Advertisement
  • দে । শ
  • নভেম্বর ৩, ২০২৬

প্রতিবাদের নামে অনির্দিষ্ট কাল জায়গা দখল নয়, দিল্লির বিক্ষোভ নিয়ে বার্তা শীর্ষ আদালতের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
প্রতিবাদের নামে অনির্দিষ্ট কাল জায়গা দখল নয়, দিল্লির বিক্ষোভ নিয়ে বার্তা শীর্ষ আদালতের

প্রতিবাদ গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। কিন্তু সেই অধিকারের আড়ালে দিনের পর দিন কোনও জনবহুল এলাকা দখল করে রাখা যায় না। তাতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হলে তার দায় কে নেবে? দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের লাগাতার আন্দোলন ঘিরে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার শুনানিতে এমন প্রশ্নই তুলল সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের পর্যবেক্ষণ, প্রতিবাদ করার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনই অন্যদেরও নিজেদের কাজকর্ম স্বাভাবিক ভাবে চালানোর অধিকার রয়েছে। তাই প্রতিবাদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা থাকলেও সেখানে অনির্দিষ্ট কালের জন্য অবস্থান করা যেতে পারে না। এমনকি নির্দিষ্ট প্রতিবাদস্থলেও কর্মসূচির সময়সীমা বেঁধে দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করে আদালত।

দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধীদের আন্দোলন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পথে নেমেছে বিরোধী শিবির। শুধু রাজনৈতিক দলগুলিই নয়, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-ও জ্ঞানেশের পদত্যাগের দাবিতে প্রতিবাদ কর্মসূচি চালাচ্ছে। দিল্লির যন্তর মন্তর, রামলীলা ময়দান-সহ বিভিন্ন এলাকায় এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপ বেড়েছে। কিন্তু লাগাতার বিক্ষোভের জেরে জনজীবন এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন দিল্লির ব্যবসায়ীরা। বিশেষত উৎসবের মরসুমে দোকানপাট বন্ধ রাখতে হওয়ায় তাঁদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে বলে দাবি।

মঙ্গলবার সেই অভিযোগ সংক্রান্ত মামলার শুনানিতেই ব্যবসায়ী ও আন্দোলনকারীদের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রাখার প্রশ্নটি সামনে আসে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনা। দিল্লির ব্যবসায়ীদের হয়ে আদালতে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী মুকুল রোহতগি। তাঁর বক্তব্য, উৎসবের মরসুমে লাগাতার প্রতিবাদ কর্মসূচির কারণে দোকানপাট বন্ধ রাখতে হলে ব্যবসায়ীদের বিপুল ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। বিশেষত যে সময়ে কেনাকাটা ও বিক্রিবাট্টা বাড়ার কথা, সে সময়েই বিক্ষোভের কারণে ব্যবসা মার খাচ্ছে। দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারা জারি থাকার কারণেও দোকানপাট বন্ধ রাখতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। ব্যবসায়ীদের হয়ে রোহতগির আর্জি, অন্তত আগামী দু–মাস কোনও প্রতিবাদ বা ধর্না কর্মসূচি না করা হোক।  

ব্যবসায়ীদের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলেন, যাঁরা প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দিচ্ছেন, তার পরিণতির দায়ও তাঁদেরই নিতে হবে। তবে আন্দোলনের জেরে ব্যবসায়িক ক্ষতির জন্য সব ক্ষেত্রে প্রতিবাদ কর্মসূচিকেই দায়ী করা যায় কি না, সেই প্রশ্নও শুনানিতে ওঠে। প্রধান বিচারপতি বলেন, প্রতিবাদ ও  ব্যবসা — দু–টিই গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। কোনো একটি অধিকারের চর্চা করতে গিয়ে অন্যের অধিকার খর্ব করা উচিত নয়। এরপরই প্রতিবাদীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আপনারা অনির্দিষ্ট কালের জন্য কোনো জায়গা দখল করে রাখতে পারেন না। অন্য প্রতিবাদীরাও রয়েছেন। ব্যবসায়ী, কৃষকেরা বা আইনজীবীরা কোথায় যাবেন? প্রতিবাদ করার অধিকার সকলের রয়েছে।’ আদালতের মতে, গণপ্রতিবাদের জন্য এমন কোনো জায়গা নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন, যেখানে আন্দোলনের কারণে ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না।

প্রতিবাদের সময়সীমা নিয়েও এ দিন স্পষ্ট অবস্থান জানায় শীর্ষ আদালত। প্রধান বিচারপতির বক্তব্য, কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় আন্দোলনের অনুমতি দেওয়া হলেও তা অনির্দিষ্ট কালের জন্য হতে পারে না। প্রতিবাদ কর্মসূচির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা প্রয়োজন। কারণ, একটি জায়গায় দীর্ঘ দিন ধরে আন্দোলন চললে অন্যদেরও সেখানে প্রতিবাদ করার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রেও ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। শুনানিতে যন্তরমন্তরে প্রতিবাদ কর্মসূচির অনুমতি না দেওয়ার বিষয়টিও উঠে আসে। সিজেপি প্রথমে ওই জায়গাতেই বিক্ষোভ দেখানোর পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু দিল্লি পুলিশ জানিয়ে দেয়, যন্তরমন্তরে কোনো ধরনের প্রতিবাদ কর্মসূচি করা যাবে না। পরিবর্তে রামলীলা ময়দান-সহ তিনটি বিকল্প জায়গা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। কেন যন্তরমন্তরে আন্দোলনের অনুমতি দেওয়া হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে আদালতে।

