- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- মে ১৮, ২০২৫
উনিশের গল্প, এবং আত্মদানের বৃত্তান্ত : অশিতীপর বৃদ্ধার ডায়েরি
শিলচর শ্মশান ঘাটে ফুলে ফুলে ঢাকা পাশাপাশি একাদশ শহিদের চিতা । সন্ধ্যায় শ্মশানের দাউদাউ নিভে এলে মানুষের কান্না শহরের চৌহদ্দি অতিক্রম করে সারা জেলায় পৌঁছে গেল । বীরাঙ্গনা কমলার হতভাগিনী মা-ও চোখের জল মুছে রাস্তায় বেরিয়েছেন, ‘এইবার আমিও গুলির মুখে দাঁড়াব ।’ পুলিশ ঘিরে রেখেছে রাজপথ । উঁচু ক্লাসের মেয়েরা সামনে এসে আওয়াজ দিচ্ছে, ‘আসাম সরকার হুঁশিয়ার, আসাম-পুলিশ মুরদাবাদ । বারীন্দ্র আর নৃপেন্দ্রর বৌ, বাজারের নগেন দাশের স্ত্রীসহ আমরা ঘরের বৌরাও ইশকুলের ছেলেমেয়েদের মিছিলে সামিল হলাম ।
পুত্র সঞ্জয় দেব লস্করের রেখাচিত্রে অমিয়া দেবলস্কর
অমিয়া দেবী বরাকের কাছাড় জেলার, বড়খলার বাসিন্দা, বয়স ৯৩। জীবন-যাপনে এখনও স্বাভাবিক আর সৃজনশীল। তাঁর স্বামী প্রয়াত, যতীন্দ্রমোহন দেব লস্কর। সুপরিচিত স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং আসাম বিধান-পরিষদের নির্বাচিত সদস্য [১৯২৭-১৯২৯]। যতীন্দ্রমোহনের জন্ম আধা-সামন্তবাদী পরিবারে, কখনও জাতবিচার কিংবা সাম্প্রদায়িক পরিচিতিকে প্রশ্রয় দেননি। দিলদরাজ বঙ্গসন্তান। বিবাহোত্তর দিনগুলিতে স্বামীকে ঘরে-বাইরের কাজে সাহায্য করতেন অমিয়া দেবলস্কর, ৬১-র ভাষা আন্দোলনে তাঁর অংশগ্রহণ আর অবদান অনস্বীকার্য। অমিয়া দেবীর দিনপঞ্জি থেকে, তখনকার ঘটনাবলীর কয়েক পৃষ্ঠা, সংশোধিত, পুর্নলিখিত চেহারায় আরম্ভ-র হাতে তুলে দিয়েছেন, তাঁরই বড়ো ছেলে, সঞ্জীব দেব লস্কর। আমরা কৃতজ্ঞ। অনুপ্রাণিত।
উনিশ বলতে তোমরা কী বোঝো ? কেবলই একটি সংখ্যা, একটি তারিখ ? আমার কাছে এটা একফোঁটা চোখের জল, একই সঙ্গে আগুনের ফুলকি । উনিশ বললে চোখের সামনে ভেসে ওঠে গ্রীষ্মের সেই দিনগুলো। সারাটা চৈত্র-বৈশাখ জুড়ে ছিল মহা প্রস্তুতি ? কীসের প্রস্তুতি ? না, যুদ্ধের নয়, জগতের বিশাল আনন্দযজ্ঞের।
সেবার বৈশাখে বাড়ির গাছে ফুটেছিল অসংখ্য গুলাচি ফুল, তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুকুরের ওই পারে কদমগাছ ভরে উঠেছিল ফুলের সমারোহে। মিষ্টি গন্ধে ভরে উঠেছিল বাড়ি। দুপুর থেকে সংসারের কাজ কর্ম সেরে অপেক্ষা করতাম, কখন দলবদ্ধ ভাবে আসবে ইস্কুলের মেয়েরা। শুরু হবে নাচ গানের মহড়া —‘হে নূতন দেখা দিক আরবার।’
ছেলেরা উদ্যোগ নিয়েছে, বিশ্বকবির জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ আপাতত স্থগিত রেখে আমার শ্রীমান এদিকে ব্যস্ত। শুনে এসেছে বিশ্বজুড়ে এ দিনটি মহা সমারোহে উদযাপিত হবে। প্রত্যক্ষ করে এসেছে, এরই প্রস্তুতিপর্ব। এরাই বা কেন পেছনে থাকবে?
