Advertisement
  • দে । শ
  • নভেম্বর ৩, ২০২৬

বিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করতে ৩২ হাজার গাছ কাটার তোড়জোড়, উচ্ছেদের মুখে দেড়শো জনজাতি পরিবার

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করতে ৩২ হাজার গাছ কাটার তোড়জোড়, উচ্ছেদের মুখে দেড়শো জনজাতি পরিবার

কয়লার উপর নির্ভরতা কমাতে পশ্চিমঘাটের বুক চিরে ৩,০০০ মেগাওয়াটের পাম্পড স্টোরেজ বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়তে চলেছে মহারাষ্ট্র। প্রকল্পের জন্য ইতিমধ্যেই কাটা হয়েছে প্রায় ১১০০টি গাছ। সব মিলিয়ে ৩২ হাজারেরও বেশি গাছ কাটার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু যে অরণ্যকে ঘিরে জনজাতি পরিবারগুলির জীবন-জীবিকা, সেই বনভূমির উপর তাঁদের নির্ভরতার কোনো সরকারি নথিই নেই। ফলে ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা। পরিবেশবিদদের উদ্বেগ, এ অরণ্য ধ্বংসের গভীর প্রভাব পড়তে পারে পশ্চিমঘাট সহ দক্ষিণ ভারতের জলবায়ু ও পরিবেশে।

গাছের গুঁড়িগুলির গায়ে এখনো স্পষ্ট সাদা চক দিয়ে লেখা নম্বর। কোনো গুঁড়িতে ১০১, কোনোটিতে ২৫৬। বন দফতরের কর্মীরা গাছ কাটার আগে প্রতিটির গায়ে ওই নম্বর লিখে রেখেছিলেন। মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলার কারজাতের সইদোঙ্গার পাহাড়ে এখন ছড়িয়ে রয়েছে এমনই অসংখ্য গাছের গুঁড়ি। মুম্বই থেকে দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার। গত সপ্তাহে গাছ কাটার কাজ বন্ধ হওয়ার আগে প্রায় ১১০০টি গাছ কাটা হয়েছে। জঙ্গলের ভিতরে স্তূপ করে রাখা হয়েছে গাছের গুঁড়ি। পাহারায় বন দফতরের কর্মীরা। যে অরণ্য থেকে বছরের পর বছর উপাদান সংগ্রহ করে সংসার চালিয়েছেন স্থানীয় আদিবাসীরা, সে জঙ্গলে এখন তাঁদের প্রবেশাধিকার নেই। এমনকি কাটা গাছের কাঠও নিয়ে যেতে দেওয়া হচ্ছে না তাঁদের।

জানা যাচ্ছে, দশেরার সকালে শুরু হয়েছিল গাছ কাটার কাজ। গ্রামবাসীদের প্রতিবাদে ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। তাঁদের আন্দোলনে যোগ দেন বিরোধী দল ও পরিবেশকর্মীরা। শেষ পর্যন্ত আপাতত কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় বন দফতর। তবে এ বিরতি স্থায়ী নয় বলেই জানাচ্ছেন আধিকারিকেরা। কারণ, ওই অরণ্য সাফ করেই তৈরি হওয়ার কথা ৩,০০০ মেগাওয়াটের পাম্পড স্টোরেজ জলবিদ্যুৎকেন্দ্র। ১৩,৫০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি তৈরি করছে টরেন্ট পাওয়ার। ২০২৯ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। প্রকল্পের জন্য সাহ্যাদ্রি পর্বতমালার ৩৭৭ হেক্টর জমি চিহ্নিত হয়েছে। কাটতে হবে ৩২ হাজারের বেশি গাছ।

