Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুলাই ৯, ২০২৫

গুজরাটে গম্ভীরা সেতু ভেঙে মহিসাগরে গাড়ি, নিহত অন্তত ৯। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের ক্ষতিপূরণ ঘোষণা। এই তবে ‘গুজরাট মডেল’! কটাক্ষ বিরোধীদের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
গুজরাটে গম্ভীরা সেতু ভেঙে মহিসাগরে গাড়ি, নিহত অন্তত ৯। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের ক্ষতিপূরণ ঘোষণা। এই তবে ‘গুজরাট মডেল’! কটাক্ষ বিরোধীদের

প্রথমে বিস্ফোরণের মতো শব্দ। মুহূর্তের মধ্যেই কেঁপে উঠল গোটা এলাকা। তার পরেই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল সেতুর মাঝের অংশ। দেখতে দেখতে একের পর এক অফিসযাত্রী, যাত্রীবোঝাই গাড়ি, মালবোঝাই ট্রাক নদীতে তলিয়ে গেল। গুজরাটের ভদোদরা জেলার পদ্রা তালুকায় গম্ভীরা-মুজপুর সেতু ভেঙে পড়ায় ঘটনায় অন্তত ৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে প্রশাসন। আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। নিখোঁজ রয়েছেন একাধিক ব্যক্তি। সেতুর ধ্বংসস্তূপ ও নদীর প্রবাহে ভেসে যাওয়া যানবাহনগুলির তল্লাশি চলছে।

বুধবার সকাল সাড়ে ৭ টা, জনবহুল সেতু দিয়ে অফিসযাত্রী ও পণ্যবাহী গাড়ির ভিড়। ব্যস্ত এ সময়ে আচমকা ভয়াবহ দুর্ঘটনা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আচমকা বিকট আওয়াজ শুনতে পেয়ে তাঁরা বুঝতে পারেন কিছু একটা ঘটতে চলেছে। একটুক্ষণ পরেই সেতুর একটি অংশ নদীতে ভেঙে পড়ে। জানা গিয়েছে, দুর্ঘটনার সময় সেতুর ওই অংশে ৫ থেকে ৬টি গাড়ি পারাপার করছিল। এর মধ্যে ছিল ২ ট্রাক, ১টি প্রাইভেট গাড়ি, ১টি পিকআপ ভ্যান ও কয়েকটি মোটরসাইকেল। প্রবল ঝাঁকুনি খেয়ে, ভারসাম্য হারিয়ে সব গাড়িই পড়ে যায় নদীতে। খবর পেয়ে, তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে পৌঁছয় দমকল ও পুলিশ বাহিনী। শুরু হয় উদ্ধার কাজ। উদ্ধারকার্যে হাত লাগান স্থানীয় বাসিন্দা, মৎস্যজীবীরা। তাঁদেরই একজন, নরেন্দ্র মালি, বলেন, ‘একটা ট্রাক পড়ল, তারপর আরেকটা। গাড়িগুলোর পেছন পেছন লোকজন জলে পড়ে যাচ্ছিল। চোখের সামনে মানুষ হারিয়ে গেল।’ আকস্মিক দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত ৯ ব্যক্তির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে প্রশাসন। ৫জনকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিখোঁজদের সন্ধানে চলছে তল্লাশি। মৃতদের মধ্যে ৬ জনের নাম জানা গিয়েছে— বৈদিক পাড়িয়ার (৪৫), নৈতিক পাড়িয়ার (৪৫), হাসমুখ পরমার (৩২), রমেশ পাড়িয়ার (৩২), ওয়াখাসিং যাদব (২৬), প্রবীণ যাদব (২৬)। ঘটনাস্থলে রয়েছে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী -র একটি দল। আনা হয়েছে বড়ো ক্রেন, ডুবুরি। গুরুতর আহত ৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এখনো নদীতে তল্লাশি চলছে। নিখোঁজদের সন্ধান ও যানবাহন উদ্ধারে জোর তৎপরতা। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, গোটা অঞ্চলের অন্যান্য সেতু ও পরিকাঠামোর উপর দ্রুত নিরাপত্তা নিরীক্ষা চালানো হবে।