বাড়ির বারান্দা, উঠোন এবং মণ্ডপে দফায় দফায় রিহার্সেল চলছে — ‘বৈশাখী ঝড় আসে আসে’, ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে, এ জীবন পুণ্য করো দহন দানে।’ শিক্ষক আর ছেলেরা অভিনয় করছে ‘বিসর্জন’, মেয়েরা করছে ‘চিত্রাঙ্গদা’। নিমন্ত্রণ করা হবে শহরের অধ্যাপকদের। শারীরিক অসুস্থতা ঝেড়ে ফেলে বাড়ির কর্তা পুত্রদের সঙ্গে সমান তালে মেতে উঠেছেন।
এখন আমাদের গ্রামে কেবল রবীন্দ্রনাথ আর রবীন্দ্রনাথ। পাড়াপড়শির বাচ্চারা আসতে যেতে নাচছে, ‘ফাগুন লেগেছে বনে বনে’, করবী গাছের নিচে দাঁড়িয়ে গাইছে, ‘ও চাঁপা ও করবী, সহসা ডালপালা তোর উতলা যে।’
এমন উৎসব তো কেউ কখনও দেখে নাই।এতদিন ছিল দোল, দুর্গোৎসব। এ যে একেবারে নুতন উৎসব, প্রাণের উৎসব, রবীন্দ্রোৎসব। হাতে আছে মাত্র ক’টি দিন বাকি। আসছে পঁচিশে বৈশাখের মহালগণ।
বাড়ির পড়ুয়াদের মধ্যে বয়ঃজ্যেষ্ঠ কনিষ্ঠ ভগ্নির পুত্র। সাজসজ্জার দায়িত্ব তার। যারা কবিতা আবৃত্তি করবে, এরা তাঁর কাছে তালিম নিতে আসছে, মাস্টারমশাইদের এত সময় কোথায় ? নাটকের পার্ট বলা যাদের আসছে না, এরাও চলে আসে তার কাছে। নাট্যমঞ্চের ডিজাইন সে-ই করবে। তার মাথায়ও কত পরিকল্পনা। পড়ার ঘরে টেবিলের উপর একতাল আঠালো মাটি দিয়ে সে তৈরি করছে রবীন্দ্রনাথ। দুপুরের দিকে একটা সময় সে একমনে বসে কাজ করে— সামনে থালায় ভেজা মাটি, এক পাত্রে জল আর হাতে একটা মসৃণ বাঁশের টল।
নিপুণ হাতের টানে ক্রমে দাড়ি, গোঁফ আর মুখের গাম্ভীর্য নিয়ে তৈরি হচ্ছেন কবিগুরু।দুপুরের কাজ শেষ করে আমি সামনে বসলে সে উৎসাহভরে বোঝায় –
‘ বুঝছ ফুলমাসি, বিশ্বব্যাপী মারামারি হানাহানি দেখে কবির বিপন্নতা তুলে ধরতে চাই এখানে ।’
আমার আগ্রহ দেখে সে বেসুরা গলায় এক কলি গান গেয়ে শোনাল ‘ হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বি, নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব ।’
ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিরাট পরিবর্তন দেখে আমি আশ্চর্য হয়ে যাই । রবিঠাকুর যেন এদের কাছে জীবন্ত হয়ে উঠছেন প্রতিদিন ! এই ছেলে মেয়েগুলোর চোখে মুখে এক নতুন উচ্ছ্বাস, নতুন আলোর আভা। বুঝে না বুঝে এরা গাইছে –
‘ শতবরণের ভাবউচ্ছ্বাস কলাপের মতো করেছে বিকাশ,
আকুল পরাণ আকাশে চাহিয়া উল্লাসে কারে যাচে রে ।’
এ প্রস্তুতির ডামাডলে আমরা ভুলেই গেছিলাম বিষয়টি। দুর্গাপূজার কয়েকদিন আগে রাজধানী শহর শিলঙে চালিহা সাহেব ঘোষণা করলেন — এখন থেকে ইশকুল-কলেজ, অফিস আদালত সর্বত্র চালু হবে রাজ্যভাষা। নিজের মাতৃভাষা যে রাজভাষা নয় সেটা তো জানা ছিল না।
পরিস্থিতি হঠাৎ পালটে যাবে, কে-ই বা ভেবেছে ! সবার মুখ থম থমে। গৌহাটি, শিলং সর্বত্র অশান্তি। মারপিটের খবর আসছে এখান থেকে, ওখান থেকে। কোথায় গেল সে দিনগুলো, কোথায় গেল নৃত্যগীত—‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে তব অবগুণ্ঠিত কুণ্ঠিত জীবনে করো না বিড়ম্বিত তারে।’
এখনও মেয়েদের পায়ের আলতা রয়েছে লাল টকটকে, নাটকের কুশীলবদের মুখে মুদ্রাশঙ্খের দাগ মুছে যায়নি।গ্রামের বৃদ্ধ বৃদ্ধা, মেয়ে বৌদের মুখে এখনও রবীন্দ্রজয়ন্তীর গল্প।
প্রতিদিনই মিছিল জোরদার হচ্ছে।শক্ত কাগজ গোল করে মাইকের চুঙ্গিতে মুখ লাগিয়ে ছেলেরা জিন্দাবাদ ধ্বনিতে গ্রাম কাঁপিয়ে তুলছে। পাঠশালা হাইস্কুল সর্বত্র পড়াশুনার পাঠ বন্ধ। দুপুরে মাস্টারেরা খালি ঘরে বসে থেকে ক্ষুব্ধ। বিকালে বাড়ি ফিরে আসছেন। নতুন যারা চাকরি পেয়েছেন, এদের মন বাইরে পড়ে থাকচ্ছে, এদের উপরেই পুলিশের কড়া নজর
