- বি। দে । শ
- অক্টোবর ৮, ২০২৬
ছাত্রবিক্ষোভে রণক্ষেত্র ফ্রান্স! আটক বহু, কাঁদানে গ্যাসে আক্রান্ত সাঁ-দেনির মেয়র
ফ্রান্সে স্কুলের পরিকাঠামো, শিক্ষক-সংকট এবং সরকারি বরাদ্দ নিয়ে শুরু হওয়া ছাত্রবিক্ষোভ ক্রমেই জাতীয় আন্দোলনের চেহারা নিচ্ছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে প্যারিসের উপকণ্ঠে কয়েকটি স্কুলকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রায় ৪০টি শহরে। ৬ অক্টোবরের বিক্ষোভে সরকারি হিসাব অনুযায়ী দেশজুড়ে প্রায় ৩ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নামেন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বহু স্কুলে শ্রেণিকক্ষ অত্যন্ত ভিড়ভাট্টা ও জরাজীর্ণ, পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই এবং শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগও প্রয়োজনের তুলনায় কম। আন্দোলন ঘিরে বিভিন্ন জায়গায় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষও হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসসহ বিভিন্ন দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম ব্যবহার করেছে। সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত ও হাজার হাজার জনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ইতিমধ্যেই তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফ্রান্স সরকার অবশ্য বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাহিনী প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক পদক্ষেপই নিয়েছে।
চলমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে আলোচনায় এসেছেন প্যারিসের উপকণ্ঠের শহর সাঁ-দেনির মেয়র বালি বাগায়োকো। গত ৬ অক্টোবর প্যারিসে শিক্ষার্থীদের আয়োজিত মিছিলে অংশ নেন তিনি। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের উত্তেজনা তৈরি হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দুই পক্ষের মাঝখানে অবস্থান নেন মেয়র। এ সময় তাঁকে কয়েকজন তরুণ বিক্ষোভকারীকে পুলিশের সামনে থেকে আড়াল করার চেষ্টা করতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, বাগায়োকো পুলিশ সদস্যদের শান্ত থাকার এবং থামার অনুরোধ করছেন। একই সময়ে মুখোশ পরা কয়েকজন তরুণ বিক্ষোভকারীও পুলিশের সামনে অবস্থান করছিলেন।
ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর মেয়রের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার পর বাগায়োকোর চোখেও গ্যাস লাগে। ভিডিওতে তাঁকে মিছিল থেকে বেরিয়ে আসার পর চোখে স্যালাইন বা আই-ড্রপ ব্যবহার করতে দেখা যায়। পরে তিনি জানান, পুলিশ বিক্ষোভকারীদের দিকে এগিয়ে এলে তাঁদের রক্ষা করতে এবং পরিস্থিতি থামানোর জন্যই তিনি মাঝখানে দাঁড়িয়েছিলেন। বাগায়োকোর বক্তব্য, রাস্তায় থাকা উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রছাত্রীরা তাঁর নিজের সন্তানও হতে পারত। তাই তাঁদের পাশে দাঁড়ানোকে তিনি নিজের দায়িত্ব বলে মনে করেন। একই সঙ্গে তিনি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে উত্তেজনা কমিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলির সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, শুধু পুলিশ মোতায়েন করে ছাত্রদের ক্ষোভের রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব নয়।
এই আন্দোলনের সূত্রপাত মূলত শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা নিয়ে। অতিরিক্ত ছাত্রসংখ্যা, শিক্ষক ও অন্যান্য স্কুলকর্মীর ঘাটতি, জরাজীর্ণ পরিকাঠামো এবং শিক্ষার সুযোগে বৈষম্য—এসব নিয়েই ক্ষোভ বাড়ছিল। সাঁ-দেনির মতো তুলনামূলক দরিদ্র এলাকাগুলিতে এই সমস্যার প্রভাব আরও বেশি বলে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য। বিক্ষোভের জেরে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারও পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু ছাত্রদের দাবিগুলি পর্যালোচনা করে অক্টোবরের শেষ নাগাদ প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। একই সময়ে পুলিশের দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত কিছু অস্ত্র নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং একটি নির্দিষ্ট ধরনের স্টান গ্রেনেডের ব্যবহার সাময়িকভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
এদিকে ফ্রান্সের এই ছাত্রবিক্ষোভ নিয়ে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্যে এই আন্দোলনকে শুধু শিক্ষা-সংক্রান্ত সমস্যা হিসেবে না দেখে ‘অনিয়ন্ত্রিত গণ-অভিবাসন’ এবং ফ্রান্সের মতো একটি ঐতিহ্যশালী দেশের ওপর ইসলামের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তবে আন্দোলনকারীদের প্রকাশ্য দাবিগুলির মূল বিষয় হলো স্কুলে অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি, শিক্ষক নিয়োগ, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশের উন্নতি এবং শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য দূর করা। ফলে ফ্রান্সের এই আন্দোলন এখন শুধু স্কুলের পরিকাঠামো বা শিক্ষক-সংকটের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; পুলিশের ভূমিকা, সরকারি শিক্ষানীতি এবং দেশের বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। আর সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ছাত্রদের সামনে দাঁড়িয়ে মেয়র বালি বাগায়োকোর কাঁদানে গ্যাসে আক্রান্ত হওয়ার ছবি এখন আন্তর্জাতিকভাবেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
❤ Support Us








