- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- জুলাই ১৯, ২০২৬
চিরবিস্ময় বিশ্ববিধাত্রীর
দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকন বলেছিলেন, ‘Read not to believe and take for granted… but to weigh and consider’ অর্থাৎ কোনো কিছুকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করার জন্য পড়ো না, (শুধু বিরোধিতা করার জন্যও না); পড়ো নিজের বিচারবুদ্ধিকে সচল রাখার জন্য। এ উক্তির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য এখন আরও গভীরভাবে অনুভূত হয়। প্রকৃত পাঠ মানে কেবল তথ্য ও তত্ত্ব মস্তিষ্কে সঞ্চয় করা নয়, বরং গভীর মনন, অনুধ্যান এবং বিচারশক্তির বিকাশ ঘটানোও বটে।
সমাজের প্রত্যেক মানুষ যে সারাজীবন দর্শন, ইতিহাস বা সমাজচিন্তায় নিমগ্ন থাকবেন, এমন প্রত্যাশা অযৌক্তিক। যখন একটি সমাজ সমষ্টিগতভাবে পাঠবিমুখ, মননবিমুখ এবং চিন্তাবিমুখ হয়ে ওঠে, তখন সে শূন্যস্থান পূরণ করে অন্য কোনো একটি শক্তি। আমাদের সময়ে এ দায়িত্ব কার্যত গ্রহণ করেছে সমাজ মাধ্যম।
এ মাধ্যমে একটানা এমন এক বিকল্প পাঠপ্রক্রিয়া গড়ে উঠেছে, যেখানে গবেষণার পরিবর্তে প্রচার, যুক্তির পরিবর্তে আবেগ, ইতিহাসের পরিবর্তে ভ্রান্ত ইতিহাস এবং মানবিকতার পরিবর্তে বিদ্বেষকে শেখানো হয়। প্রধানত দুটি পরস্পরবিরোধী শিবির কাজটি করছে। উভয়েরই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। সমাজ ও ইতিহাসের নির্বাচিত, বিকৃত এবং প্রায়শই কিছু অসত্য পাঠ মানুষের মনে প্রতিষ্ঠিত করাই তাদের লক্ষ্য।
মানুষের ধৈর্য কমে এসেছে। সমাজদর্শন, ইতিহাস, সংস্কৃতি কিংবা ভাষাতত্ত্বের গভীরে প্রবেশ করার আগ্রহ ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। গত তিন দশকের ধারাবাহিক প্রচারের ফলে বিদ্বেষেরও একটি দর্শন সমাজে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে। পরধর্মবিদ্বেষ আর গোপন বিষয় নয়; ঘরে-বাইরে, পারিবারিক আলোচনায়, সামাজিক আড্ডায় তা নির্দ্বিধায় উচ্চারিত হয়।
উচ্চশিক্ষিত পুরুষের পাশাপাশি শিক্ষিত নারী, মায়েরা ও গৃহবধূরাও অনেক সময় বিনা দ্বিধায় এমন ধারণা ব্যক্ত করেন যে, মুসলিমরা দেশভাগ করেছে, অতএব ভারতে তাদের থাকার নৈতিক অধিকার নেই; তাদের সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়াই উচিত। এমনকি আরও কঠোর ভাষাও উচ্চারিত হতে শোনা যায়। তাঁদের অনেকের মনেই বদ্ধমূল ধারণা, দেশভাগের পর ভারত কার্যত কেবল হিন্দুদের রাষ্ট্র হওয়া উচিত। নেহেরু আর গান্ধীর জন্য ধর্মীয় রাষ্ট্র হওয়াটা আটকে আছে। ভারতের সংবিধান, স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস এবং রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে এ ধারণার কোনো সামঞ্জস্য নেই।
অ্যান্ড্রয়েড ফোন আজ প্রত্যেকের হাতে। ফলে প্রায় সবাই প্রচারিত বিদ্বেষের সম্ভাব্য গ্রাহক। অনেকে বিনা যাচাইয়ে বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, মহাত্মা গান্ধী স্বেচ্ছায় দেশের ক্ষতি করে গেছেন, জওহরলাল নেহরুও তাই, সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন না কি অন্যের গবেষণা চুরি করে দার্শনিক হয়েছেন, আর মুসলিমরা স্বভাবগতভাবে দেশপ্রেমহীন। ইদানীং উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত, নৃত্যকলা, মুঘল স্থাপত্য, চিত্রকলা, ভাস্কর্য এবং ভারতীয় সংস্কৃতির বহুস্তরীয় ঐতিহ্যের প্রতিও এক ধরনের বিরূপ ধারণা তৈরি করা হয়েছে।
