- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুলাই ১৭, ২০২৫
রাজ্যে নাবালিকা প্রসূতিদের হার বৃদ্ধি, উদ্বিগ্ন স্বাস্থ্য-প্রশাসন
প্রয়াত বাউল শিল্পী গোষ্ঠগোপাল দাসের “চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে, আমরা ভেবে করবো কী” গানটিতে একটি লাইন ছিল, “এগারো মাসে তিনটি সন্তান”। ঠিক তেমন না হলেও পশ্চিমবঙ্গের নাবালিকা প্রসূতির সংখ্যা ও মৃত্যু ঘিরে অনেকটা তেমন ছবিই ধরা পড়ছে। রাজ্যের স্বাস্থ্য কর্তারা সম্প্রতি একটি বৈঠক করেছিলেন এই নাবালিকা প্রসূতি ও তাঁদের মৃত্যু হার নিয়ে। তাতে চাঞ্চল্যকর তথ্য তাঁদের নজরে এসেছে। ওই বৈঠকে উঠে এসেছে যে রাজ্যের বহু জেলায় ১৯ বছর বয়সেই দ্বিতীয় সন্তান হচ্ছে। আর সেই সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যু হচ্ছে প্রসূতির। বেশি দিনের নয়, সম্প্রতি রাজ্যের প্রসূতি-মৃত্যুর পর্যালোচনা বৈঠকে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। এই তথ্য পেয়ে বিস্মিত স্বাস্থ্যকর্তারাও। তাঁদের পর্যবেক্ষণ, যে সময়ে ওই প্রসূতি গর্ভবতী হয়েছেন তখন তাঁর বয়স ছিল ১৮। প্রথম সন্তান হয়েছে তারও দু’বছর আগে। এই যখন পরিস্থিতি তখন খুব স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন এই ঘটনা ঘটছে কি ভাবে? রাজ্যে কন্যাশ্রীর টাকা কি তাহলে সঠিক ভাবে বন্টন হচ্ছে না? না কি মেয়েদের স্কুল ছুটের হার বাড়ছে? প্রশ্ন উঠছে স্থানীয় পঞ্চায়েত কর্তাদের কর্মপদ্ধতি নিয়ে।
এই ঘটনাটি মালদহের। তবে শুধু মালদহের এই ঘটনাই যে স্বাস্থ্য কর্তাদের বিস্মিত করেছে তা নয়। স্বাস্থ্য ভবনে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে প্রতি বছর রাজ্যে যত প্রসূতির মৃত্যু হচ্ছে, তাঁদের অন্তত ১৪ শতাংশই নাবালিকা। ২০২৩-২০২৪ আর্থিক বছরে রাজ্যে যত প্রসব হয়েছে তার মধ্যে নাবালিকা প্রসূতি ছিল ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ। গত আর্থিক বছর অর্থাৎ ২০২৪-২০২৫ সালে এই সংখ্যাটা ছিল ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ। স্বাস্থ্যকর্তাদের বক্তব্য, “দুই শতাংশ হার কমলেও, বিষয়টি এখনও উদ্বেগের। মুর্শিদাবাদ, মালদহ, পশ্চিম মেদিনীপুর সহ কয়েকটি জেলাকে উদ্বেগজনক বলে চিহ্নিতও করা হয়েছে।”
স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানা গেছে, নাবালিকা প্রসূতির সংখ্যা সব থেকে বেশি মুর্শিদাবাদ, রামপুরহাট, বীরভূম জেলায়। এ ছাড়াও উদ্বেগের তালিকায় রয়েছে উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মালদহ, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, বাঁকুড়া, বিষ্ণুপুর, বসিরহাট, পশ্চিম মেদিনীপুর, নন্দীগ্রাম, নদিয়া, পুরুলিয়া ও পূর্ব বর্ধমান। স্বাস্থ্যকর্তারা নির্দেশ দিয়েছেন, ওই সমস্ত স্বাস্থ্য জেলা কিংবা সংলগ্ন মেডিক্যাল কলেজগুলিতে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, নাবালিকা কোনও প্রসূতি ভর্তি হলে সেই তথ্য তৎক্ষণাৎ স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে সেই তথ্য দ্রুত জানাতে। কিন্তু তাতে খুব উপকার হচ্ছে বলে জানাচ্ছেন বিভিন্ন জেলা স্বাস্থ্য আধিকারিকেরা। তাঁদের দাবি, “আগে গোড়ার গলদ দূর করতে হবে। অর্থাৎ নাবালিকা বিয়ে রুখতে হবে।”