যে সব শিশু-কিশোর কিশোরী বিকাল হতে না হতে রিহার্সেলে জমা হত, এরা এখনও পায়ে পায়ে এসে যোগ দেয়। এরা বুঝতে পারছে না, হঠাৎ সমাজে কী অশান্তি এসে দানা বাঁধল। পুকুর পাড়ের গোলাচি গাছে এখনও ফুলের সমাহার—চম্পা, টগর আর কদম্ব ফুলের গন্ধে বাড়ি ম ম করছে— কোকিলেরা গলা ছেড়ে গান গাইবার চেষ্টা করছে, বৌ কথা কও আর কুটুম পাখি আসর দখল করার চেষ্টা করছে।
আনন্দের ঝড় এসেছিল পঁচিশে বৈশাখে। এ তো শুধু আমাদের এখানে নয়, গৌহাটি শিলঙে, কলকাতা দিল্লিতেও বিরাট আয়োজন।
বাড়িতে আনন্দবাজার আসে। প্রথম পাতায়, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর ছবি বেরিয়েছে। পাশে রবীন্দ্রনাথের বিশাল প্রতিকৃতি। সবাই নতশিরে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছেন।
হঠাৎ কী যে হল, পক্ষকালও গেল না। হিংসার উন্মত্ততায় আমাদের ছোট্ট পৃথিবীটি ভরে উঠল।
চোখের সামনে ভাসছে ‘বিসর্জন’-এর দৃশ্যটি– রক্তাক্ত দেহে পড়ে আছে জয়সিংহ, আর মায়ের সামনে ক্রুদ্ধ স্বরে আর্তনাদ করছে রঘুপতি।
কী আশ্চর্য সমাপতন ! এই রক্তস্রোতেই সেদিন ভেসে গেল শিলচরের রেলস্টেশন– বৈশাখ পেরিয়ে জৈষ্ঠের শুরুতে। আচমকা গুলির শব্দে খান্ খান্ হয়ে গেল সেই সুর, সেই গান।
গ্রামের ছাত্ররা এখন রাস্তায়, মিছিলে —‘ভাষার অধিকার ছাড়ব না, মাতৃভাষা জিন্দাবাদ।’
♦•♦♦•♦♦•♦
সেই যে এসেছিল মৃদুভাষী ছাত্রনেতা পরিতোষ। কিঞ্চিৎ কোকড়ানো চুল, চোখে চশমা, রোগা হলেও মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ায়। আমাদের প্রণাম করে আশীর্বাদও চাইল। তাঁরই পরামর্শে সবাই নেমেছে আন্দোলনে। বালাছড়াবাগান, বিজয়পুর গ্রামের ছেলেমেয়েরাও মিছিলে সামিল। নেতৃত্ব দিচ্ছে রাজকুমার কৈরি আর দীপ্ত বর্মন, সঙ্গে আছে সমীরণ, বলাই, গোপী, সজল, অজয়, জয়ন্ত, মিলন, জীবন। মেয়ে বলে পিছিয়ে নেই ছায়া নন্দী, চঞ্চলা বর্মন, স্বপ্না ভট্টাচার্য, সাথী আদিত্য, লীলা দাম, রত্না চক্রবর্তী, মালতী, রমা, ঝর্ণা, যুথিকা, নিভা, সান্ত্বনা আর রমা বোস মোটেই পিছিয়ে নেই। সবার প্রিয় তবে বড্ড খ্যাপাটে ধন্বন্তরি হোমিওপ্যাথ, রক্ষনাথ ডাক্তার দাঁড়ালেন এদের পেছনে।
ছাত্রছাত্রীদের মিছিলের সঙ্গে টহল দিতে দিতে থানার বিশাল বপু দারোগাবাবু এসব ছেড়ে ইশকুলে গিয়ে পড়াশুনা করার পরামর্শ দিলে এদের প্রশ্ন—‘কী দিয়ে পড়ব ? সরকার তো আমাদের বই কেড়ে নিচ্ছে ?’
এসবের উত্তর তাঁর জানা নাই।
রাস্তাঘাট, গাড়িঘোড়া, অফিস আদালতও নাকি বন্ধ করে দেবে এরা। ওপারের ছেলেমেয়েরা ফেরিঘাটে ধর্ণা দিয়ে নদী পারাপার বন্ধ করে দিল। ডাক পিয়ন, পঞ্চায়েত সদস্য, পুলিশ কেউ আর এপার ওপার করতে পারবে না । নৌকা বন্ধ, কাছারি গ্রামের অকুতভয় ছাত্রনেতা দীপ্ত সাঁতরে নদী পার হয়ে ইশকুলের মাঠে হাজির। সে ছাড়া সবদিক সামলাবে কে ? এমনি প্রতিদিনই মিছিল জোরদার হচ্ছে।শক্ত কাগজ গোল করে মাইকের চুঙ্গিতে মুখ লাগিয়ে ছেলেরা জিন্দাবাদ ধ্বনিতে গ্রাম কাঁপিয়ে তুলছে। পাঠশালা হাইস্কুল সর্বত্র পড়াশুনার পাঠ বন্ধ। দুপুরে মাস্টারেরা খালি ঘরে বসে থেকে ক্ষুব্ধ। বিকালে বাড়ি ফিরে আসছেন। নতুন যারা চাকরি পেয়েছেন, এদের মন বাইরে পড়ে থাকচ্ছে, এদের উপরেই পুলিশের কড়া নজর। যেন এদের অনন্ত ছুটি । রবীন্দ্র-উৎসবের ছুটির সঙ্গে এ ছুটির অনেক তফাৎ।
♦•♦♦•♦♦•♦
দিনটি শুক্রবার।পড়ন্ত বিকেলে খবর এল শিলচর রেল ইস্টিশনে ছাত্রদের উপর গুলি ছুড়েছে পুলিশ। কী সাংঘাতিক কাণ্ড !
কখন হয়েছে ? কেন হয়েছে ?
কী করেছিল ছাত্ররা ?
