- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- জুন ২৮, ২০২৬
ভারতীয় সাহিত্যে, নিঃসঙ্গ বিস্ময়
নিছক ছদ্মনাম নয়, যে প্রতিভা আলোর অধিক
আধুনিক অসমিয়া সাহিত্য, না ঠিক বলা হলো না, বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্পকার সৌরভকুমার চালিহাকে, পিতৃদত্ত নামের আড়ালে, ছদ্মনামের ভেতরে আর বাইরে খুঁজে দেখলেন তাঁরই অনুজ পাঠক আর গল্পকার। ভূবনের সাহিত্যে সৌরভকুমার চালিহা এমন এক বিস্ময়কর প্রতিভা, যাঁর কথা বলতে গেলে কাফকা, হাসান আজিজুল হক, সন্দীপনের নাম মনে পড়ে যায়। আশা করি, সাহিত্যের নির্মল পাঠক বাড়বার পড়বেন, খুঁজে দেখবেন সুরেন মেধি বনাম সৌরভকুমারকে, তাঁর দ্বৈতসত্তার নির্মাণকে পুনরাবিষ্কার করে চমকে উঠবেন। একথাই প্রকারান্তরে স্মরণ করিয়ে দিলেন গদ্যশিল্পী তপন রায়।
সৌরভকুমার চালিহার সৃষ্টিশীলতার কালপর্ব, ১৯৪৪ থেকে ২০০৮। জীবৎকাল ১৯৩০ থেকে ২০১১। জীবদ্দশায়, আমরা জানি, তাঁর লেখক সত্তাটি রহস্যে মোড়া। তাঁকে নিয়ে চালু ছিল নানা ধরণের মিথ। সুরেন্দ্রনাথ মেধি, এই পিতৃদত্ত নামের কেজো মানুষটির সামাজিক পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করতেন আজীবন। প্রচার, গ্ল্যামার, যশ ও খ্যাতির বিড়ম্বনা থেকে দূরে থাকতে ভালোবাসতেন। এমনকি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার গ্রহণ করতেও যাননি তিনি। তাঁর হয়ে লিখিত ভাষণ পাঠ ও পুরস্কার গ্রহণ করেছিলেন একজন প্রতিনিধি। এতে কোনোরকম ভণিতা ছিল না, বরং ছিল সহজ, স্বাভাবিক ও নিদারুণ এক সত্য। হাতে গোনা কয়েকটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত বাদ দিলে অধিকাংশ পাঠকের কাছে লেখক সৌরভকুমারের ভৌগলিক অবস্থিতি সম্পর্কে ধারণাটি ছিল ঘোলাটে এবং প্রায় অগম্যই। কোনো পাঠক বা সম্পাদক সাক্ষাৎ-প্রার্থী হয়ে তাঁর দরজায় কড়া নাড়লে তিনি স্বয়ং দরজা খুলে দিতেন, জানাতেন, তাঁদের কোথাও ভুল হচ্ছে, ভুল ঠিকানায় এসে হাজির হয়েছেন তাঁরা, এটা সুরেন্দ্রনাথ মেধির বাড়ি, সৌরভকুমার চলিহা নামে এখানে কেউ থাকেন না, সুরেন্দ্রনাথ মেধির সঙ্গে কোনো কথা থাকলে না হয় বলতে পারেন, নচেৎ …। এমনকি, জানা যায়, জন্মসাল জিজ্ঞেস করলে হিসেবটাও ইচ্ছে করেই ঘুলিয়ে দিতেন — ‘থার্টি থ্রি নেকি ? মনত নাই…’।
গল্পের ধীরেন ও সুরেনের মতো মেধি ও চলিহা দুজনই দুজনের ওপর লক্ষ রাখেন, নজরদারি চালান নিরাপদ দূরত্ব থেকে। অথচ কখনো, কোনো অবস্থাতাতেই তাঁরা দুজন একে অপরের কাছাকাছি আসেন না। থেকে যান আজীবন উদাসীন। শিল্প-সাধনার শর্ত মেনেই এই আপাত-ঔদাসীন্য। লেখার জন্যই তিনি সৃষ্টি করে নিয়েছেন সৌরভকুমার নামের মুখোশ বা ‘পার্সোনা’
