- Uncategorized দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুন ৬, ২০২৬
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে যন্তর মন্তরে শুরু ‘ককরোচ’-দের বিক্ষোভ, নেতৃত্বে সিজিপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ, মোতায়েন বিপুল বাহিনী
মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও নামটি ছিল মূলত সমাজমাধ্যমের আলোচনায়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে অন্যতম আলোচিত ঘটনাপ্রবাহে পরিণত হয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। রাজধানীর যন্ত্রর মন্তরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ সহ একাধিক দাবি নিয়ে শনিবার বিক্ষোভ শুরু করেছে সংগঠনটি। তরুণ-তরুণীদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সিজিপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে। শুক্রবার রাতেই তিনি দেশে ফিরেছেন। বিমানবন্দরে তাঁকে গ্রেফতার করা হতে পারে, তীব্র জল্পনা থাকলেও, সে পথে হাঁটেনি প্রশাসন।
দিন যত এগোচ্ছে ‘ককরোচ’-দের বিক্ষোভ ও সমাবেশ ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল, উত্তেজনা আর রাজনৈতিক জল্পনা। ‘নিট-ইউজি’ প্রশ্নফাঁস-সহ বিভিন্ন সর্বভারতীয় পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগকে সামনে রেখে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে রাস্তায় নেমেছে সংগঠনটি। সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা তরুণ-তরুণীদের ভিড়ে জমজমাট হয়ে উঠেছে রাজধানীর ঐতিহাসিক প্রতিবাদমঞ্চ। আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে শুক্রবার রাতেই দিল্লিতে পৌঁছেছেন সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর তাঁর সঙ্গে দেখা করেন দিল্লি পুলিশের আধিকারিকেরা। সেখানেই তাঁকে যন্তর মন্তরে শনিবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কর্মসূচি করার অনুমতি দেওয়া হয়। পুলিশের অনুমতির খবর প্রকাশ্যে আসতেই আন্দোলনের কর্মসূচিতে নতুন গতি আসে। এর পরেই দীপকে সমাজমাধ্যমে সমর্থকদের উদ্দেশে বার্তা দিয়ে জানান, আর পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় জমায়েত হওয়ার প্রয়োজন নেই; সবাইকে সরাসরি যন্তরমন্তরে পৌঁছতে হবে।
শুক্রবার, বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে সংবিধান প্রণেতা ড. বি. আর. অম্বেডকরের আত্মজীবনী হাতে দেখা যায় অভিজিৎকে । পরে এক্স-এ করা পোস্টে তিনি লেখেন, ‘ দেশে পৌঁছে গিয়েছি। যন্তরমন্তরে আপনাদের সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষায় আছি। বই আর জাতীয় পতাকা আনতে ভুলবেন না। পুলিশকর্মীদের ফুল দিন। ভালোবাসা ও শান্তির পথেই আমাদের আন্দোলন এগোবে।’ গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশের রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে এই সংগঠন। যদিও খাতায়-কলমে এটি কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নয়, তবু জনপ্রিয়তার নিরিখে দেশের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলিকেও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে বলে দাবি সংগঠনের নেতাদের। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ার একটি পোস্টে দীপকে কটাক্ষের সুরে লিখেছিলেন, ‘‘বিজেপি নিজেকে বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বলে দাবি করে। কিন্তু তাদের ছাড়িয়ে যেতে আমাদের মাত্র চার দিন লেগেছে।’
তাঁর এ মন্তব্য ঘিরে বিতর্কও কম হয়নি। পোস্টের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এক্স থেকে সিজেপির অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট অদৃশ্য হয়ে যায়। অভিযোগ ওঠে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কেন্দ্রীয় সংস্থার নির্দেশেই অ্যাকাউন্টটি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। গোয়েন্দা মহলের একাংশের দাবি ছিল, ওই অ্যাকাউন্টের কার্যকলাপ জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে এখনও বিতর্ক রয়েছে। এ আবহেই শনিবারের সমাবেশকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নজিরবিহীন। দিল্লি পুলিশের পাশাপাশি প্রায় ৪০ কোম্পানি আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। সূত্রের খবর, যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় অন্তত দু-হাজার পুলিশকর্মী মোতায়েন রয়েছেন। নিউ দিল্লি জেলা-সহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিতে এক হাজারেরও বেশি অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আইজিআই বিমানবন্দর, প্রধান রেলস্টেশন, আন্তঃরাজ্য বাস টার্মিনাল এবং দিল্লির সঙ্গে সংযুক্ত সীমান্ত এলাকাগুলিতেও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
