- দে । শ
- এপ্রিল ২৯, ২০২৫
শ্রীক্ষেত্র দিঘার জগন্নাথ মন্দিরে চলছে যজ্ঞ-হোমের সমারোহ, বিকেলে মহাযজ্ঞে বসবেন মমতা। অক্ষয় তৃতীয়ায় বিগ্রহে প্রাণ প্রতিষ্ঠা
পুরীর জগন্নাথ মন্দিদের আদলে তৈরি করা দিঘার জগন্নাথ মন্দিরের উদ্বোধন নিয়ে এই মুহূর্তে প্রস্তুতি আর ভক্তের আগ্রহ চরমে। অক্ষয় তৃতীয়ার পুণ্যলগ্নে বুধবার দিঘায় নবনির্মিত জগন্নাথ মন্দিরে অনুষ্ঠিত হবে প্রাণ প্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠান। মন্দির প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে মহাযজ্ঞ। তিন দিনব্যাপী এই আচার-অনুষ্ঠানে দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থান থেকে আগত শতাধিক পুরোহিত অংশ নিয়েছেন। মঙ্গলবার সকাল থেকে মন্ত্রোচ্চারণ, হোম যজ্ঞ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর হয়ে উঠেছে দিঘার নিউ মন্দির চত্বর। মহাযজ্ঞের পূর্ণাহুতি হবে মঙ্গলবার সন্ধ্যায়। এরপর বুধবার বিগ্রহে প্রাণ প্রতিষ্ঠা সম্পন্ন হবে এবং বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। মন্দিরের গর্ভগৃহে বিরাজ করবেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ। পুরো প্রাঙ্গণ জুড়ে রাজস্থানি শৈলিতে নির্মিত হয়েছে বিশাল মন্দির, যা পুরীর জগন্নাথধামের আদলে তৈরি।
এ মন্দিরে উচ্চতা ৬৫ মিটার বা ২১৩ ফুট। সমুদ্র থেকে প্রায় ৩৭০ মিটার উত্তরে ভৌগলিক অবস্থান। কলিঙ্গ শিল্পের অনুকরণে নির্মিত এই মন্দিরে পুরীর জগন্নাথধামের প্রতিচ্ছবি খোঁজা হয়েছে। আগামীকাল ৩০ এপ্রিল, অক্ষয় তৃতীয়ার দিন, রাজ্য সরকারের সহায়তায় নির্মিত জগন্নাথ মন্দির-এর বহু প্রতীক্ষিত উদ্বোধন হতে চলেছে। মূল অনুষ্ঠানের আগে চলছে প্রাক-উদ্বোধনী মাঙ্গলিক আচার-অনুষ্ঠান। মন্দির উদ্বোধনের আগে অপদেবতা তাড়ানোর যজ্ঞ থেকে শুরু করে বিগ্রহে প্রাণপ্রতিষ্ঠা, পূর্ণাহুতি, আরতি, ছাপ্পান্ন ভোগ– এ সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান ধর্মীয় শুদ্ধতা আর আস্থার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। মঙ্গলবার সকাল থেকেই শুরু হয়েছে নানা আচার-অনুষ্ঠান। মন্দির চত্বরে চলেছে মহাযজ্ঞ। উপস্থিত রয়েছেন প্রায় দেড় শতাধিক পুরোহিত, দেশ-বিদেশের তীর্থযাত্রী ও পর্যটক। পুরোহিতদের মতে, মন্দিরে প্রাণ প্রতিষ্ঠার আগে বাস্তুশুদ্ধি, অপদেবতা অপসারণ এবং দেবতাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে যজ্ঞ করা আবশ্যক। সন্ধ্যায় সম্পন্ন হবে ‘পূর্ণাহুতি’। সে অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ইতিমধ্যে রাজ্যে বিভিন্ন স্থান থেকে পুরোহিত ও বৈদিক পণ্ডিতরা দিঘায় এসে উপস্থিত হয়েছেন। গত শুক্রবার সকালে ধুমধাম করে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘কলসযাত্রা’, যেখানে ২০ জন মহিলা মঙ্গলঘট হাতে মন্দির ও গর্ভগৃহ প্রদক্ষিণ করেছিলেন। উৎসবের আবহে মঙ্গলশঙ্খের ধবনিতে মুখর বঙ্গের সমুদ্রতট। আজ সেখানে চলছে যজ্ঞ-হোমের বিপুল সমারোহ। বর্তমানে দিঘাতেই সপারিসদ রয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী, মঙ্গলবার সকালে তিনি খুঁটিয়ে দেখছেন সমস্ত ব্যবস্থাপণা। বিকেলে মহাযজ্ঞে পুর্ণাহুতি দেবেন তিনি।
