- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬
পচা মাছ-মাংস, মিষ্টিতে দোলের রং! পুজোর মুখে রাজ্যজুড়ে রেস্তরাঁ অভিযানে খাদ্য দফতর, উদ্ধার ৫০০ কেজি বাসি খাবার
দুর্গাপুজোর আর বেশি দেরি নেই। তার আগে রাজ্যজুড়ে খাবারের মান নিয়ে চোখ কপালে ওঠার মতো ছবি। কোথাও ফ্রিজের ভিতর কিলো কিলো পচা মাংস। কোথাও বাসি চিংড়ি। কোথাও আবার মিষ্টিতে ব্যবহার করা হচ্ছে দোলের আবির! কলকাতা থেকে জেলার একাধিক রেস্তরাঁ, মিষ্টির দোকান, ধাবা ও খাবারের দোকানে পর পর অভিযানে ধরা পড়ল এমনই নানা অনিয়ম।
সবচেয়ে বেশি উদ্ধার কলকাতার ট্যাংরায়। একটি জনপ্রিয় ‘চাইনিজ রেস্তরাঁ’-র রান্নাঘর থেকে প্রায় ৫০০ কেজি বাসি কাঁচা মুরগি ও চিংড়ি উদ্ধার করেছে কলকাতা পুরসভা। বুধবার ওই রেস্তরাঁটি সাময়িক ভাবে বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিছু খাবার এতটাই শক্ত হয়ে জমাট বেঁধেছিল যে প্যাকেট থেকে বার করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল বলে জানিয়েছেন পুর আধিকারিকেরা। কলকাতার পাশাপাশি বাদুড়িয়া, মধ্যমগ্রাম, আরামবাগ, শক্তিগড়, পূর্ব মেদিনীপুর এবং দীঘাতেও চলেছে অভিযান। কোথাও উদ্ধার হয়েছে পচা মাংস, কোথাও মেয়াদ-ফুরোনো খাবার, কোথাও আবার মিষ্টিতে দোলের রং। দুর্গাপুজোর আগে এই ধারাবাহিক অভিযান এবং খাদ্যসামগ্রীর এমন হাল স্বাভাবিক ভাবেই উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কারণ, পুজোর সময়ে রেস্তরাঁ ও খাবারের দোকানগুলিতে ভিড় কয়েক গুণ বাড়ে।
১ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর রাজ্যে ‘ফুড সেফটি উইক’ শুরু হয়েছে। কলকাতার হগ মার্কেট, অর্থাৎ নিউ মার্কেট এলাকা থেকে কর্মসূচির সূচনা করে মুখ্যমন্ত্রী সুভেন্দু অধিকারী খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা জানিয়েছেন। তার পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয়েছে ধারাবাহিক অভিযান। কলকাতার একাধিক নামী রেস্তরাঁ থেকে জেলার মিষ্টির দোকান— বাদ পড়েনি প্রায় কোনো ক্ষেত্রই। অভিযানের ছবি সামনে আসতেই আরও চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। কোনো রেস্তরাঁর রান্নাঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে আরশোলা। কোথাও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাখা হয়েছে মাংস। আবার কোথাও ফ্রিজ খুলতেই মিলেছে ছত্রাক ধরা মুরগি।
২০১৮ সালের ‘ভাগাড় কাণ্ড’-এর স্মৃতি এখনো টাটকা। সেই বাদুড়িয়াতেই ফের উদ্ধার হল পচা মাংস। মঙ্গলবার উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়ার একটি নামী রেস্তরাঁয় হানা দিয়ে প্রায় ৪০ কেজি পচা মুরগি ও খাসির মাংস উদ্ধার করেন খাদ্য নিরাপত্তা আধিকারিকেরা। রেস্তরাঁ কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই মাংস রান্নার জন্য রাখা হয়নি। আলাদা করে সরিয়ে রাখা হয়েছিল, ফেলে দেওয়ার জন্য। কিন্তু সে ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হননি খাদ্য দফতরের আধিকারিকেরা। রেস্তরাঁটিকে নোটিস দেওয়া হয়েছে। অভিযানকে ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোরও। বিজেপি নেতা সঞ্জয় ঘোষের অভিযোগ, আগের তৃণমূল সরকারের আমলে একাধিক হোটেল ও রেস্তরাঁয় বেআইনি কাজ চলত। সরকার বদলেছে, কিন্তু ওদের অভ্যাস বদলায়নি।
কলকাতার একটি মলেও আচমকা অভিযান চালিয়ে একাধিক অনিয়মের সন্ধান মিলেছে। প্রতিদিন যেখানে হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন, সেই শপিং মলের ফুড কোর্টের কয়েকটি দোকান থেকে উদ্ধার হয়েছে পচা মাংস এবং মেয়াদ-ফুরোনো খাবারের প্যাকেট। কোনো কোনো দোকানের প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ছিল না বলে অভিযোগ। কোনো দোকানে আবার রান্নাঘরের পরিবেশ নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। একটি নামী রেস্তরাঁর ফ্রিজ খুলতেই পাওয়া যায় ছত্রাক ধরা মুরগির মাংস। পরিদর্শনকারী দলকে দেখেই কয়েক জন কর্মী খাবার ডাস্টবিনে ফেলে দিতে শুরু করেন বলেও অভিযোগ। অভিযানের পর ওই রেস্তরাঁর লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।মঙ্গলবারই কলকাতা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তরে মধ্যমগ্রামের একটি রেস্তরাঁয় অভিযান চালিয়েছিল খাদ্য নিরাপত্তা দফতর। সেখানেও ফ্রিজে রাখা পচা কাঁচা মুরগি উদ্ধার করা হয়।
