও মতাদর্শের আন্তঃসম্পর্ককে বিচার করেছেন, এবং ইতিহাসকে রাজনৈতিক বর্ণনার বাইরে এনে উৎসনির্ভর, সমালোচনামুখী ও সামাজিকভাবে সংবেদী অনুসন্ধানের পথ স্থাপন করেছেন।


মোহাম্মদ হাবিবের ঐতিহ্যকে ইরফান হাবিব নিয়ে যান আরও সুসংহত, পদ্ধতিগত স্তরে। ইরফানের জন্ম বরোদায়, প্রাথমিক লেখাপড়া লখনৌতে, কলেজ জীবন আলিগড়ে। আলিগড় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সি. সি. ডেভিসের অধীনে ডি.ফিল. সম্পন্ন হয় তাঁর। ১৯৬০ সালে রিডার এবং ১৯৬৯ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হয়ে তিনি ১৯৯১ সাল পর্যন্ত আলিগড়ে ইতিহাসের অধ্যাপনা করেন, অধ্যাপক এমেরিটাস হিসেবে যুক্ত থাকেন এবং আলিগড়ের ‘সেন্টার অফ অ্যাডভান্সড স্টাডি ইন হিস্ট্রি’-র সমন্বয়ক ও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন


মোহাম্মদ হাবিব ছিলেন লখনৌর ব্যারিস্টার মোহাম্মদ নাসিমের পুত্র। এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের বি.এ. পরীক্ষায় সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করে আলিগড়ের এম.এ.ও. কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপনা শুরু করেন। মহাত্মা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ অনুসারী আব্বাস তৈয়বজির কন্যা সোহায়লার সঙ্গে তাঁর বিবাহ তাঁকে জাতীয় কংগ্রেসের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত করে। জওহরলাল নেহরুর প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ও কংগ্রেসের প্রতি তাঁর আর্থিক সহায়তা এই সংযোগেরই সাক্ষ্য। চল্লিশের দশকে মার্ক্সবাদের প্রতি তাঁর আগ্রহ তীব্রতর হয়। ১৯৫২ সালে এলিয়ট ও ডাউসন-সম্পাদিত ‘হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া, অ্যাজ টোল্ড বাই ইটস ওন হিস্টোরিয়ানস’-এর দ্বিতীয় খণ্ডের পুনর্মুদ্রণে তাঁর লেখা ভূমিকা মধ্যযুগীয় ভারতের পুনর্পাঠ হিসেবে ঐতিহাসিক মহলকে আলোড়িত করে তোলে। এই ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ, এই কারণে যে এলিয়ট-ডাউসনের সংকলনটি ছিল ঔপনিবেশিক ইতিহাসচর্চার প্রতিনিধিত্বমূলক নিদর্শন, যেখানে ফারসি ইতিহাসবেত্তাদের বিবরণ থেকে বেছে বেছে এমন অংশ তুলে ধরা হয়েছিল, যা মধ্যযুগীয় ভারতকে মুসলিম শাসকদের দ্বারা পরিচালিত ধারাবাহিক ধ্বংস ও নিপীড়নের আখ্যান হিসেবে স্থাপিত করে। জেমস মিলের সুপরিচিত ত্রিধারা-বিভাজনের (হিন্দু যুগ-মুসলিম যুগ-ব্রিটিশ যুগ) সহায়ক আর্কাইভ।

মোহাম্মদ হাবিব এই কাঠামোকে ভেতর থেকে চ্যালেঞ্জ করেন, সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বদলে অর্থনৈতিক-সামাজিক  প্রক্রিয়ার আলোয় ইতিহাস পাঠের পথ দেখান। ১৯৪৭ সালে, তিনি ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি কংগ্রেসের সভাপতির ভাষণে বলেছিলেন, নতুন জাতিরাষ্ট্রের ইতিহাসচর্চা কোন দিকে যাবে এবং যাওয়া উচিত তা নির্ণয় করা দরকার।

