- দে । শ
- নভেম্বর ৩, ২০২৬
নজরে কৃষি ভবন চত্বরের শতাব্দীপ্রাচীন মসজিদ, ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে আদালতে সওয়াল সরকারের
নয়াদিল্লির সেন্ট্রাল ভিস্তা পুনর্নির্মাণ প্রকল্পকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক । এ বার কেন্দ্রের নজরে কৃষি ভবন চত্বরে অবস্থিত শতাব্দীপ্রাচীন কাদেমি মসজিদ। মসজিদটি সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে দিল্লি হাই কোর্টে সওয়াল করল নরেন্দ্র মোদী সরকার । আদালতে জমা দেওয়া একটি স্টেটাস রিপোর্টে কেন্দ্রের যুক্তি, কোনও সরকারি দফতরের চত্বরে স্থায়ী ধর্মীয় কাঠামোর উপস্থিতি দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় । রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পত্তির ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বজায় রাখা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে ।
কেন্দ্রের বক্তব্য, সেন্ট্রাল ভিস্তা পুনর্নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় কৃষি ভবন এবং সংলগ্ন শাস্ত্রী ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে । সেই কারণেই কৃষি ভবন চত্বর থেকে কাদেমি মসজিদ সরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন । সরকারের এই স্টেটাস রিপোর্টে প্রথম বার স্পষ্ট ভাবে জানানো হল যে, প্রকল্পের স্বার্থে মসজিদটি ওই স্থান থেকে সরানো হবে ।
তবে এই মসজিদের ইতিহাস প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি পুরনো । ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার কলকাতা থেকে দিল্লিতে ভারতের রাজধানী স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নতুন রাজধানীর জন্য জমি জরিপ শুরু হয় । সেই সময়কার সরকারি নথিতেই কাদেমি মসজিদের অস্তিত্বের উল্লেখ পাওয়া যায় । ১৯১২ সালে ব্রিটিশ স্থপতি এডউইন লুটিয়েন্স যখন নয়াদিল্লির নকশা তৈরি করছিলেন, তখনকার সরকারি মানচিত্রেও মসজিদটির অবস্থান চিহ্নিত ছিল । অর্থাৎ, ১৯৫৭ সালে কৃষি ভবন নির্মাণের অনেক আগে থেকেই ওই স্থানে মসজিদটি ছিল । শুধু তাই নয়, ১৯৭০ সালের দিল্লি সরকারি গেজেটেও কাদেমি মসজিদকে ‘তালিকাভুক্ত বৈধ ওয়াকফ সম্পত্তি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল ।
এই মসজিদ-সহ সেন্ট্রাল ভিস্তা প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, এমন ছ’টি মসজিদের সুরক্ষা চেয়ে ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে দিল্লি হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল দিল্লি ওয়াকফ বোর্ড । ওই ছ’টি মসজিদের মধ্যে কৃষি ভবনের খোলা চত্বরে অবস্থিত কাদেমি মসজিদও ছিল । সেই সময় কেন্দ্রের তরফে আদালতে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, মসজিদগুলির কোনও ক্ষতি করা হবে না । তৎকালীন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতে বলেছিলেন, ‘‘এই সম্পত্তিগুলির কিছুই হচ্ছে না । আমরা আপনাদের মহামান্য আদালতের সামনে উপস্থিত রয়েছি । এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং আমরা এখনও তা বাস্তবায়নের কাছাকাছি পৌঁছোইনি ।’’
কিন্তু এ বার কেন্দ্রের অবস্থানে স্পষ্ট বদল দেখা যাচ্ছে । মসজিদ সরানোর বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার যুক্তি তুলে ধরেছে সরকার । কেন্দ্রের আইনজীবী নিশান্ত গৌতমের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লি হাই কোর্টের বিচারপতি দয়াল বিকল্প জমি দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন । তাঁর প্রশ্ন, মসজিদ সরানো হলে বিকল্প স্থান দেওয়ার ক্ষেত্রে কী নিয়ম অনুসরণ করা হবে ? সরকার কি বলতে চাইছে, কোনও ধর্মীয় উপাসনালয়ের জন্যই বিকল্প জায়গা বরাদ্দ করা হবে না ?
বিচারপতি আরও বলেন, এ বিষয়ে নিশ্চয়ই নির্দিষ্ট কোনও নিয়ম থাকা প্রয়োজন, যেখানে বলা থাকবে যে সরকারি জমিতে কোনও সম্প্রদায়ের জন্য প্রার্থনার স্থান রাখা যাবে না । কেন্দ্রের অবস্থান ঠিক কী, তা আদালত বুঝতে আগ্রহী বলেও জানান তিনি । একই সঙ্গে সরকারি সম্পত্তিতে ধর্মীয় কাঠামো থাকা অননুমোদিত — কেন্দ্রের এই যুক্তির প্রকৃত তাৎপর্য এবং তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব কী হতে পারে, তা স্পষ্ট করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন বিচারপতি দয়াল ।
সব মিলিয়ে, সেন্ট্রাল ভিস্তা প্রকল্পের জেরে শতাব্দীপ্রাচীন কাদেমি মসজিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আইনি বিতর্ক তৈরি হয়েছে । এক দিকে সরকারি সম্পত্তির ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বজায় রাখার যুক্তি দিচ্ছে কেন্দ্র, অন্য দিকে মসজিদটির ঐতিহাসিক অস্তিত্ব, ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতি এবং বিকল্প জায়গা দেওয়ার প্রশ্ন উঠছে আদালতে । আগামী ২৩ নভেম্বর মামলার পরবর্তী শুনানি । সেই শুনানিতে কেন্দ্রের অবস্থান এবং মসজিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আদালত কী পর্যবেক্ষণ দেয়, সে দিকেই নজর থাকবে ।
❤ Support Us





