- বি। দে । শ
- অক্টোবর ২৮, ২০২৬
স্পেনে উচ্চগতির দুই ট্রেনের সংঘর্ষ! নিহত অন্তত ৪৬, আহত বহু
স্পেনের উচ্চগতির রেলপথে ফের ভয়াবহ দুর্ঘটনা। মাদ্রিদের কাছে তোলেদো প্রদেশে বুধবার সকালে দু-টি দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে। জখম হয়েছেন প্রায় দুই শতাধিক যাত্রী। সংঘর্ষের অভিঘাতে ট্রেনের একাধিক কামরা লাইনচ্যুত হয়ে রেলপথের পাশের ঢাল বেয়ে নীচে গড়িয়ে পড়ে বলে জানা যাচ্ছে। দুর্ঘটনার একটি ভিডিয়ো প্রকাশ্যে আসার পর তা ঘিরে শোরগোল পড়েছে সমাজমাধ্যমে। ভিডিয়োয় দুর্ঘটনার ভয়াবহতা এবং ছড়িয়ে থাকা ভাঙা কামরা ও ধ্বংসাবশেষের ছবি দেখা গিয়েছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, সিগন্যাল ব্যবস্থায় ত্রুটি, রেল পরিচালনায় গাফিলতি, না কি অন্য কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে এই বিপর্যয়? দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, হতাহতের প্রকৃত সংখ্যাও এখনো স্পষ্ট নয়। ইতিমধ্যে মাদ্রিদ, সিউদাদ রিয়াল এবং আন্দালুসিয়ার মধ্যে রেল পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
স্পেনের রেল পরিকাঠামো পরিচালন সংস্থা ‘এডিআইএফ’ জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বুধবার সকাল ৯টা নাগাদ মাদ্রিদ-আন্দালুসিয়া উচ্চগতির রেলপথে দুর্ঘটনাটি ঘটে। সমাজমাধ্যমের একটি বার্তায় সংস্থাটি জানিয়েছে, দু-টি উচ্চগতির ট্রেনের মধ্যে সংঘর্ষের জেরে ওই পথে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর, মাদ্রিদ থেকে সেভিলের দিকে যাত্রা করা দু-টি ট্রেনের মধ্যে একটি কোনো কারণে দাঁড়িয়ে ছিল। সে সময় একই দিকে পিছন থেকে আসা অন্য ট্রেনটি তাতে ধাক্কা মারে। সংঘর্ষের অভিঘাতে সামনের ট্রেনের কয়েকটি কামরা লাইনচ্যুত হয়ে যায়। তবে ট্রেনটি কেন দাঁড়িয়েছিল আর পিছনের ট্রেনটি কী ভাবে তার এত কাছে পৌঁছে গেল, তা এখনো জানা যায়নি।
দুর্ঘটনাগ্রস্ত ট্রেন দুটির একটি স্পেনের রাষ্ট্রায়ত্ত রেল সংস্থা রেনফের এভিই পরিষেবার, অন্যটি বেসরকারি সংস্থা ইরিয়োর বলে জানা যাচ্ছে। কাস্তিয়া-লা মাঞ্চা অঞ্চলের মুখপাত্র এস্থার পাদিয়া জানিয়েছেন, রেনফের ট্রেনটিতে ৩৯৭ জন এবং ইরিয়োর ট্রেনটিতে ১৪৭ জন যাত্রী ছিলেন। অর্থাৎ, দুর্ঘটনার সময় দু-টি ট্রেনে সব মিলিয়ে ৫ শতাধিক যাত্রী ছিলেন। প্রাথমিক ভাবে মৃতের সংখ্যা অন্তত ৪৬ বলে জানানো হলেও উদ্ধারকাজ চলাকালীন সে সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই উদ্ধারকাজে নামে জরুরি পরিষেবার কর্মীরা। স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোনিকা গার্সিয়া জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দু-টি কামরা থেকে জীবিত যাত্রীদের উদ্ধার এবং মৃতদেহ উদ্ধারের উপর আপাতত জোর দেওয়া হচ্ছে। আহতদের ওই অঞ্চলের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বয়ানে উর্দা শহরের মেয়র মানুয়েল গালান জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত জায়গার ব্যবস্থা করতে প্রশাসনের শীর্ষ স্তর থেকে তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় একটি খেলার মাঠ আর তার সংলগ্ন প্যাভিলিয়নে আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা ও উদ্ধারকাজের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তোলাই এখন প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।
দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং যাত্রীদের পরিবারের সদস্যদের বয়ানেও উঠে এসেছে সংঘর্ষের আকস্মিকতার কথা। এক যাত্রীর মেয়ে জানিয়েছেন, তাঁর বাবা ট্রেনে বসে কাজ করছিলেন। সামনে ট্রে রাখার টেবিল খোলা ছিল। আচমকাই প্রবল একটি ধাক্কা অনুভব করেন তিনি। মুহূর্তের মধ্যে কী ঘটেছিল, তা বুঝে ওঠার আগেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এদিকে, দুর্ঘটনার জেরে রেল পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সমস্যায় পড়েছেন যাত্রীরা। মাদ্রিদ থেকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলির সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম এই উচ্চগতির রেলপথ। সিউদাদ রিয়াল ও আন্দালুসিয়ার সঙ্গে রাজধানীর রেল যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় বহু যাত্রীর যাতায়াত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কত সময় লাগবে, তা এখনো জানানো হয়নি।
ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে ইতিমধ্যেই একাধিক সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। স্পেনের পরিবহণ মন্ত্রকের সূত্রের খবর, মানুষের ভুলের কারণেও এই সংঘর্ষ ঘটে থাকতে পারে। অভিযোগ, রাষ্ট্রায়ত্ত রেল পরিকাঠামো পরিচালন সংস্থা’ এডিআইএফ’-এর এক কর্মী দুর্ঘটনার সময় মূল সিগন্যাল ব্যবস্থার একটি ত্রুটি মেরামতির কাজে যুক্ত ছিলেন। সে অবস্থায় সামনে ট্রেন থাকার বিষয়ে পিছনের ট্রেনের চালককে যথাযথ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ সম্ভাবনাকে দুর্ঘটনার নিশ্চিত কারণ বলে ধরে নেওয়া যাচ্ছে না। সিগন্যাল ব্যবস্থার কোনো ত্রুটি ছিল কি না, ট্রেন দু-টির মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হয়েছিল কি না, কিংবা রেল পরিচালনায় অন্য কোনো গাফিলতি ঘটেছিল কি না, তা তদন্তের পরেই স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার আগে ট্রেন দু-টির গতিবেগ কত ছিল, সামনের ট্রেনটি কেন দাঁড়িয়েছিল এবং পিছনের ট্রেনটির চালক সময়মতো ব্রেক কষতে পেরেছিলেন কি না, এসব প্রশ্নগুলিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ইরিয়ো সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, দুর্ঘটনার পরই তারা নিরাপত্তা সংক্রান্ত জরুরি ব্যবস্থা সক্রিয় করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে যোগাযোগ রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পরিস্থিতির উপর তিনি নজর রাখছেন। পরিবহণমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে এবং কাস্তিয়া-লা মাঞ্চার আঞ্চলিক প্রশাসনের প্রধানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন তিনি। সমাজমাধ্যমে শোকপ্রকাশ করে সানচেজ লিখেছেন, তোলেদোর ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার খবরে তিনি স্তম্ভিত। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করতে, তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি পরিষেবার কর্মীরা ঘটনাস্থলে কাজ করছেন। সংশ্লিষ্ট সমস্ত প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় রেখে উদ্ধারকাজ চালানো হচ্ছে। নিহত ও আহতদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের প্রতিও সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি।
এই দুর্ঘটনা স্পেনের রেল ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতেই দেশের উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্কে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছিল। কর্দোবা প্রদেশের আদামুজ়ের কাছে একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা অন্য একটি ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ওই দুর্ঘটনায় ৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সাম্প্রতিক অতীতে স্পেনের সবচেয়ে প্রাণঘাতী রেল দুর্ঘটনাগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল সেটি। ২০১৩ সালে স্পেনের সান্তিয়াগো দে কম্পোস্তেলার কাছে একটি ট্রেন দুর্ঘটনায় ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। জানুয়ারির দুর্ঘটনার পর রেলপথের রক্ষণাবেক্ষণ, পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
স্পেন গত কয়েক বছরে উচ্চগতির রেল পরিষেবা সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ করেছে। দেশের বিভিন্ন শহরের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ গড়ে তুলতে এই রেল নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু দ্রুতগতির রেল পরিষেবার সম্প্রসারণের পাশাপাশি পরিকাঠামোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সিগন্যাল ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা আর যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই বছরে ফের উচ্চগতির ট্রেনের ভয়াবহ সংঘর্ষ সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিল। জানুয়ারির দুর্ঘটনার পরে যে প্রশ্নগুলি উঠেছিল, সেগুলির কতটা সমাধান হয়েছে, তা নিয়েও জোর আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
❤ Support Us