মহারাষ্ট্র সরকারের যুক্তি, কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের উপর নির্ভরতা কমাতে এই প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়লেও প্রয়োজনের সময়ে বিদ্যুতের জোগান নিশ্চিত করা কঠিন। সে ঘাটতি মেটাতে পাম্পড স্টোরেজ কেন্দ্র কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন বন্দোবস্তের জন্য যে অরণ্যকে বিসর্জন দিতে হচ্ছে, তার পরিবেশগত গুরুত্বও কম নয়। পশ্চিমঘাটের এ অঞ্চলকে এক সময় সর্বোচ্চ পরিবেশগত সুরক্ষার আওতায় রাখার সুপারিশ করেছিল মাধব গাডগিলের নেতৃত্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটি। বিজ্ঞানীদের একাংশের বক্তব্য, এই অরণ্য থেকে নির্গত জলীয় বাষ্প দক্ষিণ ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কারজাতের পাহাড়ে গাছ কাটার প্রভাব শুধু মহারাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে, এমন নয়।  

প্রশ্ন উঠছে, অরণ্যের উপর নির্ভরশীল স্থানীয় জনজাতি পরিবারগুলির ভবিষ্যৎ কী? ওই এলাকার দেড়শোর বেশি জনজাতি পরিবারের অরণ্যের উপর নির্ভরতার কোনো সরকারি নথি নেই। ফলে প্রকল্পের পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়ার সময় ধরে নেওয়া হয়েছে, কাউকে পুনর্বাসন বা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। অথচ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই অরণ্যই তাঁদের খাদ্য, চিকিৎসা আর উপার্জনের প্রধান অবলম্বন। গ্রামের দেবতার নাম থেকেই সইদোঙ্গার পাহাড়ের নামকরণ। পশ্চিমঘাটের প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সাহ্যাদ্রি পর্বতমালার একটি অংশ এই পাহাড়। ভারতের পশ্চিম উপকূল বরাবর ছয়টি রাজ্যের মধ্যে দিয়ে বিস্তৃত পশ্চিমঘাটের জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশগত গুরুত্ব আন্তর্জাতিক ভাবেও স্বীকৃত। সেই পর্বতমালারই একটি অংশে ছড়িয়ে রয়েছে সইদোঙ্গার, ঢাক, পালি, পোটাল, আম্বোট এবং ভালিওয়াড়ি — ছয়টি ছোটো জনপদ।

প্রস্তাবিত প্রকল্পের জন্য চিহ্নিত ৩৭৭ হেক্টর জমির মধ্যে ২৩৩ হেক্টর বন দফতরের অধীন। বাকি ১৪৪ হেক্টর রয়েছে ওই জনপদগুলির মধ্যে। পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে পেজ নদী। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য এই নদী থেকেই জল নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু এ বছর বৃষ্টির ঘাটতির কারণে নদীর জল প্রায় শুকিয়ে গিয়েছে। নদীর বুক জুড়ে এখন শুধু কালো পাথর। ছয়টি জনপদের প্রতিটিতে ২০ থেকে ২৫টি করে পরিবার বসবাস করে। সব মিলিয়ে প্রায় ১৫০টি পরিবার। অধিকাংশই কাটকারি জনজাতি সম্প্রদায়ের। তাঁদের জীবনযাত্রা অরণ্যকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। প্রতিদিন সকালে পুরুষ ও মহিলারা জঙ্গলে যান জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে। সে কাঠের বোঝা মাথায় নিয়ে বাজারে পৌঁছন তাঁরা। বিক্রি করে দৈনিক আয় হয় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। এ ছাড়াও জঙ্গল থেকে মধু সংগ্রহ করেন। ফলমূল তুলে নিজেদের খাদ্যের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজারেও বিক্রি করেন।

