- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুন ২৭, ২০২৫
হাতির মুখে রং-তুলি, দেওয়ালচিত্রে সহাবস্থানের স্বপ্ন! ঝাড়গ্রামের গ্রামে গ্রামে ‘খোয়াবগাঁ’-এর দরদী পাঠ
খাদ্যের খোঁজে জঙ্গল ছেড়ে গ্রামের পানে এগিয়ে আসছে হাতির পাল। ফসলের জমি তছনছ, বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিচ্ছে নির্বিচারে। কোথাও মানুষ হাতির তাড়া খেয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন, আবার কোথাও উল্টো ছবিও দেখা যাচ্ছে। ঝাড়গ্রামে ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে মানুষ-হাতি সহাবস্থানের সমীকরণ। এই দহনে জ্বলছে শুধু দুই পক্ষই — মানুষ ও প্রকৃতি। এমন এক দুর্বিষহ বাস্তবতায় যে বার্তাটি প্রয়োজন ছিল সহনশীলতার, সহাবস্থানের, তা এসে পৌঁছল চিত্রকলার ভাষায়। উদ্বেগের এই আবহে অভিনব এক পদক্ষেপ নিয়েছে কলকাতার ‘চলচ্চিত্র একাডেমি’। গ্রামবাসীর মন বুঝে, ভাষা না বলে, ছবি আঁকেই বোঝানোর চেষ্টা করছেন তাঁরা — ‘হাতিকে উত্ত্যক্ত নয়, সহনশীলতা হোক সমাধান’। তাঁরা বুঝেছেন, সরকারি মিটিং বা সচেতনতা শিবির যতই হোক না কেন, একটি আঁকা হাতির মুখ কিংবা একটি ছোট্ট ছেলের হাতে তুলি হয়তো অনেক বেশি গভীরভাবে ছুঁয়ে যেতে পারে গ্রামের মানুষের মন। লালবাজার থেকে শুরু, আজ কোণেদোবা, ডোরখুলি, সোহাবাসা ও জোরাখালি — গ্রামের পর গ্রাম রঙে রঙে বলছে, ‘বন্যপ্রাণকে আঘাত নয়, সহানুভূতি দাও।’
২০১৮ সাল থেকে ঝাড়গ্রামে ঘাঁটি গেড়েছেন শিল্পী মৃণাল মণ্ডল। কলকাতার গভর্নমেন্ট আর্টস কলেজের প্রাক্তনী তিনি। তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল গ্রামবাসীদের জীবনে রঙ ভড়িয়ে তোলা। আক্ষরিক অর্থেই গ্রামের প্রতিটি কাঁচামাটির বাড়ির দেওয়াল হয়ে উঠল এক-একটা সজল ছবির ক্যানভাস। শিশুদের হাতে তুলি, স্থানীয় মানুষের চোখে নতুন স্বপ্ন। মৃণাল মণ্ডলের কথায়, ‘সরকার চাইলে করিডর বানাতে পারে, খাদ্যের জোগান দিতে পারে। কিন্তু শিল্পী হিসেবে আমাদের কাজ মন ছোঁয়া — যাতে গ্রামবাসী হাতিকে শত্রু না ভাবে, সহনুভূতির চোখে দেখে।’ প্রথমে লালবাজার। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মৃণালবাবু ও তাঁর দল গ্রামটিকে রূপ দেন এক শিল্প-গ্রামে। সাহিত্যিক শিবাজি বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রামের নতুন নাম দেন ‘খোয়াবগাঁ’। স্বপ্নের গ্রাম। তার পর একে একে কোণেদোবা, ডোরখুলি, সোহাবাসা ও জোরাখালি — সবকটিই এখন এই সচেতনতা অভিযানের অংশ। গ্রামজুড়ে বাড়ির দেওয়াল হয়ে উঠেছে জীবন্ত সজীব ক্যানভাস। রঙের বাহারে মোড়া দেওয়ালজুড়ে ফুটে উঠল গ্রামীণ জীবন, উৎসব, পশুপাখি, সচেতনতার বার্তা। কোথাও হাতির মুখ, কোথাও ছোট ছেলেমেয়েরা রঙ তুলিতে তুলে ধরছে — ‘হাতির পথে বাঁধা নয়’, ‘দূরত্বে থাকুন, বন্ধুত্বে এগোন’, ‘বনের অতিথি যেন ফিরে যায় নিরাপদে’।
