Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • অক্টোবর ২৮, ২০২৬

নবান্নে মন্ত্রিসভার বৈঠক । নতুন শিল্পনীতির ঘোষণা, কৃষকদের আর্থিক সহায়তা, নিরাপত্তা নিয়ে একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
নবান্নে মন্ত্রিসভার বৈঠক । নতুন শিল্পনীতির ঘোষণা, কৃষকদের আর্থিক সহায়তা, নিরাপত্তা নিয়ে একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত

রাজ্যে শিল্পের পরিবেশ উন্নত করা থেকে কৃষকদের আর্থিক সহায়তা, প্রশাসনিক দফতরগুলির বাজেট বরাদ্দ থেকে উৎসবের নিরাপত্তা —বুধবার নবান্নে রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলো। বৈঠকে চূড়ান্ত অনুমোদন পেল বহুপ্রতীক্ষিত নতুন শিল্পনীতি। আগামী ৫ নভেম্বর নবান্ন সভাঘর থেকে ওই নীতি ঘোষণা করার কথা। পাশাপাশি, হুগলির পুরশুড়া থেকে প্রায় ৪৮ লক্ষ কৃষকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ২ হাজার টাকা করে পাঠানোর কর্মসূচিও স্থির হয়েছে। ‘কৃষক বন্ধু’ প্রকল্পের নাম বদল, বিভিন্ন দফতরের পরবর্তী পর্যায়ের অর্থ বরাদ্দ এবং আসন্ন উৎসবগুলিতে নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা হয়েছে মন্ত্রিসভায়।

শিল্পনীতি নিয়ে বেশ কিছু দিন ধরেই রাজ্য প্রশাসনের অন্দরে প্রস্তুতি চলছিল। দুর্গাপুজোর আগে নতুন নীতি প্রকাশের সম্ভাবনা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত তা ঘোষণা করা যায়নি। বুধবার মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরে আগামী ৫ নভেম্বর নবান্ন সভাঘর থেকেই নয়া শিল্পনীতির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হতে চলেছে। রাজ্যে শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে জমি পাওয়া, বিভিন্ন দফতরের অনুমতি আদায় এবং পরিকাঠামোগত সমস্যার অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। নতুন শিল্পনীতিতে সে বাধা কাটানোর দিকেই বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে বলে প্রশাসনিক সূত্রের খবর। বড়ো বিনিয়োগকারীদের জন্য আর্থিক সুবিধা বা ইনসেনটিভ, জমি সংক্রান্ত নিয়মে পরিবর্তন এবং দ্রুত অনুমোদনের ব্যবস্থা — এই তিনটি বিষয় নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। রাজ্যে নতুন বিনিয়োগ টানা, বৃহৎ শিল্প সংস্থাগুলিকে উৎসাহিত করা এবং শিল্প স্থাপনের পথে প্রশাসনিক জটিলতা কমানোই এই নীতির প্রধান লক্ষ্য বলে দাবি সরকারের।

নবান্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, ১০০ একর বা তার বেশি জমিতে শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করতে সিঙ্গল উইন্ডো ব্যবস্থাকে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, শিল্প স্থাপনের জন্য একাধিক দফতরে ঘুরে অনুমতি সংগ্রহের বদলে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র দেওয়ার উদ্যোগ করা হতে পারে। একই সঙ্গে শিল্পের জন্য বরাদ্দ জমি যাতে দীর্ঘ দিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে না থাকে, সে বিষয়েও কড়া শর্ত রাখার প্রস্তাব রয়েছে। আরও জানা যাচ্ছে, শিল্পের জন্য জমি পাওয়ার পরে তিন বছরের মধ্যে উৎপাদন শুরু করার শর্ত থাকতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু না হলে বরাদ্দ জমি ফিরিয়ে নেওয়ার মতো ব্যবস্থার কথাও বিবেচনায় রয়েছে বলে সূত্রের দাবি। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হয়েছে, তা নয়া শিল্পনীতি প্রকাশের আগে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

বৃহৎ বিনিয়োগ টানতে আর্থিক সুবিধার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ১০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ ইনসেনটিভ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তবে শুধু আর্থিক ছাড় দিয়ে শিল্পমহলকে আকৃষ্ট করা নয়, ব্যবসা করার পরিবেশ সহজ করাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। পরিবেশ সংক্রান্ত ছাড়পত্র, জমির মিউটেশন, জমির চরিত্র পরিবর্তন, ট্রেড লাইসেন্স এবং নির্মাণের অনুমতি পেতে যাতে দীর্ঘসূত্রতা না হয়, সেই ব্যবস্থার উপরেও জোর দেওয়া হতে পারে। শিল্পের জন্য জমির সংস্থান করতে হিন্দমোটর, সিঙ্গুর ও ডোমজুড়ের মতো এলাকার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সূত্রের খবর। ওই সব এলাকায় শিল্পের উপযোগী পরিকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে জমি, আর্থিক সুবিধা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে শেষ পর্যন্ত কী কী সিদ্ধান্ত নীতি-নির্দেশিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত।

