Advertisement
  • এই মুহূর্তে বি। দে । শ
  • অক্টোবর ২৬, ২০২৬

ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ বলসোনারোকে হারিয়ে চতুর্থ বার ব্রাজিলের মসনদে বামপন্থী লুলা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ বলসোনারোকে হারিয়ে চতুর্থ বার ব্রাজিলের মসনদে বামপন্থী লুলা

প্রথম দফার ভোট ফলাফলে পিছিয়ে ছিলেন। রাজনৈতিক সমীকরণও ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, অপরাধের বাড়বাড়ন্ত আর সরকারের কাজ নিয়ে অসন্তোষ — সব মিলিয়ে পুনর্নির্বাচনের লড়াই যে সহজ হবে না, তা বুঝেছিলেন ব্রাজিলের বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হার মানলেন না আশির কোঠায় পা দেওয়া প্রবীণ নেতা। দ্বিতীয় দফার ভোটে ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে চতুর্থ বার প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে বসতে চলেছেন তিনি। প্রথম দফায় পিছিয়ে পড়েও দ্বিতীয় দফায় জিতে নজির গড়লেন লুলা। তাঁর এই প্রত্যাবর্তনে শুধু ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, লাতিন আমেরিকায় বাম ও দক্ষিণপন্থী শক্তির লড়াইয়েও নতুন মাত্রা যোগ হল। আর সে সঙ্গে অস্বস্তি বাড়ল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শিবিরেও।

সরকারি ফলাফল অনুযায়ী, দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে লুলা পেয়েছেন প্রায় ৫১.৮ শতাংশ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী, ব্রাজিলের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও পেয়েছেন প্রায় ৪৮.২ শতাংশ ভোট। দু-জনের মধ্যে ব্যবধান প্রায় ৪৪ লক্ষ। ভোট গণনার শেষ পর্বে লুলার জয় নিশ্চিত হতেই সাও পাওলো ও রিও ডি জেনেইরোর রাস্তায় উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন তাঁর সমর্থকেরা। লাল পোশাক পরে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। লাল রং লুলার দল ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতীক। রিওর আকাশে আতশবাজির আলো, রাস্তায় গাড়ির হর্ন আর ভুভুজেলার শব্দে ছড়িয়ে পড়ে জয়ের উল্লাস। সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিয়োয় দেখা যায়, সাও পাওলোর একটি হোটেলে লাল তারকা-আকৃতির চশমা পরে আনন্দে লাফাচ্ছেন লুলা। পাশে তাঁর স্ত্রী রোসাঞ্জেলা দ্য সিলভা এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা।

অন্যদিকে, পরাজয়ের পরে নির্বাচনের ফল নিয়ে আপত্তি তুলেছেন ফ্লাভিও বলসোনারো। ভোটদানের সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে নজিরবিহীন বলে দাবি করে ফল বাতিলেরও আবেদন জানান তিনি। ফলে ভোটের ফল ঘোষণার পরেও ব্রাজিলের রাজনৈতিক উত্তাপ কমেনি। ব্রাজিলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় কোনো প্রার্থী প্রথম দফায় মোট বৈধ ভোটের ৫০ শতাংশের বেশি না পেলে দ্বিতীয় দফার ভোট হয়। এ বারও প্রথম দফায় কোনো প্রার্থীই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেননি। তবে লুলার তুলনায় এগিয়ে ছিলেন দক্ষিণপন্থী লিবারেল পার্টির প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো। প্রথম দফায় ২২ লক্ষেরও বেশি ভোটে এগিয়ে থাকার পরে দ্বিতীয় দফায় জয় নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিল তাঁর শিবির। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে ব্যবধান ধরে রাখতে পারেননি ফ্লাভিও।