সবার মুখে প্রশ্ন, উত্তর দেবার কেউ নেই।
এত সব দেখে শুনে জমিদারবাবু হতভম্ব। ক্ষুব্ধ স্বরে বললেন –
‘আমরা লড়াই করেছি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে, স্বাধীন দেশে লড়াই হবে দেশীয় সরকারের বিরুদ্ধে। মাতৃভাষার জন্য।’
তাঁর সে কথাগুলো আজও আমার কানে বাজে।
এখন দেশ স্বাধীন। এক কালে এ বাড়ির উঠোনে বসত স্বদেশি সভা, আসতেন কংগ্রেসি নেতারা, স্বরাজ্য পার্টির নেতা তরুণরামের অনুগামী জমিদারবাবু ইংরেজ আমলে বিধান পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। প্রবল গান্ধীবাদী, সাদা খদ্দর-পরা মানুষটির বুকের ভিতর বিপ্লবের আগুন।সশস্ত্র সংগ্রামীদের প্রতি যেমন শ্রদ্ধাবোধ, তেমনি মহাত্মার অহিংস আন্দোলনের প্রতিও তাঁর গভীর আস্থা।
রেললাইনের উপর পুলিশের গুলিতে এক স্কুলছাত্রীর শরীর ঝাঁঝরা হয়ে গেছে । দশটা মৃতদেহ নাকি পুলিশের পাহারায় হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নেবার চেষ্টা হয়েছিল । রাস্তায় বের হওয়ায় নিষেধাজ্ঞা সত্বেও সংগ্রাম সমিতির স্বেচ্ছাসেবীরা হাসপাতাল বাড়িটিকে ঘিরে রেখেছে। টাউনে মহীতোষ পুরকাইতের পিছনে হাজার হাজার মানুষ শহিদদের মৃতদেহ মাথায় নিয়ে মিছিল করেছে ।
আমি যখন নববধূ হিসেবে এ বাড়িতে আসি, তিনি তখন ইংরেজের কারামুক্ত স্বদেশি, বিধান সভার প্রাক্তন সদস্য। প্রথম প্রথম ভেতর থেকে সব শুনতাম, বারান্দা থেকে দেখতাম। ছেলেমেয়েরা বড়ো হবার পর রক্ষণশীল পরিবারের আটোসাটো বাঁধন আর রইল না।
… এখন এই বৃদ্ধ বয়সেও বৈশাখ এলে ফিরে যাই পুরনো সেই দিনে। হাওয়ায় কান পেতে শুনি তখনকার স্লোগান, শুনি রবীন্দ্রজয়ন্তীর গান– ‘সঙ্কোচের বিহ্বলতা নিজেরই অপমান, সংকটের কল্পনাতে হয়ো না ম্রিয়মান’। চোখের ভাসে রাস্তা দিয়ে গান গাইতে ওদের চলে যাওয়া দৃশ্য।কানে আসে গানের কলি– ‘মুক্ত করো ভয়, আপনা মাঝে শক্তি ধর নিজেরে করো জয়।’
♦•♦♦•♦♦•♦
সেদিনের কথাটি এবার বলি। তারিখটি উনিশে মে। গ্রামে বিকেল থেকে কানাঘুষা, টাউনে ব্যাপক গণ্ডগোল হয়েছে। গোলাগুলিও হয়েছে। কয়েকজন প্রাণ হারিয়েছে। একজন নয়, দুই জন নয় ক-য়ে-ক-জন ? এর বেশি কিছু জানা গেল না।
গ্রামে কেমন একটা গুমোট অবস্থা । সন্ধ্যেয় বারীন্দ্র, নৃপেন্দ্র দুই ভাই এল। অনেক কথা বলে গেল এরা। এরপর দফায় দফায় হাজির বাজারের ছেলের, সবার শেষে সংগ্রাম পরিষদের রক্ষনাথ। আগামীকাল জেলা জুড়ে প্রতিবাদ হবে, ‘গুলি করে আমাদের ছেলেদের মারবে আর এরা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে, তা কি হয় ?’
পরদিন সকালে উত্তেজিত হয়ে এলেন দেশমুখ ঠাকরুন। তাঁর কাছে টাটকা খবর, গতকাল রেললাইনের উপর পুলিশের গুলিতে এক স্কুলছাত্রীর শরীর ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। সাংঘাতিক কাণ্ড ! তিনি এত উত্তেজিত, যেন এক্ষুনি রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন মহিলাদের নিয়ে। চেঁচামেচি শুনে লাঠি ভর দিয়ে আমার স্বদেশি করা বৃদ্ধা ননাস ঠাকরুন এগিয়ে এলেন। এখন তাঁর আর সে দিন নাই, তবুও রক্ত গরম হয়ে গেছে—‘আমরা ইংরেজ গরমেন্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি, এইবার দেশের মন্ত্রীর সঙ্গে যুদ্ধ করমু ।’
কথা বলতে বলতে ঠক্ ঠক্ করে কাঁপছেন। আমি তাঁকে ধরে ধরে ঘরের বারান্দা পর্যন্ত এগিয়ে দিলাম। এই বয়সে এত উত্তেজনা ভালো নয়।
পরের দিন জানা গেল, দশটা মৃতদেহ নাকি পুলিশের পাহারায় হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নেবার চেষ্টা হয়েছিল। রাস্তায় বের হওয়ায় নিষেধাজ্ঞা সত্বেও সংগ্রাম সমিতির স্বেচ্ছাসেবীরা হাসপাতাল বাড়িটিকে ঘিরে রেখেছে। টাউনে মহীতোষ পুরকাইতের পিছনে হাজার হাজার মানুষ শহিদদের মৃতদেহ মাথায় নিয়ে মিছিল করেছে।
♦•♦♦•♦♦•♦
ডাকঘর থেকে পত্রিকা আর বাড়িতে পৌঁছাতে পারে না। ইশকুলের ছাত্ররা পিয়নকে ভুলিয়ে নিয়ে যায়। দোমড়ানো মোচড়ানো কাগজ বাড়িতে এলেও, আমাদের হাতে আসতে দেরি হয়। আমি নিহত ছেলেমেয়েদের ছবিতে একবার চোখ দিয়েই রেখে দিলাম। বীভৎস দৃশ্য ! এইটুকুন মেয়েটার উপর গুলি ! এবার নাকি মেয়েটি ম্যাট্রিক দিয়েছে।
শহরে কারফিউ। রাস্তায় বেরোলেই গুলির আদেশ। কে শুনে কার কথা ? কারো’ই পুলিশের ভয় নাই। সবাই ঘর ছেড়ে রাস্তায়। চারিদিকে শহিদদের নামে জয়ধ্বনি। চালিহা সাহেবের বিরুদ্ধে ধ্বনি—‘আসাম সরকার হুঁশিয়ার, জান দিব জবান দিব না, মাতৃভাষা জিন্দাবাদ।’