শুধু ছবি আঁকাই নয়, চালচিত্র একাডেমি গ্রামের মানুষদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে বিভিন্ন হস্তশিল্পে — যেমন, বাঁশ কাঠ দিয়ে মুখোশ বানানো (‘কাটুম-কুটুম’), ইকো প্রিন্টিং, মাটির পুতুল তৈরি, কাঁথা সেলাই, সেলাই মেশিনে কাজ ইত্যাদি। কেউ শিখেছে গাছ থেকে ভেষজ রং তৈরি, কেউ আবার শুরু করেছে মাছ ধরা বা কাজুবাদাম চাষ। ক্রমে গড়ে উঠেছে একটি আত্মনির্ভরশীল সমাজ। গ্রামে শুরু হয়েছে সাক্ষরতা অভিযানও। স্কুল না থাকলেও পড়াশোনার প্রতি উৎসাহ তৈরি হয়েছে। আর সেই সঙ্গে এসেছে স্বপ্ন — নিজের পায়ে দাঁড়ানোর, নিজের গ্রামকে গড়ে তোলার। গ্রামে কর্মশালার জন্য এসেছিলেন মার্কিন শিল্পী ট্রেসি-ও। শিশুদের উৎসাহ দেখে তিনি মুগ্ধ। পটচিত্র, আলপনা, এমনকি থ্রিডি আর্ট — নানা বিষয়েই হয়েছে প্রশিক্ষণ। এখন ‘খোয়াবগাঁ’ এক আদর্শ শিল্পগ্রাম — পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র। ছবির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বহু মানুষ ছুটে আসছেন এই স্বপ্নপল্লিতে। তবে গ্রামে ঢোকার নিয়ম কড়া — শুধু দেখতে চাইলে, সাধারণ ছবি তুলতে হলে নির্দিষ্ট ফি দিতে হয়। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ছবি তুললে, তার খরচ আরো বেশি। গ্রামবাসীরাই এসব নিয়ম ঠিক করেছেন, কারণ এই অর্থই ব্যবহার হয় গ্রামের উন্নয়নের কাজে।
প্রকল্পের দায়িত্বভার সামলাচ্ছেন শিল্পী কৌশ্তভ চক্রবর্তী। স্থানীয় পড়ুয়াদের নিয়ে রীতিমতো কর্মশালা চলছে — এক দিকে উপজাতি শিল্পচর্চা, অন্য দিকে বর্তমান সংকটের কথাও। মৃণালবাবু বলেন, ‘দেওয়ালচিত্র আদিম শিল্পমাধ্যম, কিন্তু এখনও সমান প্রাসঙ্গিক। মানুষ ছবিতে গল্প খোঁজে, বার্তা পায়। আশা করছি, এই ছবিগুলোর মধ্যে দিয়ে ভবিষ্যতের প্রজন্ম শিখবে সহানুভূতির পাঠ।’ জঙ্গল সঙ্কুচিত হচ্ছে, হাতিদের খাবার মিলছে না — এ কথা সরকার জানে। কিন্তু প্রতিরোধ নয়, সহাবস্থানই হতে পারে একমাত্র পথ। আর তার সুর বেঁধে দিচ্ছে গ্রামবাংলার দেওয়ালগুলো।
এ যেন এক শিল্পভিত্তিক গণসচেতনতামূলক আন্দোলন, যেখানে দেওয়াল হয়ে উঠেছে পাঠ্যবই। আদিবাসী শিল্প ও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করে এই বার্তা আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। দেওয়ালের ছবিগুলি শুধু শোভা নয়, তারা সতর্কতাও — যেন আগাম বিপদের সংকেত, আবার ভবিষ্যতের জন্য এক শান্তির দিশাও। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় — কেন এমন পরিস্থিতির জন্ম? বনাঞ্চল নিধন, খনির আগ্রাসন, বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য ভেঙে যাওয়া — এগুলির বিরুদ্ধে কি যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার? শুধু শিল্পীর হাতে কি সমাধান তুলে দেওয়া যায়? প্রকৃতি আর তার সন্তানদের বাঁচানোর প্রশ্নে রাষ্ট্রযন্ত্র যখন নিজের দায় ঝেড়ে ফেলতে ব্যস্ত, তখন কিছু সংবেদনশীল মানুষ তাঁদের মেধা ও সৃষ্টিশীলতা দিয়ে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা রচনা করছেন — এটাই আশার আলো, ভবিস্যতের বিকল্প দিশা। শিল্প একাই সমস্যার সমাধান নয় ঠিকই, কিন্তু সহানুভূতির প্রথম পাঠটি সে-ই দিতে পারে। ডিজিটাল জমানায়, যখন সহিষ্ণুতা ক্রমেই বিলুপ্তির পথে, তখন দেওয়ালে আঁকা হাতির একটি শান্ত মুখ হয়তো বলে দিতে পারে — শক্তি নয়, মমতাই বৃহৎ। রাষ্ট্র ও সমাজের তরফে এই শিল্প-আন্দোলনকে সমর্থন ও প্রসারিত করার জন্য এখনই পদক্ষেপ নেওয়া উচিৎ। কারণ সহাবস্থান শুধুই নীতিকথা নয়, তা ভবিষ্যতে মানুষের টিকে থাকার জন্যও একমাত্র পথ।
❤ Support Us






