Advertisement
  • Uncategorized দে । শ
  • জুন ২৭, ২০২৬

কলকাতা বইমেলা নিয়ে অন্যরকম পরিকল্পনা বিজেপি-ঘনিষ্ঠ প্রকাশক সংগঠনের ?

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
কলকাতা বইমেলা নিয়ে অন্যরকম পরিকল্পনা বিজেপি-ঘনিষ্ঠ প্রকাশক সংগঠনের ?

এ বছর ৫০-এ পা দিতে চলেছে আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা। এই মাইলফলক সন্ধিক্ষণে  প্রকাশনা জগতে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। দীর্ঘদিন ধরে কলকাতা বইমেলার আয়োজক ‘পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড’-এর ‘একচেটিয়া আধিপত্য’-কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এবার সরব বিজেপি-ঘনিষ্ঠ প্রকাশক, মুদ্রক ও বই বিক্রেতাদের সংগঠন ‘বঙ্গীয় গ্রন্থশিল্প পরিষদ’। তাদের দাবি, কলকাতা বইমেলা কোনো একটি সংগঠনের ‘নিয়ন্ত্রণাধীন’ অনুষ্ঠান হয়ে থাকতে পারে না। বরং বইমেলার মতো বৃহৎ সাংস্কৃতিক আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত প্রকাশক সংগঠন এবং জেলার বই-ব্যবসায়ীদেরও সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বইমেলার আয়োজনে বিকল্প সাংগঠনিক কাঠামোর পক্ষে সওয়াল করে ইতিমধ্যেই ৭০০-রও বেশি প্রকাশনা প্রতিনিধিকে এক মঞ্চে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সংগঠনটি।

তাদের বক্তব্য, কলকাতার গণ্ডি ছাড়িয়ে বইমেলাকে প্রকৃত অর্থে ‘বাংলার বইমেলা’ করে তুলতে হবে, যেখানে শুধুমাত্র একটি সংগঠন নয়, রাজ্যের সমস্ত প্রকাশক সংগঠন, জেলার প্রকাশনা সংস্থা এবং বই-শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষের সমান প্রতিনিধিত্ব থাকবে। এই দাবিকে সামনে রেখেই আগামী ২৯ জুন কলকাতার মহাজাতি সদনে সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ-র জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে ‘বঙ্গীয় গ্রন্থশিল্প পরিষদ’। আয়োজকদের দাবি, অনুষ্ঠানটির মূল উদ্দেশ্য জনপ্রিয় সাহিত্যিককে স্মরণ করা হলেও, এ মঞ্চেই আগামী বছরের আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার ভবিষ্যৎ, প্রকাশনা শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি, বইমেলার পরিচালন ব্যবস্থা ও বিকল্প সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হবে। প্রকাশনা শিল্পের ৭০০-রও বেশি প্রতিনিধি ওই বৈঠকে অংশ নেবেন বলেও দাবি সংগঠনের।

‘বঙ্গীয় গ্রন্থশিল্প পরিষদ’-এর অন্যতম আহ্বায়ক, বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার জানিয়েছেন, তাঁদের লক্ষ্য ২০২৬ সালের ৫০তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলাকে এমন একটি সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত করা, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একচেটিয়া আধিপত্য থাকবে না। তাঁর দাবি, বইমেলা মূলত লেখক, প্রকাশক, বই বিক্রেতা আর পাঠকদের যৌথ উৎসব। দেবজিৎ বলেন, ‘বুদ্ধদেব গুহর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রত্যেকেই আগামী দিনের বইমেলা নিয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারবেন। আমরা চাই কলকাতা বইমেলা সত্যিকারের অর্থে সবার বইমেলা হয়ে উঠুক।’ সংগঠনের সদস্য সপ্তর্ষি চৌধুরী জানান, অনুষ্ঠানে ৭০০-রও বেশি প্রকাশক, মুদ্রক, বই বিক্রেতা, প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। তাঁদের মতামতের ভিত্তিতেই আগামী বছরের বইমেলার জন্য নির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করা হবে।

প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার আয়োজন করে ‘পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড’। আগামী বছর বইমেলার ৫০তম সংস্করণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু ‘বঙ্গীয় গ্রন্থশিল্প পরিষদ’-এর অভিযোগ, গত কয়েক দশকে কার্যত কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রকাশনা সংস্থার প্রতিনিধিরাই গিল্ডের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করে এসেছেন। ফলে বহু প্রকাশক নিজেদের বঞ্চিত বলে মনে করেন, তাঁদের যথাযথ প্রতিনিধিত্বও নিশ্চিত হয়নি। দেবজিৎ সরকারের দাবি, গিল্ডই একমাত্র প্রকাশক সংগঠন নয়। তিনি বলেন, ‘কলেজ স্ট্রিটেই গিল্ড ছাড়াও ১৩-১৪টি প্রকাশক সংগঠন রয়েছে। পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন জায়গাতেও একাধিক সংগঠন সক্রিয়। বইমেলা একটি সামষ্টিক আয়োজন। সেখানে সবার মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’