জানা গেল এগারোটি প্রাণ গেছে। একাদশ শহিদের জয়ধ্বনি গ্রামের ছাত্রদের মুখেও। প্রতিদিন ডলু, বিজয়পুর, ধুমকর, বালাছাড়া, জারইলতলা, চন্দ্রপুর, ছেছরি প্রভৃতি গ্রাম ঝেঁটিয়ে ছেলেমেয়েরা মিছিল করে ইশকুলের মাঠে জড়ো হচ্ছে।
সংগ্রাম পরিষদের ঘন ঘন নির্দেশ আসতে থাকল। কালো পতাকা ধারণ করে মেয়েরা রাস্তায় নামবে। খবর আসছে ঝড়ের গতিতে। শিলচর শ্মশান ঘাটে ফুলে ফুলে ঢাকা পাশাপাশি একাদশ শহিদের চিতা । সন্ধ্যায় শ্মশানের দাউদাউ নিভে এলে মানুষের কান্না শহরের চৌহদ্দি অতিক্রম করে সারা জেলায় পৌঁছে গেল। বীরাঙ্গনা কমলার হতভাগিনী মা-ও চোখের জল মুছে রাস্তায় বেরিয়েছেন, ‘এইবার আমিও গুলির মুখে দাঁড়াব।’
বারীন্দ্র আর নৃপেন্দ্রর বৌ, বাজারের নগেন দাশের স্ত্রীসহ আমরা ঘরের বৌরাও ইশকুলের ছেলেমেয়েদের মিছিলে সামিল হলাম।
পুলিশ ঘিরে রেখেছে রাজপথ। উঁচু ক্লাসের মেয়েরা সামনে এসে আওয়াজ দিচ্ছে, ‘আসাম সরকার হুঁশিয়ার, আসাম-পুলিশ মুরদাবাদ।’
বড়ো দারোগাবাবু এদের নিরস্ত করতে এগিয়ে এলে, কণ্ঠস্বর আরও উঁচু মাত্রায় উঠল। অগত্যা পথ ছেড়ে দিয়ে ফিরে যাবার মুখে তিনি কী সব কটুক্তি করে গেলেন। দেশমুখ দিদিঠাকরাণ তৎক্ষণাৎ একজনের হাত থেকে বক্তৃতার চুঙ্গিটি নিয়ে শুরু করলেন গরম ভাষণ— ‘দেশে কি অরাজকতা চলছে? আমাদের ছেলেমেয়েদের গুলি করে মারবেন, আমরা রাস্তায় শান্তিপূর্ণ মিছিল করছি, এতেও বাঁধা ! কথার কী ছিরি— আমাদের মেয়েদের বলছেন গুন্ডা গুন্ডা পুড়িন !’
বুঝলাম শব্দটি দারোগাবাবুর মুখ থেকে বেরিয়েছে।
সংগ্রাম পরিষদের থেকে নির্দেশ, আজ সারা জেলা নিষ্প্রদীপ হবে। জৈষ্ঠ্য মাসের সন্ধ্যায় ঘর অন্ধকার করে আমরা সবাই উঠানে। স্বেচ্ছাসেবী ছেলেরা রাস্তায় মিছিল করছে, নিজেদের বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে মেয়েরা শঙ্খধ্বনি দিচ্ছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে স্লোগান আমাদের কানে আসছে —‘চারিদিকে অন্ধকার, আসাম সরকার হুঁশিয়ার।’
শিলচরের যোগেন দত্তর ছেলে শ্রীমান কালা প্রতিদিন প্রকাশ করছে সংগ্রামী বুলেটিন । এরই একটিতে খবর হল, সংগ্রাম সমিতির পরবর্তী কর্মসূচি জেলা জুড়ে ‘অরন্ধন’। রান্নাঘরে কেউ হাড়ি চড়াবে না, বাচ্চাদের জন্য আগের দিনে রান্না করা পান্তা ভাত থাকবে । নির্দিষ্ট দিনে আমরা সবাই উপবাস করলাম । শিবের ব্রত নয়, কালীরও নয়, মাতৃভাষার জন্য উপবাস
বাড়ির ছেলেদের নির্দেশ দেওয়া হল, একবার গ্রাম প্রদক্ষিণ শেষ করে, ঘরে ফিরে আসতে হবে। দিনকাল ভালো নয়, কোথায় কী ঘটনা ঘটে, কে জানে। যথাসময় এরা এসে খবর দিল, গ্রামে, বাজারে বস্তি এলাকায় কেউই আলো জ্বালায় নাই। তুলসীতলায়ও পর্যন্ত কেউ প্রদীপ জ্বলায় নাই। অন্ধকারেই মেয়েরা ধুপ ধুনা জ্বালিয়ে জোকার দিয়েছে। নদীর ওপারের দুর্দমনীয় ছাত্রনেতা এইসব বিস্তারিত খবর নিয়ে এলে আমরা তাঁকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যেতে বললাম। খেয়া পারাপার বন্ধ হয়ে যাবে।
এরই মধ্যে, আরেকটি ছেলে এসে খবর দিল, উত্তরে উজান নগরের দিকে একটি বাড়িতে নাকি টিমটিম আলো দেখা গেছে, এইটা অনুসন্ধান করে দেখা দরকার। বাড়ির কর্তা বললেন – ‘এইসব কথা এখন থাক, তোমরা বাড়ি যাও। এসব নিয়ে ঝগড়া কাজিয়ার সময় নয় এখন। কারও ইচ্ছা না হলে কিছু করার নাই। জোর জবরদস্তি করে শোক পালনে বাধ্য করা অনুচিত।’
ছেলেরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে, ‘আমরা জানি কা-র বাড়িতে আলো জ্বলেছে, কয়েকটা দালাল তৈরি হয়েছে গ্রামে।’
এদের নিরস্ত করা হল এই বলে, ‘নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাবার পর তো আলো জ্বলবে। ওই দিকে কার বাড়িতেই বা ঘড়ি আছে ? যাও যাও, এসব চিন্তা ছেড়ে বাড়ি যাও।’
সকালে ছেলেরা হাতে একটা মুদ্রিত কাগজ নিয়ে এল। শিলচরের যোগেন দত্তর ছেলে শ্রীমান কালা ঘরের খায় আর বনের মহিষ তাড়ায়। এক পাতার পত্রিকা বের করে ছাপানোর খরচা উঠে কি না, কে জানে, সে নিঃস্বার্থ ভাবে খবর দিয়েই যাচ্ছে। প্রতিদিন প্রকাশ করছে সংগ্রামী বুলেটিন। এরই একটিতে খবর হল, সংগ্রাম সমিতির পরবর্তী কর্মসূচি জেলা জুড়ে ‘অরন্ধন’।রান্নাঘরে কেউ হাড়ি চড়াবে না। বাচ্চাদের জন্য আগের দিনে রান্না করা পান্তা ভাত থাকবে।
এতে কি আর চালিহা সরকারের টনক নড়বে ?
