Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুলাই ১৫, ২০২৫

কাঁওয়ার যাত্রায় কিউআর কোড নির্দেশিকা, উত্তর প্রদেশ সরকারের বিরুদ্ধে নোটিশ জারি সুপ্রিম কোর্টের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
কাঁওয়ার যাত্রায় কিউআর কোড নির্দেশিকা,  উত্তর প্রদেশ সরকারের বিরুদ্ধে নোটিশ জারি সুপ্রিম কোর্টের

কাঁওয়ার যাত্রা পথে খাবারের দোকানে কিউআর কোড বসানো নিয়ে আপত্তি তুলল সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অপূর্বানন্দ ঝা এবং সমাজকর্মী আকার পটেলের দায়ের করা জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে উত্তর প্রদেশ সরকারকে নোটিশ জারি করল শীর্ষ আদালত।

উত্তর প্রদেশ সরকারের নির্দেশিকা অনুযায়ী, কাঁওয়ার যাত্রাপথে অবস্থিত প্রতিটি খাবারের দোকানে কিউআর কোড বসানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সে কোড স্ক্যান করলেই দোকানদারের নাম, পরিচয় এবং অন্যান্য তথ্য সামনে আসবে। এই নিয়মকেই ‘ডিজিটাল ধর্মীয় প্রোফাইলিং’ বলে অভিযোগ করেছেন মামলাকারীরা। তাঁদের যুক্তি, এর ফলে দোকানদারের ধর্ম ও জাতীয় পরিচয় প্রকাশ পাচ্ছে, যা ব্যক্তি গোপনীয়তার অধিকারের পরিপন্থী। মঙ্গলবার বিচারপতি এম এম সুন্দরেশ এবং বিচারপতি এন কোটিশ্বর সিংহের বেঞ্চ এ মামলার শুনানি হয়। শুনানিতে আদালত জানিয়েছে, বিষয়টি বিচারযোগ্য, তবে এ ধরণের পদক্ষেপে দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হতে পারে। রাজ্য সরকারকে তাদের বক্তব্য আদালতের সামনে পেশ করতে নির্দেশ দিয়েছেন সুপ্রিম আদালতের বিচারপতিরা। বিরোধীরা অভিযোগ করছে, এহেন পদক্ষেপ নিয়ে রাজ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে প্রশ্রয় দিচ্ছে বিজেপি, যা সরাসরি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবেশ নষ্ট করছে। তাঁদের আরো অভিযোগ, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে ধর্মীয় মেরুকরণের লক্ষ্যে কাঁওয়ার যাত্রাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টে দায়ের হওয়া এক মামলায় আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি মন্তব্য করেন, ‘লোকজন দোকানে যান খাবার খেতে, ধর্ম দেখার জন্য নয়।’

গত বছর জুলাই মাসেও সুপ্রিম কোর্ট এক আদেশে উত্তরাখণ্ড, উত্তর প্রদেশ এবং মধ্যপ্রদেশ সরকারের অনুরূপ নির্দেশিকা স্থগিত করেছিল। সে সময় আদালত বলেছিল, ‘খাবারের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, কিন্তু দোকানদার কোন ধর্মের—সে প্রশ্ন করা সংবিধান বিরোধী।’ ইউপি সরকারের নতুন নির্দেশিকার মধ্য দিয়ে, পুরনো বৈষম্যমূলক মনোভাবই ফের মাথা চাড়া দিচ্ছে বলে দাবি মামলাকারীদের। মামলাকারী অপূর্বানন্দ ঝা এদিন আদালতে বলেন, ‘২৮ জুন উত্তর প্রদেশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়, তাতে স্পষ্ট যে, ধর্মীয় পরিচয় যাচাই করার পরোক্ষ চেষ্টা করা হচ্ছে কিউআর কোড ব্যবস্থার মাধ্যমে।’ তাঁর দাবি, দোকান, ধাবা কিংবা রেস্তরাঁর মালিকদের ধর্ম বা জাত উল্লেখ করার কোনো আইনসঙ্গত ভিত্তি নেই।

