- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুন ২৮, ২০২৫
কসবার আইন কলেজে ছাত্রীর উপর নির্যাতনের ঘটনায় উত্তপ্ত মহানগর, গ্রেফতার ৪। বিরোধীদের বিক্ষোভ-মিছিলে পুলিশি ধরপাকর
রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও শিক্ষাঙ্গনে নিরাপত্তা নিয়ে ফের একবার তীব্র প্রশ্ন উঠল। দক্ষিণ কলকাতার ল-কলেজে প্রথম বর্ষের এক ছাত্রীকে গার্ডরুমে টেনে নিয়ে গিয়ে যৌননির্যাতনের ঘটনায় উত্তাল মহানগর। ঘটনায় মূল অভিযুক্ত তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রাক্তন নেতা-সহ গ্রেফতার মোট ৪ জন। এদের মধ্যে রয়েছেন কলেজের ১ নিরাপত্তারক্ষীও। পুলিশ সূত্রে খবর, ঘটনার তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। নির্যাতিতা ছাত্রী পুলিশকে জানিয়েছেন, কলেজের ইউনিয়ন সভানেত্রী হওয়ার প্রস্তাব দিয়ে তাঁকে কু-প্রস্তাব দেওয়া হয়। সে প্রস্তাবে রাজি না হওয়াতেই ঘটনার দিন তাঁকে কলেজ চত্বরেই আটকে রেখে গার্ডরুমে নিয়ে যাওয়া হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় মেন গেট, নিষ্ক্রিয় ছিলেন নিরাপত্তারক্ষী। অভিযোগ, সেখানেই তাঁর উপর একাধিক বার নির্যাতন চালানো হয়। তিনি হাতজোড় করেও রেহাই পাননি।
ঘটনার মূল অভিযুক্ত কলজের প্রাক্তনী, আলিপুর আদালতের আইনজীবী ও তৃণমূল ঘনিষ্ট। তাঁর সঙ্গে গ্রেফতার করা হয়েছে অন্য দুই অভিযুক্ত কলেজ পড়ুয়াকে। শনিবার কলেজের এক নিরাপত্তারক্ষীকেও গ্রেফতার করে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর বয়ানে অসঙ্গতি ধরা পড়তেই তাঁকে আটক করা হয়। নির্যাতিতার মেডিক্যাল পরীক্ষায় উঠে এসেছে গুরুতর নির্যাতনের প্রমাণ—শরীরে কামড়ের দাগ, নখের আঁচড় ও জোর করে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চিহ্ন। কলেজ চত্বরেই ভাইস প্রিন্সিপাল উপস্থিত ছিলেন, গেটের সামনে গার্ডও দাঁড়িয়েছিলেন, তবু ভরসন্ধ্যায় আইন পড়ুয়ার উপর ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের ঘটনা শহরবাসীকে হতবাক করে দিয়েছে।
ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু। তিনি বলেন, ‘আমি হতবাক, ব্যথিত। এমন ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’ জানা যাচ্ছে শিক্ষাদ থেকে কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট তলব করা হয়েছে, নির্দেশ দেওয়া হয়েছে গভর্নিং বডির জরুরি বৈঠকের। সঙ্গে বাড়ানো হতে পারে কলেজের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তবে, এই নৃশংস ঘটনা পর আবার একবার সামনে এসেছে কলেজগুলিতে শাসকদলের ইউনিয়ন সংস্কৃতি ও দাদাগিরি। প্রশ্ন উঠেছে— কেন একচেটিয়া শাসক ছাত্র সংগঠনের আধিপত্য, কেন এমন নির্লজ্জ ‘কালচার অফ ইমপিউনিটি’? এসএফআই, আইএসএফ, এসইউসিআই-সহ একাধিক সংগঠনের মতে, কসবা-কাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং শাসকদলের পৃষ্ঠপোষকতায় শিক্ষাঙ্গনে গজিয়ে ওঠা অপরাধচক্রের ধারাবাহিকতা। সিপিএমের রাজ্য মহম্মদ সেলিম বলেন, ‘এটা সভ্যতা ও মূল্যবোধের সঙ্কট। এদের সঙ্গে আছে কালীঘাট ও ক্যামাক স্ট্রিটের যোগ। তাই ওরা বেপরোয়া।’ একই অভিযোগ বিজেপির। তাদের মতে, ‘রাজ্যে শাসকদলের আশ্রয়েই এমন অপরাধ হচ্ছে।’ শুক্রবার ও শনিবার রাজ্যজুড়ে বিক্ষোভে নামে বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম, ছাত্রসংগঠন এসএফআই, ডিএসও-সহ একাধিক রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠন। গড়িয়াহাটে সুকান্ত মজুমদারের নেতৃত্বে মিছিল থেকে পুলিশি আটক, পথ অবরোধ, উত্তপ্ত পরিবেশ—সব মিলিয়ে ফের রাজনীতি তপ্ত। গতকালের কসবা থানার সামনে বামদের ছাত্র-যুবদের বিক্ষোভ থেকে ৭ জনকে আটক করা হয়েছিল, পরে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে।
এদিন পুলিশের হাতে আটক হয়ে, রাজ্য বিজেপির সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বলেন, ‘এটা কোনো রাজনীতির প্রশ্ন নয়। এটা মানবিকতার প্রশ্ন। পুলিশ শাসকদলের হয়ে কাজ করছে। মুখ্যমন্ত্রী ব্যস্ত রথযাত্রা নিয়ে, আর কলেজে ধর্ষিতা হচ্ছে মেয়ে !’ বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কটাক্ষ, ‘মমতার আমলে নারীসুরক্ষা বলে কিছু নেই। এই পরিস্থিতির একমাত্র প্রতিকার তৃণমূলকে গদি থেকে সরানো।’ অন্যদিকে, শনিবার কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে চিঠি দিয়ে সিবিআই তদন্তের দাবি জানালেন একাধিক আইনজীবী। তাঁদের বক্তব্য, পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাই নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে সিবিআই হস্তক্ষেপ জরুরি।
অন্যদিকে আরজি করের ঘটনার পরে পাওয়া শিক্ষা থেকেই কসবা-কাণ্ডে শুরু থেকেই সতর্ক শাসক তৃণমূল। দলীয় নেতারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। পুলিশ নিরপেক্ষ ভাবেই কাজ করছে। কাউকে আড়াল করা হয়নি।’ টিএমসিপির তরফে জানানো হয়েছে, অভিযুক্তদের সঙ্গে সংগঠনের কোনও বর্তমান সম্পর্ক নেই। বিরোধীরা অবশ্য দাবি করেছে, অভিযুক্ত এখনো টিএমসিপি-র দক্ষিণ কলকাতা ইউনিটের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে রয়েছেন। সেই দাবির পক্ষে প্রকাশ্যে এসেছে একাধিক ছবি ও তথ্য। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের গণধর্ষণ-খুনের ঘটনার পর গোটা রাজ্যে যেভাবে নাগরিক আন্দোলনের ঢেউ উঠেছিল, কসবাকাণ্ড তার পুনরাবৃত্তি ঘটাবে কি না, উঠছে সেই প্রশ্ন। সমাজমাধ্যমে ইতিমধ্যেই ডাক উঠেছে ‘রাতদখল’ কর্মসূচির। রবিবার কসবা ল-কলেজের সামনে জমায়েতের প্রস্তুতি নিচ্ছে একাধিক সংগঠন।’ নাগরিক সমাজের অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে মত অনেকের।
❤ Support Us