ব্রাজ়িলের সামরিক শাসনের অবসানের পরে ১৯৮৯ সালে সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শুরু হয়। তার পর থেকে প্রথম দফায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা কোনো প্রার্থী দ্বিতীয় দফায় জিতে প্রেসিডেন্ট হননি। লুলার জয় সে নজির ভেঙে দিল। এর আগে ২০০২ ও ২০০৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পরে ২০২২ সালে ফের ক্ষমতায় ফেরেন। এ বারও জয়ী হয়ে চতুর্থ বার দেশের শাসনভার সামলাতে চলেছেন লুলা। তাঁর নতুন মেয়াদ শুরু হবে ২০২৭ সালের ৫ জানুয়ারি। আশির কোঠায় পা দিয়েও এ জয় লুলার রাজনৈতিক জীবনে অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। ২০৩০ সালে নতুন মেয়াদ শেষ হওয়ার সময়ে তাঁর বয়স হবে ৮৫ বছর। প্রথম দুই দফায় ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার পরে তৃতীয় ও চতুর্থ মেয়াদ মিলিয়ে মোট ১৬ বছর ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট থাকবেন তিনি। তবে এ জয়কে নিঃশর্ত জনসমর্থনের প্রতিফলন বলে দেখার অবকাশ নেই। প্রায় অর্ধেক ভোটার লুলার বিপক্ষে রায় দিয়েছেন। ফলে রাজনৈতিক ভাবে বিভক্ত দেশকে সঙ্গে নিয়ে সরকার চালানোই হবে তাঁর সামনে অন্যতম বড়ো চ্যালেঞ্জ।

ব্রাজিলের নির্বাচনের ফল শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যেও সীমাবদ্ধ নয়। লাতিন আমেরিকায় সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টার প্রেক্ষিতে লুলার জয় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে আর্জেন্টিনা, চিলি, কলম্বিয়া ও পেরুর মতো দেশগুলিতে ডানপন্থী শক্তির প্রভাব বেড়েছে। সে পরিস্থিতিতে ব্রাজিলের মতো অঞ্চলের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে লুলার প্রত্যাবর্তন রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন প্রশ্ন তুলে দিল।  বলসোনারো পরিবারের সঙ্গে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা দীর্ঘ দিনের। ব্রাজিলের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে চলা বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে এর আগে ব্রাজিলের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প। পরে অবশ্য কিছুটা সুর নরম করেন তিনি। তার পর চলতি বছরে অবৈধ বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে ফের শুল্ক আরোপ করে আমেরিকা। অন্যদিকে, ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে একাধিক বার ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে লুলার সরকার।

এ প্রেক্ষিতে লুলার জয় ওয়াশিংটনের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। কারণ, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলির প্রভাব যখন লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বাড়ছে, তখন ব্রাজিলে বামপন্থী নেতৃত্বের পুনর্নির্বাচন সে প্রবণতার বিপরীতে দাঁড়াল। লাতিন আমেরিকার দুই জনবহুল দেশ ব্রাজিল ও মেক্সিকোয় এখন বামঘেঁষা সরকার ক্ষমতায়। ফলে এ অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব এবং স্থানীয় সরকারগুলির স্বাধীন অবস্থানের প্রশ্ন ফের আলোচনায় উঠে এসেছে। নির্বাচনি প্রচারেও ব্রাজিলের সার্বভৌমত্বকে প্রধান বিষয় করেছিলেন লুলা। তাঁর বক্তব্য ছিল, দেশের সিদ্ধান্ত দেশের মানুষই নেবেন, বাইরের কোনো শক্তি নয়। ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি এবং কূটনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে সরব হয়ে তিনি ভোটারদের সতর্ক করেছিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে লুলা বলেছিলেন, তাঁর প্রতিপক্ষ যেন ‘আমেরিকার পতাকা নিয়ে দেশ শাসন করতে চান’। জাতীয় পতাকার মর্যাদা ও দেশের স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখার বার্তাই ছিল তাঁর প্রচারের অন্যতম হাতিয়ার।

প্রায় ২.৬ লক্ষ কোটি ডলারের বার্ষিক অর্থনীতি নিয়ে ব্রাজ়িল লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। ট্রাম্প প্রশাসনের বাড়তি শুল্কের চাপের মধ্যেও দেশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থেকে স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখতে পারবে কি না, তা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আলোচ্য বিষয়। লুলার পুনর্নির্বাচন সে প্রশ্নে তাঁর সরকারের অবস্থানকে আরও গুরুত্ব দিল। ভোট প্রচারে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় জইর বলসোনারোর ভূমিকা এবং আমাজনের অরণ্য ধ্বংস নিয়ে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে প্রচারের হাতিয়ার করে বামপন্থীরা। তাঁদের বক্তব্য ছিল, বলসোনারো পরিবারের প্রত্যাবর্তন হলে পরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি ফের চাপে পড়তে পারে। অন্যদিকে, ফ্লাভিও অপরাধ দমনে কঠোর পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমানো, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়ে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করেন তিনি। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, প্রথম দফার পর দোদুল্যমান ভোটারদের কাছে পৌঁছনোর কৌশলই শেষ পর্যন্ত লুলাকে সুবিধা করে দিয়েছে।