মাংসের পাশাপাশি নজরে এসেছে মিষ্টিও। হুগলির আরামবাগে একটি মিষ্টির দোকানে অভিযান চালিয়ে আধিকারিকেরা দেখতে পান, মিষ্টিতে রং করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে আবির। দোকানের মালিক স্বীকার করেছেন, দোলের সময়ের পড়ে থাকা আবিরই ব্যবহার করা হয়েছিল। খাদ্য নিরাপত্তা আধিকারিক যদুনাথ হেমব্রম জানান, দোকানে দোলের আবিরকে কৃত্রিম খাদ্য-রং হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। পূর্ব মেদিনীপুরের বিভিন্ন ধাবাতেও খাবার সংরক্ষণ এবং কৃত্রিম রং ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনিয়ম ধরা পড়েছে। পর্যটনকেন্দ্র দীঘাতেও পৌঁছেছে খাদ্য নিরাপত্তা দফতরের অভিযান। উপকূলের শহরটির ২০টি হোটেলে তল্লাশি চালানো হয়। অভিযোগ, বিরিয়ানি তৈরির সময় রাসায়নিক-ভিত্তিক রং ব্যবহার করা হচ্ছিল। অভিযানের পরে ১২টি রেস্তরাঁকে নোটিস দেওয়া হয়েছে। পুজোর আগে পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে ভিড় বাড়তে চলেছে। তার আগে খাবারের গুণমান নিয়ে প্রশাসনের এই নজরদারি তাই তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিকেরা জানিয়েছেন, পুরসভার খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়মগুলি’ ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অব ইন্ডিয়া’-র নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁদের বক্তব্য, প্রস্তুত বা আধা-প্রস্তুত খাবার নির্দিষ্ট তারিখের ট্যাগ ছাড়া সংরক্ষণ করা যায় না। কাঁচা খাবার এবং কাঁচা মুরগির ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় ট্যাগ থাকা উচিত। নিয়ম ভাঙলে জরিমানার পাশাপাশি লাইসেন্স স্থগিত করার মতো পদক্ষেপও করা যেতে পারে। এক আধিকারিক জানিয়েছেন, অপরাধের ধরন অনুযায়ী জরিমানার পরিমাণ ৫০ হাজার থেকে ৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
২০১৮ সালে কলকাতা ও সংলগ্ন জেলাগুলিতে তল্লাশি চালিয়ে একটি চক্রের হদিস মিলেছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল, যারা পুরসভার ডাম্পিং গ্রাউন্ড থেকে মৃত পশুর দেহ সংগ্রহ করত। অভিযোগ ছিল, সেই মাংস রাসায়নিক দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন রেস্তরাঁ এবং ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে সরবরাহ করা হতো। পচা মাংস সংরক্ষণে অ্যালুমিনিয়াম সালফেট এবং ফর্মালিনের মতো রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছিল। মাংস বাক্সবন্দি করে অন্যত্র পাঠানো হতো। শনাক্তকরণ এড়াতে বাক্সের উপরে ইলিশ বা চিংড়ি রাখা হত বলেও অভিযোগ উঠেছিল। কলকাতার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী রাজ্যেও সে মাংস পাঠানোর অভিযোগ ছিল। শপিং মলে হিমায়িত মাংস হিসাবেও তা বিক্রি করা হত বলে অভিযোগ উঠেছিল। তদন্তকারীদের সন্দেহ ছিল, প্রায় ১০ বছর ধরে এই চক্র চলেছিল।
ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরে কলকাতার রেস্তরাঁগুলিতে আমিষ খাবারের বিক্রি প্রায় অর্ধেক হয়ে গিয়েছিল বলে জানা যায়। মাংসের বদলে অনেকেই রেস্তরাঁয় মাছ এবং নিরামিষ খাবারের দিকে ঝুঁকেছিলেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার বাংলা চলচ্চিত্র জগতের জনপ্রিয় মুখদের সামনে এনে মানুষকে মাংস খাওয়া বন্ধ না করার আবেদন জানিয়েছিল। এবারের ঘটনার আট বছর পর ফের পচা মাংস, বাসি চিংড়ি, ছত্রাক ধরা মুরগি এবং খাবারে ব্যবহারের অনুপযুক্ত রং উদ্ধারের ঘটনা সামনে এসেছে। একদিকে দুর্গাপুজো ঘিরে বাড়ছে রেস্তরাঁ, হোটেল ও খাবারের দোকানে ভিড়। অন্য দিকে অভিযান যত বাড়ছে, ততই সামনে আসছে খাবার সংরক্ষণ এবং প্রস্তুতির ক্ষেত্রে নানা গাফিলতির ছবি। উৎসবের মরসুমে সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন নজর থাকবে প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
❤ Support Us