হাবিবের ঐতিহ্যের কেন্দ্রে ছড়িয়ে রয়েছে এই ধারণা যে, ইতিহাস একটি গতিশীল সামাজিক প্রক্রিয়া। মোহাম্মদ হাবিব তাঁর ইতিহাসচর্চায় বিকাশ, অনুসন্ধান ও জাতীয় ইতিহাসের বিতর্কিত প্রশ্নগুলিকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করার পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। মধ্যযুগীয় ভারতের গবেষণায় রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে একত্রে ধরার কথা বলেছেন, এবং নতুন অনুসন্ধানের সঙ্গে উৎস-সমালোচনার কঠোরতা বজায় রাখা জরুরি বলে মনে করেছেন। তাঁর সংকলিত রচনাবলি ‘পলিটিক্স অ্যান্ড সোসাইটি ডিউরিং দ্য আর্লি মেডিভ্যাল পিরিয়ড’ (কে. এ. নিজামি সম্পাদিত, ১৯৭৪-৭৬) এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রামাণ্য সাক্ষ্য, যেখানে তিনি রাজবংশের ইতিহাসের বদলে সুফি সাধকদের জীবন, লোকবিশ্বাস ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস অনুসন্ধানে মনোযোগী হয়েছেন— কিছু সুফি মরমীয়ার প্রতি তাঁর প্রায় ব্যক্তিগত মমত্ববোধ জন্মেছিল বলেও জানা যায়। আলিগড়ে তাঁর নেতৃত্বে গবেষণা পরিমণ্ডল গড়ে উঠেছিল মূল উৎস, বহুমাত্রিক ব্যাখ্যা ও বৈজ্ঞানিক ঐতিহাসিক পদ্ধতির উপর জোর দিয়ে। রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকেও তিনি ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে ছিলেন, এবং তাঁর রচনায় প্রধানত মধ্যযুগীয় ভারতের মানুষ, প্রতিষ্ঠান ও দ্বন্দ্ব বর্ণনার সীমা ছাড়িয়ে নতুন গুরুত্ব পায়। এভাবে তিনি ইতিহাসকে স্থির সত্য নয়, বরং নিরন্তর পুনর্বিবেচিত হতে থাকা বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার পথ তৈরি করে দেন।

মোহাম্মদ হাবিবের ঐতিহ্যকে ইরফান হাবিব নিয়ে যান আরও সুসংহত, পদ্ধতিগত স্তরে। ইরফানের জন্ম বরোদায়, প্রাথমিক লেখাপড়া লখনৌতে, কলেজ জীবন আলিগড়ে। আলিগড় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সি. সি. ডেভিসের অধীনে ডি.ফিল. সম্পন্ন হয় তাঁর। ১৯৬০ সালে রিডার এবং ১৯৬৯ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হয়ে তিনি ১৯৯১ সাল পর্যন্ত আলিগড়ে ইতিহাসের অধ্যাপনা করেন, অধ্যাপক এমেরিটাস হিসেবে যুক্ত থাকেন এবং আলিগড়ের ‘সেন্টার অফ অ্যাডভান্সড স্টাডি ইন হিস্ট্রি’-র সমন্বয়ক ও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর ‘দ্য অ্যাগ্রেরিয়ান সিস্টেম অফ মুঘল ইন্ডিয়া, [১৫৫৬-১৭০৭] গ্রন্থে তিনি মুঘল যুগের ভূমি রাজস্ব প্রশাসন, কৃষি উৎপাদন প্রযুক্তি, কৃষকের অবস্থা, জায়গিরদারি রাজস্ব বণ্টন এবং সাম্রাজ্যের কৃষি সংকটকে সামগ্রিক কাঠামোযর ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করেন। এ বিশ্লেষণ তাঁর মার্ক্সবাদী পদ্ধতির শক্তি প্রকট করে তোলে— মুঘল রাষ্ট্রকে তিনি কেবল সম্রাটের ক্ষমতা বা দরবারি রাজনীতির আলোকে নয়, বরং উদ্বৃত্ত আহরণ, প্রশাসনিক নেটওয়ার্ক ও গ্রামীণ অর্থনীতির টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে বোঝার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, যেখানে রাষ্ট্র কোনো একক অথবা স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা থাকে না, বরং উৎপাদন ব্যবস্থা, শ্রেণিসংঘাত ও রাজস্বনির্ভর ক্ষমতা-সম্পর্কের জটিল কাঠামো হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ অমিয় কুমার বাগচী তাঁকে ভারতের দুই প্রধানতম ঐতিহাসিকের অন্যতম এবং দ্বাদশ থেকে অষ্টাদশ শতকের ভারত-ইতিহাসের পণ্ডিত বলে অভিহিত করেছেন। এই সময়ে তাঁর ‘অ্যান অ্যাটলাস অফ দ্য মুঘল এম্পায়ার’ (১৯৮২) প্রকাশিত হয়, যা বিশদ সাধারণ ও আঞ্চলিক মানচিত্রের মাধ্যমে তৎকালীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসকে জীবন্ত করে তোলে এবং ইতিহাস চর্চায় ভূগোলের পদ্ধতিগত ব্যবহারের এক অনন্য নজির হয়ে ওঠে।


