Advertisement
  • দে । শ
  • জুন ২৬, ২০২৫

‘জরুরি’ রাতের হাড়হিম গল্প, পাঁচ দশক পুরনো স্মৃতিমন্ধন মেওয়াতের উত্তাওয়ার

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘জরুরি’ রাতের হাড়হিম গল্প, পাঁচ দশক পুরনো স্মৃতিমন্ধন মেওয়াতের উত্তাওয়ার

১৯৭৬ সালের নভেম্বরের ঠান্ডা, হিমশীতল রাত। ঘুমন্ত গ্রামে হঠাৎ হানা দেয় পুলিশ। মহিলাদের কারো মাথার ঘোমটা সোজা করার সময় ছিল না, কেউ আবার কুয়োর জলে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বাঁচায়। কেউ কেউ ছুটে যায় পাশের জঙ্গলে। কিন্তু মহম্মদ দিনু দাঁড়িয়ে ছিলেন, অবিচল।

দেশে তখন ১৯ মাস ধরে চলছে জরুরি অবস্থা। হাজার হাজার বিরোধী নেতাকে বিচার ছাড়াই জেলে বন্দি, সংবাদমাধ্যমকে সরকারের কড়া নিয়ন্ত্রণে। আদালতের প্রতি ক্ষমতার ঔদ্ধত্য। টুঁ শব্দ করলেই পুলিশের গুলি কিংবা লাঠি। ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের উন্মুক্ত পরিবেশ। এমন এক অন্ধকার সময়ে বিশ্ব ব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তায় দেশে শুরু হয় জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ অভিযান। জনসংখ্যাকে আর্থিক উন্নয়নের অন্তরায় হিসেবে দেখা হচ্ছিল। তাই, দেশে জন্মহার রুখতেই হবে। আর তার উপায় ? শুরু বন্ধ্যাকরণ। দেশজুড়ে ৮০ লক্ষেরও বেশি পুরুষকে বাধ্যতামূলক ভ্যাসেকটমি করানো হয়, যার মধ্যে ১৯৭৬ সালেই ৬০ লক্ষ। অস্ত্রোপচারে মৃত্যু হয়েছে ২ হাজারের বেশি মানুষের। ৫০ বছর পেরিয়ে এসেও সেই বেদনার ব্যঞ্জনা আজও কাঁপিয়ে দেয় দেশের গণতান্ত্রিক চেতনা।

দিল্লি থেকে প্রায় ৯০ কিমি দূরে উত্তর ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের মেওয়াত অঞ্চল। চারদিক থেকে গ্রাম ঘিরে ফেলে পুলিশ। নির্দেশ এলো ‘উর্বর বয়স’-এর সব পুরুষদের গ্রাম মাঠে জড়ো হতে হবে। দিনু ছিলেন সেই ১৪ জনের মধ্যে, যাদের সেদিন জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আজও তাঁর মনে আছে সেই রাতের দৃশ্য। ‘যখন সবাই পালিয়ে যাচ্ছিল, গ্রামের কিছু বয়স্ক মানুষ বললেন— কেউ না থাকলে পুলিশ আরও খারাপ কিছু করবে। তাই কয়েক জনকে ‘দেওয়া’ হল। আমরা বলি, আমরা সেই রাতের বলি, যাদের আত্মত্যাগে গ্রামটা বেঁচে গেছে’—শান্ত, নরম গলায় বললেন নব্বই ছুঁইছুঁই মহম্মদ দিনু। সে সময় তাঁর স্ত্রী সলিমা গর্ভবতী। ৮ দিন পুলিশ হেফাজতে থেকে, পালওয়ালের শিবিরে অস্ত্রোপচারের পর ফিরেছেন যখন, তত দিনে জন্ম নিয়েছে তাঁদের একমাত্র পুত্র। এখন তাঁর ‘সাতপুরুষ’ নিয়ে গর্ব আর অহংকারের সংসার।

ঘটনার প্রেক্ষাপট আরো গভীরে। স্বাধীনতার মাত্র ৫ বছর পর, ১৯৫২ সালে ভারত প্রথম দেশ হিসেবে পরিবার পরিকল্পনার জাতীয় নীতি গ্রহণ করে। উদ্দেশ্য ছিল দুই-সন্তান নীতি। কিন্তু ১৯৭০-এর দশকে দেশের চূড়ান্ত জনসংখ্যা চাপ, দুর্বল অর্থনীতি ও বিদেশি চাপ, বিশ্বব্যাঙ্কের ৬৬ মিলিয়ন ডলারের ঋণ, আর মার্কিন খাদ্য সাহায্য—সব মিলিয়ে সরকারের মাথাব্যথা চরমে। জরুরি অবস্থার সুযোগ নিয়ে প্রশাসন শুরু করে এক ইতিহাস-কলঙ্কিত দমন-পীড়ন। সরকারি কর্মীদের দেওয়া হয় বন্ধ্যাকরণের কোটা। কোটা না-পূরণে বন্ধ হয় বেতন, আসে চাকরি খোয়ানোর হুমকি। পুলিশ, সেচদফতর, এমনকী রেশনও ব্যবহার করা হয় সাধারণ মানুষকে বশে আনার জন্য। মুসলিম-অধ্যুষিত গ্রামের জন্মহার তুলনামূলক বেশি হওয়ায়, বিশেষ নজরে ছিল উত্তাওয়ার। মোহাম্মদ নূর তখন ১৩ বছরের কিশোর। রাতের বেলায় বাবার কোলে ঘুমোচ্ছিলেন, হঠাৎ ঘোড়ায় চড়ে এসে হাজির পুলিশ। বাড়ির দরজা ভাঙল, হাঁড়ি-পাতিল ভেঙে দিল, আটা-ময়দায় মেশানো হলো বালি। নূরকে ধরে নিয়ে গিয়ে মারধর করা হয় থানায়। বয়স কম হওয়ায় ছেড়ে দেয় পুলিশ। সেই রাতের স্মৃতি তাঁর মনে আজো স্পষ্ট, ‘সেদিনের গ্রামে নেমে এসেছিল কবরস্থানের নিস্তব্ধতা।’

