Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • জুলাই ১৯, ২০২৬

বলাগড় বন্দর : ভূ-রাজনীতি ও জাতীয় জলপথের ভবিষ্যৎ

অয়ন মুখোপাধ্যায়
বলাগড় বন্দর : ভূ-রাজনীতি ও জাতীয় জলপথের ভবিষ্যৎ

• পর্ব ৭ •

আগের পর্বগুলোতে বলাগড়ের বন্দর প্রকল্পে স্থানীয় প্রভাব, অর্থনীতি, পরিবেশ, জমি এবং নদী ভাঙনের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করেছি। কিন্তু এ প্রকল্পের গুরুত্ব শুধু হুগলি জেলার ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে বা রাজ্যের রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি দেশের পরিকাঠামো যখন জাতীয় জলপথের রূপ নেয়, তখন তার পেছনে কাজ করে বৃহত্তর কৌশলগত, জাতীয় অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। তাই সপ্তম পর্বে আমার প্রধান আলোচনার বিষয়বস্তু হলো আঞ্চলিক গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় অর্থনীতি, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বলাগড় টার্মিনালের আন্তর্জাতিক কৌশলগত ভূমিকা।

হলদিয়া থেকে প্রয়াগরাজ পর্যন্ত বিস্তৃত ১,৬২০ কিলোমিটার দীর্ঘ জাতীয় জলপথ-১ ভারতের অভ্যন্তরীণ জলপথ পরিবহনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যস্ততম ধমনী। বলাগড় এমন এক অনন্য ভৌগোলিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যা দক্ষিণবঙ্গের শিল্পাঞ্চল, ঝাড়খণ্ডের খনি অঞ্চল এবং উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার, সবকটি ক্ষেত্রের সঙ্গেই সংযোগ স্থাপনে সক্ষম। সড়কপথে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে লরি বা ট্রাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা জাতীয় সড়কগুলোতে তীব্র যানজট, সময় অপচয় ও বায়ু দূষণ তৈরি করে। নদীপথে একটি মাঝারি বার্জ একসঙ্গে প্রায় ১০০টি ট্রাকের সমান মাল বহন করতে পারে। ফলে বলাগড় টার্মিনালটি চালু হলে জ্বালানি খরচ যেমন কমবে, তেমনই কমবে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণও, যা পরিবেশের সামগ্রিক ও আন্তর্জাতিক স্বার্থে ইতিবাচক।

বলাগড় টার্মিনাল নির্মাণের অন্যতম ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব লুকিয়ে রয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্যের নতুন সমীকরণে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে ‘ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড প্রোটোকল’ রয়েছে, তার প্রধান রুট হুগলি নদীর ওপর দিয়েই গেছে। বলাগড়ে আধুনিক টার্মিনাল তৈরি হলে, ভারত থেকে ‘ফ্লাই অ্যাশ’, পাথর, কয়লা বা উৎপাদিত শিল্পজাত পণ্য সরাসরি নদীপথে বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী বন্দরে পাঠানো অনেক সহজ ও সাশ্রয়ী হবে। বর্তমানে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত বা অন্যান্য স্থলবন্দরে মাইলের পর মাইল ট্রাকের যে দীর্ঘ লাইন এবং দিনের পর দিন পণ্য আটকে থাকার যে সমস্যা দেখা যায়, নদীপথের এই বিকল্প করিডোর সেই বাণিজ্যিক জটিলতা ও সীমান্ত জট অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারে।

ভূ-রাজনীতি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির এই বিশাল খতিয়ান নিশ্চিতভাবেই বলাগড়ে বন্দর প্রকল্পের পক্ষে এক জোরালো যুক্তি । দেশের সামগ্রিক প্রগতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বার্থে এ ধরনের টার্মিনাল অপরিহার্য। কিন্তু জাতীয় বা আন্তর্জাতিক স্তরে যে বিশাল অর্থনৈতিক লাভ হবে, তার একটা অংশ কি বলাগড়ের স্থানীয় মানুষ পাবেন ? না কি দিল্লির ‘সাগরমাল্লা প্রকল্প’ বা আন্তর্জাতিক কর্পোরেট সংস্থাগুলোর মুনাফার খাতিরে বলাগড়ের বাসিন্দাদের চিরতরে ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হবে

ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর যোগাযোগের একমাত্র পথ হলো সংকীর্ণ শিলিগুড়ি করিডোর বা চিকেনস নেক। কৌশলগত ও সামরিক কারণে এই একটিমাত্র পথের ওপর চাপ কমানো দেশের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি। বলাগড় টার্মিনাল ব্যবহার করে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে সুন্দরবন রুট হয়ে আসামের পাণ্ডু বা ধুবড়ি বন্দরে পণ্য পাঠানো সম্ভব। এর ফলে উত্তর-পূর্ব ভারতে খাদ্যশস্য, সিমেন্ট এবং ভারী যন্ত্রপাতি পাঠানোর খরচ ও সময় দুই-ই একধাক্কায় অনেক কমে যাবে, যা ভারতের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষাকেও মজবুত করবে।

ভূ-রাজনীতি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির এই বিশাল খতিয়ান নিশ্চিতভাবেই বলাগড়ে বন্দর প্রকল্পের পক্ষে এক জোরালো যুক্তি । দেশের সামগ্রিক প্রগতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বার্থে এ ধরনের টার্মিনাল অপরিহার্য। কিন্তু জাতীয় বা আন্তর্জাতিক স্তরে যে বিশাল অর্থনৈতিক লাভ হবে, তার একটা অংশ কি বলাগড়ের স্থানীয় মানুষ পাবেন ? না কি দিল্লির ‘সাগরমাল্লা প্রকল্প’ বা আন্তর্জাতিক কর্পোরেট সংস্থাগুলোর মুনাফার খাতিরে বলাগড়ের বাসিন্দাদের চিরতরে ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হবে।

ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যতটা জরুরি, ঠিক ততটাই জরুরি স্থানীয় মানুষের স্বার্থকে আন্তর্জাতিক সমীকরণের অংশীদার করা। দিল্লি বা ঢাকার উল্লেখযোগ্য চুক্তি তখনই সার্থক হবে, যখন বাংলাদেশের বার্জ বা আসামের লরি চালকেরা এসে বলাগড়ের ঘরের ছেলের চালানো ধাবায় খাবে, গ্রামীণ হোটেলগুলোয় রাত কাটাবে আর স্থানীয় বাজার থেকে নিজেদের দৈনিক রসদ কিনবে। আন্তর্জাতিক এই করিডোর যেন স্থানীয় মানুষের ছোটো ছোটো ব্যবসার এক মস্ত বড়ো আন্তর্জাতিক খরিদ্দার হয়ে উঠতে পারে, সে পথ মসৃণ করাই সরকারের আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

বলাগড় বন্দর : নদী ভাঙন ও বন্যা পরিস্থিতি – ভৌগোলিক বিপর্যয় কি অবশ্যম্ভাবী?

 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!