- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- অক্টোবর ২৬, ২০২৬
কুরসির লড়াইয়ে নেতানিয়াহুর মুখোমুখি আইজেনকোট, ভোটপ্রচারে ‘বিবি’-র পাশে ট্রাম্প
ইজরায়েলে মঙ্গলবার ভোট। ১২০ আসনের সংসদে সরকার গড়তে দরকার ৬১টি আসন। কিন্তু জনমত সমীক্ষার ইঙ্গিত, কোনো শিবিরই সহজে সে সংখ্যা ছুঁতে পারবে না। একদিকে ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াইয়ে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, অন্যদিকে প্রাক্তন সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বে বিরোধীদের সরকার গড়ার চেষ্টা। এমন অবস্থায়, নির্বাচনের ঠিক আগে নেতানিয়াহুর পাশে দাঁড়িয়ে ফের প্রচার করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
যুদ্ধের ক্ষত, নিরাপত্তার প্রশ্ন, বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষ এবং বিচারব্যবস্থার সংস্কার ঘিরে রাজনৈতিক বিভাজন — সব মিলিয়ে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে ইজরায়েল। মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, সে দেশের ১২০ সদস্যের সংসদ নেসেটের নির্বাচন। ফল নির্ধারণ করবে, প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু আরও এক বার ক্ষমতায় ফিরবেন, না কি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড়ো ধাক্কা খেয়ে সরে যেতে হবে তাঁকে। তবে ভোটের অঙ্ক বলছে, লড়াই শুধু দুই নেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শেষ পর্যন্ত কোন দল কার সঙ্গে হাত মেলাবে, কোন শর্তে তৈরি হবে সরকার, তার উপরেও নির্ভর করছে ইজরায়েলের পরবর্তী রাজনৈতিক দিশা। নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জনমত সমীক্ষাগুলির ইঙ্গিত, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এবং তাঁর জোটসঙ্গীদের পক্ষে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সহজ নয়। অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরের সামনেও একই সমস্যা। ১২০ আসনের সংসদে সরকার গড়তে প্রয়োজন অন্তত ৬১ জন সাংসদের সমর্থন। কোনো পক্ষই সে সংখ্যা নিশ্চিত করতে না পারলে ভোটের পর শুরু হবে জোট গঠনের দর-কষাকষি। আর তাতেও সমাধান না মিললে নতুন নির্বাচন পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসাবে কাজ চালিয়ে যেতে পারে নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভা।
ইজরায়েলের দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে এ বার শুধু বিরোধী দলগুলির রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ নয়, রয়েছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্নও। হামাসের ওই হামলার পর গাজ়ায় দীর্ঘ যুদ্ধ, লেবাননে সংঘাত এবং ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান — সব মিলিয়ে দেশের নিরাপত্তা ও নেতৃত্বের প্রশ্নটি নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রাক্তন সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট সেই অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতার সমীকরণ বদলাতে চাইছেন। তবে এ নির্বাচনে গাজার যুদ্ধ কিংবা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নই যে প্রধান বিতর্ক হয়ে উঠেছে, তা নয়। নির্বাচনী প্রচারে বরং বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব, ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার দায়, সেনাবাহিনীর অসন্তোষ এবং বিচারব্যবস্থার উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা। অর্থাৎ, যুদ্ধের মধ্যে দাঁড়িয়েও ইজরায়েলের ভোটারদের একাংশের কাছে প্রশ্নটা এখন শুধু দেশের নিরাপত্তা নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতাও।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইজরায়েলের ইতিহাসে অন্যতম শোকস্তব্ধ দিন। হামাসের হামলায় প্রাণহানি ও পণবন্দি হওয়ার ঘটনা দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছিল। সে ঘটনার পর এই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে চলেছেন ইজরায়েলের নাগরিকেরা। ফলে নির্বাচনী প্রচারে ৭ অক্টোবরের স্মৃতি ফিরে আসাই স্বাভাবিক। তবে সে স্মৃতিকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্র গাজায় ইজরায়েলের সামরিক অভিযান নয়, বরং হামলা প্রতিরোধে সরকারের ব্যর্থতা আর তার দায় এড়ানোর অভিযোগ। জেরুসালেমের গবেষণা সংস্থা ‘ইজরায়েল ডেমোক্র্যাসি ইনস্টিটিউটে’র সমীক্ষা অনুযায়ী, ইজরায়েলিদের প্রায় ৬৮ শতাংশের কাছে ৭ অক্টোবরের ঘটনা ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে। আরব সংখ্যালঘুদের মধ্যে এ হার ৩২ শতাংশ। তাঁদের অনেকের কাছে বরং অন্য সমস্যা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ইজরায়েলের দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু হামলার সময় নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতার দায় নিরাপত্তা আধিকারিকদের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ ও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সাফল্যের কথা তুলে ধরে নিজের নেতৃত্বের পক্ষে সওয়াল করেছেন তিনি।
বিরোধীদের বক্তব্য, ৭ অক্টোবরের হামলা নিয়ে নিরপেক্ষ সরকারি তদন্তের পথ আটকে রেখে নিজের দায় এড়াতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী। পণবন্দিদের ফিরিয়ে আনার চুক্তি আরও আগে করা যেত কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে। পাশাপাশি, ইজরায়েলের সামরিক শক্তি ব্যবহার করেও কোনো শত্রুর বিরুদ্ধে নির্ণায়ক জয় অর্জন করা যায়নি বলে অভিযোগ বিরোধীদের। পণবন্দিদের মুক্তি, নিহত সেনাদের স্মৃতি এবং হামলার পর দেশের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ — সবই ভোটের আবহে উপস্থিত। রেলস্টেশনের দেওয়ালে নিহত সেনাদের ছবি কিংবা পণবন্দিদের স্মরণে লাগানো বিবর্ণ হলুদ ফিতে মনে করিয়ে দিচ্ছে, ৭ অক্টোবরের ঘটনা ইজরায়েলের জনজীবনে কত গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। কিন্তু সে ক্ষতের দায় কার, তা নিয়েই এখন রাজনৈতিক লড়াই।
নেতানিয়াহুর সামনে আরও এক উল্লেখযোগ্য সমস্যা সামরিক পরিষেবা থেকে অতি গোঁড়াদের অব্যাহতি দেওয়ার প্রশ্ন। ইজরায়েলে অধিকাংশ পুরুষ ও মহিলার জন্য সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক। অথচ ধর্মীয় শিক্ষায় যুক্ত অতি-গোঁড়া তরুণদের বড়ো অংশকে সে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে সওয়াল করে আসছে নেতানিয়াহুর জোটসঙ্গী ধর্মীয় দলগুলি। সরকার টিকিয়ে রাখতে ওই দলগুলির সমর্থনের উপর নির্ভর করতে হয় নেতানিয়াহুকে। ফলে তাদের দাবি মেনে নেওয়ার রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাও রয়েছে তাঁর। কিন্তু একের পর এক যুদ্ধে সংরক্ষিত বাহিনীর সদস্যদের বার বার কাজে ডাকতে হওয়ায় সেনায় লোকের ঘাটতি ক্রমশ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে এক শ্রেণির তরুণের জন্য বিশেষ ছাড় কেন থাকবে, সে প্রশ্ন তুলছেন ধর্মনিরপেক্ষ ইজরায়েলিরা। প্রতি বছর ইজরায়েলে প্রায় ১৩ হাজার তরুণের ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হয়। কিন্তু তাঁদের মধ্যে ১০ শতাংশেরও কম সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ‘ইজরায়েল ডেমোক্র্যাসি ইনস্টিটিউট’-এর সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ভোটারদের প্রায় এক-চতুর্থাংশের কাছে সামরিক পরিষেবা থেকে অব্যাহতির বিষয়টি ভোটের অন্যতম প্রধান বিবেচ্য।
