- দে । শ
- জুলাই ৩১, ২০২৫
‘বাঙালিদের হয়রানি দুর্ভাগ্যজনক, সংবিধানের পরিপন্থী’, প্রতিবাদ ভারত রত্নের
বিদেশ থেকে ফিরে শান্তিনিকেতনে নিজের প্রিয় আশ্রয় ‘প্রতীচী’-তে পা রেখেই ভিনরাজ্যে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর নির্যাতনের অভিযোগে সুর চড়ালেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে স্পষ্ট বার্তা দিলেন, ‘ভারত একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র। কোনো রাজ্যের বাসিন্দা যদি অন্যত্র অবহেলার শিকার হন, তা হলে অবশ্যই প্রশ্ন তোলা উচিত। যদি বাঙালিদের উপর অত্যাচার বা অবহেলা হয়, তাহলে আমাদের আপত্তি থাকবেই। তবে এটি কেবল বাঙালির নয়, সমস্ত ভারতীয় নাগরিকের অধিকারের প্রশ্ন।’
অমর্ত্যবাবু বলেন, ‘সংবিধান বলছে, দেশের প্রতিটি নাগরিকের সারা দেশের উপর অধিকার রয়েছে। এটা কোনো আঞ্চলিক অধিকার নয়। গোটা ভারতই সব ভারতীয় নাগরিকদের ঘর। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘ওড়িশা থেকে কেউ রাজস্থানে গিয়ে যদি অবহেলিত হন, বা বাংলা থেকে কেউ গুজরাটে গিয়ে যদি কেবল ভাষার ভিত্তিতে নির্যাতনের মুখে পড়েন, তাহলে সেটা শুধু দুর্ভাগ্যজনক নয়, সংবিধানের পরিপন্থীও।’ গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বাংলা ভাষাভাষী অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে ঝড় উঠেছে। মহারাষ্ট্র, গুজরাট, ওড়িশা এবং দিল্লিতে শতাধিক বাংলাভাষী শ্রমিককে ‘অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি’ বলে আটক করার অভিযোগ উঠেছে। সেই ধরপাকড়ের প্রসঙ্গ টেনে নোবেল বিজয়ী প্রবীণ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘ভাষার প্রতি অবহেলা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা যায় না। বাংলা ভাষা হাজার বছরের পুরনো। চর্যাপদ দিয়ে যার শুরু, তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে। যে ভাষার রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম আমাদের অসাধারণ সাহিত্য উপহার দিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ জাতীয় সংগীত দিয়েছেন, সে ভাষা ও সাহিত্যকে অবজ্ঞা মানে, আমাদের আত্মপরিচয়কে অবজ্ঞা করা।‘ তিনি আরো বলেছেন, ‘ আমদের দুর্ভাগ্য যে ভারতের মতো বিবিধ ভাষা-সংস্কৃতির দেশে এখনো দেখা যায়, একটা ভাষা তার প্রাপ্য সম্মান পায় না। ভাষার ওপর আক্রমণ আর অবহেলা চলে নিরন্তর। সেটা বন্ধ হওয়া একান্ত জরুরি। ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতির মূল্যকে স্বীকার করতে হবে। যখন এ মূল্য অবহেলিত হয়, লাঞ্ছিত হয় তখন প্রতিবাদ করাটা জরুরি।’
প্রসঙ্গত, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি শান্তিনিকেতনের মাটি থেকেই ‘ভাষা আন্দোলন’-এর সূচনা করেছেন। ২৮ জুলাই মিছিল থেকে তিনি বলেছেন, যতদিন না ভিনরাজ্যে বাংলাভাষীদের উপর নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে, ততদিন আন্দোলন চলবে। এ নিয়ে অমর্ত্য সেনের সোজাসাপ্টা মন্তব্য, ‘যারা ভারতীয়, তাদের সম্পূর্ণ অধিকার আছে গোটা দেশে কাজ করার, থাকার। এই অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। শুধুমাত্র ভাষার জন্য বা জাতিগত পরিচয়ের জন্য কাউকে হেনস্থা করা — এটা কোনো সভ্য সমাজে চলতে পারে না। একজন নাগরিকের মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার থাকা উচিত। এটা নিয়ে অকারণে সংঘাতের কোনো মানে হয় না।’ সাংবাদিকদের প্রশ্নে মুখ্যমন্ত্রীর ভাষা আন্দোলন নিয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও, বাংলার প্রতি তাঁর আবেগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘এটা শুধু একটা রাজ্য বা একটা ভাষার লড়াই নয়। ভারত একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর দেশ। এখানে সবাই মিলে থাকব, এইটাই সংবিধানের স্বীকৃতি দেওয়া বহুত্ববাদের সুরু, আমাদের দীর্ঘ ইতিহাসের ধারপ্রবাহ।’
অমর্ত্য সেন জানিয়েছেন, শান্তিনিকেতনে তাঁর কোনো নির্ধারিত কর্মসূচি নেই। তবে তিনি জানিয়েছেন, এখানে থেকে বিষয়টি আরো ভালোভাবে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কন্যা নন্দনা দেব সেন এবং নাতনি মেঘলা। এদিন বোলপুর মহকুমাশাসক আয়ন নাথ ও এসডিপিও রিকি আগরওয়াল তাঁকে ফুলের তোড়া দিয়ে স্বাগত জানান। সঙ্গে ছিলেন তাঁর কন্যা নন্দনা দেবসেনও। জানা গিয়েছে, আগামী ১৯ আগস্ট পর্যন্ত শান্তিনিকেতনে থাকবেন তিনি।
❤ Support Us





