- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬
বাঘের হানায় ‘ব্রেন ডেড’, অন্যের প্রাণ বাঁচাতে মৎস্যজীবীর অঙ্গদান, মানবিক নজির সুন্দরবনে
সুন্দরবনের নোনাজলের বাদাবনে তৈরি হয়েছিল অঙ্গদানের এক মানবিক নজির। বাঘের হামলায় গুরুতর জখম হয়ে ‘ব্রেন ডেড’ হওয়া ৩৬ বছরের মৎস্যজীবী আজিত মোল্লার অঙ্গদানে সম্মতি দিয়েছিল তাঁর পরিবার। প্রতিকূলতা পেরিয়ে শুরু হয়েছিল অঙ্গ সংগ্রহের প্রক্রিয়াও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই অঙ্গ অন্য কোনো মানুষের জীবন বাঁচাতে কাজে লাগানো গেল না। অস্ত্রোপচারের টেবিলেই হঠাৎ থেমে গেল আজিতের হৃদ্যন্ত্র। চিকিৎসকদের মতে, এখন তাঁর কর্নিয়া ছাড়া আর কোনো অঙ্গ সংগ্রহ করা সম্ভব নয়।
গত বুধবার সুন্দরবনের বিদ্যা নদী সংলগ্ন কালীবেরার চরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ইলিশ ধরতে গিয়েছিলেন কুলতলির মৈপীঠের প্রত্যন্ত নগেনাবাদ এলাকার বাসিন্দা আজিত। দক্ষিণ ২৪ পরগনা বনবিভাগের অন্তর্গত ওই বাদাবন এলাকায় মাছ ধরার জাল নদীর চরে আটকে যায়। জাল ছাড়ানোর জন্য আজিতের সঙ্গে ছিলেন তাঁর খুড়তুতো ভাই হজরত মোল্লা, আনসার মোল্লা, আলম মোল্লা, হাফিজুল মোল্লা আর ভাইপো রেজ্জাক।
জাল ছাড়ানোর কাজ চলাকালীন আচমকাই পিছন থেকে আজিতের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। বাকি সঙ্গীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাঘের থাবায় রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। তবে সঙ্গে থাকা অন্যদের সম্মিলিত বাধার মুখে শিকারকে টেনে নিয়ে যেতে পারেনি বাঘ। গুরুতর জখম অবস্থায় প্রথমে তাঁকে জামতলা গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ক্ষতস্থানের গভীরতা ও আঘাতের গুরুত্ব বুঝে সেখানকার চিকিৎসকেরা তাঁকে দ্রুত এসএসকেএম হাসপাতালে রেফার করেন।
এর পর থেকে এসএসকেএম হাসপাতালের ট্রমা কেয়ারে চিকিৎসাধীন ছিলেন আজিত। রবিবার চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর মস্তিষ্কের মৃত্যু হয়েছে। আজিত আর ফিরবেন না—এই কঠিন সত্য জানার পর তাঁর পরিবারের সঙ্গে অঙ্গদানের বিষয়ে কথা বলেন এসএসকেএমে থাকা রোটো (রিজিওনাল অর্গান অ্যান্ড টিস্যু ট্রান্সপ্লান্ট অর্গানাইজেশন)-র প্রতিনিধিরা। পরিবারকে বোঝানো হয়, আজিতের অঙ্গ অন্য মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। সেই কথা শোনার পর হাসপাতাল থেকে পরিবারের সদস্যেরা বাড়ির অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করেন। শেষ পর্যন্ত অঙ্গদানে সম্মতি দেয় পরিবার।
মঙ্গলবার আজিতের স্ত্রী তসলিমা স্বামীর অঙ্গদানের সম্মতিপত্রে সই করেন। পরিবারের সম্মতি পাওয়ার পর মঙ্গলবার রাত থেকেই অঙ্গ সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু হয়। আজিতের যকৃৎ, কিডনি এবং কর্নিয়া সংগ্রহ করে প্রয়োজনমতো গ্রহীতার শরীরে প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সে আশা পূরণ হলো না। অঙ্গ সংগ্রহের অস্ত্রোপচার চলাকালীনই আজিতের হৃদ্যন্ত্র থেমে যায়। এসএসকেএম সূত্রে জানা গিয়েছে, এর ফলে যকৃৎ ও কিডনি আর সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। এখন শুধু তাঁর কর্নিয়া সংগ্রহ করা যাবে।
