Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬

আরবল্লি নিয়ে টালবাহানা নয় : নির্ধারিত সময়ে রিপোর্ট পেশ না হলে, কমিটি পুনর্গঠনের হুঁশিয়ারি শীর্ষ আদালতের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
আরবল্লি নিয়ে টালবাহানা নয় : নির্ধারিত সময়ে রিপোর্ট পেশ না হলে, কমিটি পুনর্গঠনের হুঁশিয়ারি শীর্ষ আদালতের

আরাবল্লি পাহাড়ের সংজ্ঞা ও তার সুরক্ষা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের নিষ্পত্তিতে আর দেরি করতে নারাজ সুপ্রিম কোর্ট। চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার জন্য আরও ৬ মাস সময় চেয়েছিল আরাবল্লি সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ কমিটি। সে আবেদন সোমবার খারিজ করে দিল শীর্ষ আদালত। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়ার জন্য কমিটিকে কড়া নির্দেশ দিয়েছে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিপোর্ট দিতে না পারলে কমিটিই পুনর্গঠন করা হবে—সোমবার স্পষ্ট করে দিয়েছে আদালত।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, অরবল্লি সংক্রান্ত বিষয়ে আর দীর্ঘসূত্রিতা বরদাস্ত করা হবে না। শুনানিতে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘অরবল্লি সংক্রান্ত রিপোর্ট জমা দিতে কমিটি দিন-রাত এক করে কাজ করুক। ২ মাসের মধ্যে তারা তা করতে না পারলে আমরা পুরো কমিটিই পুনর্গঠন করব।’ কমিটির তরফে আদালতের কাছে ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় চাওয়া হয়েছিল। যুক্তি ছিল, আরাবল্লি পাহাড় ও রেঞ্জের সংজ্ঞা, সীমানা আর পরিবেশগত সুরক্ষা নিয়ে ‘সর্বাঙ্গীণ’ এবং ‘আইনি ভাবে টেকসই’ রিপোর্ট তৈরি করতে আরও সময় প্রয়োজন। কিন্তু সে যুক্তিতে সায় দেয়নি শীর্ষ আদালত। বরং প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত মন্তব্য করেন, কমিটির চাওয়া সময়সীমা তাঁর অবসরের পরের তারিখের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। শুনানিতে তাঁর মন্তব্য, ‘ওরা স্পষ্ট ভাবেই আমার অবসরের পরের একটা তারিখ চেয়েছে… তারা যদি তা করতে সক্ষম না হয়, আমরা কমিটি পুনর্গঠন করব।’

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ আরাবল্লির সংজ্ঞা? দিল্লি, হরিয়ানা, রাজস্থান ও গুজরাত জুড়ে বিস্তৃত আরাবল্লি পর্বতমালা পরিবেশগত ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মরুকরণের বিস্তার রোখা, ভূগর্ভস্থ জলের ভারসাম্য বজায় রাখা, বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পরিবেশের উপর এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। ফলে আরাবল্লির সংজ্ঞা কী হবে, কোন এলাকা পাহাড় বা রেঞ্জের আওতায় পড়বে— তার উপর নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট এলাকায় খনন, নির্মাণ এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ডের উপর পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর হবে। আরাবল্লির সংজ্ঞা নির্ধারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই চার রাজ্যের মধ্যে অসঙ্গতি ছিল। কোথাও পাহাড় চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে এক ধরনের মাপকাঠি, আবার অন্যত্র অন্য সংজ্ঞা ব্যবহৃত হয়েছে। এর ফলে পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে নানা ফাঁক। সে সুযোগে আরাবল্লি অঞ্চলে বেআইনি খনন ও অবৈধ নির্মাণের অভিযোগও উঠেছে বার বার। এ পরিস্থিতিতে আরাবল্লির সংজ্ঞা শিথিল করা হলে, এত দিন সুরক্ষিত বলে বিবেচিত বহু এলাকা খনন বা নির্মাণের আওতায় চলে আসতে পারে— এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পরিবেশকর্মী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

আরাবল্লি পাহাড়ের সংশোধিত সংজ্ঞা নিয়ে পরিবেশকর্মী ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে উদ্বেগ এবং প্রতিবাদের পর, ২৫ সালের ডিসেম্বরে বিষয়টি স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে গ্রহণ করে সুপ্রিম কোর্ট। এর পর আরাবল্লি পাহাড় এবং আরাবল্লি রেঞ্জের সংজ্ঞা ও সীমানা নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনার জন্য চলতি বছরের জুনে ৫ সদস্যের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে শীর্ষ আদালত। আদালতের বক্তব্য ছিল, আরাবল্লির মতো পরিবেশগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এলাকার ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে এমন সিদ্ধান্ত বিশেষজ্ঞদের মতামত ও মূল্যায়ন ছাড়া নেওয়া উচিত নয়।

