- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- জুন ৭, ২০২৬
বলাগড় বন্দর : অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়ন
• পর্ব ২ •
প্রথম পর্বে আলোচিত হয়েছে যে ভৌগোলিকভাবে, কৌশলগত কারণে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রয়োজনে জাতীয় জলপথ-১ এর বুকে বলাগড় টার্মিনালটি গড়ে তোলা কতটা যুক্তিযুক্ত। যেকোনো বৃহৎ পরিকাঠামো প্রকল্পের প্রাথমিক সরকারি ছাড়পত্র এবং লগ্নি মঞ্জুর হয় তার ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উপযোগিতা এবং আয়ের খতিয়ান দেখে। পশ্চিমবঙ্গ, যেখানে বিগত কয়েক দশকে ভারী শিল্পের খরা এবং নতুন কর্মসংস্থানের অভাব তরুণ প্রজন্মের অন্যতম প্রধান মাথাব্যথা ও রাজ্যান্তরের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে বলাগড় বন্দর প্রকল্প কি এক নতুন অর্থনৈতিক সূর্যোদয়ের অনুঘটক হতে পারে ?
তাই এই দ্বিতীয় পর্বে আমার আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো এই প্রকল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের বাস্তব চিত্র এবং স্থানীয় ও রাজ্য স্তরে এর সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক প্রভাব।
বলাগড় ও সামগ্রিকভাবে হুগলি জেলার অর্থনীতি মূলত ঐতিহ্যগত কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু জমির খণ্ডীকরণ এবং কৃষির ওপর অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ গ্রামীণ অর্থনীতিকে একরকম সম্পৃক্ত বা স্যাচুরেটেড করে তুলেছে। এই অবস্থায় বলাগড় বন্দর প্রকল্প কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রধানত দুটি স্তরে বড়সড় জোয়ার আনতে পারে
আধুনিক অর্থনীতি এবং ম্যাক্রো-ইকোনমিক্সের নিয়ম অনুযায়ী, একটি বন্দর মানে কেবলই জাহাজ থেকে ক্রেন দিয়ে মাল নামানো বা ওঠানোর কোনো যান্ত্রিক জায়গা বা ব্যবস্থা নয়। এটি আসলে একটি সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম বা বাণিজ্য চক্র। বলাগড়ে বন্দর সংলগ্ন এলাকায় যে বৃহৎ লজিস্টিকস পার্ক ও ওয়্যারহাউজিং হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, তা এই অঞ্চলের চেহারা বদলে দিতে পারে। বলাগড়ের পাশ দিয়েই চলে গেছে বিখ্যাত অসম লিঙ্ক রোড এবং অদূরেই রয়েছে পূর্ব রেলের লাইন। জলপথ, সড়কপথ এবং রেলপথের এই বিরল ত্রিমুখী মেলবন্ধন বা মাল্টি-মোডাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থার কারণে ভারতের বড়ো বড়ো শিল্প গোষ্ঠী ও বহুজাতিক পণ্য পরিবহন সংস্থাগুলো এখানে তাদের প্রধান সরবরাহ কেন্দ্র গড়ে তুলতে অত্যন্ত আগ্রহী । আর এই লজিস্টিকস পার্ককে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে জাহাজ বা বার্জ মেরামত শিল্প, আধুনিক প্যাকেজিং ইউনিট, কন্টেইনার ম্যানুফ্যাকচারিং এবং ছোট-মাঝারি হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের এক বিশাল চেন বা ডাউনস্ট্রিম ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক নিয়ম।
যদি আমরা কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্তের দিকে তাকাই, তবে দেখা যাবে যে বলাগড় ও সামগ্রিকভাবে হুগলি জেলার অর্থনীতি মূলত ঐতিহ্যগত কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু জমির খণ্ডীকরণ এবং কৃষির ওপর অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ গ্রামীণ অর্থনীতিকে একরকম সম্পৃক্ত বা স্যাচুরেটেড করে তুলেছে। এই অবস্থায় বলাগড় বন্দর প্রকল্প কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রধানত দুটি স্তরে বড়সড় জোয়ার আনতে পারে।
প্রথম স্তরটি হলো প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান। টার্মিনাল পরিচালনা, আধুনিক ক্রেন ও ভারী যন্ত্রপাতি চালানো, জাহাজ নোঙর করার প্রযুক্তিগত কাজ, বন্দরের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বিশাল প্রশাসনিক বিভাগে প্রচুর পরিমাণে দক্ষ, আধা-দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন হবে। স্থানীয় বেকার যুবকদের যদি সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে আগাম কারিগরি প্রশিক্ষণ বা স্কিল ডেভেলপ মেন্ট দেওয়া যায়, তবে এই ক্ষেত্রটি তাদের জন্য এক স্থায়ী ও সম্মানজনক রোজগারের প্রধান উৎস হতে পারে।