তাঁর বক্তব্য, ‘বই বাংলা সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ শিল্পের সঙ্গে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা জড়িয়ে রয়েছে। তাই জেলার প্রকাশক, মুদ্রক, বই বিক্রেতা এবং পাঠকদেরও সমানভাবে এই বইমেলার অংশ বলে মনে হওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।’ শুধু বইমেলার পরিচালন ব্যবস্থাই নয়, প্রকাশনা শিল্পের নীতিগত পরিবর্তনের দাবিও তুলেছে বিজেপি-ঘনিষ্ঠ এই সংগঠন। তাদের প্রস্তাব, জেলার সরকারি বইয়ের দোকানগুলিকে আরও সক্রিয় করা হোক, সরকারি গ্রন্থাগারগুলিকে বই কেনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থার বাইরে গিয়ে বিভিন্ন প্রকাশকের বই সংগ্রহে উৎসাহিত করা হোক। এতে প্রকাশনা শিল্পে আরও ভারসাম্য তৈরি হবে বলে তাদের মত।

বইমেলার চরিত্র নিয়েও সরব হয়েছেন দেবজিৎ সরকার। তাঁর অভিযোগ, বামফ্রন্ট আমলে বইমেলার মাধ্যমে নির্দিষ্ট চিন্তাধারা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছিল। পরে তৃণমূল কংগ্রেসের আমলেও সে প্রবণতা অন্য রূপ নেয়। তাঁর অভিযোগ, ‘বাম আমলে মানুষের উপর একটি নির্দিষ্ট ভাবনা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। তৃণমূল আমলে বইমেলা কার্যত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা বইকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। গত পাঁচ দশক ধরে একটি মাত্র চিন্তার ধারা প্রতিষ্ঠার প্রবণতা দেখা গিয়েছে।’ প্রসঙ্গত, বিজেপি অতীতেও কলকাতা বইমেলার আয়োজকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছিল। গেরুয়া শিবিরের দাবি ছিল, তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে শাসকদলের সমর্থন নেই, এমন বহু প্রকাশক বইমেলায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নানা সমস্যার মুখে পড়েছেন।

বইমেলাকে তৎকালীন সরকারের প্রচারের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছিল পদ্মশিবির। তাই, ‘বঙ্গীয় গ্রন্থশিল্প পরিষদ’ দাবি তুলেছে, ভবিষ্যতের কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলাকে কোনো রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নয়, প্রকাশনার মানের ভিত্তিতে পরিচালিত করতে হবে। রাজ্য বিজেপির একাধিক নেতাও ব্যক্তিগত স্তরে মত প্রকাশ করেছেন যে, এমন একটি সর্বজনগ্রাহ্য পরিচালন সংস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে কোনো প্রকাশকের রাজনৈতিক মতাদর্শ বা দলীয় পরিচয় নয়, তাঁর প্রকাশিত বইয়ের গুণমান এবং প্রকাশনার উৎকর্ষই হবে অংশগ্রহণের একমাত্র মাপকাঠি।

অন্যদিকে, বিজেপি-ঘনিষ্ঠ সংগঠনের এ উদ্যোগকে সরাসরি বিরোধিতা করেনি ‘পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড’ও। গিল্ডের সাধারণ সম্পাদক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘বুদ্ধদেব গুহ জীবদ্দশায় যে স্বীকৃতি পাওয়ার কথা ছিল, তা তিনি পাননি। তাঁর ৯০তম জন্মবার্ষিকী উদ্‌যাপনের উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই।’ একই সুর শোনা গিয়েছে গিল্ড সভাপতি সুধাংশু দে-র গলাতেও। তিনি জানান, তাঁর প্রকাশনা সংস্থা বুদ্ধদেব গুহের বহু বই প্রকাশ করেছে। লেখকের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল। সে কারণেই তাঁর জন্মবার্ষিকী উদ্‌যাপিত হওয়ায় তাঁরা আনন্দিত। আগামী সোমবারের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, আরএসএসের পূর্ব ক্ষেত্র প্রচার প্রমুখ জিষ্ণু বসু এবং কবি বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার ৫০তম সংস্করণকে ঘিরে প্রকাশনা শিল্পে যে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে, তা আগামী কয়েক মাসে আরও তীব্র হতে পারে। বইমেলার নিয়ন্ত্রণ, বৃহত্তর প্রতিনিধিত্ব এবং প্রকাশনা জগতের ক্ষমতার ভারসাম্য— এই তিন প্রশ্নই আগামী দিনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে চলেছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!