- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ১৬, ২০২৫
এনসিইআরটির ৮ শ্রেণির নতুন সামাজিক বিজ্ঞান পাঠ্যপুস্তকে ‘মোগলদের নির্মম ইতিহাস’, সঙ্গে ‘দোষারোপ নয়’-এর সতর্কবাণী
ইতিহাস কি শুধুই রাজাদের জয়গাথা ? না কি তার অন্ধকার প্রকোষ্ঠেও আলো ফেলতে হবে শিক্ষার খাতিরে? আলো কি সবখানেই ফেলা হবে, না কি বর্তমান শাসকের ইচ্ছাতেই দেখা যাবে ইতিহাসের নির্বাচিত অধ্যায়? এ প্রশ্নই নতুন করে উঠে এল জাতীয় শিক্ষাক্রম পর্ষদ এনসিইআরটি-এর অষ্টম শ্রেণির এর নতুন পাঠ্যবই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে। আদর্শ শাসকদের গৌরবগাথার পাশাপাশি তাদের ‘নির্মমতা’ ও ‘ধর্মীয় সহিংসতা’-র দিকটিও উঠে এসেছে নতুন ভাষ্যে। ‘সমাজ অনুসন্ধান: ভারত ও তার পরিধির বাইরে’ শীর্ষক নতুন সমাজবিজ্ঞান বইয়ে একাধিক মুঘল শাসকের নির্মমতা ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার নানা দৃষ্টান্ত টেনে আনা হয়েছে। উঠে এসেছে বাবর, আকবর এবং ঔরঙ্গজেবের শাসনকালের অন্ধকার অধ্যায়। বলা হয়েছে, ‘তাঁরা অনেকেই নির্মম, রক্তপিপাসু ছিলেন, ধ্বংস করেছেন মন্দির, শিক্ষাগৃহ, শহর।’ যদিও বইয়ের একাধিক জায়গায় সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘আজকের কেউ অতীতের ঘটনার জন্য দায়ী নয়।’ অর্থাৎ ‘দোষ চাপানো নয়’, কিন্তু অস্বস্তিকর সত্যও যেন লুকিয়ে রাখা যাচ্ছে না।
নতুন পাঠ্যবইয়ে ১৩ থেকে ১৭ শতকের ইতিহাসকে নতুনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। দিল্লি সালতানাত থেকে মুঘল সাম্রাজ্য, মারাঠা শক্তির উত্থান এবং তার প্রতিরোধ—সব কিছুই এসেছে এক ছাদের নিচে। আলাউদ্দিন খিলজির সেনাপতি মালিক কাফুরের দক্ষিণ ভারতের মন্দিরে হামলা থেকে শুরু করে ঔরঙ্গজেবের মন্দির ধ্বংসের নির্দেশ—সব কিছুরই বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে বইটিতে। আগে এ বিষয়গুলি তুলনামূলকভাবে নীরবভাবে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হত, এবার সেখানে ‘সত্যকে’ লিপিবদ্ধ করতেই সচেষ্ট হয়েছে এনসিইআরটি। সংস্থার তরফে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘এ সব ঘটনাই বাস্তবে ঘটেছিল, আর তার প্রভাব পড়েছিল ভারতের সমগ্র ইতিহাসে, সে কারণেই এগুলো নতুন বইতে জায়গা পেয়েছে।’
নতুন বইয়ে মুঘল সম্রাট বাবর সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘তিনি ছিলেন একজন বুদ্ধিদীপ্ত, সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ, কিন্তু একই সঙ্গে নির্মম আর নিষ্ঠুরও। একাধিক শহরে গণহত্যা চালিয়েছিল তাঁর বাহিনী, শিশু ও নারী দাসে পরিণত করা হয়েছিল। সে সময়েয় গড়ে তোলে ‘খুলি–ঘর’, শহর দখলের পর মৃত্যুর স্মারক হিসেবে ব্যবহৃত হতো।’ আকবরের শাসনকালকে বলা হয়েছে ‘সহিষ্ণুতা ও নির্মমতার সংমিশ্রণ’। চিত্তরগড় জয়ের পর আকবর ৩০ হাজার সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছিলেন বলে বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি, আকবরের ধর্মীয় সহিষ্ণুতার দিকটিও উহ্য থাকেনি—‘দীন-ই-ইলাহী’-র প্রসঙ্গ এসেছে, তবে প্রশাসনের উপরের স্তরে অ-মুসলিমদের সীমিত উপস্থিতির কথাও বলা হয়েছে। ঔরঙ্গজেব আর তাঁর ‘ফরমান’ ঘিরে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। এবার পাঠ্যবইয়ে জানানো হয়েছে, তিনি শুধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই নয়, ধর্মীয় অনুপ্রেরণায়ও একাধিক মন্দির, স্কুল, গুরুদোয়ারা ধ্বংসের নির্দেশ দিয়েছিলেন। বারাণসী, মথুরা, সোমনাথ, এমনকি জৈন মন্দিরও রক্ষা পায়নি তাঁর হাত থেকে।
নয়া ইতিহাসের বইয়ে, ‘জিজিয়া’ করের ব্যাখ্যাতেও এসেছে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। আগের বইয়ে ওই করকে শুধুই অ-মুসলিম প্রজাদের কাছ থেকে আদায়যোগ্য কর হিসেবে দেখানো হত। এবার বলা হয়েছে, এই কর ছিল সামাজিক অপমান ও ধর্মান্তরের জন্য আর্থিক প্ররোচনার হাতিয়ার। তবে মুঘল ও সুলতানদের অবদানও উপেক্ষা করেনি বইটি। প্রশাসনিক কাঠামো, সড়ক নির্মাণ, নগরোন্নয়ন, কৃষি ও বাণিজ্যে অগ্রগতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘ভারতীয় সমাজ দুর্যোগ পেরিয়ে শহর, মন্দির ও অর্থনৈতিক পরিকাঠামো পুনর্গঠনে সক্ষম হয়েছিল।’পরবর্তী অধ্যায়ে এসেছে মারাঠা শাসনের কথা। স্বাভাবিকভাবেই ছত্রপতি শিবাজি হয়ে উঠেছেন আদর্শ রাজা। বইয়ে শিবাজির চারিত্রিক বর্ণনা দেওয়া হয়েছে ‘দূরদর্শী, চতুর কৌশলবিদ’ রূপে। যিনি ধর্মের নামে বিদ্বেষে বিশ্বাস করতেন না, ধ্বংস হওয়া মন্দির পুনঃনির্মাণে তিনি অগ্রণী সৈনিক।
নতুন ইতিহাসের বই প্রকাশ হতেই উঠছে বিতর্ক, বিরোধী রাজনৈতিক দল থেকে ইতিহাসবিদ, শিক্ষকমহলের অনেকে বলছেন, এ আসলে স্কুল শিক্ষায় গৈরিকীকরণ করবার চেষ্টা, একপেশে ইতিহাসের কাহিনী শুনিয়ে প্রচ্ছন্নভাবে ‘মগজধোলাই’ করতে চাইছে বিজেপি সরকার। কারো মতে, এটা ইতিহাসের ‘বিকৃত রূপ’ নয়, বরং ‘অলংকারহীন সত্য’। কেউ আবার বলছেন, এটি নয়া শিক্ষানীতির নির্দেশিকা অনুসারে একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। এনসিইআরটি অবশ্য বিশেষ ‘নোট’-এ জানিয়েছে, ‘ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়গুলো বুঝতে হবে তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে। কিন্তু সেই সময়ে যারা ভুল করেছেন, তাদের দোষ বর্তমান প্রজন্মের উপর চাপানো অনুচিত।’ বইয়ের একাধিক অধ্যায়ে সেই সতর্কতামূলক বার্তা বারবার তুলে ধরা হয়েছে।
❤ Support Us