গ্রামের প্রাক্তন মোড়ল আবদুল রহমান সেই সময় পুলিশের কাছে অনড় ছিলেন। একাধিকবার অফিসাররা এসে বলেছিলেন, কিছু লোক ‘দিয়ে দিতে’। রহমানের জবাব ছিল—’ আমার এলাকার একটা কুকুরও দেব না, মানুষের তো প্রশ্নই ওঠে না !’ তবু তাঁকে টপকে পুলিশ ঢুকেছিল গ্রামে। অনেকেই পালিয়ে গিয়েছিলেন, কেউ ফিরেছিলেন দিন কুড়ি পরে, কেউ আর ফিরে আসেননি কখনো। বিয়ে ভেঙে গেছিল বহু পুরুষের। কেউ কেউ মানসিকভাবে আর কোনো দিন ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি। সামাজিক লাঞ্ছনাই তাঁদের শেষ করে দিয়েছে।

বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ২৫ জুন, জরুরি অবস্থার ৫০ বছর পূর্তি স্মরণ করছে। আজ ভারতের গড় প্রজনন হার নেমেছে দুই-এর নিচে। সরকারি ভাবে আর কোনো বাধ্যতামূলক জন্মনিয়ন্ত্রণ নেই। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের ভারতও অনেক দিক থেকে সেই জরুরি অবস্থার ছায়া বহন করছে। সমাজবিজ্ঞানী শিব বিশ্বনাথন বলেন, ‘জরুরি অবস্থাই ছিল ভারতের কর্তৃত্ববাদের উত্‍স। ইন্দিরা যা শুরু করেছিলেন, মোদি সেই ছাঁচেই আরো নিখুঁত কাঠামো গড়ে তুলেছেন।’ আজ হয়তো কোনো সরকারি ঘোষণা নেই, কিন্তু ইন্দিরার মতোই বিজেপি আইন ও মিডিয়ার দখল দিয়ে গণতন্ত্রের ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে। স্বেচ্ছাচার আর স্বৈরাচার এখন যেন স্বাভাবিক একটা বিষয়। মুক্তমাধ্যম সংগঠন ‘ফ্রি স্পিচ কালেকটিভ’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা গীতা সেশু বলছেন, ‘তখন সংবাদমাধ্যম সেন্সরড ছিল, এখন সংবাদমাধ্যম স্বতঃপ্রবৃত্ত ভাবে নতজানু। তখন আইন ছিল আক্রান্ত, আর এখন আইনকেই অস্ত্র বানানো হয়েছে।’ তবে এখানে আরেকটি শিক্ষা আছে। ১৯৭৭ সালের বিপুল জনরায়ে ইন্দিরা গান্ধির পতন। অর্থাৎ স্বৈরাচার যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তার পতন অনিবার্য।

উত্তাওারের মতো ছোট একটি গ্রামের গল্প আসলে গোটা ভারতেরই গল্প। যে রাষ্ট্র, নাগরিকের সম্মতির তোয়াক্কা না করে তাকে অস্ত্রোপচারের শিবিরে নিয়ে যেতে পারে, সে আজ নাগরিকত্বের দোহাই দিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে পুরছে লাখো লাখো মানুষকে। তখন সংবাদমাধ্যম চুপ ছিল সেন্সরের ভয়ে। আজ অনেক সময় চুপ থাকে বিনা সেন্সরেই—ভয়, সুবিধা, অথবা পক্ষপাতের কারণে। তখন বিরোধী নেতাদের স্থান ছিল জেলে। আজও কি তা বদলেছে ? ৭০-এর জরুরী অবস্থায় দেশ যে ভুল করেছিল, তা স্বীকার করা দায়িত্বের। কিন্তু সেই ভুল থেকে শিক্ষা না নিয়ে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটানো আরো বড়ো অপরাধ, আরো বড়ো বর্বরতা। উত্তাওারের দিনু, যিনি নিজের দেহকে উৎসর্গ করে গ্রাম বাঁচিয়েছিলেন, তাঁর মুখের ‘সাত পুরুষ!’ কেবল উত্তরাধিকারের অহঙ্কার নয়, বরং প্রতিবাদের ভাষা। যে বার্তা বলে—গণতন্ত্র কেবল ভোট নয়, সম্মান, অধিকার, আর স্মৃতির সুরক্ষার দায়িত্ব। এক হাতে ঠান্ডা কোমল পানীয়ের গ্লাস, অন্য হাতে প্রপৌত্রের হাত। ‘নরকযন্ত্রণা’-র এর সে রাত নিয়ে আজ আর দিনু মুহম্মদরা আক্ষেপ করেন না বরং বলেন, ‘আমরা যদি না যেতাম, ইন্দিরা এই গ্রামকে আগুন দিয়ে ছারখার করে দিত।’ তাঁদের চাওয়া কেবল এটুকুই, তাঁরা যে অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছেন, তা যেন ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে না যায়, কেউ যেন ভুলে না যায়।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!