- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুলাই ১৮, ২০২৬
ভারতের মহাকাশযাত্রার নতুন অধ্যায় ! সফলভাবে মহাশূন্যে পাড়ি দেশের প্রথম বেসরকারি অরবিটাল রকেট ‘বিক্রম’-এর
ভারতের মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে শনিবার আর একটি নতুন অধ্যায় যুক্ত হল। ইসরোর সাফল্যের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে এ বার দেশের বেসরকারি মহাকাশ শিল্পও নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিল। শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান মহাকাশ কেন্দ্র থেকে সফল ভাবে উৎক্ষেপিত হলো ভারতের প্রথম বেসরকারি অরবিটাল-শ্রেণির রকেট ‘বিক্রম-১’। হায়দরাবাদ-ভিত্তিক মহাকাশ সংস্থা ‘স্কাইরুট অ্যারোস্পেস’-এর তৈরি এ রকেট শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্যই নয়, ভারতের মহাকাশ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনারও এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল।
শনিবার সকাল সাড়ে ১১টায় উৎক্ষেপণের নির্ধারিত সময় থাকলেও শেষ মুহূর্তে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে, কিছু তথ্য পুনরায় যাচাই করার প্রয়োজন দেখা দেয়। সে কারণে উৎক্ষেপণ প্রক্রিয়ায় পরিকল্পিত বিরতি নেওয়া হয়। প্রায় ৩৫ মিনিট বিলম্বের পর দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে প্রথম উৎক্ষেপণ প্যাড থেকে আকাশে উড়ে যায় সাততলা সমান উচ্চতার চার-ধাপবিশিষ্ট রকেটটি। উৎক্ষেপণের মুহূর্তে শ্রীহরিকোটার আকাশ ছিল মেঘলা। কিন্তু সে আবহাওয়াকে উপেক্ষা করেই নির্ভুল গতিপথে এগিয়ে যায় বিক্রম-১।
‘মিশন আগমন’ নাম দেওয়া হয়েছে এই পরীক্ষামূলক উড্ডয়নকে। নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভারতের বেসরকারি মহাকাশ শিল্পের নতুন যুগে প্রবেশের বার্তা। উৎক্ষেপণের প্রায় ১৬ মিনিটের মধ্যেই রকেটটি তার নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করে। প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার উচ্চতার নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথে (লো আর্থ অরবিট) একাধিক দেশি-বিদেশি প্রযুক্তি সফল ভাবে স্থাপন করে বিক্রম-১। মিশনের সাফল্যের পর ‘স্কাইরুট অ্যারোস্পেস’ জানায়, বিক্রম-১ সফল ভাবে কক্ষপথে পৌঁছেছে। সমস্ত ‘পেলোড’ নির্ধারিত ভাবে মুক্ত করা হয়েছে। সংস্থার ভাষায়, এটি এক বিরাট সাফল্য। ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির জনক বিক্রম সারাভাইয়ের স্মৃতিতে রকেটটির নামকরণ করা হয়েছে ‘বিক্রম-১’। প্রযুক্তিগত দিক থেকেও এটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সম্পূর্ণ কার্বন কম্পোজিট কাঠামোয় তৈরি রকেটটির ওজন তুলনামূলক কম হলেও শক্তি ও স্থায়িত্ব অনেক বেশি। এর সমস্ত প্রপালশন ব্যবস্থা স্কাইরুটের নিজস্ব গবেষণাগারে তৈরি। ব্যবহৃত হয়েছে অত্যাধুনিক থ্রিডি-প্রিন্টেড রকেট ইঞ্জিন আর উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কঠিন জ্বালানিভিত্তিক বুস্টার।
এ অভিযানে ‘গ্রাহা স্পেস’, ‘কসমোসার্ভ’, ‘ডিসিউবড’ এবং ‘স্কাইরুট’-এর নিজস্ব ‘স্কোপ’ পরীক্ষার পেলোড বহন করা হয়েছে। পাশাপাশি মহাকাশে পাঠানো হয়েছে ‘কসমিক ব্লুম’ নামে একটি শিল্পকর্মও। প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রতীকী বার্তারও অভাব নেই এ মিশনের। রকেটের সঙ্গে পাঠানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাতে লেখা ‘বন্দে মাতরম’ পোস্টকার্ড। এছাড়াও বর্তমান ও প্রাক্তন ইসরো চেয়ারম্যানদের বার্তা, ভারতীয় মহাকাশচারীদের শুভেচ্ছা এবং স্কাইরুটের কর্মী, বিনিয়োগকারী ও সমর্থকদের লেখা বার্তাও মহাকাশে পৌঁছেছে। মিশনের সাফল্যের খবর পৌঁছতেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উৎক্ষেপণের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত বিজ্ঞানী, কর্মী ও কর্মকর্তাদের অভিনন্দন জানান। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘ভারতের প্রথম বেসরকারি নির্মিত অরবিটাল উৎক্ষেপণযান বিক্রম-১ দেশের মহাকাশযাত্রায় এক ঐতিহাসিক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। ভারতের তরুণ প্রজন্মের প্রতিভা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং উদ্যোক্তা-মানসিকতার প্রতিফলন এটি।’
