Advertisement
  • দে । শ
  • মে ২৬, ২০২৬

সর্বস্ব ব্যয়ে ২০ লক্ষ বইয়ের ভাণ্ডার ! পদ্ম-সম্মানে সম্মানিত কর্নাটকের ‘পুস্তক মানে’-এর প্রতিষ্ঠাতা আঙ্কে গৌড়া

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
সর্বস্ব ব্যয়ে ২০ লক্ষ বইয়ের ভাণ্ডার ! পদ্ম-সম্মানে সম্মানিত কর্নাটকের ‘পুস্তক মানে’-এর প্রতিষ্ঠাতা আঙ্কে গৌড়া

বইয়ের জন্য মানুষ কতটা পাগল হতে পারেন সংসারের জিনিসপত্র বিক্রি করেসরকারি চাকরি ছেড়েসারাজীবনের উপার্জনের অধিকাংশ বই কিনতে খরচ করেশেষ পর্যন্ত নিজের বাড়িকে গ্রন্থাগারে পরিণত করা — এ গল্প যেন কোনো উপন্যাসের। অথচ এ এক বাস্তব জীবনকথা। কর্নাটকের মান্ড্যা জেলার পাণ্ডবপুরা তালুকের হারালাহল্লি গ্রামের ৭৯ বছরের আঙ্কে গৌড়া সেই বিরল মানুষদের একজনযাঁদের কাছে জ্ঞান অর্জন, জ্ঞান উন্মুক্ত করাই জীবনের প্রধান লক্ষ্য, তাঁর কাছে বই শুধু শখ নয়জীবনের ব্রত। সে ব্রতের স্বীকৃতিতেই ২৬ সালের পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হলেন তিনি।  

ভারতের অন্যতম বৃহৎ উন্মুক্ত ও বিনামূল্যের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার পুস্তক মানে’ বা ‘বইয়ের ঘর’ গড়ে তোলার জন্য আনসাং হিরোজ’ বিভাগে তাঁকে বেছে নিয়েছে কেন্দ্র। সোমবার রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর হাত থেকে দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান গ্রহণ করলেন আঙ্কে গৌড়া। হারালাহল্লি গ্রামের সরু রাস্তা পেরিয়ে পৌঁছতে হয় পুস্তক মানে’-তে। বাইরে থেকে সাধারণ বাড়ির মতো দেখতে হলেও ভিতরে ঢুকলেই যেন অন্য এক জগৎ। চারদিকে শুধু বই আর বই। তাকভর্তিমেঝেভর্তিঘরের কোণে কোণে স্তূপ করে রাখা বই। কোথাও বিরল সংস্করণের বাইবেলকোথাও পুরনো অভিধানকোথাও আবার বহু আগের সংবাদপত্রসাময়িকপত্রপাণ্ডুলিপি। কন্নড়বাংলাহিন্দিইংরেজি-সহ ২০টিরও বেশি ভারতীয় ও বিদেশি ভাষার বইয়ে ঠাসা বিশাল সংগ্রহ। সংখ্যাটা শুনলে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে— বইপত্রের সংখ্যা প্রায় ২০ লক্ষ ছাড়িয়ে গিয়েছে।

এই বিস্ময়ের পিছনে রয়েছে দীর্ঘ অভাবসংগ্রাম আর একরোখা জেদের ইতিহাস। ১৯৪৯ সালের ১৭ অক্টোবর চিনাকুরালি গ্রামের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম আঙ্কে গৌড়ার। বাবা মারিগৌড়া ও মা নিনগাম্মার সংসারে বই ছিল বিলাসিতা। পঞ্চম শ্রেণি পাশ করার পরই পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে ভেড়া চরানোর কাজে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু বইয়ের প্রতি অদম্য আকর্ষণ তাঁকে বারবার পড়াশোনার টানে ফিরিয়ে আনে। বৃত্তি আর অন্যের সাহায্যে পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি। পরে বাস কন্ডাক্টর হিসেবে চাকরি নেন তৎকালীন মাইসোর স্টেট রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনে। সে সময়েই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেন শিক্ষক গোপীনাথ বার্কি। তাঁর উৎসাহে আবার কলেজে ভর্তি হন আঙ্কে গৌড়া। মাইসুরুর মহারাজা ইভনিং কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। পরে দূরশিক্ষায় কন্নড় ভাষায় স্নাতকোত্তরও সম্পূর্ণ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসে আর্ন অ্যান্ড লার্ন’ প্রকল্পে কাজ করার সময় প্রতিদিন পাঁচ টাকা করে যা পেতেনতা দিয়ে অল্প দামের বই কিনতেন তিনি। পরে চিনিকলে চাকরি পাওয়ার পর বেতনের বড়ো অংশই চলে যেত বই কেনায়। নিজেই জানিয়েছেনকোনো  কোনো সময়ে বেতনের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত তিনি বই সংগ্রহে খরচ করেছেন। ক্রমে বইয়ের সংখ্যা এত বেড়ে যায় যেপাণ্ডবপুরার বিশ্বেশ্বরনগরের ছোট্ট বাড়ির প্রতিটি কোণ বইয়ে ঢেকে যায়। রান্নাঘরশোওয়ার ঘরবারান্দা— কোথাও আর জায়গা ছিল না। অতিথিরা সে বাড়িকে বলতেন বইপোকার স্বর্গরাজ্য। কিন্তু সমস্যা ছিল সংরক্ষণে। ধুলোবৃষ্টিপোকামাকড়ের হাত থেকে এত বই বাঁচানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছিল।

