- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- এপ্রিল ২১, ২০২৫
১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ, উপকৃত হবে ২৩ জেলা, জিন্দাল তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের শিলান্যাস করে বললেন মুখ্যমন্ত্রী
শালবনিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে জিন্দল গোষ্ঠীর ১৬ হাজার কোটি টাকার তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের শিলান্যাস সম্পন্ন হলো। ‘এই প্রকল্প শুধু শালবনির নয়, বাংলার ঐতিহাসিক প্রকল্প। গোটা বাংলার গর্ব। এর আগে রাজ্যে এমনটা কখনো হয়নি। ২৩টি জেলার মানুষ এতে উপকৃত হবেন। ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে’ – দাবি মুখ্যমন্ত্রীর ।
সিমেন্ট কারখানার পর এবার শালবনিতে আরও বড় বিনিয়োগের পথে জিন্দল গোষ্ঠী। প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার ব্যয়ে দুটি ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র গড়তে চলেছে সজ্জন জিন্দলের সংস্থা জেএসডব্লিউ এনার্জি। সোমবার দুপুরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে এই ঐতিহাসিক প্রকল্পের শিলান্যাস সম্পন্ন হয়। তাঁর সঙ্গে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জিন্দল গোষ্ঠীর কর্তকর্তা সজ্জন জিন্দল, পার্থ জিন্দল, প্রাক্তন ক্রিকেটার সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, ঘাটালের সাংসদ দেব , সাংসদ জুন মালিয়া ও জেলা প্রশাসনের শীর্ষকর্তারা। দুপুর সাড়ে ১২টার চপারে চেপে মমতা ব্যানার্জি রওনা দেন শালবনির উদ্দেশে। হেলিপ্যাডে তাঁকে স্বাগত জানান জেলা প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকরা ও সাংসদ জুন মালিয়া।
শালবনিতে পা রেখেই মুখ্যমন্ত্রী প্রথমে পরিদর্শন করেন জিন্দলদের কারখানা। এরপর তিনি প্রকল্পের শিলান্যাসে অংশ নেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে সজ্জন জিন্দল, পার্থ জিন্দল, প্রাক্তন ক্রিকেটার সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, ঘাটালের সাংসদ দেব , সাংসদ জুন মালিয়া প্রত্যেকেই বাংলার শিল্পোন্নয়নে এই প্রকল্পের তাৎপর্য তুলে ধরেন। জেএসডব্লিউ এনার্জি এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পটির বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে রাজ্য সরকার ২৫ বছরের জন্য কিনে নেবে, এই বিষয়ে রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থার সঙ্গে একটি চুক্তি ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। সংস্থার সিইও শরদ মহেন্দ্র জানান, ৪৮ মাসের মধ্যে ২ টি ইউনিটের নির্মাণ সম্পন্ন হবে। এই প্রকল্পের মধ্য দিয়ে ২০০০-এরও বেশি মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান হবে। এছাড়াও, স্থানীয় বাসিন্দাদের কর্মসংস্থানে প্রাধান্য দেওয়া হবে। স্মরণযোগ্য, এই জমি একসময় একটি বৃহৎ ইস্পাত কারখানার জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছিল বাম আমলে। ২০০৮ সালের ২ নভেম্বর মাওবাদী হামলার পর তা স্থগিত হয়ে যায়। সে দিন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য একটি কর্মসূচিতে যোগ দিতে শালবনি থেকে মেদিনীপুরে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে তাঁর কনভয়ে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণ ঘটায় মাওবাদীরা। ঘটনাচক্রে, সেই কনভয়ে শামিল ছিল কেন্দ্রীয় ইস্পাত মন্ত্রী রামবিলাস পাসওয়ানের গাড়িও। এর ফলে সন্ত্রাসের আবহে থেমে যায় শিল্প স্থাপনের প্রক্রিয়া। এবার সেই জমিতেই গড়ে উঠছে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, যার ফলে জমি সংক্রান্ত কোনও জটিলতা নেই বলেই জানায় সংস্থা। এবার সেই জমিতেই নবজন্ম পেল শিল্প সম্ভাবনা।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সজ্জন জিন্দল আশ্বাস দিয়েছেন, এই তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র পরিবেশবান্ধব হবে, কৃষকদের স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখা হবে। তিনি বলেন, ‘বাংলার উন্নতি মানে ভারতের উন্নতি। এই প্রকল্প রাজ্যের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। আমাদের লক্ষ্য, এই প্রকল্পে পরিবেশদূষণ যাতে না হয় তা নিশ্চিত করা। এই রাজ্যের উন্নতিতে আমরা অংশীদার হতে পেরে গর্বিত।’ তিনি আরো বলেন, ‘শালবনিতে গত ১০ বছরে অনেক উন্নতি হয়েছে। দেখে মনে হয়, এ রকমই তো হওয়া উচিত। এখানকার জমি কৃষকদের। তাই তাঁরা যাতে উপকৃত হন, সেটা আমাদের দেখতে হবে। দিদিও আমাকে সে কথা বার বার বলেছেন। এ রাজ্যে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। তা মাথায় রেখেই এই তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র।’ জিন্দল আরো বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের উন্নতিতে দিদি অনেক কাজ করছেন। পশ্চিমবঙ্গের উন্নতি হলে গোটা দেশের উন্নতি হবে। সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি।’