ধর্মীয় উন্মাদনার পাশাপাশি প্রশাসনিক তোড়জোড় তুঙ্গে। এই মন্দির নির্মাণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে এই প্রকল্পের তদারকি করেছেন। পূর্ব মেদিনীপুর জেলা প্রশাসন ও দিঘা-শঙ্করপুর উন্নয়ন পর্ষদের মাধ্যমে এই মন্দির তৈরি করা হয়েছে রাজস্থানের ভুবনেশ্বর ও পুরীর মন্দির স্থাপত্য অনুপ্রেরণায়। মন্দির উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে রাজ্য সরকারের উচ্চপদস্থ মন্ত্রীরা উপস্থিত থাকছেন বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে। অন্যদিকে, মন্দির উদ্বোধনের সময় রাজ্য বিজেপি-র পক্ষ থেকেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতারা উপস্থিত থাকবেন বলে জল্পনা তৈরি হয়েছে। মহাযজ্ঞ, প্রাণ প্রতিষ্ঠা ও বৃহস্পতিবারের উদ্বোধন ঘিরে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে, দিঘা থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে মন্দির চত্বরে। ভিড় সামাল দিতে পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবকও থাকবেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। প্রসাদ বিতরণ ও
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধনকে প্রতিপক্ষ বিজেপির অযোধ্যার রামমন্দিরের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পাল্টা বক্তব্য হিসেবে প্রতিস্থাপনের সমান্তরালে দাঁড় করানো হয়েছে। এখানে যেমন মুখ্যমন্ত্রী ‘প্রধান যজমান’, ঠিক যেমন অযোধ্যায় ছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। এই সাদৃশ্য সত্ত্বেও দিঘায় জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই এবং তুলনামূলক কম জনসমাগমে অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে এক ভিন্ন রাজনৈতিক কৌশলও স্পষ্ট হয়েছে। অযোধ্যায় যেমন রামমন্দির উদ্বোধনের পরে স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হওয়ার কথা শোনা গেছিল, তেমনই দিঘার মন্দির উদ্বোধন ঘিরেও স্থানীয় পর্যটন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পরিবহণে অর্থনৈতিক গতি সঞ্চারের বার্তা দিয়েছেন রাজ্য সরকার। এলইডি স্ক্রিন, প্রচার, সাজসজ্জা এবং প্রশাসনিক তৎপরতা তারই অংশ। উদ্বোধন উপলক্ষে জেলাস্তর থেকে সরাসরি সম্প্রচারের নির্দেশ এলেও, খরচ বহনের স্পষ্ট লিখিত নির্দেশিকা না থাকায় প্রশাসনের নীচুতলার কিছু বিভ্রান্তি আর অসুবিধার চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, আরএসএস, ও রাজ্য বিজেপি এই মন্দিরকে ‘তীর্থক্ষেত্র’ মানতে নারাজ। তারা এটিকে ‘সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ বলে আখ্যা দিচ্ছে। দিঘার পর্যটন মানচিত্রে এ মন্দির ভবিষ্যতে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন হোটেল মালিক ও পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা।যদিও ২৮ থেকে ৩০ পর্যন্ত দিঘা শহর জুড়ে বেরেছে পুলিশি তৎপরত, নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে যানবাহন চলাচল, ভিড় সামলাতে ক্রমাগত মাইকিং করছে দিঘা পুলিশ । তাই গত কয়েকদিন পর্যটকদের ভিড় কম দিঘায় । তবে স্থানীয়দের আশা, শুধু বঙ্গবাসী নয়, ওড়িশা, বিহার ও ঝাড়খণ্ড থেকেও ভক্তদের আসার সম্ভাবনা রয়েছে। পুরীর জগন্নাথধামের অনুকরণে এই মন্দিরও দেশের গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্র হয়ে উঠবে।
❤ Support Us