গ্রন্থের পরিবর্তে রিল, সামাজিক মাধ্যমে প্রচার এবং অপপ্রচার, গবেষণার পরিবর্তে গুজব এবং যুক্তির পরিবর্তে বিদ্বেষ মানুষের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন সমাজ ধীরে ধীরে নিজের বৌদ্ধিক ক্ষমতা হারায়। তাই আজ সবচেয়ে জরুরি কাজ, মননশীলতায় ফিরে যাওয়া, ভাবনাচিন্তার ধারাবাহিকতায় ফিরে যাওয়া এবং ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে তথ্যনিষ্ঠ ও মানবিক দৃষ্টিতে পুনরায় অনুধাবন করা
ভাষার ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত আরবি ও ফারসি শব্দের উৎসের বৈধতা অস্বীকার করা হয়, ভাষাতত্ত্ব বলছে বাংলাভাষা একটি সহস্রাব্দের সাংস্কৃতিক বিনিময়েই গড়ে উঠেছে, বিস্তার লাভ করেছে এবং সমৃদ্ধ হয়েছে। অথচ ভাষার ইতিহাস, শব্দের উৎস এবং ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন সম্পর্কে তাঁদের ধারণা অত্যন্ত সীমিত। আজও ভারতের প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও রাজস্ব ব্যবস্থার বহু কাঠামো যে মুঘল আমল থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে এসেছে, সে ঐতিহাসিক বাস্তবতাও তাঁরা স্বীকার করতে চান না।
এই প্রবণতা কেবল মতপার্থক্যের বিষয় নয়; সামগ্রিকভাবে আমাদের সমাজের মননহীনতার সামাজিক পরিণতি। যখন গ্রন্থের পরিবর্তে রিল, সামাজিক মাধ্যমে প্রচার এবং অপপ্রচার, গবেষণার পরিবর্তে গুজব এবং যুক্তির পরিবর্তে বিদ্বেষ মানুষের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন সমাজ ধীরে ধীরে নিজের বৌদ্ধিক ক্ষমতা হারায়। তাই আজ সবচেয়ে জরুরি কাজ, মননশীলতায় ফিরে যাওয়া, ভাবনাচিন্তার ধারাবাহিকতায় ফিরে যাওয়া এবং ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে তথ্যনিষ্ঠ ও মানবিক দৃষ্টিতে পুনরায় অনুধাবন করা। মননশীল সমাজ কেবল বিদ্বেষের রাজনীতিকে পরাজিত করতে পারে। এবং এ কাজে প্রধান প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো অগুনতি সত্য মিথ্যা মিশ্রিত বার্তা, রিল, ভিডিও ও উপদেশ।
এ প্রসঙ্গে বিশ্বের নানা অভিজ্ঞতার দিকেও তাকানো প্রয়োজন। ধর্মীয় রাষ্ট্রের আদর্শ যে নিজে থেকেই ন্যায়, সমৃদ্ধি, মানবিকতা ও সুশাসনের নিশ্চয়তা দেয়, ইতিহাস কখনো তার সাক্ষ্য বহন করে না। পাকিস্তান, আফগানিস্তান, অতীতে হিন্দুরাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত নেপাল, বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মায়ানমার, কিংবা বিভিন্ন আরব রাষ্ট্র, প্রত্যেকের ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতা আমাদের সামনে ভিন্ন ভিন্ন উদাহরণ তুলে ধরছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও যখনই ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তির প্রভাব বেড়েছে, তখনই গণতন্ত্র, সংখ্যালঘুর অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সামাজিক সম্প্রীতি সংকটের মুখে তো পড়েছেই, সংখ্যাগরিষ্ঠর উপরও নিপীড়ন বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা কোনো বিচক্ষণ সমাজকে উৎসাহিত করার নয়, সতর্ক হওয়ার শিক্ষা দেয়।