কিশোর ভট্টাচার্যের ‘মুখামুখি অস্পষ্টতাত’ কাব্যগ্রন্থের (২০১১) ‘গুয়াহাটি’ শীর্ষক কবিতার ’… ইফালে তুমি সৌৰভ চলিহা পঢ়া নাই অথচ জু-রোডত মাটি কিনিছা / থানৰ মাটিত নামঘৰ পাতিছা / লুইতৰ বুকুৰ মাটি খান্দিবলৈ হ’ল’ লাইনটি পড়ে একদিন সরাসরি বুকে ধাক্কা লেগেছিল। কী আশ্চর্য আয়রণি ! সৌরভ-সাহিত্যের গুণগ্রাহীদের কাছে জু-রোড প্রিয় লেখকের অবস্থিতির জন্যেই মহিমান্বিত, আলোকিত। জু-রোড তাঁদের কাছে এক মেটাফোর, নিছক কোনো ভৌগলিক অঞ্চল নয়। সৌরভকুমার না-পড়েই কেউ তাঁর প্রতিবেশী হতে পারেন। কিন্তু সারাজীবন জানতেই পারবেন না প্রতিবেশী মেধি লোকটার ভিতরে একজন চলিহা বাস করেন। আর চলিহা লোকটা যে কত বড়ো মাপের একজন স্রষ্টা, তার নাগাল তিনি বা তাঁরা কোনোদিনই পাবেন না। মেধির প্রতিবেশী হওয়ার আগে সৌরভকুমার চলিহা পাঠ করে যোগ্যতা অর্জন করা দরকার। কুচবিহার যাবার আগে যেমন অমিয়ভূষণের ‘মহিষকুড়ার উপকথা’ ‘চাঁদবেনে’ ‘মধু সাধু খাঁ’ ইত্যাদি পড়ে নেওয়াটা সৎ পাঠকের ন্যূনতম ধর্ম, পূর্ণিয়া জেলার কথা উঠলেই যেমন ‘ঢোঁড়াই চরিত মানস’ আর সতীনাথ ভাদুড়ী, ডাবলিন শুনলেই যেমন বুক কেঁপে ওঠে ‘ইউলিসিস’ আর জেমস জয়েসের নাম মনে করে, বুয়েনেস এয়ার্স বা আর্জেন্টিনা মানেই যেমন হোর্হে লুই বোর্হেস; ভিক্টরিয়া ওকাম্পো, মারাদোনা বা মেসি নয় শুধু, অন্তত বোর্হেস-প্রেমীদের কাছে, গুয়াহাটির জু-রোড মানেই তেমনি এক ও অনন্য সৌরভ… সৌরভকুমার চলিহা। জমি কিনতে জু-রোড না গেলেও তীর্থক্ষেত্র ভেবে কল্পনার জু-রোডে, ললিত ভরালি কলেজের রাস্তায়, রেল লাইন আর নামঘর পেরনো চড়াইয়ের পথ ধরে ধরে পাহাড়-বনানির শান্ত নিবিড়তায়, পানবাজারের, লাখটোকিয়ার ব্যস্ত পথে পথে চলে আমাদের নিত্য আসা-যাওয়া।
বস্তুত সৌরভ-সাহিত্যে প্রবেশ করতে বেশ দেরিই হয়ে যায় আমার। নদী ও পাহাড়ে ঘেরা আজন্ম-লালিত সেই জনপদ যখন একদিন সত্যি সত্যি আমার চোখের আড়াল হয়ে গেল, তখনই হাতে এলো তাঁর স্বপ্নের বীণা কুটিরে ঢোকার ঠিকানা ও চাবিকাঠি। এ বড়ো আনন্দের, বড়ো বেদনারও। আনন্দ, কারণ আবিস্কার। বেদনা পেয়েছি কারণ আবিস্কারটি হয়েছে দেরিতে। সঙ্গলাভের বিরল সুযোগ ততদিনে হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে চিরতরে। দেবাশিস তরফদার ও অভিজিৎ লাহিড়ীর বঙ্গানুবাদে বেশ কিছু গল্প দিয়ে তাঁকে পাঠ করা শুরু। দিনে দিনে আগ্রহ বাড়ে, ঘনিয়ে ওঠে নেশা। ততদিনে পড়ে ফেলেছি তাঁর খ্যাত-অখ্যাত, বহুল-চর্চিত এবং অনালোচিত গল্প আর গদ্য-সংকলনগুলো। দীর্ঘ অপেক্ষার পর একদিন হাতে আসে শোণিত বিজয় দাস