এই অসন্তোষকেই রাজনৈতিক হাতিয়ার করতে চাইছেন আইজ়েনকোট। প্রাক্তন সেনাপ্রধান হিসাবে সামরিক বাহিনীর সমস্যাগুলি সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে। চালু থাকা অব্যাহতির ব্যবস্থা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। গাজা যুদ্ধে নিজের ছেলে ও দুই ভাইপোকে হারানোর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে দেশের অভ্যন্তরিন প্রশাসনিক প্রশ্নও। নেতানিয়াহুর বিচারব্যবস্থা সংস্কারের পরিকল্পনা ইজরায়েলকে আগেই দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছিল। ২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা কমানো ও বিচারপতি নিয়োগে সরকারের ভূমিকা বাড়ানোর উদ্যোগের বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। সমালোচকদের আশঙ্কা ছিল, এ সংস্কারের ফলে সরকারের ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত হবে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নেতানিয়াহু অবশ্য এ উদ্যোগকে নির্বাচিত নন, এমন বিচারকদের ক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা হিসাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত এক প্রধানমন্ত্রীর হাতে আরও ক্ষমতা তুলে দেওয়ার চেষ্টা হিসাবেই বিষয়টিকে দেখেছিলেন বিরোধীরা। ৭ অক্টোবরের হামলার পর জনপরিসরে বিচারব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে আলোচনা অনেকটাই পিছনে চলে যায়। গাজার যুদ্ধ ও পণবন্দিদের ফিরিয়ে আনার দাবিই তখন বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে বিচারব্যবস্থা নিয়ে আগের মতো তীব্র আন্দোলন আর দেখা যায়নি।
‘ইজরায়েল ডেমোক্র্যাসি ইনস্টিটিউট’-এর সমীক্ষা বলছে, মাত্র ১৮ শতাংশ ইজরায়েলির কাছে বিচারব্যবস্থার সংস্কার ভোটের সিদ্ধান্তে প্রধান ভূমিকা নিচ্ছে। তবে বামপন্থী ভোটারদের মধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ বেশি। তাঁদের ২২.৫ শতাংশ বলেছেন, নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচারব্যবস্থার প্রশ্নটি প্রভাব ফেলবে। মধ্যপন্থী ও দক্ষিণপন্থী ভোটারদের কাছে এটি প্রথম চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে নেই। গত বছর সংসদে পাশ হওয়া একটি আইন বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা বাড়ানোর পথ খুলেছে। তবে নতুন সংসদ শপথ না নেওয়া পর্যন্ত আইনটি কার্যকর হবে না। নেতানিয়াহু-বিরোধী দলগুলি ক্ষমতায় এলে আইনটি বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অর্থাৎ, নির্বাচনে নেতানিয়াহু ক্ষমতাচ্যুত হলেও বিচারব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং নতুন সরকার গঠিত হলে এ আইন এবং বিচারবিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্ন ফের রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রে চলে আসতে পারে।
ইজরায়েলের ভোটারদের উদ্বেগের তালিকায় রয়েছে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচও। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে দ্রব্যমূল্য, আবাসন আর দৈনন্দিন খরচের প্রশ্ন বড়ো হয়ে উঠেছে। ইজ়রায়েলেও সে প্রবণতা স্পষ্ট। রাইখম্যান বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অ্যারন ইনস্টিটিউট ফর ইকনমিক পলিসি’-র গবেষক সারিত মেনাহেম-কারমির গবেষণা অনুযায়ী, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক ও সুইডেনের মতো ইউরোপের একাধিক ধনী দেশের তুলনায় ইজরায়েলে জীবনযাত্রার খরচ বেশি। যদিও, নেতানিয়াহুর দাবি, তাঁর সরকারের অর্থনৈতিক নীতি বৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করেছে, বিশ্বমানের প্রযুক্তি শিল্পের বিকাশে সাহায্য করেছে। বিরোধীদের বক্তব্য, অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে সমান ভাবে পৌঁছয়নি। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ইহুদি ইজ়রায়েলিদের ৩৮ শতাংশের কাছে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার খরচ নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথবা দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আরব ভোটারদের মধ্যে এই হার ৪৬ শতাংশ। তবে এই মুহূর্তে ভোটপ্রচারে অর্থনীতি নিয়ে বিশেষ আলোচনা নেই। প্রধান প্রার্থীদের কেউই বিষয়টিকে প্রচারের কেন্দ্রে আনেননি। বিভিন্ন যুদ্ধের বিপুল আর্থিক ব্যয় নিয়েও তেমন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাতের আর্থিক মূল্য অত্যন্ত বেশি। ফলে ভোটের প্রচারে নিরাপত্তা, নেতৃত্ব আর সামরিক পরিষেবা যতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, যুদ্ধের খরচ ও তার অর্থনৈতিক প্রভাব ততটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। অথচ নতুন সরকারকে ক্ষমতায় এসে এ আর্থিক চাপের মোকাবিলা করতেই হবে।
এদিকে, নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর পাশে দাঁড়িয়ে ফের প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রবিবার নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে নেতানিয়াহুকে ‘অসাধারণ যোদ্ধা প্রধানমন্ত্রী’ বলে অভিহিত করে ইজরায়েলিদের কাছে তাঁর পক্ষে ভোট দেওয়ার আবেদন জানান ট্রাম্প। নেতানিয়াহুর ডাকনাম ব্যবহার করে তাঁর বার্তা, ‘বিবিকে ভোট দিন’। ট্রাম্পের দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে দুই দেশ একসঙ্গে সাফল্য অর্জন করেছে। ইরানের সামরিক শক্তি এবং অর্থনীতি ব্যাপক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি। ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ এবং ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-র কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সামরিক পরিকাঠামোকে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী কার্যত ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, নৌ অবরোধের ফলে দেশটি তেল পাচ্ছে না এবং সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের একাধিক স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানে মুদ্রাস্ফীতির হার ৩০১ শতাংশ বলেও দাবি করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাঁর এ বক্তব্যের সব ক-টি পরিসংখ্যানের স্বাধীন যাচাই অবশ্য এখানে প্রতিষ্ঠিত নয়।
ট্রাম্পের বক্তব্য, নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অত্যন্ত ভাল, তাঁরা একসঙ্গে কাজ করে সাফল্য পেয়েছেন। ইজরায়েলের ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় সে সহযোগিতার কথা মনে রাখা উচিত। যুদ্ধের কাজ শেষ করতে নেতানিয়াহুর আরও সময় প্রয়োজন বলেও দাবি করেন তিনি। ১৮ অক্টোবরও নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। সে সময় তাঁকে শক্তিশালী, সাহসী ও মেধাবী বলে বর্ণনা করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। উত্তরে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, দুই নেতা একসঙ্গে তাঁদের লক্ষ্য পূরণ করবেন। তবে ট্রাম্পের সমর্থনকে নিছক সৌজন্যমূলক বার্তা হিসাবে দেখছে না রাজনৈতিক মহল। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে দুই নেতার ঘনিষ্ঠতা ও আমেরিকার সমর্থনকে নির্বাচনী প্রচারে তুলে ধরতে চাইছে নেতানিয়াহুর শিবির। অন্যদিকে, বিরোধীদের প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক মিত্রের সমর্থন থাকলেই কি দেশের ভিতরে নেতৃত্বের ব্যর্থতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব দেওয়া সম্ভব?
