Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুলাই ১৪, ২০২৫

এশিয়ার প্রাচীনতম উদ্যান, আলিপুর চিড়িয়াখানায় বিরুদ্ধে বন্যপ্রাণী পাচারের অভিযোগ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
এশিয়ার প্রাচীনতম উদ্যান, আলিপুর চিড়িয়াখানায় বিরুদ্ধে বন্যপ্রাণী পাচারের অভিযোগ

১৭৫ বছর পুরনো, এশিয়ার প্রাচীনতম আলিপুর চিড়িয়াখানা ঘিরে উঠছে বিস্ফোরক অভিযোগ। সেখানে একাধিক বিপন্ন প্রজাতির পশুপাখি রহস্যজনকভাবে ‘নিখোঁজ’ হয়ে যাচ্ছে। উঠছে পাচার এবং বেআইনিভাবে বেসরকারি উদ্যানে স্থানান্তরের অভিযোগ। নাম জড়িয়েছে রাজ্যের বন দফতর, চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ এবং প্রভাবশালী মহলের একাংশের। সম্প্রতি, রাজ্যের চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষকে যে হিসেব পাঠিয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল চিড়িয়াখানায় প্রাণীর সংখ্যা ছিল ৩৫১। অথচ ৩১ মার্চ অর্থ্যাৎ এক দিন আগেই সংখ্যাটি ছিল ৬৭২। তাহলে রাতারাতি কোথায় গেল ৩২১টি প্রাণী? বন দফতর নিশ্চুপ। শুধু আলিপুরই নয়। রাজ্যে আগে যেখানে প্রায় ৬০টি চিড়িয়াখানা ছিল, এখন সেখানে মাত্র ৭টি অনুমোদিত চিড়িয়াখানা রয়েছে। বাকি সমস্ত চিড়িয়াখানা আপাতত বন্ধ। সেখানকার প্রাণীদের কপালে জুটেছে বিস্মৃতি। প্রশ্ন উঠছে, কোথায় গেল বিপুল সংখ্যক পশুপাখিরা? হিসেব নেই কোথাও।

বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষকদের একাংশের দাবি, ‘নিখোঁজ’ প্রাণীগুলির কালোবাজারি মূল্য অন্তত ১০ কোটি টাকা। আর সেই সূত্রেই উঠে আসছে পাচার চক্রের ছায়া। রাজ্যে যে সাতটি চিড়িয়াখানা এখনো সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত সেগুলি হল; আলিপুর চিড়িয়াখানা-কলকাতা, পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান চিড়িয়াখানা-দার্জিলিং, রমনাবাগান মিনি চিড়িয়াখানা-বর্ধমান, গড়চুমুক হরিণ উদ্যান-হাওড়া, হরিণালয়-নিউটাউন কলকাতা। এদিকে, শিলিগুড়ির বেঙ্গল সাফারি পার্ক বেসরকারি মালিকানাধীন। সেখানেই অবৈধভাবে প্রাণী স্থানান্তরের অভিযোগে উঠেছে। রাজ্যের বন প্রতিমন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদা স্বীকার করে নিয়েছেন যে, আলিপুর চিড়িয়াখানা থেকে কিছু পশু গিয়েছে সাফারি পার্কে। তবে সেই স্থানান্তরের বিনিময়ে ‘মোটা অঙ্কের লেনদেন’ হয়েছে বলে দাবি একাধিক সূত্রের।

পরিবেশপ্রেমী সংগঠন ‘স্বজন’ ইতিমধ্যেই আশঙ্কাজনক বিষয়টি কলকাতা হাইকোর্টের নজরে এনেছে, দায়ের হয়েছে জনস্বার্থ মামলা। সংগঠনের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, কেবল পশুপাখির অবৈধ চোরাচালান বা স্থানান্তর নয়, চিড়িয়াখানার মূল্যবান জমি বিক্রি করেও রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। আলিপুর চিড়িয়াখানার ভেতরে রামব্রহ্ম সান্যাল স্মৃতি অডিটোরিয়াম এবং পশু চিকিৎসালয় ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ। পরিবর্তে তৈরি হচ্ছে একটি বহুতল ভবন। স্বজন-সংশ্লিষ্ট ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা মহালয়া চট্টোপাধ্যায় প্রশ্ন তুলেছেন, ‘চিড়িয়াখানার জমি তো বনভূমি হিসেবে তালিকাভুক্ত। তার চরিত্র পরিবর্তন করে বহুতল কী করে গড়া যায়? কেন্দ্রীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী, এমন একটি প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব হাসপাতাল থাকা বাধ্যতামূলক। সেটিও তুলে দেওয়া হয়েছে।’

পরিবেশবিদ ও প্রাণী সংরক্ষণ পত্রিকা ‘স্যাংচুয়ারি এশিয়া’-র সম্পাদক বিট্টু সেহগেল বলেন, ‘গত কয়েক দশক ধরে আমরা দাবি করে আসছি ভারতের সমস্ত চিড়িয়াখানাকে তাদের পশুপাখির জন্ম ও মৃত্যুর হিসেব জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। সেটি এখনো হয়নি আর এ অস্বচ্ছতাই পাচারকারীদের জন্য সুযোগ করে দিচ্ছে।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিবেশকর্মী জানিয়েছেন, ‘আলিপুর চিড়িয়াখানার পশুপাখি পাচার শুধু জীবন্ত প্রাণীতে থেমে নেই, তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ টার্গেট করা হচ্ছে। নখ, দাঁত, চামড়া সবই চড়া দামে কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে। ইন্টারপোল বা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশনের নজরেও বিষয়টি এসেছে, তারা ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করছে।’ পরিবেশকর্মী নব দত্তর কথায় এই পশু নিখোঁজের ঘটনা দেশের জীববৈচিত্র্যের উপর বড়ো আঘাত। এর পেছনে পাচারকারীদের লাভের স্বার্থ স্পষ্ট, বন দপ্তরের স্বচ্ছতার অভাব এখানেই সবচেয়ে উদ্বেগের।’ আলিপুর চিড়িয়াখানার ‘গোলমেলে কর্মকাণ্ড’ নিয়ে আন্দোলনের পথে নেমেছেন সর্বভারতীয় বিজ্ঞান আন্দোলন মঞ্চের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী সৌরভ চক্রবর্তী। তাঁর অভিযোগ, ‘আলিপুর চিড়িয়াখানা এখন পাচারচক্রের আঁতুড়ঘর। এর আগে ২০১৬ সালে ২৫৭টি পশু নিখোঁজের অভিযোগ উঠেছিল, ২০২১-২২ সালে সংখ্যাটি ছিল ৫৮। এখন ৩২১! কাকতালীয় ভাবে জমিও বেসরকারিকরণ হচ্ছে। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, এটা আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের খেলা।’

কলকাতার বুকে ৪৫ একর সবুজ জমির উপর দাঁড়ানো আলিপুর চিড়িয়াখানা। অসংখ্য প্রাণী, বিলুপ্তপ্রায় প্রাণ, হাজার হাজার পরিযায়ী পাখির আশ্রয়স্থল। এখন সে আশ্রয়েই থাবা বসিয়েছে মানুষের লোভ, লালসা আর হিংস্রতা! প্রশ্নের পর প্রশ্ন আছে। কিন্তু, জবাব দেবে কে?


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!