হাবিবের উত্তরাধিকার যেমন প্রশংসিত হয়েছে, তেমনি বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। ভারতীয় মধ্যযুগীয় অর্থনীতিকে ‘সামন্ততান্ত্রিক’ বলে চিহ্নিত করা যায় কি না, তা নিয়ে হরবংশ মুখিয়ার মতো ঐতিহাসিকদের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ পদ্ধতিগত বিতর্ক ভারতীয় ইতিহাসচর্চার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিছু সমালোচক তাঁর ব্যাখ্যাকে অতিরিক্ত কাঠামোবদ্ধ, এবং মুঘল রাষ্ট্র সম্পর্কে কিছু ক্ষেত্রে ‘অতিমাত্রায় সুসংহত’ ও ‘স্থির’ বলে আখ্যায়িত করেছেন


ইরফান হাবিবের ইতিহাসচিন্তার কেন্দ্রীয় দিক তাঁর মার্ক্সবাদী পদ্ধতির আত্মসমালোচনামূলক চরিত্র। ‘প্রবলেমস অফ মার্ক্সিস্ট হিস্টোরিওগ্রাফি’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, মার্ক্সবাদী ইতিহাসচর্চাকে স্থবির সূত্রে পরিণত করা যায় না; বরং নতুন তথ্য, নতুন প্রশ্ন ও নতুন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকে তাকে বারবার পুনর্বিবেচনা করতে হয়। ‘এসেজ ইন ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি: টুওয়ার্ডস আ মার্ক্সিস্ট পারসেপশন’ (১৯৯৫) গ্রন্থে সংকলিত প্রবন্ধগুলিতে এই আত্মসমালোচনামূলক অবস্থানটি বারবার প্রতিধ্বনিত হয়। এ অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা যান্ত্রিক নির্ধারণবাদে নেমে না গিয়ে সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামো, ধারণা, প্রযুক্তি, প্রতিষ্ঠান ও শ্রেণিগত সম্পর্কের জটিলতা এভাবেই রক্ষিত হয়। ইরফান হাবিবের কাছে ইতিহাস কেবল পদ্ধতির নাম নয়, অনুসন্ধানের একটি শৃঙ্খলা।