১৯৮৫ সালে নির্মিত হয়েছিল গম্ভীরা-মুজপুর সেতু। প্রায় ৯০০ মিটার দীর্ঘ সেতুটি আনন্দ ও ভদোদরা জেলা ছাড়াও মধ্য ও দক্ষিণ গুজরাটের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ। প্রশাসনের তরফে বলা হয়েছে, এই সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ ‘সময় অনুযায়ী’ করা হয়ে থাকে। রক্ষণাবেক্ষণ ঠিক সময়ে হয়ে থাকলে, কী কারণে সেতুর মাঝের স্ল্যাবটি হঠাৎ ভেঙে পড়ল, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। ঘটনাস্থলে ছুটে যান পদ্রার বিধায়ক চৈতন্যসিং জালা। তিনি জানিয়েছেন, ‘এই সেতু নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয়দের উদ্বেগ ছিল। বহুবার অভিযোগ জানানো হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।’ স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সেতুটি কেবল বিপজ্জনকই নয়, বহু আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে এখানে। এত দিন ধরে বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও প্রশাসন উদাসীন থেকেছে। ঘটনার পরেই মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র পটেল টুইট করে জানান, ‘খুবই দুঃখজনক ঘটনা। নিহতদের পরিবারের প্রতি আমার সমবেদনা। কারিগরি বিশেষজ্ঞদের একটি দল ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। আহতদের চিকিৎসা, সহায়তার সবরকম ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেতু ধসের কারণ খতিয়ে দেখা হবে।’ নিহতদের পরিবারকে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ৪ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা আর্থিক সাহায্য দেওয়ার ঘোষণাও করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ত্রাণ তহবিল থেকে নিহতদের পরিবারপিছু ২ লক্ষ টাকা ও আহতদের জন্য ৫০ হাজার টাকা সাহায্য ঘোষণা করা হয়েছে।

দুর্ঘটনা ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। বিজেপির ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দেগে, প্রাক্তন কংগ্রেস সভাপতি অমিত চাভদা বলেছেন, ‘সেতুটির করুণ দশা নিয়ে বহুবার সতর্ক করেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখন ৯টি প্রাণ চলে যাওয়ার পর সরকারের টনক নড়েছে! এটাই কি গুজরাট মডেল? গুজরাটে বেশ কয়েকটি পুরোনো, ক্ষতিগ্রস্ত সেতু রয়েছে, কিন্তু রাজ্য সরকার কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এখনই বিকল্প রুটের ব্যবস্থা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’ ভদোদরার জেলাশাসক অনিল ধামেলিয়া জানান, ‘প্রথম লক্ষ্য উদ্ধারকার্য চালানো। তারপর গাড়িগুলি টেনে তোলা হবে। আপাতত বিকল্প পথে গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’ একটি পুরনো, দুর্বল সেতু। জানাজানি সত্ত্বেও গাড়ি চলত তার উপর দিয়ে। প্রশাসনের উদাসীনতার মাশুল দিল সাধারণ মানুষ। সেতু ভাঙার এই ঘটনা নতুন নয় গুজরাটে। ২০২২ সালের অক্টোবরে মোরবিতে মচ্ছু নদীর উপর শতাব্দীপ্রাচীন ঝুলন্ত সেতু ভেঙে প্রাণ হারান ১৪০ জনেরও বেশি মানুষ। মেরামতির পরে কোনো নিরাপত্তা শংসাপত্র ছাড়াই সাধারণ মানূষের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল সেই ব্রিজ। ২০২৪ সালের বর্ষায় সুরেন্দ্রনগরের হাবিয়াসার এলাকায় প্রবল জলের তোড়ে নদীর উপর থাকা একটি ছোট সেতু হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। কপালজোরে কোনো হতাহতের খবর মেলেনি, তবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে গোটা অঞ্চল। প্রশাসন তড়িঘড়ি অন্য রুট চালু করলেও প্রশ্ন থেকে যায়— রক্ষণাবেক্ষণ কই? গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে আমরেলির ডাটারদি এলাকায়তেও একটী নির্মীয়মাণ সেতু ধসে পড়ে। নির্মাণে নজরদারির অভাব, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি— সব মিলিয়ে গুজরাটের ‘উন্নয়ন’ কতটা মজবুত, তা নিয়ে সন্দেহ দানা বাঁধছে দেশজুড়ে।

 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!