- দে । শ
- আগস্ট ৬, ২০২৬
‘জলের বদলে ডেটা খেয়ে বাঁচা যায় না’, গুগলের বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প ঘিরে বাড়ছে বিতর্ক
পাহাড়-জঙ্গলের বুকে ভারী যন্ত্রের গর্জনে দিনরাত মুখর। দক্ষিণ ভারতের উপকূলীয় শহর বিশাখাপত্তনমে গুগলের বহুল প্রতীক্ষিত ডেটা সেন্টার প্রকল্পের কাজ এখন পূর্ণোদ্যমে চলছে। কিন্তু যত এগোচ্ছে নির্মাণ, ততই ঘনীভূত হচ্ছে বিতর্ক। জলের সঙ্কট, বন্যপ্রাণের নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের স্বচ্ছতা— এই তিন প্রশ্নকে সামনে রেখে একের পর এক আইনি লড়াই শুরু হয়েছে। পথে নেমেছেন পরিবেশকর্মীরা, সরব স্থানীয় বাসিন্দারাও। ফলে গুগলের ভারতের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ, প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের এই বিনিয়োগ এখন কার্যত পরিবেশ বনাম উন্নয়নের পরীক্ষার মুখে।
অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার অবশ্য গোড়া থেকেই এ প্রকল্পকে রাজ্যের অর্থনীতির জন্য ‘ঐতিহাসিক’ ও ‘রূপান্তরমূলক’ বলে দাবি করে এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী এন. চন্দ্রবাবু নাইডুও একাধিকবার জানিয়েছেন, এ প্রকল্প অন্ধ্রপ্রদেশকে ডিজিটাল অবকাঠামোর অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলবে। কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগ, প্রকল্পের সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব যথাযথভাবে বিচার না করেই দ্রুত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে, গত কয়েক সপ্তাহে বিশাখাপত্তনমে একাধিক প্রতিবাদ মিছিল হয়েছে। শিশু থেকে প্রবীণ— বহু মানুষ হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন। কোথাও লেখা, ‘ডেটা খেয়ে বাঁচা যায় না’, আবার কোথাও গুগলের লোগোর উপর আঁকা হয়েছে হাতকড়ার প্রতীক। সামাজিক মাধ্যমে সেসব ছবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
রবিবার পরিবেশরক্ষাকারী সংগঠনগুলির এক জনসমাবেশেও তৈরি হয়েছে আন্দোলনের পরবর্তী রূপরেখা। সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী দিনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতা প্রচার চালানো হবে। পাশাপাশি সমুদ্রসৈকতেও প্রতিবাদ কর্মসূচি সংগঠিত করা হবে।ওই সভায় ‘গ্রিন বিশাখা’-র প্রতিষ্ঠাতা রাজা রাম মোহন রায় স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘উন্নয়ন মানুষের জীবন-জীবিকা-সংস্কৃতি কেড়ে নিয়ে হতে পারে না।’ তাঁর বক্তব্য, শহরের বর্তমান জল পরিস্থিতিই অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তার উপর আরও একটি বৃহৎ শিল্পপ্রকল্প চাপ তৈরি করলে সাধারণ মানুষের সমস্যা কয়েকগুণ বাড়বে। সরকারি তথ্য বলছে, প্রায় ২৫ লক্ষ জনসংখ্যার বিশাখাপত্তনমে প্রতিদিন জল প্রয়োজন প্রায় ৪৮ কোটি লিটার। অথচ শহরটি বর্তমানে বিভিন্ন জলাধার ও নদী থেকে পায় মাত্র ৪১ কোটি লিটার জল। সে কারণে শহরের বহু এলাকায় নিয়মিত জল রেশনিং করতে হয়।
এহেন পরিস্থিতিতে পরিবেশকর্মীদের প্রশ্ন, বিপুল পরিমাণ সার্ভার নিয়ে গড়ে ওঠা ডেটা সেন্টারের জন্য আগামী ২০ বছরের নিশ্চিত জল সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলে, তার প্রভাব কি শহরের সাধারণ মানুষের উপর পড়বে না? বিশ্বজুড়েই ডেটা সেন্টার শিল্পের বিরুদ্ধে একই ধরনের উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ, হাজার হাজার সার্ভার ঠান্ডা রাখতে প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ জল এবং বিদ্যুৎ। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলসঙ্কটে ভোগা অঞ্চলে এই ধরনের প্রকল্পের প্রভাব আরও বেশি হতে পারে। গত জুলাই মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের ৪২টি অঙ্গরাজ্যে ১৪২টি প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়েছিল একই ইস্যুতে।