শিল্পনীতির পাশাপাশি বুধবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে কৃষকদের আর্থিক সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। আগামী ৫ নভেম্বর হুগলির পুরশুড়া থেকে প্রায় ৪৮ লক্ষ কৃষকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ২ হাজার টাকা করে পাঠানোর কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রাজ্যের অংশের অর্থ হিসেবে এই টাকা দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে রাজ্য সরকারের ‘কৃষক বন্ধু’ প্রকল্পের নাম বদলে ‘মুখ্যমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি’ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে বৈঠক সূত্রে খবর। আগামী ৫ নভেম্বরের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী এবং কৃষিমন্ত্রীর উপস্থিত থাকার কথা। বিভিন্ন জেলা থেকে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক প্রতিনিধিরা ভার্চুয়াল মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেন। কৃষকদের আর্থিক সহায়তা এবং প্রকল্পের নাম পরিবর্তন — দু-টি সিদ্ধান্তই আগামী দিনে রাজ্যের কৃষি নীতি ও সরকারি প্রকল্পের প্রচারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে অর্থ প্রদানের প্রকৃত উৎস, প্রকল্পের আওতায় উপভোক্তাদের যোগ্যতা এবং অর্থ হস্তান্তরের পদ্ধতি সম্পর্কে সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।

প্রশাসনিক কাজের গতি বাড়ানোর লক্ষ্যেও পদক্ষেপ করেছে রাজ্য সরকার। মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যে সব দফতর ইতিমধ্যে তাদের বরাদ্দ বাজেটের অন্তত ৩৫ শতাংশ অর্থ খরচ করেছে, তাদের পরবর্তী পর্যায়ের বরাদ্দ ছাড়ার ব্যবস্থা করতে অর্থ দফতরকে নির্দেশ দেওয়া হবে। সরকারি দফতরগুলির বাজেট খরচের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হলে উন্নয়নমূলক কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে কোন কোন দফতর ইতিমধ্যে বরাদ্দের নির্দিষ্ট অংশ খরচ করেছে এবং কত অর্থ ছাড়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো সামনে আসেনি।

এর পাশাপাশি, আগামী ১১ থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত রাজ্য জুড়ে জনজাতি গৌরব দিবস পালনের সিদ্ধান্তও হয়েছে মন্ত্রিসভার বৈঠকে। জনজাতি সম্প্রদায়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অবদানকে সামনে রেখে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করা হতে পারে। জেলা স্তরেও এই উপলক্ষে অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। উৎসবের মরসুমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জনসুরক্ষার বিষয়টিও এ দিনের বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। কালীপুজো উপলক্ষে রাজ্যের একাধিক মন্ত্রীকে বিভিন্ন জেলার দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। উৎসবের সময়ে প্রশাসনিক তৎপরতা বজায় রাখা, সাধারণ মানুষের অসুবিধার দিকে নজর দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরিষেবা সুনিশ্চিত করাই এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য বলে মনে করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, চোরবাগানের সাম্প্রতিক অনভিপ্রেত ঘটনার পর কালীপুজো, ছটপুজো ও জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রস্তুতি নিয়ে নবান্নে পৃথক বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে। বিকেল ৪টে থেকে ওই বৈঠকে পুজোমণ্ডপের নিরাপত্তা, দর্শনার্থীদের ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে আগাম ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। পুলিশ ও প্রশাসনের আধিকারিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। বড়ো বড়ো পুজোগুলিতে ভিড় সামলানো, প্রবেশ ও বেরোনোর পথ সচল রাখা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি — এ বিষয়গুলির উপরেই বৈঠকে জোর দেওয়া হতে পারে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর।

এ দিন বিজেপির নির্বাচনী সংকল্পপত্রে ঘোষিত প্রতিশ্রুতি এবং বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ কতটা এগিয়েছে, তা খতিয়ে দেখতেও পর্যালোচনা বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোন কোন পদক্ষেপ করা হয়েছে, কোথায় কাজ বাকি রয়েছে এবং পরবর্তী পর্যায়ে কী করণীয়, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এ ছাড়াও নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বৈঠক ঘিরে রাজনৈতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তাঁদের আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সামনে না এলেও, রাজ্যের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বৈঠকটি নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে, বুধবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে শিল্পনীতি, কৃষকদের আর্থিক সহায়তা এবং প্রশাসনিক ব্যয় সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলিই বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। আগামী ৫ নভেম্বর নতুন শিল্পনীতি ঘোষণার পর বিনিয়োগকারীদের জন্য কী ধরনের সুযোগ তৈরি হয়, জমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে কী শর্ত রাখা হয় এবং শিল্প স্থাপনের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় কতটা পরিবর্তন আসে, সে দিকেই এখন নজর শিল্পমহলের।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!