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এই প্রকল্প শুধু শালবনির নয়, বাংলার ঐতিহাসিক প্রকল্প। গোটা বাংলার গর্ব। এর আগে রাজ্যে এমনটা কখনো হয়নি। ২৩টি জেলার মানুষ এতে উপকৃত হবেন। ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।’ বিদ্যুৎ পরিকাঠামোয় ইতিমধ্যে ৭৬ হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। আগামী দিনে আরও ৪৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে রাজ্যে বছরে মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহার ৬০০ ইউনিট, যা সর্বভারতীয় গড়ের তুলনায় কম। তাই এই বিদ্যুৎ প্রকল্প রাজ্যের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ভিত্তি রচনা করবে। শালবনির তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের শিলান্যাস তো হল, আগামী দিনে শিল্পের ক্ষেত্রে বাংলা আরও কতটা উন্নতি করতে চলেছে তার একটা হিসেবও দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, রাজ্যে ৬ টি ইকোনমিক করিডর তৈরি হয়েছে শুধু পশ্চিম মেদিনীপুরেই ৩৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। বীরভূমের দেউচা-পাঁচামিতে বিশাল কয়লাখনি তৈরির কাজ চলছে, যা থেকে এক লক্ষ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি রঘুনাথপুরে ৫টি বৃহৎ সংস্থার বিনিয়োগ আসছে। ৩০ এপ্রিল দিঘায় জগন্নাথ মন্দিরের উদ্বোধন করবেন তিনি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমরা চাই না, নতুন প্রজন্ম কোনও সমস্যায় পড়ুক। তাদের জন্য আরো উন্নয়নের দরজা খুলতে হবে।’ বাম শাসনের সময়ের বিদ্যুৎ সংকটের প্রসঙ্গ টেনে মমতা বলেন, ‘আগে বলা হত লোডশেডিংয়ের সরকার। আর নেই দরকার। এখন ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পরিষেবা মিলছে। পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন যেখানে একসময় ২০০০ মেগাওয়াটে ছিল, তা এখন ১০,০০০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। আমাদের লক্ষ্য ১৮,০০০ মেগাওয়াট।’ এই প্রকল্প রাজ্যের ২৩টি জেলাকে উপকৃত করবে। ১৫ হাজার কর্মসংস্থান হবে। আগামী দিনে রাজ্যে আরো ২ তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হবে জিন্দলদের সাহায্যে।’ মমতা মনে করিয়ে দেন, গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিজিবিএস-এ ৯৯ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছিল। তার মধ্যে ১৩ লক্ষ কোটি টাকা ইতিমধ্যেই বিনিয়োগ হয়েছে। বিরোধীরা বারংবারই শিল্প ইস্যুতে মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল সরকারকে নিশানা করে আসছে। বিরোধীরা দাবি করে, তৃণমূল আমলে শুধু বড় বড় কথা বলা হয়, আদতে শিল্প হয়নি আর ভবিষ্যতেও হবে না। বিরোধীদের কটাক্ষ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমার সমালোচনা করতে পারেন, কিন্তু আমায় উপেক্ষা করতে পারবেন না। যারা বলেন, বাংলায় শিল্প হচ্ছে না – তারা চোখ মেলে দেখে যান। প্রচারে নয়, কাজেই আমাদের বিশ্বাস। বাংলার ঐক্যই আমাদের শক্তি, এই ঐতিহাসিক প্রকল্প সেই ঐক্যের সাক্ষর।’
এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলার শিল্পায়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরদের একাংশ। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সমালোচনা চলবে, কিন্তু উন্নয়নের পথে আমরা থামব না। বাংলার ভবিষ্যৎ আমরা গড়বই।’ অনুষ্ঠানে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘শালবনির এই প্রকল্প কেবল পশ্চিম মেদিনীপুর নয়, গোটা বাংলার উন্নয়নের প্রতীক হয়ে উঠবে।’ সাংসদ দেব বলেন, ‘যাঁরা বলেন বাংলায় শিল্প নেই, তাঁরা এসে দেখে যান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কীভাবে উন্নয়ন ঘটাচ্ছেন।’ শালবনিতে জিন্দল গোষ্ঠীর এই প্রকল্প কেবলমাত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেই নয়, কর্মসংস্থান, পরিকাঠামো উন্নয়ন ও শিল্প-পরিবেশ তৈরির দিক থেকেও রাজ্যের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পথে মাইলফলক হয়ে থাকবে – এমনটাই মত বিশ্লেষকদের। তবে এই প্রকল্পের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল পরিবেশ। শালবনি অঞ্চলের সংলগ্ন এলাকাগুলি জীববৈচিত্র্য ও বনসম্পদে সমৃদ্ধ। একাধিক পরিবেশবিদ ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন, কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প কীভাবে পরিবেশবান্ধব হতে পারে? যদিও জিন্দল গোষ্ঠী আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে দূষণ নিয়ন্ত্রণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, তবু দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রীর সফর ঘিরে আঁটসাঁট নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করা হয়েছে শালবনিতে। দফায় দফায় বৈঠক করছে, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা প্রশাসন। সোমবার রাতে মেদিনীপুর সার্কিট হাউসে মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন। মঙ্গলবার তিনি মেদিনীপুর কলেজ মাঠে সরকারি অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। সেখানে মুখ্যমন্ত্রীর গোয়ালতোড় সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট-সহ একাধিক নতুন প্রকল্পের উদ্বোধন করবার কথা রয়েছে।
❤ Support Us






