Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুলাই ২৮, ২০২৫

‘অপারেশন সিঁদুর’ বিতর্কে সারাদিন উত্তাল সংসদ। বিরোধীদের প্রশ্নবাণে বিদ্ধ কেন্দ্র, পাল্টা আক্রমণে রাজনাথ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘অপারেশন সিঁদুর’ বিতর্কে সারাদিন উত্তাল সংসদ। বিরোধীদের প্রশ্নবাণে বিদ্ধ কেন্দ্র, পাল্টা আক্রমণে রাজনাথ

সোমবার লোকসভার অধিবেশন শুরু হতেই বিরোধীদের হইহট্টগোলে মুখর হয়ে উঠেছিল সংসদ ভবন। নির্ধারিত ছিল দুপুর ১২টায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহের ভাষণ দিয়ে ‘অপারেশন সিঁদুর’ নিয়ে ১৬ ঘণ্টার আলোচনা শুরু হবে। কিন্তু বিরোধী সাংসদদের লাগাতার বিক্ষোভে সবটাই দেরিতে শুরু হয়। স্পিকার ওম বিড়লা প্রশ্ন তোলেন, ‘বিরোধীরা আদৌ কি আলোচনায় আগ্রহী?’ কিন্তু তাতে বিশেষ লাভ হয়নি। লাগাতার চিৎকার-চ্যাঁচামেচিতে অধিবেশন ২ টো পর্যন্ত মুলতুবি হয়ে যায়। অথচ, এর আগেই সপ্তাহখানেক ধরে বিরোধীরা দাবি জানিয়ে আসছিলেন অভিযান নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ আলোচনার। সেই আলোচনার শুরুতেই এমন হট্টগোল অনেকে রাজনৈতিক দ্বিচারিতা হিসেবেও দেখছেন। অবশেষে সব বাধা কাটিয়ে দুপুর ২টোর ঠিক পরে শুরু হয় বহু প্রতীক্ষিত আলোচনা।

আলোচনার শুরুতেই প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাথনাথ সিং বলেন, পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার পরপরই ভারতীয় সেনা মাত্র ২২ মিনিটের একটি সফল অভিযানে পাকিস্তানে থাকা নয়টি জঙ্গিঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেয়। অভিযানে মৃত্যু হয় শতাধিক জঙ্গি, প্রশিক্ষক ও লজিস্টিক কর্মীর। জয়েশ-ই-মহম্মদ, লস্কর-ই-তৈয়বা এবং হিজবুল মুজাহিদিনের মতো সংগঠনের ঘাঁটিগুলি ধ্বংস করা হয়। রাজনাথ সিংহের বক্তব্য ছিল সুসংহত, কড়া এবং বার্তাবাহী। তিনি স্পষ্ট করে দেন, ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে নয়, আত্মরক্ষার খাতিরেই অভিযান চালিয়েছিল সেনা।তিনি বলেন, গত ১০ মে রাতে দেড়টা নাগাদ পাকিস্তান ভারতীয় সীমান্ত লক্ষ্য করে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট ছোড়ে। ভারত সেই হামলা রুখতে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে। এরপর ভারতীয় বায়ুসেনা পাল্টা জবাবে পাকিস্তানের একাধিক বিমানঘাঁটিতে বোমাবর্ষণ করে, যার পরই ইসলামাবাদ আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দেয়। যে মুহূর্তে লক্ষ্যপূরণ হয়েছে, সেই মুহূর্তেই থেমে গেছে অপারেশন সিঁদুর। রাজনাথ স্পষ্ট জানান, অপারেশন সিঁদুর কোনো আন্তর্জাতিক চাপে থেমে যায়নি।

রাজনাথের এ দাবি অবশ্য মানতে নারাজ বিরোধীরা। কংগ্রেস সাংসদ গৌরব গগৈ প্রশ্ন তোলেন, ‘অপারেশন সফল বলছেন। তাহলে এখনো পহেলগাঁও হামলার মূল ৫ জঙ্গিকে ধরা যায় নি?’ তাঁর যুক্তি, অভিযানে নিহত জঙ্গিদের মধ্যে কারা পহেলগাঁও হামলার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল, সেটা সরকার জানাতে ব্যর্থ। তিনি আরো অভিযোগ তোলেন, ‘আপনারা নিজেই বলছেন, পাকিস্তান আবার হামলা চালাতে পারে। তাহলে হঠাৎ করে কেন থামানো হল অপারেশন? কেন পাক অধিকৃত কাশ্মীর ছিনিয়ে আনার চেষ্টা করা হল না?’ পাশাপাশি, তিনি রাফাল যুদ্ধবিমান ধ্বংসের প্রসঙ্গ তুলে সরাসরি জবাব চান, ‘বিমানের ক্ষতির দায় কে নেবে?’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, তিনি অন্তত ২৬ বার বলেছেন, ভারত-পাক যুদ্ধবিরতি তাঁর মধ্যস্থতায় সম্ভব হয়েছে। তৃণমূলের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তোলেন, ‘জঙ্গিরা ভারতে ঢুকে মানুষ খুন করল, এবং নির্বিঘ্নে ফিরে গেল! বিএসএফ ও সিআরপিএফ কী করছিল? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন কোথায় ছিলেন?’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, সেনার সাহসিকতা নিয়ে দেশের ১২৫ কোটি মানুষ গর্বিত।

