- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ২৯, ২০২৫
হিমাচল প্রদেশে বৃষ্টির তাণ্ডব অব্যাহত, হরপা বানে নিহত ৩, নিখোঁজ ১। বন্ধ চণ্ডীগড়–মানালি প্রধান সড়ক, ওড়িষাতেও বানবাসী বহু গ্রাম
হিমাচল প্রদেশের মান্ডি শহরে সোমবার গভীর রাতে প্রবল বৃষ্টিপাতের জেরে অব্যহত ভয়াবহ হরপা বান। প্রবল জলের তোড়ে ভেসে গেছে বহু ঘরবাড়ি, গাড়ি, জনপদ। প্রকৃতির রোষে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, নিখোঁজ ১। ধস ও জলবন্দির কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছে চণ্ডীগড়–মানালি প্রধান সরক। থমকে রয়েছে জনজীবন, বিচ্ছিন্ন বহু এলাকা।
হিমাচল সরকারের দাবি, এদিন গভীর রাতের যখন দুর্যোগ নামে, তখন শহরের অধিকাংশ মানুষ ঘুমোচ্ছিলেন। আচমকা পাহাড়ি ঝরনা থেকে নেমে আসে উন্মত্ত জলস্রোত। জেল রোড অঞ্চলে বহু ঘরের ভিতরে আচমকা ঢুকে পড়ে বন্যার জল। তলিয়ে যায় মান্ডি বাস স্ট্যান্ড, জল ঢুকে পড়ে আঞ্চলিক হাসপাতালে যাওয়ার রাস্তাতেও। একাধিক এলাকায় ধস নামে। ভিক্টোরিয়া ব্রিজ, ডিএভি স্কুল সংলগ্ন অঞ্চল, এমনকি শহরের ব্যস্ততম জায়গাগুলিতেও ধসের খবর মিলেছে। পুলিশ সূত্রে জানা যাচ্ছে, বন্যার কবলে পড়ে বহু প্রায় ২৫টিরও বেশি গাড়ি জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে, বহু গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শহরের একটা বড়ো অংশ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মান্ডি জেলার ডেপুটি কমিশনার অপূর্ব দেবগন জানিয়েছেন, ‘রাত থেকেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তৎপর আছে বিপর্যয় মোকাবিলা দল। উদ্ধার অভিযান চলছে। এখনো কয়েকজন ব্যক্তি ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।’
এদিকে চণ্ডীগড়–মানালি জাতীয় সড়কের একাধিক জায়গায় ধসের কারণে পথ বন্ধ। মান্ডি জেলার প্যান্ডোহের ৪ মাইল, ৯ মাইল ও দ্বারায় রাস্তায় ধস নেমেছে। বিপুল যানজটের সৃষ্টি হয়েছে হাইওয়ের দুই পাশে। শতাধিক গাড়ি আটকে পড়েছে পাহাড়ের গায়ে। বহু পর্যটক ও স্থানীয় মানুষ গাড়িতে আটকে পড়েছেন। হোটেল বা বিশ্রামের জায়গা না থাকায় অনেকেই গাড়ির ভিতরেই রাত কাটাতে বাধ্য হয়েছেন। হিমাচলের মুখ্যমন্ত্রী সুকভিন্দর সিং সুখু জানিয়েছেন, ‘আমি নিজে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা দ্রুততর করার নির্দেশ দিয়েছি জেলা প্রশাসনকে।’ বিরোধী দলনেতা জয় রাম ঠাকুর ঘটনাস্থল জেল রোডে গিয়েছিলেন। ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন, ক্ষোভ ও অসহায়তা শোনেন।
হিমাচল প্রদেশে চলতি বর্ষা মৌসুমে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। ২০ জুন থেকে ২৯ জুলাইয়ের মধ্যে রাজ্যে মোট ১৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে বর্ষাজনিত দুর্ঘটনায়। নিখোঁজ ৩৫ জন। ১,৩১৬টি বাড়িঘর সম্পূর্ণ বা আংশিক ভাবে ধসে পড়েছে। রাজ্যে ইতিমধ্যেই ৪২টি হরপা বান, ২৫টি মেঘভাঙা প্রবল বৃষ্টি এবং ৩২টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। রাজ্য প্রশাসনের হিসাব বলছে, আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫২৩.