কিন্তু এখন আর জঙ্গলে ঢোকার অনুমতি নেই তাঁদের। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আয়ের সব পথ। যে অরণ্য তাঁদের এতদিন বাঁচিয়ে রেখেছে, সেখান থেকেই থেকেই কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন তাঁরা। জঙ্গলের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক শুধুই খাদ্য বা উপার্জনেরও নয়। অরণ্যই তাঁদের কাছে প্রাথমিক চিকিৎসালয়। নিম, গুলভেল বা গিলয় এবং আদুলসা বা মালাবার নাটের মতো গাছগাছড়া ব্যবহার করেন নানা রোগের চিকিৎসায়। জ্বর, শ্বাসকষ্ট, দাঁতের সমস্যা কিংবা শরীরের ক্ষত সারাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ভেষজ উদ্ভিদের উপর নির্ভর করেছেন তাঁরা। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার বদলে বহু ক্ষেত্রে জঙ্গলের গাছপালাই তাঁদের ভরসা। স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, কোভিড অতিমারির দিনগুলিতে যখন সংক্রমণের ভয়ে গোটা পৃথিবী ঘরবন্দি, তখনও তাঁরা জঙ্গলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি। তাঁরা গুলভেলের পাতা খেতেন। তাঁদের বিশ্বাস, এ পাতা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এই সম্প্রদায়ের একজনও করোনায় আক্রান্ত হননি জানা যাচ্ছে।

শহরের কোনও মানুষ যেমন জঙ্গলে গিয়ে সহজে বাঁচতে পারবেন না, তেমনই জনজাতি সম্প্রদায়ের মানুষেরাও অরণ্য ছাড়া বাঁচতে পারবেন না। জঙ্গল চলে গেলে তাঁদের জীবন, জীবিকা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি; সবই হারিয়ে যাবে। পেজ নদীও তাঁদের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্ষায় নদীতে জল বাড়লে মাছ ও কাঁকড়া ধরে বাজারে বিক্রি করেন গ্রামবাসীরা। কিন্তু এ বছর বৃষ্টির ঘাটতিতে নদী প্রায় শুকিয়ে যাওয়ায় সে উপার্জনের পথও বন্ধ। পরবর্তী বর্ষা আসা পর্যন্ত তাঁদের কাছে অরণ্যই একমাত্র অবলম্বন। অথচ সে অরণ্যেই এখন তাঁদের প্রবেশ নিষেধ। জনজাতি ও অন্যান্য প্রথাগত বনবাসীদের অধিকার রক্ষার জন্য ২০০৬ সালে কার্যকর হয় ‘বনাধিকার আইন’। আইনে অরণ্য এলাকায় বসবাসকারী সম্প্রদায়গুলিকে তাঁদের প্রথাগত ভাবে ব্যবহার করা বনভূমির উপর অধিকার দাবি করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বনজ সম্পদ সংগ্রহ, জীবিকা নির্বাহ এবং অরণ্যের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রথাগত অধিকারের স্বীকৃতিও এই আইনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

আইনের ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, এ অধিকার সংক্রান্ত দাবি যাচাইয়ের প্রাথমিক দায়িত্ব গ্রামসভার। গ্রামসভা দাবিগুলি গ্রহণ করবে, সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করবে এবং সুপারিশ-সহ মহকুমা স্তরের কমিটির কাছে পাঠাবে। পরবর্তী সময়ে সরকারি কমিটি সে দাবির বৈধতা বিচার করে সিদ্ধান্ত নেবে। অর্থাৎ, বনভূমি কোনো প্রকল্পের হাতে তুলে দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের প্রথাগত অধিকার নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। বন দফতরের আধিকারিকদের বক্তব্য, অরণ্যের উপর নির্ভরশীল পরিবারগুলির কোনো তালিকা গ্রামসভার তরফে জমা পড়েনি। ফলে সরকারি নথিতে তাঁদের নির্ভরতার কোনো প্রমাণ নেই। সে ভিত্তিতেই প্রকল্পের জন্য জমি হস্তান্তরের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।

কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকের দেওয়া পরিবেশগত ছাড়পত্রেও উল্লেখ রয়েছে, এ প্রকল্পের জন্য কোনো পরিবার বা গ্রামকে পুনর্বাসন দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। অর্থাৎ, অরণ্যের উপর নির্ভরশীল প্রায় ১৫০টি পরিবারের অস্তিত্ব এবং তাঁদের জীবন-জীবিকার বাস্তবতা সরকারি নথিতে কার্যত অনুপস্থিত। কারজাতের ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসার সমীর শিন্ডে অবশ্য দায় চাপিয়েছেন গ্রামসভার উপর। তাঁর বক্তব্য, কতগুলি জনজাতি পরিবার অরণ্যের উপর নির্ভরশীল, তারা কোথায় চাষ করে, কোথা থেকে বনজ সম্পদ সংগ্রহ করে, কোথায় ঔষধি গাছপালা সংগ্রহ করে — সেসব তথ্য গ্রামসভাকে নথিভুক্ত করার কথা। তার পর বন দফতর সে জায়গা যাচাই করে পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণের যোগ্য পরিবারগুলিকে চিহ্নিত করে। এ ক্ষেত্রে গ্রামসভা কোনো নথি জমা করেনি। ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত কোনও সুপারিশও জমা দেয়নি। গত ১৮ মাসে আমরা একাধিক জনশুনানির আয়োজন করেছি। সেখানে ৪০০-রও বেশি মানুষ উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের অনেকেই বনভূমি থেকে বনজ সম্পদ সংগ্রহের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। আমরা গ্রামসভাকে আনুষ্ঠানিক ভাবে সেই সংক্রান্ত নথি জমা দিতে বলেছিলাম। কিন্তু সে নথি আমাদের কাছে আসেনি। তাই ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হয়নি।

পালি গ্রামের গ্রামসভার তরফে অবশ্য এ নিয়ে এখনো কোনো মন্তব্য সামনে আসেনি।  তবে, অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। পালি গ্রাম পঞ্চায়েতের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র বা এনওসি না নিয়েই গত সপ্তাহে গাছ কাটার কাজ শুরু হয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে। সাধারণত স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামত গ্রহণের প্রশ্ন ওঠে এ ধরনের প্রকল্পে। কিন্তু বন দফতরের বক্তব্য, গাছ কাটার জন্য পঞ্চায়েতের অনুমতিপত্রের প্রয়োজন নেই। সমীর শিন্ডে বলেন, ‘গাছ কাটার কাজ শুরু করার জন্য বন দফতরের পঞ্চায়েতের কাছ থেকে কোনো এনওসি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রকের ছাড়পত্র থাকলেই চলে। সে ছাড়পত্র ইতিমধ্যেই পাওয়া গিয়েছে।’ তাই আপাতত গাছ কাটার কাজ বন্ধ থাকলেও তা স্থায়ী সিদ্ধান্ত নয়। কবে আবার কাজ শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর দাবি, ‘গ্রামে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য সাময়িক ভাবে গাছ কাটার কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।’

প্রসঙ্গত, সইদোঙ্গারের অরণ্য শুধু জনজাতি মানুষের জীবন-জীবিকার উৎস নয়, একাধিক বন্যপ্রাণীরও বাসস্থান। ২০১০ সালে পশ্চিমঘাটের পরিবেশগত গুরুত্ব ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রক পরিবেশবিদ মাধব গাডগিলের নেতৃত্বে পশ্চিমঘাট পরিবেশ বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছিল। ২০১১ সালের অগস্টে জমা পড়া সে রিপোর্টে মহারাষ্ট্রের ১০টি জেলাকে পরিবেশগত ভাবে সংবেদনশীল পশ্চিমঘাট অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরিবেশগত সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে অঞ্চলগুলিকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছিল কমিটি। ‘ইএসজেড-১’ ছিল সর্বোচ্চ সুরক্ষার এলাকা। ‘ইএসজেড-২’-এ কিছু বিধিনিষেধ মেনে উন্নয়নমূলক কাজের সুপারিশ করা হয়েছিল। আর ‘ইএসজেড-৩’-এ নিয়ন্ত্রিত ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের সুযোগ রাখা হয়েছিল।