আজিতের পরিবারের এ সিদ্ধান্ত অবশ্য অঙ্গদানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। কুলতলির মৈপীঠের প্রত্যন্ত নগেনাবাদ এলাকার এই পরিবারের শিক্ষার পরিসরও খুব বেশি নয়। আজিত নিজে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। তিন প্রজন্মের মধ্যে দ্বিতীয় প্রজন্মের এক সদস্য নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। তবে বর্তমান প্রজন্মের দুই ভাইঝির মধ্যে আছিয়া মোল্লা জামতলা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। অন্য ভাইঝি রুনা মোল্লা আগামী বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। চিকিৎসকদের একাংশের মতে, সুন্দরবনের বাদাবন ঘেরা প্রত্যন্ত এলাকায় তথাকথিত শিক্ষার হার কম হলেও অঙ্গদানের বিষয়ে পরিবারের সিদ্ধান্তে তা বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং প্রবল শোকের মধ্যেও পরিবার যে মানবিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটিই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
আজিতের চারটি শিশুসন্তান রয়েছে। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটটির বয়স মাত্র আট মাস। ভাই হাফিজুল মোল্লা জানিয়েছিলেন, ভাই চলে গেলেও তাঁর অঙ্গের মাধ্যমে অন্য মানুষের শরীরে তিনি বেঁচে থাকবেন—এই ভাবনাই পরিবারকে অঙ্গদানে রাজি হতে সাহায্য করেছে। মঙ্গলবার হাফিজুল বলেন, ‘হাসপাতালের তরফে আমাদের কোনও চাপ দেওয়া হয়নি। ডাক্তারবাবুরা বোঝানোর পরে ভাবলাম, বাড়িতে তো ভাইয়ের দেহই ফিরিয়ে নিয়ে যাব। তার চেয়ে ভাইয়ের অঙ্গে আরও অনেকে বাঁচলে শান্তি পাব। আমার বৌদির কোলে আট মাসের শিশুসন্তান রয়েছে। দাদার আরও তিন ছেলে আছে। তাদের কী ভাবে মানুষ করবে, সে চিন্তা তো আছেই। তবুও অনেকের ভালো হবে বলার পরে এক কথায় বৌদি সম্মতিপত্রে সই করে দিয়েছে।’
মানবিক এ সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন চিকিৎসকরাও। এসএসকেএমের নেফ্রোলজি বিভাগের প্রধান চিকিৎসক অর্পিতা রায়চৌধুরী বলেন, ‘অঙ্গদান নিয়ে এখনো অনেকের মধ্যে কুসংস্কার রয়েছে। ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে মরণোত্তর অঙ্গদান থেকে অনেকে পিছিয়ে আসেন। সেখানে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকা বলে শুধু নয়, একটি মুসলিম পরিবার যে এ কাজে এগিয়ে এসেছে, তা অঙ্গদান আন্দোলনের বড়ো প্রাপ্তি। আজিতের পরিবার যা করে দেখাল, নিশ্চিত ভাবেই তা দৃষ্টান্ত। কিন্তু সবটা তো আমাদের হাতে নেই।’
সুন্দরবনের একটি নিম্নবিত্ত পরিবারের এই সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন ‘বেঙ্গল অর্গান ডোনেশন সোসাইটি’র প্রতিষ্ঠাতা-চেয়ারম্যান চিকিৎসক সৌরভ কোলেও। তাঁর কথায়, ‘যে কোনো মৃত্যু দুঃখজনক। জীবিকার সন্ধানে গিয়ে এক জন ৩৬ বছরের যুবক মারা গেলেন, এর চেয়ে মর্মান্তিক আর কী হতে পারে! পরিবারের সদস্যেরা সেই শোকের মধ্যেও অঙ্গদানের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, এটা বড় বিষয়। যাঁরা চেতনা নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলেন, সুন্দরবনের এই যুবকের পরিবারের সিদ্ধান্ত তাঁদের সকলের কাছে উদাহরণ হয়ে রইল।’ অঙ্গদানের প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা না পেলেও আজিতের পরিবারের সিদ্ধান্ত সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এক জনপদ থেকে সমাজের সামনে এক গুরুত্বপূর্ণ মানবিক বার্তা রেখে গেল— মৃত্যুর পরেও অন্যের জীবনে বেঁচে থাকার সুযোগ রয়েছে।
❤ Support Us