তাই, ট্রাম্পের সমর্থনের পরেও আত্মবিশ্বাসী আইজেনকোট। তাঁর বক্তব্য, ইজরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা ঠিক করার অধিকার সে দেশের ভোটারদেরই। মরক্কোর অভিবাসী পরিবারে জন্ম আইজেনকোটের। দীর্ঘ সামরিক জীবনের অভিজ্ঞতা, চলমান যুদ্ধে ব্যক্তিগত ক্ষতির কথা তুলে ধরে তিনি নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসাবে নিজেকে তুলে ধরতে চাইছেন। তবে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানও যে নেতানিয়াহুর নীতি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, এমন নয়। ইজরায়েলের রাজনৈতিক পরিসরে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে প্রধান দলগুলির মধ্যে বড়ো ধরনের মতপার্থক্য নেই। নির্বাচনের প্রধান দুই শিবিরেই এমন দলগুলির প্রভাব রয়েছে, যারা অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইজরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধী। দীর্ঘদিন ধরে থমকে থাকা শান্তি প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু করার প্রতিশ্রুতিও দুই প্রধান প্রার্থীর কাছ থেকে শোনা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় নেতানিয়াহুর বিদায় ঘটলেও ইজরায়েলের সামগ্রিক নিরাপত্তানীতি কিংবা ফিলিস্তিনের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
ইজরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যত আলোচনা, অধিকৃত পশ্চিম তীরে তাঁর সরকারের নীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও ততটাই উদ্বেগ। গত কয়েক বছরে পশ্চিম তীরে ইজরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য করা, উগ্রপন্থী বসতিস্থাপনকারীদের হিংসার অভিযোগ বেড়েছে। নেতানিয়াহুর বিরোধীরা ক্ষমতায় এলেও এই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’-এর বিশ্লেষক মাইরাভ জনসজেইনের মতে, নতুন সরকার গঠিত হলেও পশ্চিম তীরে ইজরায়েলের আগ্রাসী নীতির গতি কমানোই হতে পারে সর্বোচ্চ সম্ভাব্য পরিবর্তন। বসতি সম্প্রসারণের পুরো ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া হবে, এমন আশা করার কারণ নেই। নেতানিয়াহুর প্রায় ১৭ বছরের শাসনে পশ্চিম তীরে সশস্ত্র বসতিস্থাপনকারীদের প্রভাব বেড়েছে। বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গ্রামে হামলা, পরিবারগুলিকে বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য করা, জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর সে প্রক্রিয়া আরও তীব্র হয়েছে বলে অভিযোগ। জলের সংযোগ ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পাশাপাশি বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করার জন্য হুমকি দেওয়ার ধারাবাহিক অভিযোগ রয়েছে।
পশ্চিম তীরের বিভিন্ন অঞ্চলে বসতিস্থাপনকারীদের অস্থায়ী শিবির গড়ে তোলার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বসতি-বিরোধী সংগঠন কেরেম নাভোটের গবেষক দ্রোর এতকেসের দাবি, পশ্চিম তীরে ২৫০টিরও বেশি এমন শিবির তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যে সব অঞ্চলে ফিলিস্তিনি পশুপালক সম্প্রদায়গুলি দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছে, সেসব এলাকাগুলিতেই বসতিস্থাপনকারীদের কার্যকলাপ বেশি। অভিযোগ, পশুপালকদের উপর হামলা, জলের উৎস দখল, পশুচারণের জমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এ শিবিরগুলির মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। এতকেসের মতে, পশ্চিম তীরের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অঞ্চলের উপর ইজরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এর ফলে জর্ডন সীমান্ত বরাবর পশ্চিম তীরের পূর্ব প্রান্তের প্রায় পুরো অঞ্চল থেকেই ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। অভিযোগ, এ পদক্ষেপের উদ্দেশ্য স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করা। পশ্চিম তীর, গাজা ও পূর্ব জেরুসালেমকে নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু ইজরায়েলের বসতি সম্প্রসারণ সে সম্ভাবনার পথে সবচেয়ে বড়ো বাধা হয়ে উঠেছে বলে দাবি আন্তর্জাতিক মহলের।