নির্দিষ্ট দিনে আমরা সবাই উপবাস করলাম। শিবের ব্রত নয়, কালীরও নয়, মাতৃভাষার জন্য উপবাস।
♦•♦♦•♦♦•♦
বাজারে একটা ঘর ভাড়া করে সংগ্রাম কমিটির অফিস খোলা হয়েছে। কোথা থেকে একটা মাইকও জোগাড় হল। সন্ধ্যা হলে রক্ষনাথ মাইকে নিত্যদিনের কার্যসূচির ঘোষণা করে। এর মধ্যে সংবাদ এল, একাদশ শহিদের চিতাভস্ম টিনের কৌটায় করে জেলার প্রতিটি গ্রাম এবং শহরে পাঠানো হচ্ছে। শিলচর থেকে মাছিমপুর, জাটিঙ্গামুখ হয়ে আমাদের গ্রামেও আসবে। সবার শ্রদ্ধা নিবেদন শেষ হলে, কৌটাগুলো সোনাপুর-বিহাড়া-কালাইন-বদরপুর-শ্রীগৌরী-ভাঙ্গা বাজার হয়ে আবার শিলচর ফিরে যাবে। ভাড়া করা মাইকে, অবিরাম ঘোষণায় আমাদের এ সব মুখস্থ হয়ে গেছে ।
সন্ধ্যায় গ্রামের মেয়েরা শঙ্খধ্বনি আর জোকার দিয়ে স্বেচ্ছাসেবীদের হাত থেকে চিতাভস্মের পাত্র নিজেদের মাথায় তুলে নিল। এরপর একেবারে থানার সম্মুখ দিয়ে এগিয়ে বাজারে প্রবেশ করে আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করলে আমি প্রতিবেশি মেয়েবৌদের সঙ্গে নিয়ে শঙ্খ বাজিয়ে প্রদীপ দিয়ে আরতি করে ভস্মাধারের ডালা মাথায় নিয়ে পুবের ঘরে সুন্দর একটি কাপড় দিয়ে ঢাকা, ফুল দিয়ে সাজানো চৌকির উপর রাখলাম। বাড়িতে তখন আর তিল ধারণের স্থান নাই। দুই শ্রীমানকে কারা যেন শিখিয়ে রেখেছিল, গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে ওরা ‘জয়হিন্দ, জয়হিন্দ’, ‘মাতৃভাষা জিন্দাবাদ’ ধ্বনি তুললে সবাই এতে কণ্ঠ দেবে।
চিতাভস্ম নিয়ে মিছিলের পেছন পেছন পুলিশ বাহিনীও এসে পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে সব কিছু প্রত্যক্ষ করে গেল। খোঁজ করল, রাজকুমার কোথায় ?
শিলচরে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়েছে। পরিতোষ পালচৌধুরী আত্মগোপন করে আছেন।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে অফিসের মাইকে রক্ষনাথের কণ্ঠ প্রকট—‘পুলিশ এসে আমাকে অ্যারেস্ট করতে চায়, করে নিয়ে যেতে পারে।আমি চ্যালেঞ্জ করছি ছাত্রনেতা রাজকুমারের টিকির নাগাল পাওয়াও পুলিশের বাপের সাধ্যি নাই । তাঁকে আমরা জমিদার বাড়িতে চৌকির নিচে লুকিয়ে রেখেছি ।’
‘এই রে, কেউ একজন দৌড়ে যাও, পাগল ডাক্তারকে সামলাও। এখন তাঁর মাথার ঠিক নাই’, এই বলে বাড়ির বয়ঃজ্যেষ্ঠ ছেলে খড়ম পায়ে খট খট করে উঠানে নেমে এল।
♦•♦♦•♦♦•♦
প্রতিদিনই এখানে ওখানে প্রতিবাদ, ধর্ণা, হরতাল। গ্রামে তেমন সরকারি অফিস আদালত কোথায় যে বন্ধ করা হবে ? ছেলে মেয়েরা পঞ্চায়েত, ডাকঘর, পিডবলিউডি অফিসের সামনেই জিন্দাবাদ ধ্বনি তোলে। ভেতর থেকে ওরাও বেরিয়ে এদের সমর্থন করছেন।
কাঁহাতক শূন্য ময়দানে খেলা যায় ? রক্ষনাথ স্থির করল, একদিন থানায় ধর্না হবে। সংগ্রাম কমিটির অনুমোদন চলে এল। গোপনে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবীর লিস্ট তৈরি হল। সমস্ত পরিকল্পনার গর্ভাধার আমাদের বাড়ির সেই ঘর, যেখানে এক রাতের জন্য শহিদের চিতাভস্ম রাখা হয়েছিল।
স্থির হল আগামীকাল সকালে এদের নিয়ে থানা অভিযান শুরু হবে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে আবার বেজে উঠল অফিসের মাইক। রক্ষনাথ থানা অভিযানের কথাটা অবশ্য শেষ করতে পারল না। কেউ একজন এসে ওকে নিবৃত্ত করল, বাড়ি থেকে আমরা বুঝে নিলাম ব্যাপারটি।গ্রামের অন্য যারা যা বোঝার ঠিকই বুঝলেন, সবই পাগলা ডাক্তারের কাণ্ড। সবাই বলছে, মাইকটা কাল ফেরত দেওয়া হোক্, খালি গলায়ই যা বলার বলা যাবে।
সকালবেলা ছেলেমেয়েদের পিকেটিং করতে পাঠিয়ে আমরা অপেক্ষা করছি। বাড়ির ইনি বলছেন ‘শান্তিপূর্ণ হরতাল এটা, কে এতে বাঁধা দেবে?’