গাডগিল কমিটির মানচিত্রে কারজাত তালুকের পালি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকাকে ‘ইএসজেড-১’-এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। অর্থাৎ, এ অঞ্চলে নতুন বড়ো বাঁধ, খনি কিংবা বৃহৎ পরিকাঠামো নির্মাণের বিরোধিতা করেছিল কমিটি। যদিও সে সুপারিশ কার্যকর হয়নি। পরবর্তী সময়ে গঠিত অন্য একটি কমিটি সংরক্ষিত এলাকার পরিধি কমিয়ে দেয়। পশ্চিমঘাটের পরিবেশগত ভাবে সংবেদনশীল অঞ্চল চিহ্নিত করার চূড়ান্ত রিপোর্ট এ পর্যন্ত একাধিক খসড়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছে। প্রকল্পের পরিবেশগত ছাড়পত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, ‘ইএসজেড-১’-এর অন্তর্ভুক্ত ভীমাশঙ্কর অরণ্য প্রকল্পস্থল থেকে মাত্র ১৫.৫ কিলোমিটার দূরে। সমীক্ষা করা এলাকায় বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইনের অন্তর্ভুক্ত ২৬টি প্রজাতির প্রাণীর উপস্থিতি রয়েছে। তালিকায় রয়েছে ১৪টি স্তন্যপায়ী প্রাণী। তার মধ্যে চিতাবাঘ, ভারতীয় স্লথ ভালুক, ভারতীয় সজারু, সম্বর হরিণ, অ্যান্টিলোপ, বনবিড়াল এবং ভারতীয় নেকড়ে রয়েছে। ছয়টি পাখির প্রজাতির মধ্যে রয়েছে ময়ূর, অস্প্রে, কালো ঈগল এবং সাদা চোখের বাজপাখি। সরীসৃপের ছয়টি প্রজাতির মধ্যে রয়েছে এশীয় গিরগিটি, রাসেলের ভাইপার, গোখরো, দাঁড়াশ ও ভারতীয় অজগর।

যদিও বন দফতর জানিয়েছেন, এই ২৬টি প্রজাতির উপস্থিতি প্রকল্পের জন্য চিহ্নিত ৩৭৭ হেক্টর জমির প্রতিটি অংশে পাওয়া যায়নি। প্রকল্পের পরিবেশগত ছাড়পত্রের জন্য যে বৃহত্তর অঞ্চল জুড়ে সমীক্ষা চালানো হয়েছিল, সে এলাকাতেই তাদের উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছে। ওই সমীক্ষা এলাকার সঙ্গে ভীমাশঙ্কর অরণ্যের সংযোগ রয়েছে। এক আধিকারিকের দাবি, ‘পাহাড়ের গ্রামগুলিতে চিতাবাঘের দেখা পাওয়া খুবই সাধারণ ঘটনা। স্ত্রী চিতাবাঘেরা প্রায়ই গ্রামের কাছাকাছি পাহাড়ের ঢালে সন্তান প্রসব করে, শাবকদের নিয়ে সেখানে আশ্রয় নেয়। পাহাড়ের ওই সব এলাকায় মুরগি ও কুকুরের মতো শিকার সহজেই পাওয়া যায়। ফলে গ্রামগুলি চিতাবাঘের শিকারের উপযুক্ত জায়গা হয়ে ওঠে।’ প্রকল্পের প্রস্তাবে জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ পরিকল্পনার জন্য ৩.২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বন দফতেরর দাবি, পরিবেশগত ছাড়পত্রে চিহ্নিত গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতিগুলিকে রক্ষার জন্য প্রকল্পের কাজ শুরুর আগেই সংরক্ষণ পরিকল্পনা কার্যকর করার নির্দেশ রয়েছে। এর উদ্দেশ্য, মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখা।