দ্বিতীয় স্তরটি আরও বড়, যা হলো পরোক্ষ কর্মসংস্থানের মহাসমুদ্র। অর্থনীতিবিদদের বাস্তব সমীক্ষা বলে, যেকোনো বন্দরে সরাসরি একটি চাকরি তৈরি হলে তার হাত ধরে পরোক্ষভাবে অন্তত পাঁচটি থেকে সাতটি নতুন জীবিকার সুযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয়। এর প্রথম প্রভাব পড়বে পরিবহন ক্ষেত্রে। বন্দরে পণ্য খালাস ও সরবরাহের জন্য দৈনিক শত শত লরি, ট্রাক এবং কন্টেইনার ট্রেলারের আনাগোনা বাড়বে। এর ফলে চালক, খালাসি, লরি মালিকদের সংগঠন এবং বড় বড় গ্যারেজ বা মেকানিকদের এক বিশাল বাজার তৈরি হবে।
সিঙ্গুর বা নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাতের পর পশ্চিমবঙ্গে বড় আকারের শিল্প বা পরিকাঠামো প্রকল্পে বড় পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ কারীদের মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা বা জড়তা কাজ করে এসেছে। কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকারের যৌথ বা সমন্বিত উদ্যোগে যদি বলাগড়ে এই টার্মিনালটি সফলভাবে বাস্তবায়িত করা যায়, তবে তা বিনিয়োগের বাজারে এক বিশাল ইতিবাচক বার্তা দেবে
তৃতীয় প্রভাব পড়বে স্থানীয় পরিষেবার ক্ষেত্রে। বন্দরে কর্মরত হাজারো কর্মচারী, জাহাজের বিদেশী ও দেশী কর্মী এবং ব্যবসায়ী মহলের দৈনন্দিন প্রয়োজনে স্থানীয় এলাকায় আবাসন, ব্যাংক, আধুনিক বাজার এবং বিনোদনমূলক ক্ষেত্রের অভূতপূর্ব সম্প্রসারণ ঘটবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ক্যাশ ফ্লো বা টাকার জোগান বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

সিঙ্গুর বা নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাতের পর পশ্চিমবঙ্গে বড় আকারের শিল্প বা পরিকাঠামো প্রকল্পে বড় পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ কারী দের মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা বা জড়তা কাজ করে এসেছে। কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকারের যৌথ বা সমন্বিত উদ্যোগে যদি বলাগড়ে এই টার্মিনালটি সফলভাবে বাস্তবায়িত করা যায়, তবে তা বিনিয়োগের বাজারে এক বিশাল ইতিবাচক বার্তা দেবে। এটি জাতীয় স্তরে প্রমাণ করবে যে, দক্ষিণবঙ্গে এখনও বড় পরিকাঠামো তৈরি এবং তা সফলভাবে পরিচালনা করার মতো রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুকূল পরিবেশ বজায় রয়েছে, যা ব্র্যান্ড পশ্চিমবঙ্গের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে।
তবে অর্থনৈতিক তত্ত্বের এই ঝলমলে এবং আশাব্যঞ্জক খতিয়ান শুনেই উল্লসিত হওয়া পরিপক্ব বিশ্লেষণের লক্ষণ নয়। একজন নিরপেক্ষ বিশ্লেষকের দায়িত্ব হলো অর্থনীতির আলোর ঠিক পেছনেই যে সামাজিক বাস্তবতা রয়েছে, তাকেও চিনে নেওয়া। কর্পোরেট বা ভারী শিল্পের এই মস্ত বড় খতিয়ানের পাশাপাশি আমাদের সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে একদম মাটির কাছের সাধারণ মানুষের অর্থনীতিতে। বন্দরের হাত ধরে যে হাজার হাজার নতুন মানুষের পা পড়বে বলাগড়ের মাটিতে, তাঁদের কেন্দ্র করে স্থানীয় গ্রামীণ যুবকদের খাবারের ছোটখাটো হোটেল, ধাবা, লরি গ্যারেজ, গাড়ির স্পেয়ার পার্টস এবং মুদি ও স্টেশনারি দোকানের যে বিপুল ঘরোয়া বাজার তৈরি হবে, তা কিন্তু অবহেলা করার মতো নয়। অনেক সময় বড় কারখানার বা বন্দরের টেকনিক্যাল চাকরির সুযোগ স্থানীয় সাধারণ যুবকদের নাগালের বাইরে চলে যায়, কিন্তু এই স্বাধীন ব্যবসাকেন্দ্রিক কর্মসংস্থানের সুযোগগুলোই এলাকার সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড কে সবচেয়ে বেশি এবং সরাসরি শক্ত করবে। পরবর্তী পর্বে আমি আলোচনা করব এই অর্থনৈতিক জোয়ারের সমান্তরালে যে পরিবেশগত অন্ধকারের সংশয় লুকিয়ে আছে, অর্থাৎ গঙ্গা, সবুজ দ্বীপ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর এই প্রকল্পের সম্ভাব্য আঘাত নিয়ে।
♦–♦•♦–♦ ♦–♦•♦–♦
❤ Support Us







