- নন্দন চত্বর প্রচ্ছদ রচনা
- জানুয়ারি ২২, ২০২৬
আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার শুভারম্ভ! ১০ কোটি ব্যয়ে ‘বইতীর্থ’ গড়ার ঘোষণা, নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে সরব মুখ্যমন্ত্রী
পড়ন্ত শীতের আলতো অভিমান গায়ে মেখে, চিরতরুণের সবুজ ছড়িয়ে ডালপালা মেলেছে মহানগর কলকাতার বইকেন্দ্রিক মহোৎসব— আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা ২০২৬। এ পুস্তকমেলা যে কেবল বই কেনাবেচার আয়োজন নয়, কয়েক দশক ধরে এই মেলা হয়ে উঠেছে বাঙালির সংস্কৃতি, মতপ্রকাশ এবং নাগরিক চেতনার এক বিশেষ মঞ্চ, তা কথায়-বার্তায়, যুক্তি-তর্কে সুপষ্ট। তাই ৪৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যে সাহিত্য ও রাজনীতির সহাবস্থান নতুন কিছু নয়। বরং তা বইমেলার ঐতিহ্যেরই সম্প্রসারণ। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা, মেলা প্রাঙ্গণেই স্থায়ী ‘বইতীর্থ’ নির্মাণে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ, নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ডকে এ বিষয়ে সরকারি ভাবে আবেদন জানাতে বলা হয়েছে। আগামী বছর কলকাতা বইমেলা পা দেবে সুবর্ণজয়ন্তীতে। তার প্রাক্কালে বইকে ঘিরে স্থায়ী পরিকাঠামো গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত প্রকাশক-পাঠক মহলের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণের পথে এ এক দুর্দান্ত পদক্ষেপ। বইমেলা শুধু কয়েক দিনের উৎসব নয়, সারা বছরের সাহিত্যচর্চার কেন্দ্র হয়ে উঠুক, এ ভাবনাকে প্রশাসনিক স্বীকৃতি দেওয়া নিঃসন্দেহে স্বাগতযোগ্য। মঞ্চে বসে তিনি জানালেন, বিষয়টি নিয়ে একটি প্রাথমিক নকশাও এঁকেছিলেন, যদিও ব্যস্ততার কারণে তা সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। তাঁর কথায়, মহাকালধাম বা জগন্নাথধামের মতোই বইকে ঘিরে এক তীর্থক্ষেত্র গড়ে তুলতে চান প্রকাশক-পাঠকেরা, সরকার মহতী উদ্যোগে সর্বোতভাবে পাশে থাকবে।
তবে বইমেলার উদ্বোধনী মঞ্চ যে কেবল সংস্কৃতির পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তার ইঙ্গিত মিলল মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের অন্য অংশে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং প্রতিবাদ উঠে এল প্রকাশ্যে। অমর্ত্য সেন, জয় গোস্বামীর মতো বিশিষ্টজনদের শুনানিতে ডাকার প্রসঙ্গ তুলে তিনি যে প্রশ্ন তুলেছেন, তা নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক শালীনতার প্রশ্নও বটে। ভোটার তালিকা সংশোধন প্রয়োজনীয়, কিন্তু সে প্রক্রিয়া যদি হয়রানির চেহারা নেয়, তা হলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাও। তিনি বলেন, ‘আমার ঘরে আগুন লাগেনি, কিন্তু পাশের বাড়িতে আগুন লাগলে আমি চুপ থাকতে পারি না। আমার প্রতিবেশী সুখে না থাকলে আমি সুখে থাকতে পারি না।’ চলমান এই হয়রানির প্রতিবাদে কবিতাও লিখেছেন বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘২০২৬ সালকে সামনে রেখে ২৬টি কবিতা লিখেছি। ওগুলো হেলিকপ্টারে যেতে যেতে লেখা।’ এবারের বইমেলায় তাঁর লেখা মোট ৯টি নতুন বই প্রকাশ পাচ্ছে। সব মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দাঁড়াল ১৬২। তবে নিজের লেখালিখিকে খুব বড়ো করে দেখতে নারাজ তিনি। বললেন, তিনি ছোটখাটো লেখেন, খুব বেশি সময় পান না। জেলার সফর বা বিমানে যাত্রার সময়টুকুই তাঁর লেখার সময়।