কারজাতের পাহাড়ে গাছ কাটার প্রভাব কি শুধু ওই এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? না কি তার অভিঘাত পৌঁছতে পারে কয়েকশো কিলোমিটার দূরের অঞ্চল পর্যন্ত? পরিবেশবিদদের উদ্বেগের জায়গা এখানেই। ২০১৮ সালে ‘আইআইটি বম্বে’ এবং ‘কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ’-এর চার গবেষকের একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছিল পশ্চিমঘাটের অরণ্যের সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের বৃষ্টিপাতের গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্রের কথা। ‘ময়েশ্চার সাপ্লাই ফ্রম দ্য ওয়েস্টার্ন ঘাটস ফরেস্টস টু ওয়াটার ডেফিসিট ইস্ট কোস্ট অফ ইন্ডিয়া’ শীর্ষক ওই গবেষণায় বলা হয়েছিল, বাষ্পমোচন বা ইভাপোট্রান্সপিরেশন প্রক্রিয়ায় মাটি ও উদ্ভিদ থেকে জলীয় বাষ্প বায়ুমণ্ডলে মিশে যায়। পশ্চিমঘাটের অরণ্য এই প্রক্রিয়ায় বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ আর্দ্রতা সরবরাহ করে। বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমে সে আর্দ্রতা পৌঁছে যায় দূরবর্তী অঞ্চলেও। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, পশ্চিমঘাটের অরণ্য থেকে নির্গত জলীয় বাষ্প তামিলনাড়ুর দিকে পরিবাহিত হয়। কাবেরী অববাহিকার বৃষ্টিপাতেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে পশ্চিমঘাটের অরণ্য ধ্বংস হলে ওই অঞ্চলে বৃষ্টিপাত এবং জলের প্রাপ্যতা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যেতে পারে। বিশেষ করে খরা কিংবা বৃষ্টির ঘাটতির সময়ে এই প্রভাব আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে তামিলনাড়ু এবং কাবেরী অববাহিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পশ্চিমঘাটের অরণ্য থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩ মিলিমিটার বৃষ্টির সমতুল্য আর্দ্রতা সরবরাহ হয়। অরণ্যের গাছপালা ধ্বংস হলে তামিলনাড়ুর গড় ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ০.২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এই গবেষণার অন্যতম লেখক রঘু মূর্তুগুড্ডে আইআইটি বম্বের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক। তাঁর মতে, ‘ঘন সবুজ অরণ্যের উপরে কুয়াশার আস্তরণ দেখা যায় প্রায়ই। উদ্ভিদ থেকে নির্গত আর্দ্রতারই একটি দৃশ্যমান রূপ সেটি। বাষ্পমোচন প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদ থেকে যে জলীয় বাষ্প নির্গত হয়, তা বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সে আর্দ্রতা বহু দূরের অঞ্চলেও বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারে।’ তাঁর মতে, এ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে প্রভাব পড়ে তামিলনাড়ুতে। তবে মহারাষ্ট্রও তার প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। মূর্তুগুড্ডে বলেন, ‘বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব আমরা ইতিমধ্যেই অনুভব করছি। কিন্তু ভূমির ব্যবহারে পরিবর্তন — যেমন অরণ্য ধ্বংস, নগরায়ণ এবং কৃষিকাজের বিস্তার; স্থানীয় স্তরে সে প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এর ফলে পরিবেশের উপর উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’

আইআইটি খড়্গপুরের অধ্যাপক অমেয় পাঠক বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতা পরিবহণ নিয়ে কাজ করেন। তাঁর বক্তব্য, অরণ্য শুধু বৃষ্টির জল ধরে রাখে না, মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখে, ভূগর্ভস্থ জলের পুনর্ভরণে সাহায্য করে, মাটির স্বাস্থ্যও রক্ষা করে। ফলে অরণ্য ধ্বংস হলে মাটির গুণমান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ জলের স্বাভাবিক ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আসে। পাঠক বলেন, ‘সাহ্যাদ্রির অরণ্য সাফ করলে নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের উপর ঠিক কতটা প্রভাব পড়বে, তা সরাসরি পরিমাপ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে সংখ্যাভিত্তিক বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, একটি অঞ্চলে ভূমির ব্যবহারে পরিবর্তন হলে তার প্রভাব বহু দূরের বায়ুপ্রবাহের অভিমুখে থাকা অঞ্চলের বৃষ্টিপাতেও পড়তে পারে। সে প্রভাব রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়েও বিস্তৃত হতে পারে। বিষয়টি বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি।’