রাজনাথ সিং বিরোধীদের তীব্র আক্রমণ করে বলেন, ‘এ ধরনের প্রশ্ন জাতীয় স্বার্থ প্রতিফলিত করে না। বিরোধীরা জানতে চায়, ভারতের কতটা ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু শত্রু পক্ষের ক্ষয়ক্ষতির খোঁজ কেউ নেয় না। অপারেশন সফল, সেনাদের সাহসিকতা প্রশ্নাতীত। পরীক্ষায় কেউ ভালো নম্বর পেলে কেউ জিজ্ঞেস করে না, কলম ভেঙে গিয়েছিল কিনা। যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে কি না, সেটা আসল প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, মিশন সফল হয়েছে কি না—উত্তর, হ্যাঁ।’ তিনি পুনরায় বিরোধীদের মনে করিয়ে দেন, ‘যুদ্ধ থেমেছে ভারতের রাজনৈতিক ও সেনা লক্ষ্য পূরণ হওয়ায়, বাইরের কোনো শক্তির চাপে নয়। পাকিস্তান ফের আগ্রাসন দেখালে ভারত আবার শক্ত জবাব দেবে। অপারেশন সিঁদুরের মাধ্যমে বিশ্বের কাছে ভারতের সামরিক ক্ষমতার বার্তা পৌঁছে গিয়েছে।’ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রাজীবরঞ্জন সিংও অভিযোগ করেন, বিরোধীরা শুধু ক্ষয়ক্ষতির প্রশ্ন করছেন, কিন্তু সেনার বীরত্ব বা পাকিস্তানের আগ্রাসনের প্রসঙ্গ একবারও তুলছেন না। তিনি বলেন, ‘আপনারা ভোটের রাজনীতি চালিয়ে যান, প্রধানমন্ত্রী দেশের কল্যাণে কাজ করে যাবেন।’

সপ্তাহের শুরুতেই প্রবল বিতর্ক তৈরি হয়েছিল কংগ্রেস নেতা পি চিদাম্বরমের একটি মন্তব্য ঘিরে। সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘জঙ্গিরা পাকিস্তান থেকে এসেছে, এই দাবির কোনও প্রমাণ নেই। ওরা ভারতের নাগরিকও হতে পারে।‘ বিজেপি এ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে চিদাম্বরমের দেশভক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। পরে অবশ্য চিদাম্বরম দাবি করেন, তাঁর বক্তব্য বিকৃত করে প্রচার করা হয়েছে। কংগ্রেসের তরফেও আজ সংসদে গৌরব গগৈ স্পষ্ট করে বলেন, কংগ্রেস বিশ্বাস করে জঙ্গিরা পাকিস্তান থেকেই এসেছিল, চিদাম্বরমের মন্তব্য বিকৃত করা হয়েছে। আলোচনার এক পর্যায়ে নির্দল সাংসদ পাপ্পু যাদবও প্রশ্ন তোলেন, ‘জঙ্গিরা কী ভাবে এল, কেন তাদের ধরা গেল না?’ সমাজবাদী পার্টির সাংসদ রামশঙ্কর রাজভর বলেন, ‘দেশবাসী অপারেশন সিঁদুর নয়, অপারেশন তন্দুর চেয়েছিলেন। যারা হামলা চালিয়েছে, তাদের একেবারে ছাই করে দেওয়ার দাবি ছিল জনতার। সরকার ১৭ দিন কেন অপেক্ষা করল, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।’ প্রতিবেদণ করা পর্যন্ত, লোকসভায় এখনো ‘অপারেশণ সিঁদুর’ ঘিরে বিতর্ক চলছে।

সব মিলিয়ে আজ সংসদে চলমান প্রবল বিতর্ক স্পষ্ট করে দিয়েছে, কেন্দ্র সরকার এবং বিরোধীদের মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা কৌশল ও প্রকাশ নিয়ে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে। সরকার মনে করছে, সেনা ও সরকারের হাতে পুরো বিষয়টি ছেড়ে দেওয়া উচিৎ, জনতার আস্থা রাখা উচিত। অন্যদিকে বিরোধীরা মনে করছে, মানুষের করের টাকায় চালিত যুদ্ধ বা প্রতিরক্ষা অপারেশনের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এবং ব্যাখ্যা পাওয়া দেশের নাগরিকদের অধিকার। সরকার বলছে অভিযান সফল, পাকিস্তান হার মেনেছে। বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছে, তার প্রমাণ কোথায়? অপারেশন শুরু হলেও, পহেলগাঁও হামলাকারীরা এখনও অধরাই কেন?

 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!