চতুর্থ বারের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও লুলার সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক। সংসদে তাঁর পথ মসৃণ হওয়ার সম্ভাবনা কম। ব্রাজ়িলের কংগ্রেসে ডানপন্থীদের প্রভাব যথেষ্ট বেশি। ফলে আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন নীতি কার্যকর করা — সব ক্ষেত্রেই বিরোধিতার মুখে পড়তে হতে পারে লুলাকে। অর্থনীতিও উদ্বেগের কারণ। আগামী দিনে দেশের আর্থিক বৃদ্ধির হার কমতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ এখনো কাটেনি। তার সঙ্গে রয়েছে অপরাধী গোষ্ঠীগুলির দাপট এবং নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ। ব্রাজিলের বিভিন্ন শ্রমজীবী এলাকায় অপরাধী গোষ্ঠীগুলির হিংসা ও প্রভাব মোকাবিলা করতে সরকার কী পদক্ষেপ করে, তার উপরেও নির্ভর করবে আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। লুলার সরকারকে এক দিকে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে, অন্য দিকে নিরাপত্তার প্রশ্নে দৃশ্যমান সাফল্য দেখাতে হবে। একই সঙ্গে যাঁরা তাঁকে ভোট দেননি, তাঁদের আস্থাও অর্জন করতে হবে। কারণ, এ বারের নির্বাচনে জয় এলেও ব্রাজ়িলের রাজনৈতিক বিভাজন যে কমেছে, এমন দাবি করার সুযোগ নেই।

লুলার জয় হলেও ব্রাজিলের সাধারণ মানুষের ক্ষোভের জায়গাগুলি অস্বীকার করার উপায় নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, সংসার চালানোর খরচ এবং অপরাধের বাড়বাড়ন্ত — এ তিনটি বিষয় এ বারের নির্বাচনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। লুলার সরকারের আমলে মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্ব কমেছে এবং সরকারি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ক্ষুধা থেকে মুক্ত করার চেষ্টা হয়েছে। তবু বহু ভোটার মনে করেছেন, তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে আর্থিক স্বস্তি এখনো যথেষ্ট নয়। ফ্লাভিও আমজনতার এই অসন্তোষকেই প্রচারের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান, খাদ্যপণ্যের দাম কমানো ও অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। তাঁর বাবা জইর বলসোনারোর রাজনৈতিক পরিচয়ের তুলনায় নিজেকে বেশি সংযত ও মিশুকে নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন।

অন্যদিকে, পরাজয়ের পরে নির্বাচনের ফল নিয়ে আপত্তি তুলেছেন ফ্লাভিও বলসোনারো। নির্বাচনের দিন শেষ মুহূর্তে ভোটদানের সময়সীমা বাড়ানো নিয়ে প্রবল বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার মাত্র তিন মিনিট আগে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ক্রিস্তিয়ানো জানিন ভোটগ্রহণ আরও দু-ঘণ্টা চালু রাখার নির্দেশ দেন। দুই প্রার্থীর শিবিরই সময় বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছিল। সাও পাওলো ও সালভাদোরে ভোটারদের কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার বাস চলাচলে সমস্যার অভিযোগ তুলে সময় বাড়ানোর অনুরোধ করেছিল লুলার শিবির। দক্ষিণ ব্রাজিলে প্রবল বৃষ্টির কারণে ভোটারদের অসুবিধার কথা জানিয়ে একই আবেদন করেছিল ফ্লাভিওর শিবির। নির্দেশের জেরে ভোট গণনা শুরু হতে দু-ঘণ্টা দেরি হয়। তবে, কতগুলি কেন্দ্রে নির্ধারিত সময়ের পরে ভোটগ্রহণ চলেছিল, তা স্পষ্ট নয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ফল ঘোষণার পরে আপত্তি তোলেন ফ্লাভিও। ভোটের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে নজিরবিহীন বলে দাবি করে তিনি নির্বাচনের ফল বাতিল করার আবেদন জানান। তবে তাঁর শিবিরও যে সময় বাড়ানোর অনুরোধ করেছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!