- এই মুহূর্তে দে । শ
- আগস্ট ৪, ২০২৫
ঝাড়খণ্ডের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শিবু সোরেন প্রয়াত! পুত্র হেমন্ত বললেন ‘সব হারালাম’
থেমে গেল ‘দিসম গুরু’-র লড়াই। দীর্ঘ ১ মাসেরও বেশি সময় ধরে দিল্লির স্যার গঙ্গা রাম হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার পরে আজ সকালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার প্রতিষ্ঠাতা, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও প্রবীণ রাজ্যসভার সাংসদ শিবু সোরেন। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। বাবাকে হারিয়ে শোকাতুর ছেলে, ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন শোকজ্ঞাপন করে লেখেন, ‘প্রিয় দিসম গুরুজি আর নেই। আজ আমি সব হারালাম।’
আদিবাসী স্বার্থরক্ষার লড়াইয়ে সারা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন শিবু সোরেন। সাঁওতাল সমাজে জন্ম, তারপর বামপন্থী নেতা একে রায় ও বিনোদ বিহারী মাহাতোর সঙ্গে হাত মিলিয়ে ১৯৭২ সালে গঠন করেছিলেন ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা। তখন থেকেই শুরু হয় পৃথক রাজ্যের দাবিতে তীব্র আন্দোলন। তাঁর নেতৃত্বেই দীর্ঘ লড়াইয়ের পথ পেরিয়ে ২০০০ সালে ভারতের মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে নতুন রাজ্য ঝাড়খণ্ড। কিন্তু রাজনৈতিক সাফল্যের পথ তাঁর জন্য সহজ ছিল না। আটবার লোকসভায় নির্বাচিত হয়েছেন, ২ বার রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন। ৩ বার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন, কিন্তু একবারও পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হন ২০০৫ সালে, কিন্তু মাত্র ৯ দিনেই পদত্যাগ করতে হয় আস্থাভোটে পরাজয়ের কারণে। পরবর্তী ২ মেয়াদেও রাজনৈতিক টানাপড়েনে কার্যকালের অকাল সমাপ্তি ঘটে। ২০০৪ সালে মনমোহন সিংয়ের সরকারে কয়লা মন্ত্রকের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৭৪ সালের ‘চিরুদিন কাণ্ড’-এ তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির হলে, তাঁকে ইস্তফা দিতে হয়। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে আবার মন্ত্রী হন। কিন্তু ফের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার জন্য পদত্যাগ করেন। ২০০৬ সালে আবার কয়লা মন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। তবে রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কালো অধ্যায় বোধহয় প্রাক্তন সচিব শশীনাথ ঝা হত্যাকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত হওয়া। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবে এ ধরনের অপরাধে দোষী প্রমাণিত হওয়ার নজির তখন প্রথম। পরে অবশ্য দিল্লি হাইকোর্ট তাঁকে বেকসুর খালাস দেয়।
তাঁকে ঘিরে বিতর্ক যতই থাকুক, সাধারণ মানুষ ও জনজাতির অধিকারের প্রশ্নে কখনো পিছপা হননি শিবু সোরেন। কখনো তিনি ইউপিএ-র পাশে, তো কখনো তিনি এনডিএ-র মিত্র। তবে সব সময় নিজের রাজ্যের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। শেষ মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হয় যখন তাঁর দল ইউপিএ-কে সমর্থন জানায় সংসদে, আর তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে বিজেপি সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। সত্যিকারের বিদায়টা অবশ্য শুরু হয়েছিল দেড় মাস আগে। হঠাৎ স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। কিডনির জটিল সমস্যার কারণে জুনের তৃতীয় সপ্তাহে তাঁকে ভর্তি করা হয় দিল্লির স্যার গঙ্গা রাম হাসপাতালে। হাসপাতালের তরফে জানানো হয়েছে, ‘শ্রী শিবু সোরেন ১৯ জুন ভর্তি হন। দীর্ঘ চিকিৎসার পরও তাঁকে বাঁচানো যায়নি। আজ সকাল ৮:৫৬-এ তিনি পরলোকগমন করেন।’ প্রায় ১ মাস ধরে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।
শিবু সোরেনের প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লিখেছেন, ‘শ্রী শিবু সোরেনজি মাটির সঙ্গে জুড়ে থাকা নেতা ছিলেন। জনগণের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ছিল অটল। জনজীবনের নানা স্তরে কাজ করেছেন তিনি। বিশেষত, উপজাতি সম্প্রদায়, দরিদ্র ও নিপীড়িতদের ক্ষমতায়নের পক্ষে ছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে আমি শোকাহত। ওঁর পরিবার এবং অনুরাগীদের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। ওঁর পুত্র, মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ওম শান্তি!’ বিজেপি নেতা নিশিকান্ত দুবে বলেন, ‘একটি যুগের অবসান ঘটলো। তাঁর অবদান স্মরণীয়।’শিবসেনা (উদ্ধব বল) নেতা সঞ্জয় রাউত বলেছেন, ‘তিনি শুধু ঝাড়খণ্ড নয়, গোটা ভারতের আদিবাসী সমাজের জন্য ছিলেন এক বাতিঘর। তাঁর আসন ছিল আমার পাশেই, প্রায়ই খবর নিতাম। শুনেছিলাম শরীর ভালো নেই, আজ শুনলাম চলে গেছেন।’ কংগ্রেস সাংসদ প্রমোদ তিওয়ারির মতে, ‘শিবু সোরেন ছিলেন আদিবাসী সমাজের সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ কণ্ঠস্বর, জাতীয় রাজনীতিতে তাঁদের মুখপাত্র।’ যুগের অবসান হল। শিবু সোরেন রেখে গেলেন স্ত্রী রূপি সোরেন, পুত্র হেমন্ত ও বাসন্ত এবং কন্যা অঞ্জলিকে। ২০০৯ সালে তাঁর আর এক পুত্র দুর্গা সোরেন প্রয়াত হন। বর্তমানে হেমন্ত সোরেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার সভাপতি। বাসন্ত সোরেনও একজন বিধায়ক। আজ ঝাড়খণ্ড অশ্রু-বৃষ্টিতে বিদায় জানাবে তার সন্তানকে, যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন পাহাড়-জঙ্গল-জনজাতির মানুষের জন্য।
❤ Support Us







