Advertisement
  • দে । শ
  • আগস্ট ৬, ২০২৬

বস্ত্রশিল্পেই বাংলার অর্থনীতির নতুন ভরসা, নির্মলার সফর ঘিরে লগ্নির বার্তা; শিল্পনীতি নিয়ে তৃণমূল সরকারকে নিশানা শুভেন্দুর

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বস্ত্রশিল্পেই বাংলার অর্থনীতির নতুন ভরসা, নির্মলার সফর ঘিরে লগ্নির বার্তা; শিল্পনীতি নিয়ে তৃণমূল সরকারকে নিশানা শুভেন্দুর

বাংলার শিল্পায়নের নতুন অধ্যায় শুরু করতে বস্ত্রশিল্পকেই অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শিল্পে বিনিয়োগ টানতে প্রশাসনিক সংস্কারএকাধিক নীতিগত পরিবর্তনজমি বরাদ্দ থেকে শুরু করে কেন্দ্রের সহযোগিতার আশ্বাস— সব মিলিয়ে মিলন মেলা প্রাঙ্গণে আয়োজিত বস্ত্রশিল্প প্রদর্শনী ও সম্মেলনের মঞ্চ থেকে নতুন শিল্প-রূপরেখার ছবি তুলে ধরলেন মুখ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে পূর্বতন তৃণমূল সরকারের শিল্পনীতি এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের অভাব নিয়েও তীব্র সমালোচনা শোনা যায় তাঁর বক্তব্যে।

মুখ্যমন্ত্রীর দাবিদীর্ঘ দিন ধরে শিল্পোন্নয়নের দৌড়ে পিছিয়ে পড়া বাংলাকে ফের জাতীয় অর্থনীতির মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনাই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য। সে উদ্দেশ্যেই বস্ত্রশিল্পকে গ্রোথ ইঞ্জিন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁর কথায়রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই প্রশাসনিক পরিবেশে আমূল বদল এসেছে। শিল্পমহলের দীর্ঘ দিনের অভিযোগ— তোলাবাজিসিন্ডিকেট রাজস্থানীয় স্তরের প্রশাসনিক জটিলতা ইত্যাদি দূর করে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে শুভেন্দুর বার্তাগত পাঁচ দশকে যে শিল্প কাঠামো ভেঙে পড়েছিলতা পুনর্গঠনের দায়িত্ব এখন সরকার এবং শিল্পমহল— উভয়েরই। কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের জাতীয়তাবাদী’ ও দেশপ্রেমিক’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেনবাংলাকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভাষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে ছিল কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের প্রসঙ্গ। সম্প্রতি দিল্লিতে তাঁর সঙ্গে বৈঠকের কথা উল্লেখ করে শুভেন্দু জানানরাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হলেও অর্থমন্ত্রীর বিশেষ আগ্রহ ছিল বাংলার চা ও বস্ত্রশিল্পকে ঘিরে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবিনির্মলা সীতারামন তাঁকে স্পষ্ট জানিয়েছেনএই দুই ক্ষেত্রের উন্নয়নে কেন্দ্র প্রয়োজনীয় সহায়তা করতে আগ্রহী। এ আবহেই তিনি ঘোষণা করেনআগামী ২৪ থেকে ২৮ গস্টের মধ্যে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গ সফরে আসতে পারেন। সে সফরে বাংলার বস্ত্রশিল্পের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর একটি বিশেষ বৈঠকের আয়োজন করা হবে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, ‘বাংলার টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে তিনি গভীরভাবে ভাবছেন। শিল্পমহলের কাছে এটা বিরাট সুযোগ।’ রাজ্যের চা-শিল্প নিয়েও আশাবাদী মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যবন্ধ হয়ে থাকা চা-বাগানগুলি চালু করার বিষয়ে কেন্দ্র ইতিবাচক। চা-শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা এবং শিল্পের পুনরুজ্জীবনে কেন্দ্র ও রাজ্য যৌথভাবে কাজ করবে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।

শিল্পপতিদের দীর্ঘ দিনের দাবি ছিল প্রশাসনিক জটিলতা কমানো। সে দাবির প্রেক্ষিতেই এদিন ড়ো ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান১০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আর স্থানীয় পুরসভাকর্পোরেশন বা পঞ্চায়েতের অনুমোদনের জন্য আলাদা করে ঘুরতে হবে না। রাজ্য সরকারের সিঙ্গল উইন্ডো সিস্টেম’-এর মাধ্যমেই সমস্ত প্রয়োজনীয় অনুমোদন মিলবে। একই সঙ্গে তিনি জানানজমি ক্রয় নীতি ইতিমধ্যেই কার্যকর হয়েছে। খুব শীঘ্রই চালু হতে চলেছে নতুন ভূমি উন্নয়ন নীতিও। শিল্পের প্রয়োজনে বিধানসভায় আইন সংশোধনের প্রয়োজন হলেও সরকার সে পথেই হাঁটবে বলে আশ্বাস দেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণাআগামী এক মাসের মধ্যে অন্তত ২৫ জন শিল্পপতির হাতে শিল্পের জন্য জমি তুলে দেওয়া হবে। তাঁর মতেজমি সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা দূর করতে পারলেই শিল্প বিনিয়োগের গতি আরও বাড়বে।