এদিকে, প্রকল্পের পক্ষে মহারাষ্ট্র সরকারের যুক্তি, ক্রমাগত বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। অথচ সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুতের মতো পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির উৎপাদন সব সময় সমান থাকে না। সূর্যের আলো না থাকলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়। বাতাসের গতি কমলেও ব্যাহত হয় বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন। বিশেষ করে সন্ধ্যার সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও তখন সৌরবিদ্যুতের জোগান থাকে না বললেই চলে। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ সঞ্চয়ের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে পাম্পড স্টোরেজ কেন্দ্রের গুরুত্ব বাড়ছে। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীসের বক্তব্য, কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের উপর রাজ্যের নির্ভরতা কমাতে এই প্রকল্প। নীতি আয়োগের ‘ইন্ডিয়া ক্লাইমেট অ্যান্ড এনার্জি ড্যাশবোর্ড’-এর তথ্য অনুযায়ী, মহারাষ্ট্রের মোট বিদ্যুতের ৭৪.১৯ শতাংশ আসে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। প্রস্তাবিত কেন্দ্রটির উৎপাদন ক্ষমতা ৩,০০০ মেগাওয়াট। রাজ্যের মোট বিদ্যুতের চাহিদার প্রায় এক-দশমাংশ ও মুম্বইয়ের চাহিদার প্রায় তিন-চতুর্থাংশের সমান এই ক্ষমতা।

উল্লেখ্য, পাম্পড স্টোরেজ পদ্ধতিতে সাধারণত দুটি জলাধার তৈরি করা হয়। একটি পাহাড়ের উপরে, অন্যটি নীচে। বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে নীচের জলাধার থেকে জল পাম্প করে উপরের জলাধারে তুলে রাখা হয়। পরে চাহিদা বাড়লে সেই জল নীচে নামিয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। অর্থাৎ, অতিরিক্ত বিদ্যুৎকে জলের সম্ভাব্য শক্তিতে রূপান্তরিত করে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করা হয়। এ ধরণের ব্যবস্থার সবচেয়ে  বড়ো সুবিধা, এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ব্যবধান কমাতে সাহায্য করে। সরাসরি বিদ্যুৎকে বৃহৎ পরিমাণে সঞ্চয় করে রাখা সম্ভব নয়। তাই যখন বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকে, তখন অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে নীচের জলাধার থেকে জল উপরের জলাধারে তোলা হয়। এর ফলে বৈদ্যুতিক শক্তি জলের সম্ভাব্য শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে সঞ্চিত থাকে। পরে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লে সে জল টারবাইনের মধ্যে দিয়ে নীচে নামিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। অনেক সময় পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ চাহিদার তুলনায় বেশি হয়ে যায়। পাম্পড স্টোরেজ কেন্দ্রগুলি সেই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কাজে লাগিয়ে জল উপরের জলাধারে তুলে রাখতে পারে। পরে প্রয়োজন অনুযায়ী সেই সঞ্চিত শক্তি ব্যবহার করা সম্ভব।

