Advertisement
  • দে । শ
  • অক্টোবর ২৮, ২০২৬

অর্ণবের দাপটে লণ্ডভণ্ড অন্ধ্রপ্রদেশ, মৃত ৫ ! ওড়িশাতেও দুর্যোগ, ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলায় বৃষ্টির পূর্বাভাস

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
অর্ণবের দাপটে লণ্ডভণ্ড অন্ধ্রপ্রদেশ, মৃত ৫ ! ওড়িশাতেও দুর্যোগ, ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলায় বৃষ্টির পূর্বাভাস

অন্ধ্রপ্রদেশ-ইয়ানাম উপকূল অতিক্রম করার পর শক্তি হারিয়েছে অর্ণব। কিন্তু তার অভিঘাতে বিপর্যস্ত অন্ধ্রপ্রদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা। ঝড়ের দাপটে গাছ উপড়ে পড়েছে, ভেঙেছে বিদ্যুতের খুঁটি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাড়িঘর। রেল পরিষেবাও বিঘ্ন, বন্ধ রয়েছে বহু স্কুল ও অনান্য প্রতিষ্ঠান। এ পর্যন্ত ৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। অন্ধ্রের পাশাপাশি ঘূর্ণির প্রভাবে ওড়িশাতেও অতি ভারী বৃষ্টি চলছে, বিপজ্জনক এলাকা থেকে সরানো হচ্ছে বাসিন্দাদের। পাশাপাশি বিপর্যয় মোকাবিলায় তৎপর প্রশাসন। পশ্চিমবঙ্গেও বৃষ্টির দাপট বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (আইএমডি)।

বুধবার ভোরে অন্ধ্রপ্রদেশ ও ইয়ানাম উপকূল অতিক্রম করে অর্ণব। উপকূল অতিক্রম করার সময় ঘূর্ণিঝড়টির সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১২৫-১৩৫ কিলোমিটার। দমকা হাওয়ার গতিবেগ পৌঁছেছিল ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত। আইএমডি জানিয়েছে, অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় হিসেবে উপকূলে আছড়ে পড়ার পর বুধবার সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ শক্তি হারিয়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয় অর্ণব। তবে ঝড়ের কেন্দ্র সম্পূর্ণ ভাবে স্থলভাগে প্রবেশ করার পরেও তার প্রভাবে বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কা কাটেনি। অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশার বিভিন্ন এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে অন্ধ্রপ্রদেশে একাধিক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির খবর পাওয়া গিয়েছে। প্রাথমিক ভাবে ৩ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছিলেন সে রাজ্যের বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর আধিকারিকেরা। এর পর সরকারি বুলেটিনে ৫ জনের মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়েছে। বিশাখাপত্তনম, অনাকাপল্লে, কাকিনাড়া, কোনসীমা ও পশ্চিম গোদাবরী জেলা থেকে মৃত্যুর খবর মিলেছে। কোথাও গাছ ভেঙে পড়ে, কোথাও আবার ছিঁড়ে পড়া বিদ্যুতের তারের সংস্পর্শে এসে মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। পশ্চিম গোদাবরী জেলার ভীমবরমে গাছ ভেঙে পড়ে মৃত্যু হয় ৪৬ বছর বয়সি চোক্কা কিশোর কুমারের। তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। একই এলাকায় বুধবার সকালে আরও একটি দুর্ঘটনা ঘটে। একটি মন্দিরের কাছে বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়ে সংবাদপত্র সরবরাহকারী রামবাবুর মোপেডের উপর। মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে।

অন্যদিকে, মঙ্গলবার রাতে বিশাখাপত্তনম জেলায় কৃষিজমির একটি নালার উপর ছিঁড়ে পড়া বিদ্যুতের তারের সংস্পর্শে এসে মৃত্যু হয় ৫৩ বছর বয়সি এক ব্যক্তির। বুধবার সকালে অনাকাপল্লে জেলার ইয়েল্লামাঞ্চিলি শহরে বাড়ির বাইরে একটি খোলা বিদ্যুতের তারে পা দিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু হয় ৫৫ বছর বয়সি এক মহিলার। পুলিশ সূত্রে এই খবর জানা গিয়েছে। জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর ইন্সপেক্টর জেনারেল নরেন্দ্র সিং বুন্দেলা জানিয়েছেন, অন্ধ্রপ্রদেশেই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে। গাছ উপড়ে পড়ার পাশাপাশি একাধিক বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, রাজ্যে কয়েকশো বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৫৭ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে ত্রাণশিবিরে রাখা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় অন্ধ্রপ্রদেশ-সহ ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, পুদুচেরি, তেলেঙ্গানা এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে এনডিআরএফের মোট ৩৯টি দল মোতায়েন করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে অন্ধ্রপ্রদেশে পাঠানো হয়েছে আরও চারটি দল। পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে প্রশাসন।

