- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ২২, ২০২৫
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ‘বিপদ’ নাকি নতুন পাঠ-পঠনের পদ্ধতি! কলকাতার স্কুলে স্কুলে এআই-এর ব্যবহার ঘিরে উদ্বিগ্ন শিক্ষকমহল, চিন্তিত অভিভাবকরা
একটা সময় ছিল, যখন হোমওয়ার্ক মানেই রাত জেগে পড়া, চারটে বই ঘেঁটে তথ্য সংগ্রহ, তারপর নিজের মন-মননের প্রাচুর্যে নতুন রচনার খসড়া লিখে, তবেই শিক্ষককের কাছে জমা দেওয়া। আর এখন? প্রশ্ন ছুড়ে দিলেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি উত্তর হাতে ধরিয়ে দেয়। পড়াশোনার পরিশ্রমের ভীষণ প্রয়োজনীয় সে পথ দ্রুত বদলে যাচ্ছে ‘কপি-পেস্ট’-এর অভ্যেসে। আর তাতেই চিন্তার ভাঁজ পড়েছে স্কুল-কলেজের মাস্টারমশাই দিদিমণিদের কপালে।
ক্লাসরুমের চেনা চিত্র বদলেছে। ছাত্রছাত্রীরা আগের মতো বইয়ের পাতা উল্টে, লাইব্রেরিতে বসে, কিংবা ক্লাসে নোট খাতায় লেখালিখি করে পড়াশোনা করছে—এমন দৃশ্য আর খুব বেশি চোখে পড়ে না। এখন অনেকটাই নির্ভরতা প্রযুক্তির উপর, বিশেষ করে চ্যাটজিপিটি বা অন্যান্য জেনারেটিভ এআই টুলের দিকে। আর এই নামগুলোই শিক্ষকদের ডায়েরিতে এখন নতুন বিপদ সংকেত। বহু ছাত্রছাত্রী এখন হোম অ্যাসাইনমেন্টের কাজ করছেন এইসব টুলস-এর সাহায্যে। সৃজনশীলতা আর বিশ্লেষণাত্মক চিন্তা কোথায় যেন গুম হয়ে যাচ্ছে। বহু স্কুলে ক্লাস ৮ থেকে শুরু করে কলেজের ফাইনাল বর্ষ পর্যন্ত, ছাত্রছাত্রীরা হোম অ্যাসাইনমেন্ট থেকে শুরু করে প্রজেক্ট, এমনকি পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও এআই ব্যবহার করছে। প্রশ্নপত্রের উত্তরের জন্য কেউ আর চারটে বই ঘেঁটে সময় নষ্ট করতে চায় না। টাইপ করে প্রশ্ন বসালেই এআই উত্তর এনে দিচ্ছে—সহজে, দ্রুত, নিখুঁত গঠনে। এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই হারিয়ে যাচ্ছে নিজস্ব ভাবনা, মৌলিকতা এবং অধ্যয়নের অভ্যাস।
দাঁড়িয়েছে। কলকাতার একাধিক স্কুলের শিক্ষক জানাচ্ছেন, ছাত্রছাত্রীদের লেখার ধরনে বদল এসেছে। কারও রচনায় দেখা যাচ্ছে অসাধারণ গাঁথুনি, দুর্লভ তথ্য, বইয়ের ভাষা—যা তাদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে প্রকাশিত ভাবনার সঙ্গে মেল খায় না। শিক্ষকেরা বুঝতে পারছেন, কাজটি এআই-এর করা। কিন্তু সবক্ষেত্রে প্রমাণ করা যায় না, কারণ এখনকার এআই প্ল্যাটফর্মগুলি এতটাই উন্নত, যে সাদামাটা অনুবাদ বা কপি-পেস্টের সীমা পেরিয়ে গেছে বহু দূর। শুধু ইংরেজি নয়, বাংলাতেও তারা অনায়াসে সাবলীল। যোধপুর পার্ক গার্লস হাইস্কুলের জীবনবিজ্ঞানের শিক্ষিকা অজন্তা চৌধুরী জানিয়েছেন, ‘ছাত্রের লেখার ধরন আমরা চিনি। কিন্তু এমন গোছানো, তথ্যসমৃদ্ধ রচনা যখন দেখি, তখনই সন্দেহ হয়—এটা কি আদৌ ওর লেখা?’ তবে সবসময় সন্দেহ করবারও উপায়ও থাকছে না। লেখা একটু ঘষেমেজে ব্যবহার করলে এআই-এর তৈরি কাজ চেনা কঠিন। অঙ্কের শিক্ষক সুপ্রিয় পাঁজার বক্তব্য, ‘ছাত্রদের হাতে মোবাইল সবসময়। জটিল অঙ্কও এখন চ্যাট জিপিটি করে দিচ্ছে। বিপদটা বুঝছি, কিন্তু উপায় তো কিছু নেই।’