ও মুনীন বায়ন সম্পাদিত বৃহদায়তন ‘সৌরভকুমার রচনাবলী’। লেখকের সঙ্গে ধীরে ধীরে তৈরি হতে থাকে কাল্পনিক সম্পর্ক। কথন-রীতির অনন্য ভঙ্গি, ভাষার সঙ্গীতময়তা, বহুকৌণিক দ্যুতি, উজ্জ্বল অন্তর্দৃষ্টি, সজাগ-সচেতন ব্যক্তিক তথা সামাজিক অবলোকন, এমনকি অবচেতনার কারুকার্যকয় স্রোতের মুখে মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ প্রিয় লেখকের চিরন্তন শিল্পীমন আমি খুঁজে পাই, মুহুর্মুহ আবিস্কার করি তাঁরই রচনাবলীর আলোছায়ায়। বিরল স্বাদ ও মাত্রার গল্পগুলো ছাড়াও ক্রমে ভালো লাগতে থাকে চিন্তা ও রসে পরিপুষ্ট তাঁর কাহিনীহীন গদ্যগুলো। কবিদৃষ্টিসম্পন্ন সরস বুদ্ধিদীপ্ত মানবিক এবং অত্যন্ত মৌলিক ভাবে চিন্তা করতে সক্ষম অসমিয়া তথা ভারতীয় ভাষার এমন বিরল ক্ষমতাবান এক আন্তর্জাতিক মানের লেখক এতদিন আমাদের হাতের নাগালের মধ্যেই বেঁচেছিলেন, ভাবলেই শিউরে উঠি।
২
তাঁর ‘ধীরেন সুরেন’ গল্পের দুই পুরনো বন্ধুর দেখা হওয়া না-হওয়া, কথা বলা, না-বলা, সম্পর্ক-অসম্পর্কের টানা-পোড়েনের মতো এক সূক্ষ্ম মায়াটানেই আজীবন বাঁধা ছিল সুরেন্দ্রনাথ মেধি ও সৌরভকুমার চলিহার জীবন। ধীরেন ও সুরেনের মতো তাঁরা কখনো দুই বন্ধু — কাছের, দূরের… কখনো আবার একই সত্তার এপিঠ-ওপিঠ; যেন দ্বৈতরূপ । দুজনের মধ্যেকার এই যে দূরত্ব, এই যে নৈকট্য, এই যে মায়া, সম্পর্কের এই যে দ্বান্দিকতা — সব তাঁর নিজেরই তৈরি, সবই তাঁর শিল্পসৃষ্টি ও সৌন্দর্য-সাধনার অঙ্গ। তিনি জাদুকরের মতো পরিধান করতেন সৌরভকুমার নামের এক সূক্ষ্ম পোষাক। মুহূর্তেই সে পোষাক খুলে লুঙি বা পাজামা পরে লোকচক্ষুর আড়ালে একা একা ঘরোয়া পরিবেশে, বাজারে বা কলেজের কমনরুম কি ক্লাসরুমে হয়ে উঠতেন মেধি। কিংবা কখনই তাঁরা — মেধি ও সৌরভকুমার; আলাদা হতেন না। একই দেহে অতি সূক্ষ্মতায় বিরাজমান থেকে যায় দুটি আত্মতার সত্তা। গল্পের ধীরেন ও সুরেনের মতো মেধি ও চলিহা দুজনই দুজনের ওপর লক্ষ রাখেন, নজরদারি চালান নিরাপদ দূরত্ব থেকে। অথচ কখনো, কোনো অবস্থাতাতেই তাঁরা দুজন একে অপরের কাছাকাছি আসেন না। থেকে যান আজীবন উদাসীন। শিল্প-সাধনার শর্ত মেনেই এই আপাত-ঔদাসীন্য। লেখার জন্যই তিনি সৃষ্টি করে নিয়েছেন সৌরভকুমার নামের মুখোশ বা ‘পার্সোনা’। কবি রমেন্দ্রকুমার আচার্যচৌধুরী তাঁর ‘ব্রহ্ম ও পুঁতির মউরি’ কাব্যসংকলনের মুখবন্ধে ‘পার্সোনা’ প্রসঙ্গে বহুবছর আগে লিখেছেন ‘…কথক উত্তমপুরুষ হলেও তাকে কবির সঙ্গে একাত্ম করলে ভুল হবে। অনভিজ্ঞ পাঠক সহজেই এই ভ্রমে পড়েন। এই কথক; আধুনিক সমালোচনার ভাষায় পার্সোনা বা মুখোশ — কবিতার কল্প-কাহিনীর শিল্পিক