সেদিন রেলস্টেশনে তো ওরা শান্তিপূর্ণ হরতালই করছিল। আমি বাড়ির বিশ্বস্ত কর্মীকে খবর আনতে পাঠিয়েছি।
দুপুর পর্যন্ত ছেলেমেয়েরা থানার ভিতর ঢুকে এখানে-ওখানে যেখানে জায়গা পেল বসে পড়ল। পুলিশ সব গতিবিধি শান্ত ভাবে লক্ষ্য করে গেছে। এরপর শহর থেকে একটা গাড়ি এসে থামল। পুলিশের ব্যস্ততা বাড়ল। ওরা জানাল, হরতালকারীরা থানা এলাকার বাইরে না গেলে ধরপাকড় শুরু হবে।
‘খেলা’ জমে গেল। সবাই এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘গ্রেপ্তার করো ।’ পুলিশ জানাল– ‘তোমাদের শিলচর জেলে নিয়ে যাওয়া হবে।’
থানার সামনের রাস্তা লোকে লোকারণ্য। মাতৃভাষা জিন্দাবাদ, বাংলা ভাষা জিন্দাবাদ, জান দেব জবান দেব না, ইত্যাদি ধ্বনিতে সবদিক মুখরিত। পুলিশ বিষয়টিকে আর এগোতে না দিয়ে তাড়াতাড়ি চারপাঁচ জন বন্দি নিয়ে শিলচর অভিমুখে রওয়ানা হল। সবাই জয়ধ্বনি দিতে দিতে বাড়িমুখো, যাদের গ্রেফতার করা হল না, এরা উচ্চস্বরে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির দিকে পা বাড়াল
এতে এরা আরও খুশি। অতি উৎসাহে নিজ নিজে বাড়িতে খবর পাঠাল, মেয়েদের জামাকাপড় নিয়ে এসো। এবার বড়ো-দারোগা এগিয়ে এলেন। অল্পবয়সীদের গ্রেপ্তার করতে অস্বীকার করে এদের নাম কেটে দিলেন —
‘তোমরা বাড়ি যাও তো। জেলখানা বাচ্চাদের জন্য নয়।’
পুলিশের গাড়ি বন্দিদের তুলে নিতে রেডি। উৎসাহী ছেলেমেয়েদের মন খারাপ। কেউ কেউ কান্নাকাটি করছে দেখে দারোগা ধমকে উঠলেন—
‘এখন কাঁদছো আর রাত্রি হলে মা মা ডাকলে কেউ আসবে না। দেখি সরো, সরো।’
ইতিমধ্যে সারা গ্রামে খবর রটে গেল। থানার সামনের রাস্তা লোকে লোকারণ্য। মাতৃভাষা জিন্দাবাদ, বাংলা ভাষা জিন্দাবাদ, জান দেব জবান দেব না, ইত্যাদি ধ্বনিতে সবদিক মুখরিত। পুলিশ বিষয়টিকে আর এগোতে না দিয়ে তাড়াতাড়ি চারপাঁচ জন বন্দি নিয়ে শিলচর অভিমুখে রওনা হল। সবাই জয়ধ্বনি দিতে দিতে বাড়িমুখো, যাদের গ্রেফতার করা হল না, এরা উচ্চস্বরে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির দিকে পা বাড়াল।
বাজারের মুরব্বিরা মেয়েদের বললেন, ‘তোমরা শাড়ি পরিয়া গেলে না কেনে গো মা ? কেমনে তারা বুঝবে তুমরা সংগ্রামী লেডি ?’
ছেলেরাও আফসোস করল, হাফপেন্ট না পরে ট্রাউজার পরে গেলেই পারত।
পরদিন খবর এল, জেলে আমাদের মেয়েদের দুপুরে ভাত খাইয়ে ছেড়ে দিচ্ছে। সরকারি গাড়িতে সন্ধ্যার আগেই এদের থানায় আনা হবে, অভিভাবকরা এসে নিয়ে যাবেন।
বিকেলের ছেলেমেয়ে, সঙ্গে বড়রাও মালা নিয়ে গ্রামের প্রবেশ পথে এদের বরণ করে থানার প্রাঙ্গন পর্যন্ত এলেন। শ্লোগানের সঙ্গে চলছে শঙ্খধ্বনি। গাড়ি থেকে বন্দিরা বীরদর্পে নেমে এলে এদের নিয়ে মিছিল করে সবাই বাড়িতে গেল।
♦•♦♦•♦♦•♦
শিলচর করিমগঞ্জ বদরপুর হাইলাকান্দি সর্বত্র আন্দোলন চলছে, পাশাপাশি চলছে ধরপাকড়। প্রধানমন্ত্রী নেহেরু, মন্ত্রিসভার সদস্য লালবাহাদুর শাস্ত্রী মহোদয়কে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে পাঠালেন। কী হয় না হয়, কিছুই বুঝতে পারছি না। আন্দোলন থামার কোন লক্ষণ নেই।
খবর এল, শিলচরের মেয়েরা আদালত দখল করে ফেলেছে। জজ সাহেবের চেয়ারে বসে চালিহার বিরুদ্ধে সরকারি কাগজেই রায় লিখে দিয়েছে। গণহত্যার অভিযোগ এনেছেন একজন স্বেচ্ছাসেবক, এদেরই একজন পেশকার হয়ে অভিযোগ দাখিল করেছেন।দু-পক্ষের দুই উকিলও বাদী বিবাদীর পক্ষে সওয়াল করে, সাক্ষী সাবুদের কথা শুনে যথারীতি আদালতের কাজ প্রায় শেষ করেও এনেছেন, এমন সময় পুলিশ এসে আদালতে ঢুকল, জজ সাহেবাকে গ্রেপ্তার করবে।