গত প্রজন্মের পড়ুয়াদের কাছে একটা সময় পরীক্ষার প্রস্তুতি মানেই ছিল নোট তৈরির যুদ্ধ। টেস্ট পেপার ঘেঁটে, সম্ভাব্য প্রশ্নের তালিকা তৈরি করে ছাত্রছাত্রীরা প্রস্তুত হত। এখন সেই অভ্যাসেই হানা দিচ্ছে উন্নত প্রযুক্তি। ব্রিটেনের একটি সমীক্ষা বলছে, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে প্রতি ১ হাজার পড়ুয়ার মধ্যে ৫.১ জন ধরা পড়েছে এআই ব্যবহার করে। ভারতে এখনো এমন কোনও পরিসংখ্যান নেই, কিন্তু প্রবণতা যে বাড়ছে, তা নিয়ে একমত শহরের শিক্ষকরা। প্রযুক্তি না বুঝলে পিছিয়ে পড়ছেন শিক্ষকরাও। যাঁরা প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেননি, তাঁদের পক্ষে ছাত্রদের কারসাজি ধরা আরো কঠিন। অনেক প্রবীণ শিক্ষক এখনও এ আই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নেওয়া হয়ে কিনা জানবার প্ল্যাটফর্ম ‘টার্নিটিন’-এর মতো সফটওয়্যারের সঙ্গে পরিচিত নন। ফলে ছাত্রের মৌলিক কাজ আর চ্যাটজিপিটির তৈরি কাজ আলাদা করা কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠছে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত স্বস্তির জায়গা ছিল এআই-এর দুর্বল বাংলা। কিন্তু সে সময়ও ফুরিয়েছে। এখন চ্যাটজিপিটি হোক বা জেমিনাই, অনায়াসেই পরিষ্কার বাংলায় উত্তর দিচ্ছে। এক শিক্ষিকার কথায়, ‘আগে বাংলায় অনুবাদ করাতে গড়বড় হত। এখন সেটা প্রায় নিখুঁত। ফলে বাংলা মাধ্যমও আর আলাদা করে সুরক্ষিত নয়।’ ‘দ্য পার্ক ইনস্টিটিউশন’-এর এআই ও ডেটা সায়েন্সের শিক্ষক সঞ্জয় ঘোষ জানালেন, ‘ছাত্রছাত্রীদের লিখে জমা দিতে বলি। জানি, তারা এআই ব্যবহার করে। কিন্তু কাগজে লেখার ফলে অন্তত ২০ শতাংশ মনে থাকবে। সেই থেকে তারা কিছুটা হলেও শিখবে।’ তাঁর মত, বারবার একই বিষয়ে হাতেকলমে লিখিয়ে নিলে ছাত্রদের মধ্যে কিছুটা হলেও সত্যিকারের শিখন হবে।
শুধু স্কুল বা স্নাতক স্তরের কলেজ নয়, কলকাতার বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেও এআই ব্যবহার সম্পর্কে নজরদারি শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দেবজ্যোতি কোনার জানাচ্ছেন, ‘স্নাতক, স্নাতকোত্তর বা পিএইচডি স্তরে জমা পড়া সমস্ত থিসিস ‘টার্নিটিন’ বা ইউজিসি-র ড্রিলবিট সফটওয়্যার দিয়ে যাচাই করি।’ তবে তাঁর মতে, প্রযুক্তি ছাড়াও শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্কই বড় হাতিয়ার। ‘ছাত্রকে যদি কাছ থেকে চিনে থাকেন শিক্ষক, তাহলে সেই ছাত্র কোনও অসৎ উপায়ে লিখলে তা ধরা পড়বেই।’ বলছেন দেবজ্যোতি। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের সভাপতি চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য মনে করেন, ‘এআই-এর উপকারও আছে। কিন্তু খারাপ ব্যবহারের দিকটাই বেশি দেখা যাচ্ছে।’ ইউরোপের অনেক দেশ ইতিমধ্যেই স্কুল-কলেজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। ভারতে এখনো এমন কোনো আইন হয়নি। তবে ভবিষ্যতে নিয়ম আনার কথা ভাবা হচ্ছে বলেই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রক সূত্রে খবর।
এতকিছুর মাঝে তবু রয়েছে আশার আলো। সব ছাত্রই যে এআই-কে শর্টকার্ট হিসেবে ব্যবহার করছে, তা নয়। কেউ কেউ আছে, যারা সত্যিই জানার জন্য, বিষয়ের গভীরতা বুঝতে অত্যাধুনিক আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করছে। তারা সংখ্যায় এখনো কম হলেও, আগামীতে এই অংশটাই বাড়বে বলে শিক্ষকদের মত। অজন্তা চৌধুরীর কথায়, ‘ছাত্রদের বোঝাতে চেষ্টা করি। কিছুক্ষণের জন্য মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু সত্যিই গ্লানিবোধ হচ্ছে কি না, সেটা বলা কঠিন।’ প্রযুক্তি এক দিনে আসেনি, নিষিদ্ধ করেও থামানো যাবে না। বরং কচিকাঁচাদের তার সঙ্গে সহাবস্থান শেখানো দরকার। স্কুলে, কলেজে, বাড়িতে, পড়ুয়াদের শুধু এআই ব্যবহার নয়, তার দায়বদ্ধ ব্যবহার শেখাতে হবে।
❤ Support Us