১১ কোটি টাকায়। স্থানীয় আবহাওয়া দফতর আগাম জানিয়েছিল, মান্ডি, কুলু, সিমলা ও কাংড়া জেলায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ৪ জেলায় ‘কমলা সতর্কতা’ জারি হয়েছিল। সেই সতর্কতা যে একেবারে যথাযথ ছিল, তা বুঝিয়ে দিল সোমবার রাতের তাণ্ডব। রবিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত ধর্মশালায় ৩৫ মিমি, মালরাওনে ২৬.৪ মিমি, কাংড়ায় ২৬ মিমি, মানালিতে ১১ মিমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টিতে কেঁপে উঠেছে সিমলা, মুরারি দেবী সহ একাধিক এলাকা। রাজ্য জুড়ে প্রায় ২০০টিরও বেশি রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে একাধিক এলাকা। বন্ধ রয়েছে অন্তত ৭৫টি বিদ্যুৎ ট্রান্সফর্মার। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৯৭টি জল সরবরাহ প্রকল্প। মান্ডি জেলাতেই অন্তত ১৩১টি রাস্তা এখনও বন্ধ।
অন্যদিকে, ওড়িশার জাজপুরে চলছে বন্যার দাপট: বাইতারিণীর জলস্ফীতিতে প্লাবিত ৪টি গ্রাম। জমে থাকা মেঘ, টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের জোড়া চাপে বিপর্যস্ত ওড়িশার জাজপুর জেলা। বৈতরণী নদীর জল বিপদসীমার উপরে উঠতেই রীতিমতো বানভাসি দশা জেলার ৪টি গ্রামে। প্রশাসনের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ৬০০ জন বাসিন্দা, জলবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ১৫০টি পরিবার। প্রশাসন সূত্রে খবর, গত তিন দিনের টানা বর্ষণে বৈতরণী নদীর জলস্তর দ্রুত বেড়ে যায়। শনিবার বিকেলে নদী আখুয়াপাড়া পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করে। সাধারণত এই অঞ্চলের বিপদসীমা ধরা হয় ১৮.৩৩ মিটার। শনিবার সন্ধ্যায় তা ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় ১৮.৮ মিটারে। জেলা প্রশাসনের তরফে সময় থাকতে গ্রামবাসীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। ইতিমধ্যে বানবাসিদের জন্য অস্থায়ী শিবির খুলে খাদ্য, পানীয় জল ও ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। জাজপুরের অতিরিক্ত জেলা শাসক শিবানন্দ স্বাইন জানিয়েছেন, ‘চারটি গ্রামে প্রায় ৬০০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আমরা তাঁদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে এসেছি। পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে। জলের স্তর ধীরে ধীরে নামছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা সকাল থেকে ত্রাণ বিতরণ করছি। এখনও পর্যন্ত কোনও প্রাণহানির খবর নেই। কৃষিজমি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে তা পর্যালোচনা চলছে।’
আবহাওয়াবিদদের মতে, প্রকৃতির চরম খামখেয়ালিপনার নেপথ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব। এল নিনো, লা নিনার চক্র ক্রমেই আরো গভীর ও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে শুরু করে পশ্চিম ভারতের রাজ্যগুলিও বারংবার পড়ছে জলবায়ুর মারপ্যাঁচে। বিগত কয়েক বছর ধরেই বর্ষা আগাম এসেছে, যাচ্ছে দেরিতে। কিন্তু তার প্রকৃতি হচ্ছে হঠাৎ আক্রমণের—ঝড়, দমকা বৃষ্টি, অতিবৃষ্টি আর হরপা বান তার অমোঘ অস্ত্র। বিজ্ঞানীরা বলছেন, যদি এই মুহূর্তে আবহাওয়া বিষয়ে তৎপর না হওয়া যায়, আগামী দিনে আরও বড়ো বিপর্যয় অপেক্ষা করছে ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য।
❤ Support Us






