- দে । শ
- জানুয়ারি ১৬, ২০২৩
কী শীত! মাইনাস ৫৮ ডিগ্রিতেই দিব্যি স্বচ্ছন্দ নগর জীবন
বাংলায় শীতের ব্যাটিং -এ এখন মন্থর গতি। কিন্তু এমন সময়ই সাইবেরিয়ার এক শহরে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ৫৮ ডিগ্রির নীচে। বিশ্বের শীতলতম শহর আখ্যা পাওয়া ইয়াকুতস্কর মানুষ চরম প্রতিকূল পরিবেশেই খুঁজে নিয়েছেন জীবনের চলার ছন্দ।
মস্কো থেকে ৫৩০০ কিমি পূর্বদিকে অবস্থিত এই শহরটিতে অক্টোবর থেকে এপ্রিল সাতমাস সময়ে রীতিমত শৈত্যপ্রবাহ চলে। এর মধ্যে তিন মাস ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারী তাপমাত্রা থাকে -৪০ ডিগ্রির নীচে। দিনের পর দিন ধরে সূর্যের দেখা মেলে না। কখনও বা সকালে সাড়ে দশটায় সকাল হয়। তিনটের মধ্যে রাত নেমে যায়। তারপর ক্রমশ অন্ধকারে আরও ঠান্ডায় ডুবে যায় শহরটা। কিন্তু এত ঠাণ্ডা এখানকার মানুষদের কাবু করতে পারেনি। এই হাড় কাঁপানো শীতেও তাঁরা দিব্যি রাস্তায় ঘুরে বেড়ান। নিয়মিত দোকান খোলেন। প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে মানুষ দোকানে ভিড় জমান। পালন করেছেন বর্ষবরণের উৎসব। এখানে এই তিনমাস সময়ে এতটাই ঠাণ্ডা থাকে যে স্কুল গুলো বন্ধ রাখতে হয়। যদিও অনলাইনে পড়াশোনা চলে। তবে অভিভাবকদের দাবি প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও বাচ্চাদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে আগ্রহী তাঁরা।

ইয়াকুৎস্ক শহরের প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ পানীয় জলকে করে তুলেছে দুর্লভ। এলাকাবাসীদের কথায়, পিপাসার্ত মানুষের পিপাসা মেটাতে গেলে পার্শ্ববর্তী জমাট বাধা নদী ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। সেখান থেকে পাত্র ভরতি বরফ নিয়ে এসে তা গরম করে গলিয়ে পান করতে হয় এখানকার সাধারণ মানুষকে।
পথেঘাটে হাঁটার চ্যালেঞ্জটা আরও বেশি। বাইরে মিনিট কুড়ি থাকলেই মুখের পেশি থেকে আঙুল- সব অসাড় হয়ে যায়। তাই কোনও ভাবেই সর্বোচ্চ আধঘণ্টার বেশি কেউ বাইরে থাকেন না। চারপাশে বরফের চাঁই। তবু পরিবহণ ব্যাপারটা ইয়াকুৎস্কে ভালই। তবু এই শহরে মানুষ বাস-টাসে উঠতে খুব একটা চান না। কারণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাসের জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করা মানেই শীতের তীব্র কামড় সহ্য করা। তাই বেশির ভাগ মানুষই ট্যাক্সিতে যাতায়াত করেন। যে সব বাসিন্দাদের নিজেদের গাড়ি আছে তাঁরা গাড়িটাকে মুড়ে রাখেন কম্বলে। বার্ধক্যে উপনীত মানুষদের পক্ষে হাঁটাচলা আরও কষ্টকর, কারণ রাস্তাঘাটে বরফ পড়ে থাকার কারণে রাস্তা পিছল থাকে, তাই চলাফেরায় অসাবধান হলে পড়ে যাওয়ার ভয় অনেক বেশি।
শীতলতম স্থলে বসবাসের নজির এই প্রথম নয়। তবে এক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, শহরের জনসংখ্যা। এত ঠাণ্ডা সত্ত্বেও এখানে লক্ষাধিক মানুষের বাস। অথচ এই শহর থেকে পূর্বদিকে মাত্র ৫০০ মাইল দূরে অবস্থিত একটি গ্রামে জনসংখ্যা ৫০০ র বেশি নয়। তাপমাত্রা এই গ্রামোটিতে সবথেকে কম – ৭১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। হীরে, সোনা, ইউরেনিয়ামের খনির উপস্থিতি শহরটিকে জনবহুল করে তুলেছে। এই খনিগুলোর উপস্থিতির কারণে এখানকার মানুষের উপার্জন ভালোই হয় । যার বেশিরভাগটাই খরচ হয় প্রবল শীতের সঙ্গে মানিয়ে চলার ক্ষেত্রে। কারণ বাইরের ঠাণ্ডা শুধু বাইরেই থাকে না,তার প্রভাব পড়ে বাড়ির মধ্যেও। নিজেদের বসতবাড়িগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্য স্টিলের বুনিয়াদের ওপর যার নীচে বায়ু চলাচল করে। এতে পারমাফর্স্ট বা হিমায়িত মাটি সহজে গলে না। ঘর উষ্ণ রাখতে ব্যবহার করা হয় গ্যাসোলিন, ব্যাটারি প্রভৃতি।
ইয়াকুতস্ক এলাকার মানুষ প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকেন অত্যন্ত সহজেই, আনন্দের সঙ্গে। শহরের এক মাছ বিক্রেতা তাঁর জমাট বাধা মাছ বিক্রী করতে করতে বলেন যে এখানে কোনো শর্টকার্ট ফর্মূলা নেই টিকে থাকার। কেবলমাত্র পুরু শীত বস্ত্র পরিধান করে থাকতে হবে। বাস্তবিক ভাবেই এলাকার মানুষ প্রবল শীতেও আনন্দ উৎসবের মধ্যে থাকেন। রাতে তাঁরা নাইট ক্লাব ও পাবে যান। শহরজুড়ে রয়েছে রেস্তোরাঁ, শপিং মল ।সেখানেই ভিড় জমান সাধারণ মানুষ। প্রবল শৈত্যপ্রবাহের মধ্যেও স্বচ্ছন্দ প্রাণবন্ত জীবনযাপনের চিত্র সর্বত্র।
❤ Support Us