ভারতে নয়া এই বিতর্কের জেরে বিষয়টি পৌঁছেছে আদালতেও। ‘জল বিরাদরি’ নামের একটি সংগঠন অন্ধ্রপ্রদেশ হাই কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছে। তাদের অভিযোগ, প্রকল্পটির জন্য নিকটবর্তী জলাধারের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে, যা ভবিষ্যতে জলসঙ্কট আরও তীব্র করতে পারে। সোমবার হাই কোর্ট রাজ্য সরকারকে এই অভিযোগের জবাব দিতে নির্দেশ দিয়েছে। মামলার পরবর্তী শুনানি হবে ২৪ আগস্ট। এছাড়াও ‘হিউম্যান রাইটস ফোরাম’ ভারতের পরিবেশ আদালতে আরও তিনটি পৃথক মামলা দায়ের করেছে। তাদের অভিযোগ, গ্রামীণ পানীয় জল প্রকল্পের উপর সম্ভাব্য প্রভাব খতিয়ে না দেখেই প্রশাসন এই প্রকল্পে ছাড়পত্র দিয়েছে।
অন্যদিকে, পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার। এক বিবৃতিতে সরকারের দাবি, প্রকল্প নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে, তার অনেকটাই ‘ভুল ও বিভ্রান্তিকর’। তবে সরকার একই সঙ্গে জানিয়েছে, প্রতিবাদ করা নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার। অভিযোগের মধ্যে যদি কোনও বাস্তব ভিত্তি থাকে, তা হলে সরকার আলোচনা করবে, তথ্য-সহ ব্যাখ্যা দেবে এবং প্রয়োজন হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। চন্দ্রবাবু সরকারের আরও দাবি, গ্রামীণ বা আবাসিক ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ জল কোনওভাবেই এই ডেটা সেন্টারের জন্য ব্যবহার করা হবে না। এমনকি নিকটবর্তী জলাধার থেকেও প্রকল্পে জল সরবরাহ করা হবে না।
গুগলও সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে জানিয়েছে, প্রকল্পটি দেশের সমস্ত প্রযোজ্য আইন মেনেই গড়ে তোলা হচ্ছে। সংস্থার দাবি, স্থানীয় জলসম্পদের উপর চাপ কমাতে আধুনিক এয়ার-কুলিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, যাতে জলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। এ ছাড়া প্রকল্পের নির্মাণ এবং ভবিষ্যতের পরিচালনাকালে শব্দদূষণ কমাতে বিশেষ সাউন্ড-ড্যাম্পেনিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে বলেও জানিয়েছে গুগল। সংস্থার দাবি, তারা স্থানীয় এলাকার পরিবেশের কোনো ক্ষতি করবে না। তবে, সরকার বা সংস্থার বক্তব্যের সাথে একমত নন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের মতে, শুধু জল নয়, আরও বড়ো উদ্বেগ প্রকল্পের অবস্থান। নির্মীয়মাণ ডেটা সেন্টারটি কম্বলকোন্ডা বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য থেকে মাত্র ৮৬০ মিটার দূরে। এই অভয়ারণ্যে চিতাবাঘ, প্যাঙ্গোলিন-সহ একাধিক সংরক্ষিত প্রাণীর বাস। অভিযোগ, ভারী নির্মাণযন্ত্র, অবিরাম শব্দ এবং ভবিষ্যতের শিল্প কার্যকলাপ ওই অভয়ারণ্যের পরিবেশের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও রাজ্য সরকারের বক্তব্য, প্রকল্পটি আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ন্যূনতম দূরত্বের বাইরেই অবস্থিত। ফলে নিয়মভঙ্গের কোনো প্রশ্ন নেই।
প্রসঙ্গত, গুগলের বিতর্কিত এই ডেটা সেন্টার প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে আদানি গোষ্ঠীর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে। সরকারি অনুমান অনুযায়ী, এ প্রকল্প থেকে প্রায় ১ লক্ষ ৮৮ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। সে কারণেই অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার এটিকে রাজ্যের শিল্পোন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে তুলে ধরছে। তবে পরিবেশবাদীদের বক্তব্য, কর্মসংস্থান অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু উন্নয়নের নামে যদি জল, জঙ্গল তথা পরিবেশ এবং মানুষের মৌলিক জীবনযাত্রা বিপন্ন হয়, তবে সে উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। তাই আদালতের রায় এবং প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন তাকিয়ে বিশাখাপত্তনমের মানুষ।
❤ Support Us