পরে, ‘স্কাইরুট’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা পবন কুমার চন্দনা ও নাগা ভারত ডাকার সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা শুধু মহাকাশে নতুন গাছ রোপণ করোনি, মাটিতেও এমন এক নতুন শিকড়কে শক্তিশালী করেছেন, যা আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।’ তাঁর মতে, এ সাফল্য ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর স্বপ্নকে আরও শক্ত ভিত দিল। ‘ইন-স্পেস’-এর চেয়ারম্যান ড. পবন গোয়েঙ্কাও এ উৎক্ষেপণকে ঐতিহাসিক বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, ‘এটি শুধু স্কাইরুটের জন্য নয়, ভারতের জন্যও এবং সম্ভবত গোটা বিশ্বের বাণিজ্যিক মহাকাশ শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।’ ইসরোর প্রাক্তন চেয়ারম্যান এস. সোমনাথও স্কাইরুটের তরুণ বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। তাঁর মতে, বেসরকারি সংস্থার হাতে এ ধরনের জটিল মহাকাশ মিশনের সফল বাস্তবায়ন ভারতের মহাকাশ গবেষণা ও শিল্পকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেবে।
সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, উৎক্ষেপণের সময় সাময়িক বিরতি এলেও পরে রকেটের প্রতিটি ধাপ নির্ভুল ভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বিচ্ছিন্নকরণ থেকে শুরু করে চূড়ান্ত কক্ষপথে প্রবেশ— সব কিছুই পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়েছে। এ তথ্য বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন থেকেই ‘স্কাইরুট’ মূল্যবান প্রকৌশলগত তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। সে তথ্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে বিক্রম রকেট পরিবারের আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি করা হবে। প্রায় ৩৫০ কিলোগ্রাম ওজনের ‘পেলোড’ নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথে বহন করার ক্ষমতা রয়েছে বিক্রম-১-এর। তবে ‘স্কাইরুট’-এর লক্ষ্য শুধু একটি রকেট উৎক্ষেপণ নয়। সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হলো মহাকাশে ‘ক্যাব সার্ভিস’ চালু করা। অর্থাৎ, উপগ্রহ সংস্থা বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলি প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কক্ষপথে নিজেদের উপগ্রহ পাঠাতে সংস্থার রকেট ভাড়া নিতে পারবে। অনেকটা যেমন প্রয়োজনমতো ট্যাক্সি বুক করা হয়।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে ইসরোর দুই প্রাক্তন বিজ্ঞানী পবন কুমার চন্দনা এবং নাগা ভারত ডাকা ‘স্কাইরুট অ্যারোস্পেস’ প্রতিষ্ঠা করেন। দ্রুত বর্ধনশীল ক্ষুদ্র উপগ্রহ বাজারের জন্য কম খরচে, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য উৎক্ষেপণ পরিষেবা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই তাঁদের যাত্রা শুরু। ২০২২ সালে তাঁদের ‘বিক্রম-এস’ ভারতের প্রথম বেসরকারি নির্মিত রকেট হিসেবে মহাকাশে পৌঁছে নজির গড়েছিল। চার বছরের মধ্যে সে সাফল্যকে আরও বড়ো মাত্রা দিল ‘বিক্রম-১’। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সাফল্যের ফলে শুধু একটি বেসরকারি সংস্থার নয়, ভারতের মহাকাশ শিল্পের সামগ্রিক অবস্থানও শক্তিশালী হলো। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কেন্দ্রের মহাকাশ খাত সংস্কার নীতির ফলে বেসরকারি সংস্থাগুলির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিক্রম-১-এর সফল উৎক্ষেপণ সে নীতির কার্যকারিতারও বাস্তব প্রমাণ। মহাকাশ গবেষণা ও বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণের বৈশ্বিক বাজারে ভারতের অংশীদারিত্ব বাড়ানোর পথে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
❤ Support Us





