- দে । শ
- আগস্ট ৭, ২০২৬
উত্তর মেরু অভিযানে উত্তরাখণ্ডের দশম শ্রেণির ছাত্র লাকি রাওয়াত
হিমালয়ের কোলে ছোট্ট পাহাড়ি শহর চকরাতা। সেখানকার এক কিশোরের সাফল্যে গর্বিত শুধু উত্তরাখণ্ড নয়, গোটা দেশ। দশম শ্রেণির ছাত্র লাকি রাওয়াত এমন এক কৃতিত্বের নজির গড়েছেন, যা জীবনে অর্জন করার সুযোগ খুব কম মানুষেরই হয়। বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষামূলক কর্মসূচি ‘আইসব্রেকার অব নলেজ’-এ ভারতের একমাত্র ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। আর সে সূত্রেই উত্তর মেরুর বরফের রাজ্যে পাড়ি দিয়েছেন লাকি। পৃথিবীর অন্যতম দুর্গম ও প্রতিকূল পরিবেশে জলবায়ু পরিবর্তন, বাস্তুতন্ত্র, সামুদ্রিক বিজ্ঞান এবং মেরু গবেষণা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ মিলবে তাঁর।
রাশিয়ার মুরমানস্ক বন্দর থেকে শুরু হয়েছে এই ব্যতিক্রমী ১০ দিনের অভিযান। বিশ্বের ২২টি দেশের ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সি পড়ুয়াদের নিয়ে পারমাণবিক শক্তিচালিত আইসব্রেকার ‘৫০ লেট পোবেদি’ উত্তর মেরুর ৯০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশের দিকে যাত্রা করেছে। ভারত, বাংলাদেশ, চিন, রাশিয়া-সহ বিভিন্ন দেশের নির্বাচিত পড়ুয়ারা এ অভিযানে একসঙ্গে বিজ্ঞানভিত্তিক নানা কর্মশালা, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, গবেষণামূলক কার্যক্রম আর সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বৈজ্ঞানিক কৌতূহল জাগিয়ে তোলাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন উদ্যোগতরা।
এ অভিযানে সুযোগ পাওয়া মোটেই সহজ ছিল না। লাকিকে পেরোতে হয়েছে কঠোর তিন ধাপের আন্তর্জাতিক নির্বাচন প্রক্রিয়া। হাজার হাজার আবেদনকারীর মধ্য থেকে প্রতিটি অংশগ্রহণকারী দেশ থেকে মাত্র একজন করে পড়ুয়াকে বেছে নেওয়া হয়েছে। সেই কঠিন প্রতিযোগিতায় ভারতের প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব এসে পড়েছে উত্তরাখণ্ডের এই কিশোরের কাঁধে। অভিযানে রওনা হওয়ার আগে লাকি বলেন, ‘আমি উত্তরাখণ্ডের চকরাতার বাসিন্দা। এই আন্তর্জাতিক অভিযানে ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিতে পেরে নিজেকে অত্যন্ত সম্মানিত মনে হচ্ছে। আমরা ১০ দিনের জন্য উত্তর মেরুতে যাচ্ছি। পৃথিবীর খুব অল্পসংখ্যক মানুষের মতো আমরাও উত্তর মেরুতে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা অর্জন করব।’
ছেলের এ সাফল্যে উচ্ছ্বসিত তাঁর পরিবারও। বাবা রাম সিংহ বলেন, ‘আমার ছেলে কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছে। ও উত্তর মেরুতে ১০ দিনের বৈজ্ঞানিক অভিযানে যাচ্ছে। একজন বাবা হিসেবে এর চেয়ে বড়ো গর্বের মুহূর্ত আর কী হতে পারে!’ শুধু পড়াশোনাতেই নয়, লাকি একজন দক্ষ জুডোকাও। খেলাধুলার মাধ্যমে অর্জিত শৃঙ্খলা, মানসিক দৃঢ়তা এবং অধ্যবসায়ই তাঁকে এই আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছে দিয়েছে বলে মনে করেন তাঁর পরিবারের সদস্যেরা। ‘আইসব্রেকার অব নলেজ’ কর্মসূচির লক্ষ্য কেবল পড়ুয়াদের উত্তর মেরু ঘুরিয়ে আনা নয়। আগামী প্রজন্মের বিজ্ঞানমনস্ক নেতৃত্ব গড়ে তোলা, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সংকট সম্পর্কে সচেতন করে তোলা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব উপলব্ধি করানোই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। বরফে ঢাকা আর্কটিক অঞ্চলে গবেষকদের কাজ কাছ থেকে দেখা, মেরু অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে জানা, সমুদ্র ও জলবায়ুবিজ্ঞানের বিভিন্ন দিক নিয়ে হাতে-কলমে শেখা এবং বিশ্বের নানা প্রান্তের সমবয়সীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের বিরল সুযোগ পাচ্ছেন অংশগ্রহণকারীরা।
চকরাতার শান্ত পাহাড়ি জনপদ থেকে শুরু হওয়া লাকি রাওয়াতের এই যাত্রা শেষ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে পৃথিবীর উত্তরতম প্রান্তে। তাঁর এ সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, ভারতের তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনারও প্রতীক। কঠোর পরিশ্রম, মেধা এবং জানার অদম্য আগ্রহ থাকলে বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে পৌঁছানো সম্ভব— লাকির উত্তর মেরু অভিযান সে বার্তাই আরও একবার তুলে ধরল।
❤ Support Us