যৌথ পুলিশ কমিশনার, ডিসিপি, অতিরিক্ত ডিসিপি এবং এসিপি পদমর্যাদার আধিকারিকদের মাঠে নামানো হয়েছে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের বাসভবনের বাইরেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে, চলছে কড়া তল্লাশি। রিজার্ভ বাহিনীও প্রস্তুত রাখা হয়েছে যে কোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির মোকাবিলায়। যন্তরমন্তরে জমায়েত হওয়া সমর্থকদের উদ্দেশে সিজেপির তরফে একাধিক নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। সংগঠনের মুখপাত্র সৌরভ দাস সকলকে সরাসরি যন্তর মন্তরে পৌঁছনোর আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্ট করে দেন, কেউ যেন পার্লামেন্ট স্ট্রিট এলাকায় ভিড় না করেন।
সকালে যন্তর মন্তরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সৌরভ বলেন, ‘ধর্মেন্দ্র প্রধান একজন অযোগ্য শিক্ষামন্ত্রী। তাঁকে হয় নিজে পদত্যাগ করতে হবে, নয়তো প্রধানমন্ত্রীর উচিত তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ করা। দীর্ঘদিন ধরে চলা অজবাবদিহি, অব্যবস্থা আর প্রশাসনিক উদাসীনতার বিরুদ্ধে এই আন্দোলন। এটি যুবসমাজের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলন। আমরা শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করব।’ সংগঠনের ডিজিটাল মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা দাবি করেছেন, শনিবারের দিনটি ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে থাকবে। তাঁর মতে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, পরীক্ষাপদ্ধতি, সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে যে ক্ষোভ দীর্ঘদিন ধরে জমা হয়েছে, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে এই কর্মসূচির মাধ্যমে।
সমর্থকদের জন্য দেওয়া নির্দেশিকাতেও ব্যতিক্রমী বার্তা দিয়েছে সিজিপি। আন্দোলনস্থলে বই নিয়ে আসতে বলা হয়েছে ‘সবার জন্য শিক্ষার অধিকার’-এর প্রতীক হিসেবে। সঙ্গে রাখতে বলা হয়েছে জাতীয় পতাকা। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কর্মসূচির প্রতিটি মুহূর্তের ভিডিও রেকর্ড রাখতে হবে। পুলিশের কোনো ‘সন্দেহজনক আচরণ’ নজরে এলে তা-ও নথিবদ্ধ করতে বলা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে বারবার জোর দেওয়া হয়েছে শান্তিপূর্ণ অবস্থানের উপর। কোনো রকম উস্কানি বা ট্রোলের ফাঁদে পা না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে সমর্থকদের। এমনকি প্রচণ্ড গরমের কথা মাথায় রেখে সানস্ক্রিন ব্যবহার, পর্যাপ্ত জল পান এবং খাবার খেয়ে কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আবেদনও জানিয়েছে সংগঠন।
শনিবার বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যন্তর মন্তরে ভিড়ও বাড়তে থাকে। হাতে বই, জাতীয় পতাকা এবং বিভিন্ন দাবি-দাওয়া লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভকারীরা স্লোগান তুলছেন, ‘ধর্মেন্দ্র প্রধান, পদত্যাগ করুন’ এবং ‘ককরোচরা আসছে, ধর্মেন্দ্র প্রধান যাচ্ছেন’। সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, দেশের কোটি কোটি ছাত্রছাত্রী ও চাকরিপ্রার্থীর ভবিষ্যৎ আজ অনিশ্চয়তার মুখে। সেই কারণেই জবাবদিহির দাবিতে এই আন্দোলন।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত দেশের একাংশের তরুণ-তরুণীকে ‘আরশোলা’ ও ‘পরজীবী’ বলে উল্লেখ করেছিলেন বলে দাবি করে সমাজমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। বিচারপতির বক্তব্যের ব্যাখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলতে থাকে। সে বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতেই গত ১৬ মে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র আত্মপ্রকাশ। প্রথমে এটি একটি অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই তা যুবসমাজের ক্ষোভের এক নতুন প্রতীকে পরিণত হয়। এর পর ‘নিট-ইউজি’ প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ঘিরে দেশজুড়ে শুরু হওয়া প্রতিবাদ আন্দোলনে সমর্থন জানান প্রযুক্তিবিদ অভিজিৎ দীপকে। তিনি ঘোষণা করেন যে আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়াতে তিনি দেশে ফিরবেন। এক ভিডিওবার্তায় তিনি জানিয়েছেন, ‘এখন সময় এসেছে ভারতের সংবিধানের পথ অনুসরণ করে আমাদের একত্রিত হওয়ার। শান্তিপূর্ণ ভাবে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আওয়াজ তুলতে হবে।’
এদিকে, যন্তরমন্তরের সমাবেশে সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক-এর সম্ভাব্য উপস্থিতি নিয়েও জল্পনা তুঙ্গে। কয়েকদিন আগে প্রকাশ্যে সিজেপির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। এমনকি অভিজিৎ দীপকেকে গ্রেফতার করা হলে ছয় সপ্তাহের অনশনে বসার কথাও ঘোষণা করেছিলেন। ফলে শনিবারের কর্মসূচিতে তাঁকে দেখা যাবে কি না, তা নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। শুক্রবার দিল্লি হাইকোর্টে বিক্ষোভকে ঘিরে সম্ভাব্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশঙ্কা তুলে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তবে আদালত জরুরি শুনানির আবেদন খারিজ করে দেয়। ফলে প্রশাসনিক অনুমতি এবং কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেই শুরু হয়েছে এই বহুল আলোচিত কর্মসূচি।
❤ Support Us