অন্ধ্রপ্রদেশে ঘূর্ণিঝড়ের সরাসরি অভিঘাতের পাশাপাশি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে দক্ষিণ ওড়িশার আবহাওয়া। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ওই অঞ্চলের একাধিক জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হয়ে চলেছে। নিচু ও ধসপ্রবণ অঞ্চল থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ চলছে। রাজ্যের বিপর্যয় মোকাবিলা মন্ত্রী সুরেশ পূজারি জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব দক্ষিণ ওড়িশার সব জেলাতেই পড়তে পারে। মলকানগিরিতে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। প্রশাসনের বিশেষ নজরে রয়েছে গঞ্জাম, গজপতি, রায়গড়া, কোরাপুট, মলকানগিরি এবং নবরংপুর জেলা। বুধবার রাজ্যের ৩০টি জেলার মধ্যে ১৬টি জেলার স্কুল ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র বন্ধ রাখা হয়েছে। বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য ২,০৩৭টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সেখানে খাবার, পানীয় জল এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিষেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

কালাহান্ডি, কন্ধমাল এবং নুয়াপাড়া জেলার প্রশাসনকেও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। নবরংপুর, রায়গড়া, কোরাপুট, মলকানগিরি, গজপতি এবং গঞ্জাম জেলায় অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়ে লাল সতর্কতা জারি করেছে আইএমডি। ওই জেলাগুলিতে ঘণ্টায় ৫০-৭০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। বারগড়, সুবর্ণপুর, বৌধ, নুয়াপাড়া, বলাঙ্গির, কালাহান্ডি, কন্ধমাল, পুরী, খুরদা এবং নয়াগড় জেলাতেও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কতা রয়েছে। সেখানে ঘণ্টায় ৪০-৬০ কিলোমিটার বেগে হাওয়া বইতে পারে। রাজ্যের অন্যান্য অংশেও ভারী বৃষ্টি এবং ঘণ্টায় ৩০-৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী সুরেশ পূজারি জানিয়েছেন, আগামী ২৪ ঘণ্টা পরিস্থিতির বিচারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে। তাঁর মতে, প্রাণহানি শূন্যে নামিয়ে আনাই প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।

রাজ্যের বিশেষ ত্রাণ কমিশনার রাজেশ পি পাটিল জানিয়েছেন, দক্ষিণ ওড়িশার কয়েকটি জেলায় গাছ উপড়ে পড়েছে। তবে তাঁর বক্তব্যের সময় পর্যন্ত বড়ো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। বিপর্যয় মোকাবিলায় মোট ৩১৩টি দল মোতায়েন করেছে রাজ্য সরকার। এর মধ্যে রয়েছে ওড়িশা বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর ৬০টি দল, এনডিআরএফের ৯ টি দল এবং দমকল ও জরুরি পরিষেবার ২৪৪টি দল। সমুদ্রে থাকা ১৯,১৪৩টি মাছ ধরার নৌকাই উপকূলে ফিরে এসেছে বলে প্রশাসন জানিয়েছে। ধসপ্রবণ বিপজ্জনক এলাকায় সাময়িক ভাবে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সতর্কতা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব পড়েছে পূর্ব উপকূলের রেল পরিষেবাতেও। ঝড় ও বৃষ্টির কারণে ৫০টিরও বেশি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় গাছ ভেঙে পড়ায় রেল চলাচলে সাময়িক বিঘ্ন ঘটে। তবে রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়েছে। রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব সমাজমাধ্যমে জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড়ের পরিপ্রেক্ষিতে আধিকারিকদের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছেন তিনি। দশটি জায়গায় গাছ পড়ে রেল চলাচলে সামান্য বিঘ্ন ঘটেছিল। সেগুলি দ্রুত সরিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে ট্রেন চলাচল নিশ্চিত করতে পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

বিমান পরিষেবাতেও প্রভাব পড়েছে। ভুবনেশ্বরের বিজু পট্টনায়ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অধিকাংশ বিমান চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ভুবনেশ্বর-জয়পুর-বিশাখাপত্তনম রুটে চলাচলকারী একটি বিমান বুধবার বাতিল করা হয়েছে। বিমানবন্দরের অধিকর্তা প্রসন্ন প্রধান জানিয়েছেন, বিশাখাপত্তনমের আকাশসীমা এড়াতে চেন্নাই ও হায়দরাবাদ থেকে ভুবনেশ্বরগামী বিমানগুলিকে বিকল্প পথে রায়পুরের উপর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। অন্যদিকে, কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও একাধিক বিমান বাতিল হয়েছে অথবা পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে। নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত বলে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাব থেকে রেহাই মিলছে না পশ্চিমবঙ্গেরও। জাতীয় আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত রাজ্যের কয়েকটি জেলায় ভারী বৃষ্টি হতে পারে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকেই দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং পূর্ব মেদিনীপুরের উপকূলবর্তী এলাকায় দমকা হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে বুধবার সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত কলকাতায় ১৯.১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বুধবার কলকাতার আকাশ মেঘলা থাকার পাশাপাশি হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। শুক্রবার সকাল পর্যন্ত পূর্ব মেদিনীপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়ায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অন্য দিকে, শনিবার সকাল পর্যন্ত দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি এবং আলিপুরদুয়ারে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। উপকূলের আশপাশে ও সমুদ্রে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মৎস্যজীবীদের যেতে নিষেধ করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব কমলেও বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় উপকূলবর্তী এলাকায় সতর্কতা জারি রেখেছে প্রশাসন।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!