রাষ্ট্রনায়কেরা ঈশ্বর, আল্লাহ বা অন্য কোনো ধর্মীয় আদর্শের নামে শপথ গ্রহণ করেন বলেই তাঁদের চিন্তা, চরিত্র বা কর্ম স্বয়ংক্রিয়ভাবে মহৎ হয়ে ওঠে, তা তো নয়। ইতিহাসে এমন কোনো প্রমাণ নেই যে, কেবল ধর্মীয় পরিচয় বা ধর্মের নামে শাসন প্রতিষ্ঠা করলেই দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, বৈষম্য, হিংসা কিংবা স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটে। মানুষের নৈতিকতা গড়ে ওঠে শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক চর্চার মাধ্যমে। রাষ্ট্রের ধর্মীয় পরিচয় তার বিকল্প হতে পারে না।
ভারতবর্ষে গত কয়েক দশকে নিরন্তর প্রচারের মাধ্যমে যে একপেশে মানসিকতা নির্মাণের চেষ্টা চলছে, তার দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি নিয়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে। আমরা দেখছি, অতি উৎসাহে অনেক শহর, গ্রাম, জেলা কিংবা প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তিত হচ্ছে; ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, এমনকি বিজ্ঞান শিক্ষার উপরও মতাদর্শগত হস্তক্ষেপ ঘটছে। যোগ্য ব্যক্তির স্থলে আরও যোগ্য কেউ আসতে পারেন, কিংবা অযোগ্য ব্যক্তির প্রতিষ্ঠাও হতে পারে। কিন্তু এইসব দৃশ্যমান পরিবর্তনের আড়ালে যদি দেশের অর্থনীতি ক্রমশ কয়েকটি পরিবারের হাতে কেন্দ্রীভূত হতে থাকে, জাতীয় সম্পদ যদি কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে পুঞ্জিভূত হয়, শিল্পোন্নয়ন যদি ব্যাহত হয়, কর্মসংস্থানের সংকট যদি গভীরতর হয় এবং বৈদেশিক ঋণের চাপ যদি বাড়তেই থাকে, তবে দেশের অগ্রগতি নয়, ভিন্নতর দিকে চলে যাওয়ার আশঙ্কাই প্রবল হবে।
ভারতবর্ষ মূলত হাজার হাজার বছরের এক দীর্ঘ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক সহযাত্রার নাম। এ ভূখণ্ডের সভ্যতা কোনো একক জনগোষ্ঠী, একক ভাষা, একক বিশ্বাস কিংবা একক জীবনপদ্ধতির সৃষ্টি নয়। অসংখ্য জাতি, জনজাতি, ভাষাগোষ্ঠী, পার্বত্য সমাজ, অরণ্যচারী, কৃষিজীবী সম্প্রদায়, কারিগর, শিল্পী, সাধক এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত জীবনসাধনায় গড়ে উঠেছে বিশ্বের বিস্ময়, সম্মেলিত ভারত
ভারতবর্ষের প্রকৃত শক্তি অন্যত্র। হাজার বছরের ইতিহাসে অসংখ্য সংঘাত, আক্রমণ, রাজনৈতিক উত্থান-পতন এবং সামাজিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও এই দেশ শান্তি, সহাবস্থান, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান এবং বহুত্ববাদী চেতনাকে ধারণ করে এক অনন্য সভ্যতার পরিচয় দিয়েছে। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘বিশ্ববিধাত্রীর এক চিরবিস্ময়’, সেই বিস্ময়ের উৎস কোনো একক ধর্মীয় পরিচয়ে নয়, বৈচিত্র্যের মধ্যে সহাবস্থানের ঐতিহ্যে।
আমাদের বিবেচনার বিষয় কেবল আগামী একটি বা দুটি কিংবা তিনটি নির্বাচনী পর্ব নয়। আমাদের ভাবতে হবে আগামী শতাব্দী, এমনকি আগামী সহস্রাব্দের ভারতকে নিয়ে। আমরা কি এমন একটি দেশ দেখতে চাই, যেখানে মানুষের পরিচয়ের ভিত্তি হবে ঘৃণা, সন্দেহ এবং প্রতিশোধ? না কি এমন এক সমাজ, যেখানে মতের পার্থক্য থাকবে, ধর্মের বৈচিত্র্য থাকবে? মানবিকতা, ন্যায়, যুক্তিবোধ এবং পারস্পরিক সম্মান জাতীয় জীবনের ভিত্তি হয়ে থাকবে?
