Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • জুলাই ৫, ২০২৬

বলাগড় বন্দর : নদী ভাঙন ও বন্যা পরিস্থিতি – ভৌগোলিক বিপর্যয় কি অবশ্যম্ভাবী?

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বলাগড় বন্দর : নদী ভাঙন ও বন্যা পরিস্থিতি – ভৌগোলিক বিপর্যয় কি অবশ্যম্ভাবী?

• পর্ব ৬ •

গত পর্ব গুলোতে আলোচনা করেছি কীভাবে এই বন্দর প্রকল্প স্থানীয় কৃষি ও মৎস্যজীবীদের চিরাচরিত জীবিকাকে অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে। তবে বলাগড় বন্দরকে ঘিরে কেবল অর্থনৈতিক বা সামাজিক আশঙ্কাই শেষ কথা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অত্যন্ত গুরুতর একটি ভৌগোলিক, জলবিজ্ঞান এবং পরিবেশ-প্রকৌশলগত প্রশ্ন। হুগলি নদীর এই নির্দিষ্ট অংশের গতিপ্রকৃতি আর তার চারপাশের ভূখণ্ড এমনিতেই প্রাকৃতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল।

তাই এ পর্বে আমার আলোচনার মূল বিষয় হলো প্রস্তাবিত নদী বন্দর বলাগড় ও সংলগ্ন অঞ্চলের নদী ভাঙন কিংবা বন্যা পরিস্থিতিকে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ বা অনিয়ন্ত্রিত করে তুলবে না তো!

যাঁরা হুগলি জেলার ভৌগোলিক গঠনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত, তাঁরা জানেন যে বলাগড়, জিরাট, গুপ্তিপাড়া এবং সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা বছরের পর বছর ধরে মারাত্মক নদী ভাঙনের শিকার। এ অঞ্চলে হুগলি নদী বেশ কয়েকটি তীব্র বাঁক বা ‘মিয়েন্ডার’ নিয়েছে। নদী বিজ্ঞানের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, নদীর বাঁকের বাইরের দিকে জলের ধাক্কা ও স্রোতের বেগ সবসময় বেশি থাকে, সেখানে ভাঙন তীব্র রূপ নেয়। তদুপরি, এখানকার মাটির গঠন মূলত বেলে-পলিযুক্ত, যা জলের তোড়ে খুব সহজেই তলা থেকে ধসে যায়। প্রতি বছর বর্ষাকালে বলাগড়ের বিঘার পর বিঘা দামি কৃষিজমি, আমবাগান, বহু মানুষের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। স্থানীয় মানুষের কাছে নদী ভাঙন কোনো সেমিনারের তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, এ এক জীবন্ত, বার্ষিক আতঙ্ক।

বর্ষাকালে দামোদর বা রূপনারায়ণের মতো নদীর ছাড়া জল এবং গঙ্গার নিজস্ব জলস্ফীতির কারণে এ অঞ্চল সহজেই প্লাবিত হয়। বন্দর সংলগ্ন এলাকায় জেটি, রিটেইনিং ওয়াল এবং অন্যান্য কংক্রিটের পরিকাঠামো নির্মাণের ফলে নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহের পথ সংকুচিত হতে পারে। নদীর বুদবুদ বা চরের অংশগুলো বন্যা প্রতিরোধে প্রাকৃতিক ‘বাফার’ হিসেবে কাজ করে। অতিরিক্ত জল হলে তা চরের ওপর ছড়িয়ে পড়ে মূল জনবসতিকে রক্ষা করে। কিন্তু বন্দরে লজিস্টিকস হাব গড়ার জন্য যদি এই চরগুলোকে কংক্রিটে বাঁধিয়ে দেওয়া হয়, তবে বন্যার জল সরাসরি গ্রামের ভেতর ঢুকে পড়বে এবং জলমগ্নতার স্থায়িত্ব বাড়িয়ে দেবে

এরকম প্রাকৃতিকভাবে ভাঙনপ্রবণ ও সংবেদনশীল এলাকায় যখন আধুনিক নদী বন্দর গড়ে তোলা হবে, তখন নদীর ওপর মানুষের কৃত্রিম হস্তক্ষেপ ও ইঞ্জিনিয়ারিং বহুগুণ বেড়ে যাবে। নদী বিজ্ঞানীদের মতে, এর ফলে বলাগড় অঞ্চলে প্রধানত দুটি বিপদ দেখা দিতে পারে : প্রথমত, কৃত্রিম ড্রেজিং ও পাড়ের স্থায়িত্বহানি। বন্দরে বড়ো বড়ো বার্জ বা জাহাজ ঢোকানোর জন্য নদীর তলদেশ থেকে অনবরত বালি ও পলি তুলতে হবে। এর ফলে নদীর মাঝখানটা যখন কৃত্রিমভাবে গভীর হয়ে যাবে, তখন পাড়ের মাটির স্বাভাবিক ঢাল বা ভারসাম্য নষ্ট হবে। তলার মাটি সরে গেলে ওপরের পাড় আরও দ্রুত এবং ধস আকারে নদীতে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করে।