নেতানিয়াহুর বিরোধীরা যদিও সবচেয়ে হিংস্র বসতিস্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ও কিছু অবৈধ অস্থায়ী বসতি সরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু নেতানিয়াহুর সরকার যে ১০০টিরও বেশি নতুন বসতিকে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে, সেগুলি সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা তাঁদের নেই। এর মধ্যে ৪৪টি আগে অস্থায়ী বসতি ছিল। কয়েক দশক আগে তৈরি হওয়া বহু বসতিও এখন পূর্ণাঙ্গ শহরতলির রূপ নিয়েছে। ইজ়রায়েলের বক্তব্য, পশ্চিম তীর ইহুদিদের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় মাতৃভূমির অংশ। এ অঞ্চলের ভবিষ্যৎ আলোচনার মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইজরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে কোনোরকম শান্তি আলোচনা হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতি আরও সুসংহত বর্ণবৈষম্যমূলক শাসনব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসাবে আইজেনকোটের নাম সামনে এলেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান বিরোধীদের একাংশের প্রত্যাশার সঙ্গে মেলে না। তিনি দ্বি-রাষ্ট্র ব্যবস্থার পক্ষে নন। তবে পশ্চিম তীরের যে ৪০ শতাংশ অঞ্চলে বর্তমানে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ প্রশাসন চালায়, সেখানে সীমিত স্বশাসনের পক্ষে। বাকি ৬০ শতাংশ অঞ্চল সরাসরি ইজরায়েলি সামরিক শাসনের অধীনে রয়েছে। সেখানে বসতি সম্প্রসারণের অনুমতি দেওয়ার পক্ষেও তিনি।
তবে বসতিস্থাপনকারীদের হিংসা দমনে ইজরায়েলি সেনা ও আধাসামরিক সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে আরও ক্ষমতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আইজেনকোট। তাঁর সম্ভাব্য জোটসঙ্গীদের মধ্যে এমন বামপন্থী রাজনীতিকেরাও রয়েছেন, যাঁরা বসতি সম্প্রসারণের বিরোধী এবং দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে ছিলেন। নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে তাঁরা নিজেদের অবস্থান আপাতত সরিয়ে রাখতে সম্মত হয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ইজরায়েলের বিরোধী শিবির এখনো দক্ষিণপন্থীদের নিরাপত্তানীতির বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প তুলে ধরতে পারেনি। সম্ভাব্য হুমকিকে আগেভাগে দমন করা, সামরিক অভিযানের স্বাধীনতা বজায় রাখা ও নিরাপত্তার জন্য ‘বাফার জ়োন’ তৈরি করার নীতির বিরুদ্ধে বিরোধীদের অবস্থান স্পষ্ট নয়। ইজরায়েলের নির্বাচনের ফল তাই শুধু নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, পরবর্তী সরকারের নীতি কোন দিকে যাবে, তারও ইঙ্গিত দেবে। ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা, সামরিক পরিষেবা থেকে অব্যাহতি সমস্যা, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ থেকে ফিলিস্তিন প্রশ্ন সবই ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
নেতানিয়াহুর সমর্থকেরা তাঁকে অভিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে তুলে ধরছেন। তাঁদের দাবি, তিনি আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও ইজ়রায়েলের নিরাপত্তার প্রশ্নে আপস করেননি। অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পরেও ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতার দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর সরকার ধর্মীয় দলগুলির উপর নির্ভরশীল হওয়ায় সামরিক পরিষেবা থেকে অব্যাহতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যারও সমাধান করতে পারছে না। ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন নেতানিয়াহুর প্রচারে বাড়তি শক্তি জোগাতে পারে। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমর্থন ইজরায়েলের ভোটারদের অসন্তোষ দূর করতে পারবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। আইজেনকোটের সামনে আবার চ্যালেঞ্জ, নেতানিয়াহু-বিরোধী ভোটকে একত্র করে ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা। ভোটের পর কোনো শিবিরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে শুরু হবে জোট গঠনের আলোচনা। তখন ছোটো দলগুলির সমর্থনই সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে। আর সেই দর-কষাকষির মধ্যেই ঠিক হবে, ইজরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, যুদ্ধ, নিরাপত্তা ও অধিকৃত পশ্চিম তীর নিয়ে দেশের নীতি কতটা বদলাবে।
❤ Support Us