কমিটির পদাধিকারবলে প্রধান করা হয়েছে ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব ফরেস্ট্রি রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন’-এর ডিরেক্টর জেনারেলকে। সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন ‘ফরেস্ট সার্ভে অব ইন্ডিয়া’র প্রাক্তন ডিরেক্টর জেনারেল ড. সুভাষ অশুতোষ, ‘জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া’র প্রাক্তন ডিরেক্টর ড. রাজেন্দ্র কুমার শর্মা, পরিবেশ, ‘বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক’-এর প্রাক্তন যুগ্মসচিব ব্রিজ মোহন সিং রাঠোর এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানি বিভাগের প্রাক্তন প্রধান অধ্যাপক অশোক কে. ভাটনগর। এ ছাড়াও ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান সেটেলমেন্টস’-এর অধ্যাপক জগদীশ কৃষ্ণস্বামী এবং সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব হরিয়ানার অধ্যাপক লক্ষ্মীকান্ত শর্মাকে বিশেষ আমন্ত্রিত সদস্য হিসেবে প্রয়োজন অনুযায়ী কমিটির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকের ডিরেক্টর পদমর্যাদার এক জন আধিকারিককে কমিটির সদস্য-সচিব করা হয়েছে।

সোমবারের শুনানিতে শুধু সময়সীমা বেঁধে দেওয়াই নয়, রিপোর্ট তৈরির প্রক্রিয়া নিয়েও কমিটিকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। আরাবল্লি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে যাঁদের স্বার্থ প্রভাবিত হতে পারে, তাঁদের বক্তব্য শুনে তবেই চূড়ান্ত রিপোর্ট তৈরি করতে হবে।  বিশেষ করে রাজস্থান এবং গুজরাতের মূলনিবাসী সম্প্রদায়ের মতামত নেওয়ার উপর জোর দিয়েছে আদালত। ওই অঞ্চলের ভূদৃশ্যের সঙ্গে যাঁদের জীবন-জীবিকা ও স্বার্থ সরাসরি জড়িত, তাঁদের বাদ দিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না— আদালতের নির্দেশের তাৎপর্য এমনই। তবে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে দ্রুত আদালতের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হলে পুরো রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। কমিটিকে বিষয়ভিত্তিক অন্তর্বর্তী রিপোর্ট জমা দেওয়ারও অনুমতি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ফলে আরাবল্লি সংক্রান্ত কোনও জরুরি প্রশ্নে চূড়ান্ত রিপোর্টের আগেই আদালত প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে পারবে। আগামী ২ ডিসেম্বর মামলার পরবর্তী শুনানি। সে সময়ে কমিটির রিপোর্ট এবং রিপোর্ট থেকে উঠে আসা বিভিন্ন প্রশ্ন পর্যালোচনা করতে পারে শীর্ষ আদালত।

উল্লেখ্য, আরাবল্লির সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে পাহাড় চিহ্নিত করার মাপকাঠি। খননের ক্ষেত্রে অরবল্লির কার্যকরী সংজ্ঞা নির্ধারণে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকের একটি কমিটির সুপারিশ আগেই গ্রহণ করেছিল সুপ্রিম কোর্ট। সেই সংজ্ঞা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট জেলাগুলিতে স্থানীয় ভূমির উচ্চতা থেকে অন্তত ১০০ মিটার উঁচু যে কোনো ভূ-প্রকৃতিকে ‘আরাবল্লি পাহাড়’ হিসেবে ধরা হবে। এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট ঢাল ও তার সঙ্গে সংযুক্ত ভূ-প্রকৃতিও অন্তর্ভুক্ত। আবার এমন দু-টি বা তার বেশি পাহাড় যদি একে অপরের ৫০০ মিটারের মধ্যে থাকে, তা হলে সেই এলাকাকে ‘আরাবল্লি রেঞ্জ’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।  এই সংজ্ঞা কার্যকর হলে অরবল্লির বিস্তীর্ণ অংশ সুরক্ষার আওতার বাইরে চলে যেতে পারে কি না, তা নিয়েই মূল উদ্বেগ পরিবেশমহলে। সে বিতর্কেরই চূড়ান্ত মীমাংসার পথে এখন তাকিয়ে সুপ্রিম কোর্ট।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!