কেন্দ্রের হয়ে জবাব দিতে গিয়ে তুষার মেহতা জানান, গত ২০ জুলাই যন্তর মন্তরে মাত্র এক দিনের জন্য প্রতিবাদ কর্মসূচি করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আন্দোলনকারীরা নির্ধারিত সময়ের পরেও সেখান থেকে সরে যাননি। বরং দীর্ঘ সময় ধরে বিক্ষোভ চালিয়ে ওই জায়গা কার্যত দখল করে রেখেছিলেন তাঁরা। এমনকি সংসদ ভবন অভিমুখে মিছিলও করেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। তুষারের বক্তব্য, সংসদ ভবনকে অন্য কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। সেখানে মিছিল নিয়ে যাওয়ার অধিকার আন্দোলনকারীদের নেই। একই ভাবে সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখেও অভিযান করা যায় না। তাঁর মতে, প্রতিবাদের অধিকার থাকলেও তার একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা থাকা প্রয়োজন।

এ দিন আদালতে শুধু ব্যবসায়ীদের ক্ষতির অভিযোগই নয়, প্রতিবাদ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও একাধিক আবেদন শোনা হয়। আন্দোলনকারীদের বেআইনি ভাবে আটক, তাঁদের উপর পুলিশি অত্যাচার এবং বিক্ষোভের সময় সাংবাদিকদের মারধর ও আটক করার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি, দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা, ট্রেন পরিষেবায় বিধিনিষেধ আরোপ, ইন্টারনেট পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগও রয়েছে। মামলাগুলির প্রেক্ষিতে আদালত জানিয়েছে, ব্যবসায়ীদের ক্ষতির অভিযোগের নিষ্পত্তি করতে হলে প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজকদেরও মামলার পক্ষ করতে হবে। শুধু ব্যবসায়ী সংগঠনগুলির বক্তব্য শুনে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনোরকম সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। কারণ, তাঁদের বক্তব্য শোনার সুযোগ না দিয়ে এই বিষয়ে বিচার করা যায় না। সে কারণে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলিকে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল এবং প্রতিবাদী সংগঠনগুলিকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছে বেঞ্চ।

উল্লেখ্য, দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে জনজীবন ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ আগেও উঠেছিল। গত ১১ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছিল, কোনো অবস্থাতেই যেন বেআইনি ভাবে কাউকে আটক করা না হয়। সাধারণ মানুষের যাতায়াত অবাধ ও স্বাভাবিক রাখতে হবে। মেট্রো ও ট্রেন পরিষেবা সচল রাখতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রয়োজনীয়তা সাপেক্ষে ইন্টারনেট পরিষেবাও বন্ধ করা যাবে না বলে জানিয়েছিল আদালত। কিন্তু সে নির্দেশের পরেও প্রতিবাদীদের আটক এবং মেট্রো ও ট্রেন চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন একাধিক আবেদনকারী। এর পর বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ বিশেষ শুনানিতে বসেছিল। আদালতের নির্দেশ অমান্য করে প্রতিবাদ কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে প্রাথমিক ভাবে আদালত অবমাননার বিষয়টি বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করে বেঞ্চ।

কেন্দ্রীয় সরকার, দিল্লি পুলিশ এবং দিল্লি মেট্রো রেল কর্পোরেশনকে (ডিএমআরসি) নোটিস পাঠিয়ে হলফনামা জমা দিতে বলা হয়। একই সঙ্গে আদালতের নির্দেশ কতটা কার্যকর হয়েছে, তার বিস্তারিত রিপোর্টও চাওয়া হয়েছিল। আগের শুনানিতে সমস্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে বিক্ষোভ চলাকালীন সংগৃহীত সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্য সমস্ত ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছিল শীর্ষ আদালত। আন্দোলনকারীদের বেআইনি আটক, পুলিশি অত্যাচার এবং সাংবাদিকদের উপর হামলার অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ওই তথ্যপ্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রতিবাদের নামে দীর্ঘ সময় ধরে একই জায়গা আটকে রাখার বিরোধিতা অবশ্য এই প্রথম নয়। ২০২১ সালে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ)-এর বিরুদ্ধে দিল্লির শাহিনবাগে দীর্ঘ দিন ধরে চলা আন্দোলন সংক্রান্ত মামলার শুনানিতেও একই ধরনের পর্যবেক্ষণ করেছিল সুপ্রিম কোর্ট। প্রতিবাদের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েও আদালত জানিয়েছিল, যখন খুশি, যেখানে খুশি রাস্তা বা জনবহুল জায়গা আটকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া কাম্য নয়। সাধারণ মানুষের যাতায়াতের অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সে মামলায় আদালতের বক্তব্য ছিল, প্রতিবাদ করা যায়, কিন্তু তার জন্য জনজীবন অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্তব্ধ করে দেওয়া যায় না। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের অভিযোগের আইনি লড়াইও চলছে শীর্ষ আদালতে। গত ১৫ অক্টোবর কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী এবং বিরোধী শিবিরের আরও ১২ জন নেতা ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ দেওয়া এবং এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে আবেদন করেন। সে আবেদনের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন-সহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির কাছে জবাব চেয়েছে আদালত।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!