দ্বিতীয়ত, ভারী জাহাজের ঢেউয়ের অভিঘাত। বন্দরে যখন শ’য়ে শ’য়ে টন ওজনের পণ্যবাহী জাহাজ যাতায়াত করবে, তখন তাদের প্রপেলারের ধাক্কায় নদীতে শক্তিশালী কৃত্রিম ঢেউয়ের সৃষ্টি হবে। ঢেউ যখন অনবরত এসে কাঁচা নদীপাড়ে আঘাত করবে, তখন পাড় ক্ষয়ের গতি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যাবে।

ভারতের নদী ভাঙন প্রতিরোধের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, কেবল ‘জিও-ব্যাগ’ বা বোল্ডার ফেলে প্রকৃতির এই বিপুল শক্তিকে চিরকাল আটকে রাখা যায়নি। নদী ভাঙন বা বন্যার মতো ভৌগোলিক বিপর্যয় রুখতে বিজ্ঞানসম্মত সমীক্ষা যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি এই দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করা

বন্যা পরিস্থিতি ও জলনিকাশি ব্যবস্থার সংকটও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। বলাগড়ের ভৌগোলিক অবস্থানের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, বর্ষাকালে দামোদর বা রূপনারায়ণের মতো নদীর ছাড়া জল এবং গঙ্গার নিজস্ব জলস্ফীতির কারণে এ অঞ্চল সহজেই প্লাবিত হয়। বন্দর সংলগ্ন এলাকায় জেটি, রিটেইনিং ওয়াল এবং অন্যান্য কংক্রিটের পরিকাঠামো নির্মাণের ফলে নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহের পথ সংকুচিত হতে পারে। নদীর বুদবুদ বা চরের অংশগুলো বন্যা প্রতিরোধে প্রাকৃতিক ‘বাফার’ হিসেবে কাজ করে। অতিরিক্ত জল হলে তা চরের ওপর ছড়িয়ে পড়ে মূল জনবসতিকে রক্ষা করে। কিন্তু বন্দরে লজিস্টিকস হাব গড়ার জন্য যদি এই চরগুলোকে কংক্রিটে বাঁধিয়ে দেওয়া হয়, তবে বন্যার জল সরাসরি গ্রামের ভেতর ঢুকে পড়বে এবং জলমগ্নতার স্থায়িত্ব বাড়িয়ে দেবে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, আধুনিক ‘হাইড্রোডাইনামিক মডেলিং’, নদী-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে পাড় এমনভাবে বাঁধানো হবে, যাতে ভাঙন আটকানো যাবে। কিন্তু ভারতের নদী ভাঙন প্রতিরোধের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, কেবল ‘জিও-ব্যাগ’ বা বোল্ডার ফেলে প্রকৃতির এই বিপুল শক্তিকে চিরকাল আটকে রাখা যায়নি। নদী ভাঙন বা বন্যার মতো ভৌগোলিক বিপর্যয় রুখতে বিজ্ঞানসম্মত সমীক্ষা যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি এই দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করা। নদীর পাড় বৈজ্ঞানিক উপায়ে বাঁধিয়ে যদি সেখানে ভাঙনমুক্ত স্থায়ী বাণিজ্যিক জোন তৈরি করা যায়, তবে এলাকার মানুষ নিশ্চিন্তে নদীর ধারেই নিজেদের হোটেল, লজ বা ছোটো দোকানপাট গড়ে তুলতে পারবেন। প্রাকৃতিক বিপর্যয় রুখে মাটির স্থায়িত্ব রক্ষা করা যতখানি জরুরি, ঠিক ততখানিই জরুরি নিরাপদ জমিতে মানুষের স্বাধীন ব্যবসার রুটি-রুজিকে সুরক্ষিত রাখা।

♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦

বলাগড় বন্দর : কৃষি ও মৎস্যজীবীদের জীবিকা, সংকটে গ্রামীণ অর্থনীতি?


  • Tags:
❤ Support Us
এক অর্ধ-গবেষকের বিদ্যাদাতা পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
আমার কাক্কা পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
বহুমাত্রিক সুজিত চৌধুরী পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
error: Content is protected !!