জল ব্যবহারের প্রশ্নেও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে ‘টরেন্ট পাওয়ার’। প্রকল্পের জলাধারগুলিতে মূলত বৃষ্টির জল ব্যবহার করা হবে। পেজ নদীর উপর নির্ভর করে সারা বছর জল নেওয়ার পরিকল্পনা নেই। সংস্থার বক্তব্য, ‘জল সরবরাহের হিসাব করার ক্ষেত্রে বর্ষার মরসুমি জলপ্রবাহকে বিবেচনা করা হয়েছে। বর্তমানে নদীতে যে পরিমাণ জল রয়েছে, সারা বছর সে পরিমাণ জল পাওয়া যাবে — এমন অনুমানের উপর প্রকল্পটি নির্ভরশীল নয়।’ পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের উন্নয়নের জন্য একাধিক প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে সংস্থা। তাদের দাবি, জনজাতি মানুষের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা-সহ ৫০ শয্যার একটি বহুমুখী হাসপাতাল তৈরি করা হবে। তৈরি হবে স্কুল এবং দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্রও। প্রকল্পের পরিবেশগত ছাড়পত্রের আবেদনে নির্মাণপর্বে ২,০০০ কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ‘টরেন্ট’-এর দাবি, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে স্থানীয় উন্নয়নের জন্য কয়েকটি কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্কুলের সংস্কার, উঁচু বাতিস্তম্ভ বসানো, চিকিৎসা শিবিরের আয়োজন। গ্রামের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের অগ্রাধিকার ও প্রকল্পের অগ্রগতির ভিত্তিতে ভবিষ্যতেও উন্নয়নমূলক কাজ চালানো হবে।’

অরণ্য ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ হিসাবে বিকল্প বনসৃজনের পরিকল্পনা করেছে ‘টরেন্ট পাওয়ার’। প্রকল্পস্থল থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলায় ২৫৩ হেক্টর জমি বন দফতরের হাতে তুলে দিয়েছে ‘টরেন্ট’ গোষ্ঠী। ওই জমিতে বর্তমানে আনুমানিক ৭০ হাজার গাছ রয়েছে। বন দফতর সেখানে আরও ৩০ হাজার গাছ লাগাবে। সংস্থার দাবি, প্রকল্পের ফলে যে পরিবেশগত ক্ষতি হবে, তার তুলনায় বিকল্প বনসৃজনের সুফল অনেক বেশি। তাদের বক্তব্য, ‘ক্ষতির তুলনায় লাভের পরিমাণ প্রায় ৩,০০০ গুণ। যে গাছ কাটা হচ্ছে, তার পরিবর্তে প্রায় ৫,৫০০টি গাছের সমপরিমাণ কার্বন শোষণের ক্ষমতা সংরক্ষিত হচ্ছে।’ কিন্তু এ যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন পরিবেশকর্মীদের একাংশ। কারণ, অরণ্য কেবল গাছের সংখ্যার হিসাব নয়। নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থানে গড়ে ওঠা অরণ্যের নিজস্ব বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য, মাটির গঠন, জলধারণ ক্ষমতা আর বৃষ্টিপাতের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। সাতারায় নতুন করে গাছ লাগালে সইদোঙ্গারের অরণ্যের সেই পরিবেশগত ভূমিকা কতটা পূরণ হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

তার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে আরও একটি প্রশ্ন। দেড়শোর বেশি যে জনজাতি পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ অরণ্যের উপর নির্ভর করে বেঁচে রয়েছে, তাদের জীবিকার ক্ষতিপূরণ কী ভাবে হবে? একটি নতুন হাসপাতাল, স্কুল কিংবা কয়েক হাজার কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি কি তাঁদের অরণ্যনির্ভর জীবনযাত্রার বিকল্প হতে পারে? উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন নেই। কয়লার উপর নির্ভরতা কমানো, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোও জরুরি। কিন্তু সে লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে যদি একটি সংবেদনশীল অরণ্য, তার জীববৈচিত্র্য এবং কয়েক প্রজন্মের মানুষের জীবন-জীবিকা বিপন্ন হয়, তা হলে উন্নয়নের হিসাবেও সেই ক্ষতির মূল্যায়ন জরুরি। কারজাতের সইদোঙ্গারে আপাতত গাছ কাটা বন্ধ। কিন্তু ৩২ হাজার গাছ, ১৫০টি জনজাতি পরিবার এবং পশ্চিমঘাটের পরিবেশগত ভবিষ্যৎ — তিন প্রশ্নেরই উত্তর এখনো অধরা।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!