ইরফান হাবিবের আরেকটি অবদান, ভারতীয় ইতিহাসকে বৈশ্বিক ও তুলনামূলক প্রশ্নের সামনে নিয়ে আসা। মুঘল ভারতে পুঁজিবাদী বিকাশের সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর আলোচনায় তিনি ঔপনিবেশিক যুক্তির পুরনো ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন, যেখানে ভারতের অনগ্রসরতাকে প্রাকৃতিক দুর্বলতা বা ‘ওরিয়েন্টাল স্থবিরতা’ হিসেবে তুলে ধরা হতো— যার বহু পরবর্তী প্রতিধ্বনি এডওয়ার্ড সাইদ তাঁর ‘ওরিয়েন্টালিজম’ (১৯৭৮) গ্রন্থে বিশ্লেষণ করেছেন। এই প্রশ্ন তোলার মধ্য দিয়েই ইরফান হাবিব ভারতীয় ইতিহাসকে বিশ্ব অর্থনৈতিক বিতর্কের মধ্যে স্থাপন করেন, এবং তাঁর কাজ ঔপনিবেশিক ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ায়, ইতিহাসকে কৃষক, শ্রম, উৎপাদন ও প্রযুক্তিকে কেন্দ্রীয় বিশ্লেষণী একক হিসেবে তুলে ধরে। একই প্রশ্নবৃত্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বি, রামশরণ শর্মা, রোমিলা থাপার ও বিপান চন্দ্রের মতো ভারতীয় মার্ক্সবাদী ঐতিহাসিকদের প্রজন্ম, যাঁরা মিলিতভাবে ঔপনিবেশিক ও সাম্প্রদায়িক ইতিহাস-বয়ানের বিরুদ্ধে বিকল্প জ্ঞানকাণ্ড নির্মাণ করেছিলেন। ইরফান হাবিবের বিশিষ্টতা এই যে, তিনি এই বৃহত্তর প্রজন্মের মধ্যেও মধ্যযুগীয় অর্থনৈতিক ইতিহাসের খুঁটিনাটি পরিসংখ্যান ও দলিলনির্ভর বিশ্লেষণে অতুলনীয় কঠোরতা বজায় রেখেছেন।

ইরফান হাবিবের ইতিহাসচিন্তার একটি বিশেষ পরিধি হচ্ছে, তিনি ধর্মকে স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা হিসেবে না দেখে সামাজিক শক্তির সঙ্গে তার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন, যা ভারতীয় ইতিহাসে ধর্মীয় পরিচয়কে প্রাকৃতিক ও স্থির বলে দেখার প্রবণতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। জাতিভেদ নিয়ে আলোচনায় তিনি ‘কাস্ট’-কে বিশেষ ধরনের ‘শ্রেণি-বিভাজন’ বলে চিহ্নিত করেছেন, এবং এও দেখিয়েছেন যে দিল্লির সুলতানি শাসনের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তা বাস্তবে স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে মান্যতা পেয়েছি— অর্থাৎ তাঁর বিশ্লেষণে ধর্মীয় শাসন ও সামাজিক বাস্তবতার সম্পর্ক দ্বন্দ্বময়, সরলরৈখিক নয়।

হাবিবের উত্তরাধিকার যেমন প্রশংসিত হয়েছে, তেমনি বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। ভারতীয় মধ্যযুগীয় অর্থনীতিকে ‘সামন্ততান্ত্রিক’ বলে চিহ্নিত করা যায় কি না, তা নিয়ে হরবংশ মুখিয়ার মতো ঐতিহাসিকদের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ পদ্ধতিগত বিতর্ক ভারতীয় ইতিহাসচর্চার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিছু সমালোচক তাঁর ব্যাখ্যাকে অতিরিক্ত কাঠামোবদ্ধ, এবং মুঘল রাষ্ট্র সম্পর্কে কিছু ক্ষেত্রে ‘অতিমাত্রায় সুসংহত’ ও ‘স্থির’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। রাজনৈতিক পরিসরেও তাঁর ইতিহাসচর্চা বিতর্কের বাইরে থাকেনি— সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মুরলী মনোহর জোশী স্বয়ং একটি গ্রন্থ প্রকাশ করে ‘হাবিব অ্যান্ড কোং’-এর ইতিহাস-ব্যাখ্যাকে খণ্ডন করার চেষ্টা করেন, যা দেখিয়ে দেয় সংকীর্ণ রাজনীতি ও আলীগড়ের ধর্মনিরপেক্ষ, উৎসনির্ভর ইতিহাসচর্চার মধ্যে সংঘাত কতটা গভীর। এই দ্বৈততা গুরুত্বপূর্ণ: এমন বিতর্ক বড়ো বড়ো ঐতিহাসিকদের ঘিরেই তৈরি হয়, কারণ তাঁদের কাজ বিদ্যমান প্রশ্নকে ‘স্থির’ থাকতে দেয় না, বরং নতুন প্রশ্ন, নতুন আর্কাভ ও নতুন তর্কের ক্ষেত্র সৃষ্টি করে। হাবিবের ক্ষেত্রে এই দ্বৈততা তাঁর দুর্বলতা নয়, বরং তাঁর প্রভাবেরই পূর্ণলক্ষণ।

এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, তাঁর দীর্ঘ ইতিহাস চিন্তার কেন্দ্রে আছে সাম্প্রদায়িক ও উদ্ধত জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের বিরোধিতা। ‘আলিগড় হিস্টোরিয়ান্স সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল ইতিহাস চর্চায় বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা এবং সাম্প্রদায়িক ও জাতীয়তাবাদী বিকৃতির প্রতিরোধ গড়ে তোলা। এই সোসাইটির অধীনে প্রকাশিত বহুখণ্ডে বিভক্ত ‘আ পিপলস হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া’ সিরিজের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ইরফান হাবিব প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে শুরু করে সিন্ধু সভ্যতা, বৈদিক যুগ, মৌর্য ভারত হয়ে ঔপনিবেশিক অর্থনীতি পর্যন্ত ভারতের ইতিহাসকে শাসককেন্দ্রিকতা থেকে সরিয়ে প্রতিরোধ ও সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার বৃহত্তর ক্যানভাসে স্থাপন করেছেন— অনেকটা যেভাবে ইংরেজ ঐতিহাসিক ই. পি. থম্পসন বা এরিক হবসবম ‘নিচ থেকে ইতিহাস’ (হিস্ট্রি ফ্রম বিলো) রচনার যে ধারা প্রবর্তন করেছিলেন, তারই একটি ভারতীয় প্রতিধ্বনি হাবিব প্রভাবিত সিরিজে খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৬৮ সালে তিনি ‘নেহরু ফেলো’-র অন্যতম নির্বাচিত হন, ১৯৮২ সালে তপন রায়চৌধুরীর সঙ্গে যৌথভাবে ‘আমেরিকান হিস্টোরিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন’-এর ‘ওয়াটুমাল পুরস্কার’-এ সম্মানিত হন। ১৯৯৭ সালে ‘রয়েল হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি’র নির্বাচিত ফেলো মনোনীত হন এবং ২০০৫ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করে। তাঁকে কেন ‘ভারতরত্ন’ দেওয়া হয়নি, তা অবশ্যই অমীমাংসিত প্রশ্ন, রাজনৈতিক ক্ষুদ্রতার চিহ্ন।

হাবিবের ঐতিহ্যের তাৎপর্য এখানেই যে, ইতিহাস অতীতের মৃত দলিল নয়, মানুষ, ক্ষমতা, উৎপাদন, মতাদর্শ ও সংগ্রামের আবহমান বিজ্ঞান। মোহাম্মদ হাবিবের উদার, গতিশীল বিশ্বচেতনাবোধ এবং তাঁর পুত্র ইরফান হাবিবের কঠোর উৎসনির্ভর, সমাজ-অর্থনীতি-কেন্দ্রিক ইতিহাসচর্চা মিলিয়ে যে উত্তরাধিকার নির্মিত হয়েছে, তা কেবল পরিবারিক বৌদ্ধিক পরম্পরা নয়— তা ভারতীয় ইতিহাসচর্চার এক অনিবার্য মানদণ্ড, যেখানে অতীতকে বোঝার অর্থ দাঁড়ায় বর্তমানের ক্ষমতা-সম্পর্ককেও নিরন্তর প্রশ্ন তোলা।

♦—♦•♦—♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!