ডিজিটাল যুগে বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দাপটে মানুষ বই থেকে কিছুটা দূরে সরে যাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন ছুড়ে দেন তিনি। যদিও নিজেই বলেন, বইপ্রেমীরা এখনও বই পড়েন এবং বইয়ের কোনও সীমারেখা নেই। বই মানে শিক্ষা, সংস্কৃতি, মান ও সম্মান—এই উপলব্ধি কোনও প্রযুক্তিই মুছে দিতে পারে না বলে তাঁর মত। নিজের ব্যক্তিগত অভ্যাস প্রসঙ্গে মমতা জানান, তিনি আজও কম্পিউটারে টাইপ করতে স্বচ্ছন্দ নন। হাতে লিখতেই তাঁর বেশি ভাল লাগে। তাঁর মতে, হাতে লেখার মধ্যে যে স্বাচ্ছন্দ্য ও সংযোগ রয়েছে, তা ল্যাপটপ বা কম্পিউটারে সম্ভব নয়। তাই প্লেন, হেলিকপ্টার বা সফরের ফাঁকে ফাঁকেই কলম চালান তিনি। বক্তব্যের এক পর্যায়ে নিজের আয়ের প্রসঙ্গও তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। দাবি করেন, তাঁর একমাত্র আয় বইয়ের রয়্যালটি। সাত বার সাংসদ নির্বাচিত হলেও মাসে দেড় লক্ষ টাকা পেনশন পাওয়ার অধিকার থাকা সত্ত্বেও তিনি গত ১৫ বছরে এক পয়সাও নেননি। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবেও সরকারের কাছ থেকে কোনও বেতন নেন না বলেই তাঁর দাবি। সার্কিট হাউসে থাকলে নিজের পকেট থেকে ভাড়া দেন, এমনকি নিজের চায়ের খরচও নিজে বহন করেন বলে জানান তিনি। সমালোচকদের উদ্দেশে কটাক্ষ করে বলেন, যাঁরা গালাগালি দেন, তাঁদের মগজে মরুভূমি রয়েছে।
২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এবারের বইমেলা চলবে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে মেলা। প্রবেশমূল্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। রয়েছে ১১০০টি স্টল। ব্রিটেন, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, পেরু-সহ ২০টিরও বেশি দেশ অংশগ্রহণ করছে। এবারের থিম কান্ট্রি আর্জেন্টিনা। গত বছর কলকাতা বইমেলায় দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২৭ লক্ষ। বই বিক্রি হয়েছিল ২৩ কোটি টাকার। এ বার সেই রেকর্ড ছাপিয়ে যাবে বলেই আশাবাদী মুখ্যমন্ত্রী। উদ্বোধনী মঞ্চ থেকে সকলকে শান্তিপূর্ণ ভাবে বইমেলায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলা স্বাধীনতা আন্দোলনের পুণ্যভূমি। এখানে সংস্কৃতির মিলনমেলা চলুক।’ উন্নত মেট্রো যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে এ বছর রেকর্ড ভিড়ের সম্ভাবনার কথাও জানানো হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য সিসিটিভি নজরদারি, সাদা পোশাকের পুলিশ, অ্যান্টি-ক্রাইম ইউনিট এবং ই-স্কুটার প্যাট্রোলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এদিন মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন, আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মারিয়ানো কৌসিনো, সাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী, শিল্পী শুভাপ্রসন্ন, ছিলেন রাজ্য সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। অনুষ্ঠান পরিচালনায় সামগ্রিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ডের সাধারণ সম্পাদক ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়।
❤ Support Us