প্রয়োজনে, একটি বিশেষ অবস্থায় ভূমিকা গ্রহণের জন্য, উদ্ভাসিত কাল্পনিক চরিত্র। …উহ্য লেখকসত্তাও বাস্তব মানুষটির একটি সাহিত্যিক সৃষ্টি, কল্পরূপ মাত্র’। গল্প বলার প্রয়োজনে একজন মেধির পক্ষেও জরুরি ছিল এই ‘পার্সোনা’-র সন্ধান। আমৃত্যু এরকম পার্সোনার প্রতি যিনি থেকে যাবেন বিশ্বস্ত —বৈজ্ঞানিকের নিষ্ঠায়, কঠোরতায় আর সতর্কতায় — অপর দিকে তাঁর লেখক সত্তা ছড়িয়ে থাকে — একজন মহাশিল্পীর নৈপুণ্যে, বৈরাগ্যে আর মাত্রাজ্ঞানে।
কখনো তরুণ বয়েসে মেধির জীবনে হয়ত এক ঝলক বসন্তবাতাসের মতো এসেছিল অস্ফুট এক প্রেম, যা অচিরেই গিয়েছিল হারিয়ে, চলিহার হাতে তাই হয়ত পরম যত্নে আর আর্তিতে ফুটে ওঠে ‘আচ্ছন্ন’ ‘হেরাল’ ‘স্টুডিওত’ ‘হিহঁতেও পাহাড় বগালে’ বা ‘ইরা’ হয়ে।
সুরেন্দ্রনাথ মেধি হয়ে তিনি অতিথির জন্য ঘরের দরজা খুলে দেন, বাজার গিয়ে দর-দাম করে কেনেন মাছ-ডিম-কেক-চাপাতা-সিগারেট, কলেজের কমনরুমে বসে সকৌতুকে কলিগ-অধ্যাপকের কাছে ডিএ বৃদ্ধি বা আগামী শিক্ষাবর্ষের সাম্ভাব্য কর্মসূচি বিষয়ে শোনেন এক্সপার্ট কমেন্ট, ক্লাসরুমে গিয়ে ছাত্রদের দেন গণিত ও থিওরেটিক্যাল ফিজিক্সের পাঠ। ড. মেধি হয়ে যেমন তাঁকে লিখতে হয় ‘চিন্তার বেগ কিমান?’ বা ‘গ্যডেলর সূত্র’র মতো গুরুভার বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ, কি আস্ত একখানা বই, তেমনি রিসিভ করতে হয় ডাকে আসা সৌরভকুমার চলিহার নামে প্রকাশক, সম্পাদক বা সাহিত্য অকাদেমির চিঠি। সুরেন্দ্রনাথ মেধি হয়ে তাঁকে স্ত্রী-কন্যা সহ যেমন যেতে হয় সমুদ্রভ্রমণে, হেঁটে বেড়াতে হয় তার প্রিয় শহরের পথে পথে, হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের পাশে চাপা পড়া আসাম-টাইপ বাড়ি ও গুয়াহাটির বিরল সৌন্দর্যের ক্রম-অপসৃয়মান হতশ্রী চেহারা দেখে বেদনা পেতে হয় যেমন, সৌরভকুমার হয়ে তেমনি তাঁকে লিখতে হয় ‘বীণা কুটির’ আর ‘এহাত ডাবা’র বেণু মিশ্রের হেরে যাওয়ার গল্প। কখনো তরুণ বয়েসে মেধির জীবনে হয়ত এক ঝলক বসন্তবাতাসের মতো এসেছিল অস্ফুট এক প্রেম, যা অচিরেই গিয়েছিল হারিয়ে, চলিহার হাতে তাই হয়ত পরম যত্নে আর আর্তিতে ফুটে ওঠে ‘আচ্ছন্ন’ ‘হেরাল’ ‘স্টুডিওত’ ‘হিহঁতেও পাহাড় বগালে’ বা ‘ইরা’ হয়ে। কদাচিৎ অধ্যাপক মেধির ছায়া চলিহার ‘খরাং’ গল্পের মধ্যে পেয়ে গেলেও সুরেন্দ্রনাথের মুখে ভুলেও শোনা যাবে না একজন সৌভকুমারের কথা।