সরকারি উদ্যোগের ফল ইতিমধ্যেই মিলতে শুরু করেছে বলেও দাবি করেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্যলাক্স কোজি ইতিমধ্যেই রাজ্যে নতুন প্রকল্পের কাজ শুরু করেছে। আমুল উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গে দুটি নতুন উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তুলতে জমি পেয়েছে। সেখানে দুগ্ধজাত পণ্যআইসক্রিম এবং অন্যান্য খাদ্যপণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়াও শ্যাম স্টিলের প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং পুরুলিয়ায় অমিত মেটালিক্সের চার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের কথাও উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবিরাজ্যে এখন প্রায় প্রতি মাসেই নতুন বিনিয়োগের প্রস্তাব আসছে।

ভাষণে তৃণমূল সরকারের শিল্পনীতি নিয়েও সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। বিশেষ করে বস্ত্রশিল্পে সুরাত থেকে সুতো ও কাঁচামাল আমদানির বিরোধিতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেনশিল্পের স্বার্থে আন্তঃরাজ্য বাণিজ্যকে সংকীর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা উচিত নয়। তাঁর বক্তব্যসুরাত থেকে কাঁচামাল এলেও সে সুতো দিয়ে শান্তিপুরফুলিয়া বা পূর্বস্থলীর তাঁতিরা কাপড় বুনছেন। ফলে পরিবহণ থেকে উৎপাদন— গোটা মূল্য সংযোজন প্রক্রিয়ায় লাভবান হচ্ছেন বাংলার মানুষই। তাই দেশের এক প্রান্তের শিল্প অন্য প্রান্তের অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করে— এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া প্রয়োজন বলেই মন্তব্য করেন তিনি। ভাষণের শেষ পর্বে ইতিহাসের প্রসঙ্গও টেনে আনেন মুখ্যমন্ত্রী। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকার উল্লেখ করে তিনি বলেনপশ্চিমবঙ্গ গঠনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত না হলে রাজ্যের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত। একই সঙ্গে কলকাতাকে দেশের সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক রাজধানী বলে উল্লেখ করে তিনি দাবি করেনমিলন মেলার বস্ত্র প্রদর্শনী থেকেই ৫০০ থেকে ১,০০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হতে পারে।

এদিন, প্রায় ২০০টি স্টল এবং দেশ-বিদেশের ক্রেতাদের উপস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে শুভেন্দু বলেনদুর্গাপুজোর মরসুমের আগেই এখান থেকে বিপুল পরিমাণ অর্ডার সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী এক-দুবছরের মধ্যেই শিল্পের নিরিখে বাংলা নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।  এ দিনের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মণপ্রতিমন্ত্রী উমেশ রাইমুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়ালকলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ-সহ প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকেরা। শিল্পমহলের একাংশের মতেঘোষণাগুলি বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হয়এখন সেদিকেই নজর থাকবে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের।

প্রসঙ্গত, শুধু বস্ত্রশিল্প নয়রাজ্যে বৃহৎ শিল্প বিনিয়োগ বাড়াতেও সক্রিয় হয়েছে রাজ্যের নতুন সরকার। নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছেসম্প্রতি মুম্বাইয়ে টাটা গোষ্ঠীর শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে রাজ্যের শিল্প দপ্তরের প্রতিনিধিদল। বৈঠকে সিঙ্গুরে ন্যানো প্রকল্প ঘিরে ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত আইনি ও প্রশাসনিক বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা হওয়ার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে বিনিয়োগের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হয়েছে। প্রশাসনিক সূত্রের দাবিউৎপাদন শিল্পতথ্যপ্রযুক্তিপরিকাঠামো-সহ একাধিক ক্ষেত্রে টাটা গোষ্ঠীকে নতুন বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অতীতের সিঙ্গুর বিতর্ককে পিছনে ফেলে শিল্পবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে দেশের প্রথম সারির শিল্পগোষ্ঠীগুলিকে আবার বাংলায় আনাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে সূত্রের খবর। যদিও টাটা গোষ্ঠীর সঙ্গে হওয়া বৈঠক নিয়ে এ পর্যন্ত রাজ্য সরকার বা সংস্থার পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি। তবে প্রশাসনিক মহলের মতেশিল্প বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে পশ্চিমবঙ্গকে ফের শিল্পের মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগগুলি নেওয়া হচ্ছে।


  • Tags:
❤ Support Us
Advertisement
error: Content is protected !!