Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুন ১৭, ২০২৫

ভুলের পাঠ্যক্রম, বিভ্রান্তির পাঠশালা! উচ্চ-মাধ্যমিকের বাংলা বইয়ে ভুলেভরা পাঠক্রম দেখে ক্ষোভে ফুঁসছেন শিক্ষক সমাজ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ভুলের পাঠ্যক্রম, বিভ্রান্তির পাঠশালা! উচ্চ-মাধ্যমিকের বাংলা বইয়ে ভুলেভরা পাঠক্রম দেখে ক্ষোভে ফুঁসছেন শিক্ষক সমাজ

নতুন শিক্ষাবর্ষের গোড়ায় হাতে এসে পৌঁছেছে উচ্চ মাধ্যমিকের বাংলা পাঠ্যবই। আর সেই বই খুলতেই শিক্ষক-শিক্ষিকা থেকে সাহিত্যপ্রেমী মহলের চোখ কপালে! একের পর এক তথ্যগত ভুলে ভরা এই বইগুলি ঘিরে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র অসন্তোষ। এক-দুটি মুদ্রণপ্রমাদ বা সম্পাদনার ত্রুটির নয়, একের পর এক তথ্যগত ভুল, গবেষণার অভাব, সাহিত্যিক ব্যাখ্যার বিকৃতি এবং বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নিখাদ পাঠ চর্চায় যারা নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন, যারা ছাত্রদের যত্ন নিয়ে পড়ান সেই শিক্ষক, তাঁরা সবাই প্রশ্ন তুলেছেন— এই বই হাতে ধরিয়ে বাংলা সাহিত্যের কোন চেহারা তুলে ধরা হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে? এ তো বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিশুদ্ধতা ও ঐতিহ্যের উপর সরাসরি আঘাত। বাংলা সাহিত্যের পাঠ্যক্রম কেবল সাহিত্যিক রচনার তালিকা নয়। তা এক সামাজিক-সাংস্কৃতিক স্মৃতি নির্মাণের প্রক্রিয়া। পাঠ্যবই তরুণ ছেলেমেয়েদের শেখায় কাদের পড়তে হবে, কীভাবে পড়তে হবে। এর মধ্য দিয়েই তৈরি হয় তাঁদের মানসিক গঠন, ভাষাবোধ, আর সামাজিক মূল্যবোধ। সেই কারণেই পাঠ্যক্রমে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, নজরুল, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বিবেকানন্দ, শক্তি চট্টোপাধ্যায় কিংবা বিদেশি সাহিত্যিক নেরুদার অনুবাদ পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা হয়— যাতে ছাত্রছাত্রীরা বাংলা ভাষার গভীরতা, বহুত্ববাদ ও জগৎচেতনার সঙ্গে পরিচিত হয়। একদিকে, যেখানে বাংলাভাষার মর্যাদা রক্ষায় নিয়মিত স্লোগান ওঠে, ‘মাতৃভাষায় শিক্ষা’-র দাবিতে নানা প্রচার চলে, সেখানে বাংলা পাঠ্যবইয়ের এই পরিণতি যেন মুখে ভাষার মর্যাদা আর হাতে তার অপমানের দলিল।

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বহুল পরিচিত কবিতা ‘কেন এল না’ উচ্চ মাধ্যমিক তৃতীয় সেমেস্টারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু পাঠ্যবইয়ে স্পষ্ট করে লেখা হয়েছে— কবিতাটি নাকি তাঁর ‘পদাতিক’ কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া। অথচ প্রকৃত তথ্য বলছে, এটি তাঁর ‘যত দূরেই যাই’ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। এ তথ্য এখন শুধু গুগল সার্চ করলেই পাওয়া যায়। অথচ একটি সরকার অনুমোদিত পাঠ্যবইতে এমন মৌলিক তথ্য ভুল রয়েছে। জীবনানন্দ দাশের ‘ঝরা পালক’-এর প্রকাশকাল ১৯২৭-এর পরিবর্তে ১৯২৮ লেখা হয়েছে। বলা হয়েছে, তিনি জীবদ্দশায় কোনও স্বীকৃতি পাননি— অথচ তাঁর ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে সাহিত্যসমাজ তখনই তোলপাড় হয়েছিল। শুধু তাই নয়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘দেশিকোত্তম’ সম্মানকে‘ডি.লিট’ ডিগ্রির সঙ্গে তুলনা করে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা অবাস্তব এবং বিভ্রান্তিকর। একটি কৃতিত্বের স্বীকৃতি, অন্যটি সম্মানসূচক বিদ্যাবিষয়ক ডিগ্রি, স্বীকৃতির প্রেক্ষাপট, প্রক্রিয়া ও গুরুত্ব একেবারেই আলাদা। শিক্ষকরা বলছেন, ‘ছাত্রছাত্রীদের কাছে এমন ভুল তথ্য দেওয়া শুধু দায়িত্বজ্ঞানহীনতাই নয়, এটা এক ধরনের সাহিত্যচর্চার অশ্রদ্ধার উদাহরণও।’

