- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুলাই ১৮, ২০২৬
বন কেটে কয়লার পথ, বিপন্ন প্রায় ৪ লক্ষ গাছ। দেশের কোন দুই রাজ্যে ২ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে খননের ছাড়পত্র কেন্দ্রের ?
দেশে কয়লা উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে একের পর এক খনি প্রকল্পে সবুজ সংকেত দিচ্ছে কেন্দ্র। সে ধারাবাহিকতায় ছত্তীশগড় ও ওড়িশায় ২ হাজার হেক্টরেরও বেশি বনভূমি খনির কাজে ব্যবহারের জন্য ‘নীতিগত অনুমোদন’ দিল কেন্দ্রের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকের অধীন ‘ফরেস্ট অ্যাডভাইজরি কমিটি’। এ অনুমোদনের ফলে দু-রাজ্যে কয়েক লক্ষ গাছ কাটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি, হাতি-সহ একাধিক বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং বননির্ভর গ্রামবাসীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
কমিটির সাম্প্রতিক বৈঠকের কার্যবিবরণী অনুযায়ী, মোট ১৩টি প্রকল্পের জন্য ‘স্টেজ-১’ বা ‘নীতিগত বন অনুমোদন’-এর সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তিনটি বৃহৎ কয়লাখনি প্রকল্প। তিন প্রকল্পেই প্রায় ১,৭৩৭ হেক্টর বনভূমি অন্য কাজে ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে, যা অনুমোদনের জন্য বিবেচিত মোট ২,০০৪ হেক্টর বনভূমির সিংহভাগ। ছত্তীশগড়ের রায়গড় জেলায় অবস্থিত পুরুঙ্গা কয়লা ব্লক এবং পেলমা ওপেন কাস্ট মাইন প্রকল্পের জন্য মোট ৯৮৩.৪৪ হেক্টর বনভূমি ব্যবহারের সুপারিশ করেছে কমিটি। এর মধ্যে পুরুঙ্গা প্রকল্পের জন্য ৬২১.৩৩১ হেক্টর এবং পেলমা প্রকল্পের জন্য ৩৬২.১০৯ হেক্টর বনভূমি বরাদ্দের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পুরুঙ্গা কয়লা ব্লকের প্রকল্পটি পরিচালনা করবে ‘আম্বুজা সিমেন্টস লিমিটেড’, যা বর্তমানে আদানি গোষ্ঠীর অন্তর্গত। অন্যদিকে পেলমা ওপেন কাস্ট মাইন প্রকল্পটি রাষ্ট্রায়ত্ত ‘সাউথ ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেড’-এর নামে থাকলেও, ২০২৩ সালে সংস্থাটি ‘আদানি এন্টারপ্রাইজেস’ -এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘পেলমা কোলিয়ারিজ’-এর সঙ্গে খনি পরিচালনার চুক্তি স্বাক্ষর করে।
পরিবেশ মন্ত্রকের নথি অনুযায়ী, পুরুঙ্গা প্রকল্পে ৪,৩৬৮টি গাছ কাটতে হবে। যদিও প্রকল্পটি ভূগর্ভস্থ খনন পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে, তবুও মাটির উপরের স্তরে ‘টেনসাইল স্ট্রেন’ বা প্রসারণজনিত বিকৃতির আশঙ্কা রয়েছে। অনুমান করা হয়েছে, বনাঞ্চলের নির্দিষ্ট অংশে প্রতি মিটারে ৪.৪৮ মিলিমিটার পর্যন্ত ভূমির প্রসারণ ঘটতে পারে। সে কারণেই প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে উপযুক্ত প্রশমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে কমিটি। ভূমি বসে যাওয়ার মাত্রা পূর্বাভাস ছাড়িয়ে গেলে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ক্ষতিপূরণমূলক বনসৃজনও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
