Advertisement
  • দে । শ
  • জুন ২৪, ২০২৫

পথ কুকুরদের জন্য মিড ডে মিল ! নয়া নির্দেশিকা ঘিরে বিতর্ক

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
পথ কুকুরদের জন্য মিড ডে মিল ! নয়া নির্দেশিকা ঘিরে বিতর্ক

রাজ্যের স্কুলে মিড ডে মিলের আওতায় এবার শুধু ছাত্রছাত্রীরা নয়, পথ কুকুররাও পাবে খাবার। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সমগ্র শিক্ষা মিশনের জারি করা এক নির্দেশিকায় একথাই বলা হয়েছে। বিবৃতি অনুযায়ী এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হল, স্কুলের পাশের পথ কুকুরদের খাওয়ানো এবং সেই সঙ্গে শূন্য থেকে কুকুরদের প্রতি সহানুভূতি ও মমত্ববোধ গড়ে তোলা। নয়া নির্দেশিকা ঘিরে একদিকে শিক্ষক মহলে এর যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে পশুপ্রেমী সংগঠনগুলো এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে।

পথ কুকুরদের জন্য একবেলা খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য সম্প্রতি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রকের কাছে আবেদন জানিয়ে ছিলেন সমাজকর্মী ও পশুপ্রেমী মেনকা গান্ধি। তার প্রেক্ষিতেই রাজ্য সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। রাজ্যের বিদ্যালয় শিক্ষা দফতরের অধীন প্রকল্প ‘পশ্চিমবঙ্গ সমগ্র শিক্ষা মিশন’-এর তরফে সমস্ত জেলার শিক্ষা আধিকারিকদের ওই নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে। নির্দেশ অনুযায়ী, পথ কুকুরদের খাওয়ানোর জন্য স্কুল চত্বরে একটি নির্দিষ্ট সময়েই খাবারের ব্যবস্থা করা হবে। আর এই কাজের দায়িত্বে থাকবে মিড ডে মিল কর্মীরা। এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে ছাত্রছাত্রীদের সুরক্ষার সঙ্গে কুকুরদের প্রতিও সহানুভূতির বার্তা দেওয়া হবে। শিক্ষকরা অবশ্য জানাচ্ছেন, যখন স্কুলে অতিরিক্ত খাবারের পরিমাণ থাকে, তখন সেটি কুকুরদের দেওয়া হতে পারে।

এছাড়াও, পথ কুকুরদের টিকাকরণ এবং নির্বীজকরণের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে রাজ্য প্রশাসনের নির্দেশে। এর জন্যে জেলা প্রাণিসম্পদ বিকাশ দপ্তর এবং স্কুল কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে প্রাণীপ্রেমের বোধ গড়ে তোলাও একটি লক্ষ্য, যাতে তারা বুঝতে পারে আশপাশের জীবের প্রতি তাদের দায়িত্ব। তবে এই উদ্যোগে নিয়ে শিক্ষক মহলে থেকে নানা প্রশ্ন উঠেছে, অনেকেই মনে করছেন, মিড ডে মিলের বরাদ্দই যথেষ্ট নয়। বর্তমান বরাদ্দে যে পরিমাণ খাবার স্কুলে তৈরি করা হয়, তা ছাত্রদের জন্যই কষ্টকর হয়ে পড়ে। তাহলে, কুকুরদের খাওয়ানোর জন্য অতিরিক্ত অর্থ কোথা থেকে আসবে, তা পরিষ্কার নয়। শিক্ষকরা বলছেন, কিছু স্কুলে কর্মী সংকটের কারণে মিড ডে মিল ঠিকভাবে চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে। সেখানে যদি নতুন দায়িত্ব যোগ করা হয়, তবে স্কুল কর্তৃপক্ষের উপর চাপ আরও বাড়বে। এছাড়া, শিক্ষক সংগঠনগুলির অনেকেই দাবি করছেন, খাওয়ানোর বিষয়টি কীভাবে পরিচালিত হবে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। যেমন, কোন স্কুলে কুকুরের সংখ্যা কত, তা নির্ণয় করা সম্ভব নয়। তাই, কীভাবে এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

রাজ্য সরকার বর্তমানে মিড ডে মিলের জন্য ছাত্র প্রতি ৫.৪৫ টাকা বরাদ্দ করে। সেই পরিমাণ অর্থে, কুকুরদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কলকাতার এক স্কুলের প্রধান শিক্ষক মন্তব্য করেন, ‘যে বরাদ্দে মিড ডে মিল চলছে, সেখানে যদি কুকুরদের খাবার যোগ করা হয়, তা হলে অর্থের সংকট তৈরি হবে।‘ বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, ‘কুকুরদের খাওয়ানোর উদ্যোগ ভালো, কিন্তু এতে আর্থিক খরচ কোথা থেকে আসবে তা পরিষ্কার করা প্রয়োজন। আমরা জানি না, মিড ডে মিলের বেঁচে যাওয়া খাবারের সঙ্গে কুকুরদের খাওয়ানো হবে, না আলাদা করে কোন বরাদ্দ করা হবে।‘ অন্যদিকে, পশুপ্রেমী সংগঠনগুলি এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা বলছেন, এটি সমাজে প্রাণীপ্রেমের বার্তা পৌঁছানোর একটি বড় সুযোগ। ‘কুকুরদের খাওয়ানোর মাধ্যমে শিশুরা জানবে কীভাবে প্রাণীদের প্রতি সহানুভূতি থাকতে হয়।’ বলেন পশুপ্রেমী সংগঠনের এক সদস্য।

এছাড়া, স্কুলের চত্বরে পথ কুকুরকে খাবার দেওয়ার পর কুকুরের আক্রমণের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে অনেকের। শিক্ষকরা বলছেন, কুকুরের সংখ্যা বাড়লে, স্কুলে অঘটন ঘটার সম্ভাবনা বাড়বে। বিশেষ করে প্রজননকালীন সময়ে কুকুরের আচরণ অনেক সময় আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। কলকাতার পার্ক ইনস্টিটিউশনের প্রধান শিক্ষক সুপ্রিয় পাঁজা বলেছেন, ‘এই নতুন নির্দেশনায় সঠিক দিকনির্দেশনা না দিলে, স্কুল চত্বরে কুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে তা নানা সমস্যার সৃষ্টি করবে।’ পাশাপাশি শিক্ষক সংগঠনগুলির অভিযোগ, শিক্ষকরা ইতিমধ্যেই অত্যন্ত চাপে আছেন। অতিরিক্ত দায়িত্ব নেওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। যাদবপুর বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক পার্থপ্রতিম বৈদ্য বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যেই মিড ডে মিলের দায়িত্ব সামলাচ্ছি। এর মধ্যে যদি নতুন দায়িত্ব যোগ হয়, তবে তার জন্য অতিরিক্ত জনবল কোথা থেকে আসবে?’

পশ্চিমবঙ্গ সমগ্র শিক্ষা মিশন অবশ্য জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মধ্যে রাজ্যের সমস্ত স্কুলে পথ কুকুরদের খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হবে। তবে এই প্রক্রিয়া কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সে সম্পর্কে আরও বিস্তারিত নির্দেশিকা আসবে বলে জানানো হয়েছে। রাজ্যের পথ কুকুরদের জন্য এই নতুন উদ্যোগ নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে রাজ্যের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক মহলে। তবে, সব কিছুই নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন এবং তার সঙ্গে যুক্ত সমস্যাগুলির সমাধানে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!