গদ্যাংশেও ভুলের ছড়াছড়ি। এবারে স্বামী বিবেকানন্দের একটি ঐতিহাসিক চিঠি পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যা লেখা হয়েছিল ‘উদ্বোধন’ পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদকের উদ্দেশে। সেই চিঠিতে তিনি চলিত বাংলার প্রচলনের পক্ষে যুক্তি দেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে বইয়ে এই চিঠির টিকা লেখা হয়েছে সাধুভাষায়— যা পুরোপুরি চিঠির বক্তব্য আর তার ভাষ্যরীতি বইয়ে পরস্পরবিরোধী। শুধু বই নয়, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের ইউটিউব চ্যানেলেও ধরা পড়েছে গুরুতর বিভ্রান্তি। পাঠ্য ‘আদরিণী’ গল্পের লেখক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়। কিন্তু ভিডিও ক্লাসে যাঁকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে, তিনি রবীন্দ্র গবেষক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়— যিনি সাহিত্যতত্ত্বে দেশিকোত্তম, পদ্মভূষণ ও রবীন্দ্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। অথচ ‘আদরিণী’র গল্পকার প্রয়াত হয়েছেন ১৯৩২ সালেই। তিনি এই সম্মানগুলি পাওয়ার সময় জীবিতই ছিলেন না। সম্মান, জীবনকাল, সাহিত্যচর্চা— সব গুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ কি কেবল অসতর্কতা? না কি নির্ভেজাল অজ্ঞতা? এখানেই শেষ নয়, তৃতীয় সেমেস্টারে অন্তর্ভুক্ত পাবলো নেরুদার কবিতা ‘তার সঙ্গে’, যেটির অনুবাদ করেছিলেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, তার ভাষারীতিও বদলে দেওয়া হয়েছে। বাংলা অনুবাদের সেই স্বকীয় মেজাজ ও সুর, যা পাঠক হৃদয়ে নেরুদার প্রেমভাবকে পৌঁছে দিত, তা এখানে কার্যত মুছে ফেলা হয়েছে। ফলে অনুবাদকের স্বর ও শৈলীর স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে গিয়েছে। বইয়ের একাধিক অংশে সংকলন এবং পত্রিকার মধ্যে কোনও পার্থক্য টানা হয়নি। কোথাও লেখা হয়েছে, গল্প সংকলনে প্রকাশিত কোনও গল্প নাকি প্রথমে ছাপা হয়েছিল পত্রিকায়— কিন্তু তার উৎসের উল্লেখ নেই। কোথাও আবার গোটা একটি সংকলনের লেখক হিসেবে একজন লেখককে দেখানো হয়েছে। শিক্ষকরা কটাক্ষ করে বলেন, ‘এত কাঁচা হাতের কাজ দেখে মনে হয়, চটজলদি বই লিখেছে কেউ, আর সেটির মান যাচাই করবার প্রয়োজন মনে করেনি মধ্যশিক্ষা পর্যদ বা শিক্ষাদপ্তর কেউই!’

এখানেই দৃষ্টিগোচর হয় আরও গভীর সমস্যা— আমাদের পাঠ্যক্রম প্রস্তুতির পদ্ধতি। বিভিন্ন সময়ে একাধিক অভিযোগ উঠেছে, পাঠ্যবই তৈরিতে পেশাদার সাহিত্যিক, গবেষক বা শিক্ষাবিদদের উপেক্ষা করে অল্প অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানুষদের নিয়েই দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। কখনও রাজনৈতিক আনুগত্য, কখনও ব্যক্তিগত সুবিধাবাদ, কখনও আবার সময়সীমা পূরণের তাগিদে মানের সঙ্গে আপস হচ্ছে। রাজ্যের একাধিক শিক্ষক সংগঠন প্রশ্ন তুলছেন ‘এ ভুল শুধু তথ্যগত নয়, এগুলি শিক্ষাব্যবস্থার অগভীর পরিকল্পনার ফসল। যারা বই তৈরি করেছে, তারা কি আদৌ বাংলা সাহিত্য পড়াশোনা করেছে। এ বই কারা লিখেছেন, কারা সম্পাদনা করেছেন, কারা অনুমোদন দিয়েছেন? পর্ষদকে জবাব দিতে হবে।বইতেই যদি ভুল শেখানো হয়, শিক্ষকের আর কিছু করার থাকে না।’