ইতিহাসের শেষ কথা কখনো বিদ্বেষ নয়। সভ্যতার শেষ অর্জনও কোনো সম্প্রদায়ের অপর সম্প্রদায়ের ওপর বিজয় নয়। মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন তার মনন, তার সহমর্মিতা আর তার ন্যায়বোধ। যদি সে শক্তিকেই আমরা হারিয়ে ফেলি, তবে যত বিজয়ের স্বপ্নই দেখি না কেন, শেষ পর্যন্ত ভারত পরাজিত শক্তিতে রূপান্তরিত হবে।
ভারতবর্ষকে বুঝতে গেলে কেবল রাজবংশের ইতিহাস, যুদ্ধের ইতিহাস বা ধর্মীয় ধারার ইতিহাস জানলে চলে না। ভারতবর্ষ মূলত হাজার হাজার বছরের এক দীর্ঘ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক সহযাত্রার নাম। এ ভূখণ্ডের সভ্যতা কোনো একক জনগোষ্ঠী, একক ভাষা, একক বিশ্বাস কিংবা একক জীবনপদ্ধতির সৃষ্টি নয়। অসংখ্য জাতি, জনজাতি, ভাষাগোষ্ঠী, পার্বত্য সমাজ, অরণ্যচারী মানুষ, কৃষিজীবী সম্প্রদায়, কারিগর, শিল্পী, সাধক এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত জীবনসাধনায় গড়ে উঠেছে বিশ্বের বিস্ময়, সম্মেলিত ভারত।
ভারতবর্ষের প্রকৃত পরিচয় তাই একমাত্রিক বর্ণনায় ধরা সম্ভব নয়। এখানে একই সঙ্গে বেদ-উপনিষদের চিন্তা, বৌদ্ধ-জৈন করুণাবোধ, লোকায়ত দর্শন, ভক্তি-সুফি মানবপ্রেম, পাহাড়-অরণ্যের প্রকৃতিনির্ভর জীবনবোধ এবং অসংখ্য অখ্যাত মানুষের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রাম। সবকিছু মিলিয়েই এই সভ্যতার আত্মা
নদী-সমতলের সভ্যতার পাশাপাশি পাহাড়, অরণ্য ও সীমান্ত অঞ্চলের জনগোষ্ঠীরাও ভারতীয় সমাজ-সংস্কৃতির নির্মাণে সমান অংশীদার। নাগা, কুকি, খাসি, গারো, মিজো, বোড়ো, ডিমাসা, বরাহি সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের নানা জনগোষ্ঠী; মধ্যভারতের অরণ্য অঞ্চলের আদিবাসী সমাজ; হিমালয় ও অন্যান্য পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসীরা তাঁদের নিজস্ব জীবনদর্শন, প্রকৃতিচেতনা, লোকজ জ্ঞান, সংগীত, শিল্প, সামাজিক মূল্যবোধ দিয়ে ভারতীয় অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করেছেন।
ভারতীয় সংস্কৃতির অনন্য সম্পদ তার অপ্রাতিষ্ঠানিক ধারাগুলি। রাষ্ট্র বা সংগঠিত ধর্মব্যবস্থার বাইরে থেকেও অসংখ্য লোকবিশ্বাস, গৌণ ধর্মাচার, আঞ্চলিক আধ্যাত্মিক সাধনা, প্রকৃতিপূজা, স্মরণীয় ও বরণীয় পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য, লোকদেবতার উপাসনা এবং মানবকেন্দ্রিক দর্শন ভারতীয় জীবনের গভীরে প্রবাহিত হয়েছে। এই ছোটো ছোটো স্রোত সমাজকে অধিক সহনশীল, গ্রহণশীল এবং মানবিক করে রেখেছে।
এ সভ্যতার নির্মাণে শুধু ক্ষমতাবান বা বিশেষ কোনো সমাজ নয়, প্রান্তিক মানুষের অবদানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমজীবী মানুষ, কারুশিল্পী, কৃষক, মৎস্যজীবী, যাযাবর সম্প্রদায়, লোকশিল্পী, এমনকি দীর্ঘদিন সামাজিকভাবে উপেক্ষিত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষও ভারতীয় সমাজের আচার, সংস্কৃতি ও লোকজীবনের অংশ হয়ে আছেন। তাঁদের উপস্থিতি প্রমাণ করে ভারতীয় সমাজের পরিধি কখনো সংকীর্ণ পরিচয়ে আবদ্ধ ছিল না।
ভারতবর্ষের প্রকৃত পরিচয় তাই একমাত্রিক বর্ণনায় ধরা সম্ভব নয়। এখানে একই সঙ্গে বেদ-উপনিষদের চিন্তা, বৌদ্ধ-জৈন করুণাবোধ, লোকায়ত দর্শন, ভক্তি-সুফি মানবপ্রেম, পাহাড়-অরণ্যের প্রকৃতিনির্ভর জীবনবোধ এবং অসংখ্য অখ্যাত মানুষের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রাম। সবকিছু মিলিয়েই ভারতীয় সভ্যতার আত্মা।
নজরুলের ভাষায় যে ‘উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাত্রীর’ উচ্চারণ, সে বিস্ময় কোনো একক গৌরবের ঘোষণা নয়; বহু মানুষের, বহু পথের, বহু সাধনার সম্মিলিত অভিযাত্রার প্রতীক। ভারতবর্ষের শক্তি তার বহুস্তরীয় জীবনচর্যার সৃজনশীল সমন্বয়ে। ভবিষ্যতের ভারতও তখনই আরও শক্তিধর হবে, যখন সে নিজের বহুবর্ণ, বহুস্বর, বহুমাত্রিক উত্তরাধিকারকে সম্মানের সঙ্গে ধারণ করতে আরও সক্ষম হয়ে উঠবে।
♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦
❤ Support Us