এগিয়ে আসেন শিল্পপতি শ্রীহরি খোদে। আঙ্কে গৌড়ার সংগ্রহ দেখে মুগ্ধ হয়ে তিনি ১২ লক্ষ টাকা দিয়ে জমি কিনে দেন। পরে প্রায় ৮০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে তৈরি হয় বৃহৎ গ্রন্থাগার ভবন। আঙ্কেগৌড়া জ্ঞান প্রতিষ্ঠান’-এর অধীনে গড়ে ওঠে আজকের পুস্তক মানে। এই গ্রন্থাগারের সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট্য— এখানে প্রবেশ বা বই পড়ার জন্য কোনো ফি লাগে না। দরজা খোলা থাকে সকলের জন্য। ছাত্রছাত্রীগবেষকশিক্ষকলেখক থেকে সাধারণ বইপাগল মানুষ— সকলেই আসেন এখানে। স্থানীয়দের দাবিদেশের নানা প্রান্ত থেকে গবেষকেরাও আসেন বিরল বই খুঁজতে। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরাও না কি এই গ্রন্থাগারে এসেছেন।

তবে পুস্তক মানে’ শুধুই বইয়ের ভাণ্ডার নয়। এখানে রয়েছে বিরল মুদ্রাডাকটিকিটপুরনো ক্যামেরামানচিত্রশুভেচ্ছা কার্ডের বিশাল সংগ্রহও। আঙ্কে গৌড়ার কাছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ৪ হাজারেরও বেশি আলোকচিত্র এবং প্রায় ৮০টি বই রয়েছে বলেও জানা গিয়েছে। তাঁর সংগ্রহে থাকা বিরল মুদ্রার মূল্যই প্রায় ২ কোটি টাকা বলে দাবি করেছেন তিনি। আজও আঙ্কে গৌড়া ও তাঁর স্ত্রী বিজয়লক্ষ্মী গ্রন্থাগারের মধ্যেই থাকেন। বিশাল বইয়ের স্তূপের ফাঁকে ছোট্ট জায়গায় তাঁদের খাওয়া-দাওয়াবিশ্রাম। ছেলে সাগরও এ কাজে বাবাকে সাহায্য করেন। এখনো হাজার হাজার বই তালিকাভুক্ত হয়নি। অনেক বই বস্তাবন্দি অবস্থায় পড়ে রয়েছে। গ্রন্থাগারের পরিধি বাড়ানোর জন্য নতুন তলা তৈরির কাজ চলছে। আঙ্কে গৌড়ার কথায়, ‘সব বই ঠিকমতো সংরক্ষণ করতে গেলে অন্তত ১০ একর জমি লাগবে।’

পদ্ম সম্মানে গোটা দেশের কাছে প্রবাদপ্রতিম এই মানুষটির পরিচিতি পৌঁছেছে। তাতে আনন্দ পেলেও, আত্মঅহং-এ ভোগেন না আঙ্কে। এর আগেও তাঁর কাজের স্বীকৃতি মিলেছে। ২০১৪ সালে কর্নাটক রাজ্যোৎসব পুরস্কার পান তিনি। কন্নড় বুক অথরিটির সাহিত্য পরিচারক পুরস্কার’, ‘অপ্রতিম রত্ন’ সম্মানঅল ইন্ডিয়া কন্নড় সাহিত্য সম্মেলনে সংবর্ধনা— একের পর এক সম্মান এসেছে তাঁর ঝুলিতে। পুস্তক মানে’-র নাম উঠেছে লিমকা বুক অব রেকর্ডসেও। তবু আঙ্কে গৌড়া নিজের কাজে অবিচল, অক্লান্ত। তিনি বলেন, ‘আমি কখনও পুরস্কারের জন্য কাজ করিনি। শুধু চেয়েছিযে কেউ যেন বই পড়তে পারে।’ ডিজিটাল যুগে যখন বই পড়ার অভ্যাস ক্রমশ কমছেতখন কর্নাটকের এক প্রত্যন্ত গ্রামের এই মানুষটি একঝলক টাটকা বাতাসের বার্তা দিচ্ছেন। তাঁর কাছে বই কেবল কাগজে বাঁধা অক্ষর নয়সমাজ বদলের শক্তি। আর সেই বিশ্বাস থেকেই আজ পুস্তক মানে’ হয়ে উঠেছে গ্রামীণ ভারতের অন্যতম আলোকস্তম্ভ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!