প্রবল সমালোচনার মাঝে, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের সভাপতি চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য জানান, ‘আমরা কিছু ভুলের খবর পেয়েছি। প্রতিটি অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। বিস্তারিত রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে। কোথাও ভুল থাকলে তা দ্রুত সংশোধন করা হবে।’ শিক্ষাবিদ ও গবেষক মহলের ক্ষোভ, অভিযোগ আসার পর শুধু ভুল সংশোধন করলেই দায় শেষ হয়ে যায়? যারা এই বই প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের কোনরকম জবাবদিহি হবে না? শাস্তির মুখে পড়তে হবে না? বর্ষীয়ান এক অধ্যাপক বলেছেন, ‘এই ভুলগুলো হল বাংলা সাহিত্যচর্চার প্রতি চরম অশ্রদ্ধা ও গা-ছাড়া মনোভাবের প্রতিফলন। যারা এই ভুল করেছে, তারা নিজেরাও হয়তো জানে না কোন কবিতা কোথা থেকে এসেছে! এই ভুলের শিকড় অনেক গভীরে— আমাদের পাঠ্যক্রম নির্মাণের দায়বদ্ধতার অভাবে, সাহিত্যবোধে অগভীরতায়, আর সর্বোপরি, মাতৃভাষাকে অবহেলার ঐতিহাসিক প্রবণতায়।’ ভারতের ২০২০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি ভাষাভিত্তিক শিক্ষা, স্থানীয় ইতিহাস-সংস্কৃতির প্রাধান্য, আর ‘বিশ্লেষণাত্মক পড়াশোনা’-এর উপর জোর দেওয়ার কথা বলে, বলা হয়, ছাত্রছাত্রীরা যেন নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে আত্মিক সংযোগ গড়ে তুলতে পারে। অথচ পরিস্থিতি সম্পুর্ণ ভিন্ন, একদিকে ভাষা আধিপত্যবাদ অন্যদিকে চুড়ান্ত অবহেলা দুই মিলিয়ে বাংলা ভাষার অস্তিত্ব ক্রমশ খাদের কিনারে দাঁড়িয়েছে। বাংলা ভাষা আজ বিশ্বায়নের চাপে কোণঠাসা। ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা, চাকরির বাজারে ভাষার গুরুত্ব কমে আসা, শহুরে মধ্যবিত্তের দ্বিভাষিক দোদুল্যমানতা— সব মিলিয়ে মাতৃভাষা হারাচ্ছে গণমাধ্যম ও শিক্ষার কেন্দ্রীয়তা। এই প্রেক্ষিতে বাংলা পাঠ্যবই হয়ে উঠতে পারত ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জাগানোর অন্যতম হাতিয়ার। ছাত্রছাত্রীদের সামনে বাংলা সাহিত্যকে শ্রদ্ধার সঙ্গে হাজির করার এ ছিল সুযোগ। সেখানে ভুলে ভরা বই যেন তামাশার অবতার!

তবে বাংলায় পাঠ্যপুস্তকে ভুলের ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৮০ ও ৯০-র দশকে একাধিকবার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ইতিহাস ও ভূগোলের বইয়ে তথ্যগত ভুল ধরা পড়েছিল। এক সময় কাজী নজরুলের কবিতায় কবির নামই লেখা ছিল ‘নজরুল ইসলাম খান’ বলে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনীতে জন্মস্থান ও মৃত্যুর সাল ভুল ছিল এক দশকেরও বেশি সময়। শিক্ষক সমাজ প্রতিবাদ করেছিলেন, সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন করেছিল— কিন্তু ভুল শুধরানো ছাড়া দায় নির্ধারণের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ হয়নি। বর্তমানে এই প্রবণতা আরো গভীর হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থায় আমলাতান্ত্রিকতা বাড়তে বাড়তে এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে পাঠ্যক্রম নির্মাণেও রাজনৈতিক পক্ষপাত, তড়িঘড়ি সময়সীমা পূরণ, বা দক্ষতার চেয়ে আনুগত্যই হয়ে উঠছে প্রধান মানদণ্ড।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!