অন্যদিকে, পেলমা ওপেন কাস্ট মাইন প্রকল্পে প্রভাব আরও বিস্তৃত। প্রকল্পটির মোট খনন লিজ এলাকা ২,০৭৭.৯৩৫ হেক্টর। এর মধ্যে ৩৬২ হেক্টরেরও বেশি বনভূমি রয়েছে। সরকারি নথি বলছে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ৫২,৫৭০টি গাছ কাটা পড়বে। উদ্বেগের বিষয়, খনি এলাকা উচ্চ সংরক্ষণমূল্যসম্পন্ন বনাঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত। বুনো হাতির বিচরণক্ষেত্র এলাকাটি কেলো নদীর সংলগ্ন। যদিও সরকারি রিপোর্টে স্বীকৃত হাতি করিডরের অস্তিত্বের কথা বলা হয়নি, কিন্তু স্থানীয়দের মতে, এ অঞ্চলে নিয়মিত হাতির চলাচল রয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড়ো পরিবেশগত অভিঘাত পড়তে পারে ওড়িশার অঙ্গুল জেলার আলকানন্দা কয়লাখনি প্রকল্পে। ‘রুংটা সন্স প্রাইভেট লিমিটেড’-এর এই প্রকল্পের জন্য ৭৫৪.০৩৯ হেক্টর বনভূমি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে কমিটি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই এক প্রকল্পেই ৩ লক্ষ ৩০ হাজারেরও বেশি গাছ কাটা হতে পারে। ফলে তিনটি কয়লা প্রকল্প মিলিয়ে প্রায় ৩ লক্ষ ৮৯ হাজার গাছ কাটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ওডিশার কেওঁঝর জেলায় ‘টাটা স্টিল’-এর গন্ধলপাড়া লৌহ আকরিক ব্লকের জন্য ২১৬.৮৭৫ হেক্টর বনভূমি ব্যবহারের প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়েছে। তবে সেখানে ‘বন সংরক্ষণ আইন’-এর অধীনে চূড়ান্ত ছাড়পত্র ছাড়া জমির চরিত্র পরিবর্তন বা খননকাজ শুরু করা যাবে না বলে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে কমিটি।
দুই রাজ্যের প্রকল্পগুলিকে ঘিরে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশবিদ ও প্রাক্তন বনকর্তাদের একাংশ। অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক এবং প্রাক্তন পরিবেশ মন্ত্রক কর্মকর্তা প্রকৃতি শ্রীবাস্তবের মতে, আলকানন্দা কয়লাখনি প্রকল্পের প্রভাব শুধুমাত্র বনভূমি বা গাছের সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর দাবি, ‘এলাকাটি তফসিলি জনজাতি অধ্যুষিত। ফলে বন উজাড়ের পাশাপাশি গ্রাম ও বননির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকাও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সিজিমালি বক্সাইট প্রকল্প নিয়ে যে ধরনের উদ্বেগ দেখা গিয়েছিল, এখানেও একই প্রশ্ন উঠে আসছে।’ যদিও, পরিবেশ মন্ত্রকের নিয়ম অনুযায়ী, ‘স্টেজ-১’ অনুমোদন কোনো প্রকল্পের চূড়ান্ত ছাড়পত্র নয়। এটি নীতিগত সম্মতি মাত্র। প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে ক্ষতিপূরণমূলক বনসৃজন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ পরিকল্পনা, ‘নেট প্রেজেন্ট ভ্যালু’ জমা দেওয়া-সহ একাধিক শর্ত পূরণ করতে হবে। সব শর্ত পূরণের পরই মিলবে ‘স্টেজ-২’ বা চূড়ান্ত অনুমোদন। তার পর সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার বনভূমি অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য আনুষ্ঠানিক বিবৃতি জারি করবে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে অন্যত্র। একদিকে দেশজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন, তাপপ্রবাহ, বনভূমি সংকোচন আর বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অন্যদিকে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার যুক্তিতে কয়লা উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছে কেন্দ্র। তীব্র এ টানাপোড়েনের মাঝেই বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল এখন খনির সম্প্রসারণের নতুন মানচিত্রে জায়গা করে নিতে চলেছে। গাছ, বন আর স্থানীয় মানুষের ভবিষ্যৎ কতটা সুরক্ষিত থাকবে, সে প্রশ্নের উত্তর আপাতত সময়ের হাতেই।
❤ Support Us