মালদা জেলায় ক্রমেই বাড়ছে নাবালিকা মায়ের মৃত্যু সংখ্যা ৷ বাড়ছে নাবালিকা গর্ভবতীর সংখ্যাও ৷ স্বাস্থ্য দফতরের সমীক্ষাতেই এই তথ্য মিলছে ৷ এই নিয়ে উদ্বিগ্ন প্রশাসন ৷ প্রশ্ন উঠেছে কন্যাশ্রী প্রকল্পের ভূমিকা নিয়েও ৷ নাবালিকা বিয়ে বন্ধ করতে প্রশাসনের কড়া উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সবাই ৷
জেলা স্বাস্থ্য দফতরের তথ্য বলছে, ২০২১-২২ বর্ষে মালদা জেলায় নাবালিকা মায়ের মৃত্যুর হার ছিল মোট মৃত্যুর ২৩.৬১ শতাংশ ৷ ২০২৩-২৪ বর্ষে সেই হার বেড়ে দাঁড়ায় ২৭.১৪ শতাংশে ৷ আর চলতি বছরের প্রথম দু’টি মাসে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি মায়ের মৃত্যুর হার প্রায় ৫৫ শতাংশে পৌছেছে ৷ এর মধ্যে সিংহভাগের বয়স ১৮ বছর হয়নি বলেই স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানা যাচ্ছে ৷ বছর শেষে এই পরিসংখ্যান কোথায় গিয়ে ঠেকতে পারে, তা চিন্তা করে এখন থেকেই আতঙ্কিত স্বাস্থ্যকর্তারা ৷
রাজ্যের মহিলা ও শিশু উন্নয়ন এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী শশী পাঁজার দাবি, “নাবালিকা বিয়ে রুখতে উদ্যোগের ঘাটতি নেই। বর্তমান আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে অনেক পরিবারেই তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। সেখানে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধার কথা জানিয়ে, সচেতনতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।” কিন্তু এত কিছুর পরেও নাবালিকা বিয়ে যে একেবারে বন্ধ করা যায়নি, তার প্রমাণ মিলছে স্বাস্থ্য দফতরের এই পরিসংখ্যানে।
নাবালক কোনও দম্পতি পাওয়া গেলে গর্ভধারণ সম্পর্কে তাদের সচেতন করার মূল দায়িত্ব আশাকর্মীদের, সেটা হচ্ছে কতটা সেই প্রশ্নও উঠছে স্বাস্থ্য কর্তাদের কথায়। কারণ, নিজের এলাকায় কোন নাবালিকার বিয়ে হয়েছে তা সহজে জানতে পারেন ওই আশাকর্মীরাই। ওই কর্তার কথায়, “বিভিন্ন কারণে আশাকর্মীদের বড় অংশ ক্ষুব্ধ। তাতে কাজে অসুবিধা হচ্ছে। এর পরে, তাঁরা বোঝালেও যে সর্বত্র ফল মিলছে তেমন নয়। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দরকার।” রাজ্যে প্রসূতি মৃত্যুর নেপথ্যে ‘সিজ়ার’-ও একটি বড় কারণ বলে দাবি স্বাস্থ্যকর্তাদের। স্বাস্থ্য ভবন সূত্রের খবর, গত আথির্ক বছরে রাজ্যে প্রায় ১৪ লক্ষ প্রসব হয়েছে। তার মধ্যে ৯০০ জন প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে, যাদের ৭৬ শতাংশের ‘সিজ়ার’ হয়েছিল।
সূত্রের খবর, প্রসূতি-মৃত্যুর অডিটে স্বাস্থ্যকর্তাদের পর্যবেক্ষণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সিনিয়র চিকিৎসকেরা ‘সিজ়ারে’র সময় তো বটেই, পরবর্তী সময়েও উপস্থিত থাকছেন না। ‘সিজ়ার’ থেকে শুরু করে পরবর্তী কোনও সমস্যাতেও ‘কল-বুক’ পাঠানো হলে যে চিকিৎসক এসে প্রসূতিকে দেখছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই চিকিৎসক-পড়ুয়া বা সিনিয়র রেসিডেন্ট। প্রসূতি-মৃত্যুর অডিটে চিকিৎসার যে কাগজপত্র অডিট কমিটির কাছে আসছে, তার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে সিনিয়র চিকিৎসকদের নিজেদের হাতে লেখা কোনও নোট নেই। বদলে সব পরামর্শই এসেছে ফোনে।
❤ Support Us