মেধি ও চলিহার রহস্যময় দ্বান্দিক সম্পর্কের কথায় স্টিভেন্সনের ‘ড. জেকিল ও মি. হাইড’-য়ের কথা মনে না পড়লেও, নিশ্চিত মনে পড়বে বহুদিন আগে পড়া অশ্রুকুমার সিকদারের বঙ্গানুবাদে হোর্হে লুই বোর্হেসের ‘বোর্হেস অ্যান্ড আই’ প্যারাবোলটির কথা : ‘যার নাম বোর্হেস, ওই অন্য জনের জীবনেই সব কিছু ঘটে। আমি বুয়েনেস এয়ার্সের পথ দিয়ে চলতে চলতে লহমার জন্য দাঁড়াই, যান্ত্রিকভাবে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি প্রবেশপথের খিলান ও দরজার জাফরির কাজ; আমি বোর্হেসকে জানি ডাকে আসা চিঠিপত্রে, অধ্যাপকদের নামের তালিকায় ও জীবনী-অভিধানে তাঁর নাম দেখে। আমি ভালোবাসি সময়-মাপা গেলাস, মানচিত্র, আঠারো শতকের ছাপাখানার অক্ষর, কফির স্বাদ, স্টিভেনসনের গদ্য; সেও এসব পছন্দ করে, কিন্তু গরিমার বশবর্তী হয়ে সে এই সমস্তকে পর্যবসিত করে যেন অভিনেতার গুণে। আমাদের পরস্পরের সম্পর্ক বিদ্বেষের এ কথা বললে বাড়িয়ে বলা হবে; আমি বেঁচে আছি, আমি জীবন-যাপন করে চলেছি, যাতে বোর্হেস সাহিত্য রচনা করতে পারে … … আমি বেঁচে থাকব বোর্হেসের মধ্যে, নিজের মধ্যে নয় ( অবশ্য আমি একজন কেউ, একথা যদি সত্য হয়), কিন্তু তাঁর বইতে আমি নিজেকে খুঁজে পাইনে বললেও চলে; বেশি খুঁজে পাই বরং অন্য বইতে, গিটারের শ্রমসাধ্য ঝংকারে। অনেক বছর আগে আমি তাঁর থেকে স্বাধীনতা পেতে চেয়েছিলাম এবং শহরতলীর পুরাণ রচনা ছেড়ে শুরু করেছিলাম কাল ও অনন্তকে নিয়ে খেলতে, সেই সব খেলারও মালিক এখন বোর্হেস …’
সত্তার এই দ্বৈততার অনুভব খুব প্রবল না হলেও কদাচিৎ রবীন্দ্রনাথের কোনো গান বা কবিতাতেও ধরা পড়ে। যেমন — ‘যে আমি যায় কেঁদে হেসে / তাল দিতেছে মৃদঙ্গে সে, / অন্য আমি উঠতেছি গান গেয়ে’। কবি, লেখক, শিল্পী মাত্রই নিজের সত্তার গভীরে অনুভব করেন এক ‘অপর’-কে। সেই অপরত্বের সন্ধানে তাকে পেরিয়ে আসতে হয় এক বা একাধিক কন্ঠস্বর। জন্ম নেয় পার্সোনা।
পৃথিবীর দেশে দেশে কালে কালান্তরে অনেক লেখক প্রয়োজনে ছদ্মনাম গ্রহণ করেছেন, করবেন। পেঙ্গুইন প্রকাশিত পর্তুগালের কবি ফার্নান্দো পেসোয়ার চটি কবিতা বইটির কথা মনে পড়ছে — ‘আই হ্যাভ মোর সোলস দ্যান ওয়ান’— চারটি ভিন্ন আঙ্গিকে ও ভিন্ন কবি-নামে; আলবার্তো কায়েরো, রিকার্ডো রিজ, আলভেরো দ্য কেম্পোজ এবং পেসোয়া — একাই তিনি চারজন হয়ে লিখেছেন কবিতা। ওভাবেই লিখে গেছেন আজীবন এবং মনে করেছেন এই চারটি নাম তাঁরই চারটি ভিন্ন ভিন্ন সত্তার কন্ঠস্বর বা প্রকাশ ; যা কোনোমতেই তাঁর ছদ্মনাম নয়। সুরেন্দ্রনাথ মেধির পার্সোনা বা অল্টার ইগো সৌরভকুমার চলিহাও একই ভাবে নিছক কোনো ছদ্মনাম নয়। তার চেয়েও বেশি, অন্যরকম কিছু একটা।
♦•–•♦♦•–•♦♦•–•♦♦•–•♦
লেখক, সুপরিচিত গল্পকার। ভারতীয় রেলওয়ের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী
❤ Support Us