এ বিচারের খবর বিকালে চারিদিকে রাষ্ট্র হয়ে গেল। আমাদের গ্রামেও পৌঁছল। আমাদের কৌতূহল আর মিটে না। পরদিন গ্রামে এল আনন্দবাজার আর যুগান্তর। খবর পেয়ে বাড়ির উঠানে ভিড়। সবাই জানতে চায়, কী ঘটেছে আদালতে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পত্রিকা উৎসাহী শ্রোতাদের সামনে পাঠ করছে উঁচূ ক্লাসের ছেলেরা । আজও আমার কানে বাজে সেই সংবাদ পাঠ —
‘বেলা নয় ঘটিকায় সত্যাগ্রহীরা জেলা জজের ঘরে প্রবেশ করেন, সওয়া দুইঘণ্টা কাল নিজেদের আদালত চালাইয়া যান । কোনও ভাবেই আদালতের মর্যাদা ক্ষুন্ন হয় নাই ।’
এই সব শুনে সবার বুক গর্বে স্ফীত । জজ সাহেবা রায় ঘোষণা করলেন — ‘অদ্য হইতে বাংলা আসামের সরকারি ভাষা রূপে গৃহীত হইল’।
বাক্য শুনে সবাই হাততালি দিয়ে উঠল —‘ বাংলাকে সরকারি ভাষারূপে স্বীকার না করার অপরাধে, সেই সঙ্গে ভাষার অধিকার চাইতে আসা এগারোটি প্রাণ হরণ করার অপরাধে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শ্রী বিমলাপ্রসাদ চালিহা ও অর্থমন্ত্রী শ্রী ফকর উদ্দিন আলী আহমেদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হইল। একই সঙ্গে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেওয়া হইল নির্বাসন দণ্ড।’
কলেজ পড়ুয়া নির্ভীক মেয়ে গোপা অনড়। দামাল মেয়েটিকে বোঝানোর জন্য বাড়ি থেকে ডেকে আনা হল তাঁর মা’কে। ম্যাজিস্ট্রেটের মেয়ে গোপাকে টলানো গেল না। ইতিমধ্যে সশস্ত্র পুলিশবাহিনী আদালত ভবনটি ঘিরে ফেলেছে। আদালতের বাইরে হাজার জনতার ভিড়। ব্যাপক কোলাহল আর শ্লোগান চলছে, গুণে গুণে পনেরো থেকে ষোলজন সত্যাগ্রহীকে গ্রেপ্তার করল পুলিশ।
সেদিনের বিচারকক্ষে কারা কী ভূমিকা পালন করেছেন, কে কোন আসনে বসেছিলেন এটা জানতে সবাই উদ্গ্রীব। কয়েক দিন পরে জানলাম, জজের চেয়ারে যে বসেছিল, সেই সাহসী কলেজ ছাত্রীটির নাম গোপা দত্ত। তাঁর এজলাসে পেশকার হয়েছে মনীন্দ্র রায় । কাঠগড়ায় করজোড়ে আসামি হিসাবে দাঁড়িয়েছে আরেক সত্যাগ্রহী, নাম সত্য ঘোষ। উকিল ব্যারিস্টার সেজেছিল সমর দেব এবং দুই ছাত্রী সহ কয়েকজন। তিনজন বাদী ছিলেন তুষার, বাবুল, সুব্রত । বাকি নামগুলো আজ আর মনে নেই।

সঞ্জয় দেবলস্করের রেখাচিত্রে কলেজ ছাত্রী গোপা দত্তের এজলাস। পরবর্তীকালে গোপা আইচ নামে সত্যজিৎ পরিচালিত ‘ঘরে বাইরে’ চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছিলেন তিনি
বিচার চলাকালীন, সরকারি জজ সাহেব পেছনের কোঠা দিয়ে এজলাস ঘরে পা দিয়ে ভেতরের কাণ্ডকারখানা দেখে, তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে গেলেন। আসরে এলেন এসপি—‘আপনি জজের আসন ছেড়ে দিন’।
কলেজ পড়ুয়া নির্ভীক মেয়ে গোপা অনড়। দামাল মেয়েটিকে বোঝানোর জন্য বাড়ি থেকে ডেকে আনা হল তাঁর মা’কে। ম্যাজিস্ট্রেটের মেয়ে গোপাকে টলানো গেল না। ইতিমধ্যে সশস্ত্র পুলিশবাহিনী আদালত ভবনটি ঘিরে ফেলেছে। আদালতের বাইরে হাজার জনতার ভিড়। ব্যাপক কোলাহল আর শ্লোগান চলছে, গুণে গুণে পনেরো থেকে ষোলজন সত্যাগ্রহীকে গ্রেপ্তার করল পুলিশ।
চারিদিকে সাহসী মেয়ে গোপা আর তাঁর সঙ্গীদের জয়জয়কার উঠল। এমন অভিনব বিচারের কথা ভূভারতে কেউ কোনও দিন তো শুনে নাই। সাবাই ধন্য ধন্য করতে লাগল, সাবাশ জজসাহেবা ! এও এক ইতিহাস।
আজ এই বার্ধ্যক্যে, গ্রীষ্মের দুপুরে তালপাতার পাখা হাতে আমি বারান্দায় বসে আকাশের দিকে চেয়ে থাকি, স্মৃতি হাতড়ে পুরোনো খাতায় লিখে রাখি উনিশের গল্প — এ গল্পে নেমে আসেন রবীন্দ্রনাথ, আমার দুর্বল শ্রবণযন্ত্রে ঝংকৃত হয় বজ্রর ধ্বনি, কমলার মায়ের কান্না, উঠোনের ধুলোর ওপর লেখা হয় রক্তাক্ত ইতিহাস।
♦•♦♦•♦♦•♦ ♦•♦♦•♦♦•♦ ♦•♦♦•♦♦•♦ ♦•♦♦•♦♦•♦
❤ Support Us