সম্প্রতি, মুজফফরনগরের মীরাপুরে এক সংখ্যালঘু ধাবা মালিকের উপর চড়াও হন কাঁওয়ার যাত্রীরা। অভিযোগ, ধর্মীয় পরিচয় গোপন করেছেন ওই ব্যক্তি। ভাঙচুর চালানো হয় তাঁর রেস্তোরাঁয়। এর জেরে নতুন করে বিতর্ক দানা বাঁধে কাঁওয়ার যাত্রা ও ধর্মীয় মেরুকরণকে ঘিরে। সংবাদসংস্থা পিটিআই সূত্রে জানা গিয়েছে, মীরাপুরের সাইনি ভাট্টা চকের কাছে ‘লাকি শুদ্ধ ধাবা ভোজনালয়ে’ রবিবার ভাঙচুর চালান কয়েক জন কাঁওয়ার যাত্রী। অভিযোগ, ধাবা মালিক অন্য ধর্মালম্বী হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে অন্য ধর্মের বলে পরিচয় দেন। তাঁর আসল নাম জানতে চেয়ে তর্ক শুরু হয়। এরপরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ধাবার এক কর্মী থানায় অভিযোগ জানিয়েছেন। স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত শুরু হয়েছে। আর আগেও অন্য একটি ধাবায় হামলা চালিয়েছিল কাঁওয়ার যাত্রীরা। সেবার অভিযোগ ছিল, তাঁদের খাবারে পেঁয়াজ পরিবেশন করা হয়েছে। এমনকী, ২৮ জুন মুজাফফরনগরের ৫৮ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে অবস্থিত ‘পণ্ডিত জি বৈষ্ণব ধাবায়’ ধর্মীয় পরিচয় জানতে চেয়ে এক কর্মীর পোশাক খুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল স্বামী যশবীর জি মহারাজ আর তাঁর অনুগামীদের বিরুদ্ধে।

ইতিমধ্যে, উত্তরপ্রদেশ সরকারের নির্দেশে ১০ জুলাই থেকে রাজ্যের কাঁওয়ার যাত্রাপথের ধারে সমস্ত মাংসের দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশ জারি হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, শ্রাবণ মাস জুড়ে পবিত্র যাত্রার মর্যাদা রক্ষার্থে এই পদক্ষেপ। তবে বিরোধীদের মতে, এর পেছনেও রয়েছে স্পষ্ট ধর্মীয় পক্ষপাতদুষ্টতা। যোগী রাজ্যের নির্দেশের ঢেউ পৌঁছে গিয়েছে রাজধানী দিল্লিতেও। নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তার সরকার মাংসের দোকান বন্ধ নিয়ে মুখ না খুললেও, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নিজেদের মতো করে শুরু করেছে ‘সার্টিফিকেট’ বিতরণের কাজ। শহরের বিভিন্ন দোকান, রেস্তোরাঁ, মুদির দোকানে গিয়ে তাঁরা স্টিকার সেঁটে তাঁরা দোকানদার কোন ধর্মের তা লিখে দিচ্ছেন। সংগঠনটির দাবি, দিল্লি-সহ আশপাশের ১৭৩টি ব্লকে ১৫০টি দল গঠন করে তাঁরা দোকান পরিদর্শনের কাজ চালাচ্ছে। প্রায় ৫০০০ দোকানে এই অভিযান চালানোর লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। দোকানে ঢুকে গুদাম ঘেঁটে দেখা হচ্ছে মাংসজাত দ্রব্য রয়েছে কিনা। যদিও দিল্লি পুরসভা স্পষ্ট জানিয়েছে, ১৯৫৭ সালের পৌর-আইনে পুণ্যার্থীদের জন্য কোনো মাংস দোকান বন্ধ রাখার বিধান নেই। ফলে সরকার বা চাইলেও তা আইনত বাধ্যতামূলক করা সম্ভব নয়।

উল্লেখ্য, শ্রাবণ মাসে অনুষ্ঠিত হয় কাঁওয়ার যাত্রা। এই যাত্রায় অংশ নেন ভগবান শিবের ভক্তেরা। তাঁরা গঙ্গা থেকে জল সংগ্রহ করে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে নিয়ে যান নিজেদের এলাকায় অবস্থিত শিব মন্দিরে। সেই জল অর্পণ করা হয় মহাদেবকে। ভক্তদের বলা হয় ‘কাঁওয়ারিয়া’। উত্তর ভারতজুড়ে এ যাত্রা ঘিরে প্রতিবছর ব্যাপক জনসমাগম ও নিরাপত্তার বন্দোবস্ত থাকে। তবে এবারে যোগী সরকারের কিউআর কোড নিয়ে উঠেছে বিতর্কের ঝড়।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!