Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • এপ্রিল ৫, ২০২৬

ঘিরে ধরে ‘তথ্য-রাক্ষস’, অচলায়তন ভাঙবে কে ?

ইমরাজ হাসান
ঘিরে ধরে ‘তথ্য-রাক্ষস’, অচলায়তন ভাঙবে কে ?

কয়েকমাস ধরে বাংলার প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বাতাবরণে ‘এসআইআর’ শব্দটি চিনে জোঁকের মতো লেপ্টে আছে। দিশেহারা মানুষ, যাঁদের কাগজ বানের জলে ভেসে গেছে, ঝড়ে উড়ে গেছে, চাপা পড়েছে মাটির তলায়; তাঁরা একবুক ভয় নিয়ে কাগজ খুঁজে চলেছেন। আলোচনা-সমালোচনা, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, বাক্-প্রতিবাক্, দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা, কাগজ জোগাড়-লম্বা লাইন, মৃত্যু-শোক, ক্ষোভ-দমন ঘিরে রেখেছে ভূখণ্ডের আকাশ-বাতাস। এমত অবস্থায়, ভোটমুখী জনপদে সাধারণ মানুষের জীবন কার্যত পরিণত হয়েছে তথ্য আর প্রমাণে। ‘বেঁচে আছি’— এ কথা প্রমাণ করা কঠিন। জীবনের থেকে বোধকরি মৃত্যুর স্বচ্ছতা অনেক বেশি। ঠিক যেন রবি ঠাকুরের ‘জীবিত ও মৃত’ -এর অবিস্মরণীয় পঙ্‌ক্তির রুক্ষ বাস্তব অভিঘাত— ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল, সে মরে নাই’। 

দেশজুড়ে, ভোটমুখী রাজ্যগুলোর কয়েকটিতে চলা কাগজে-কলমে ভোটার ‘স্বচ্ছতা’র বাণী, বাস্তবে এক অদৃশ্য প্রাচীর পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংশোধনের সাম্প্রতিকতম পর্ব ঘিরে এমন জটিল, কূট-অভিসন্ধির কটু গন্ধ ভেসে আছে। ২০২৫–২৬ সালের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা ‘এসআইআর’-কে নজিরবিহীন কর্মযজ্ঞ বলে বারবার অবিহিত করেছে জ্ঞাননেতৃত্বের নির্বাচন কমিশন। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর, এ কথা বলতে সংকোচ নেই, বাংলায় ‘এসআইআর’ নজিরবিহীনই বটে। তবে তা আর্শীবাদ না অভিশাপ, ইতিহাস নিশ্চয় এ নিয়ে রচনা লিখতে দেবে আগামী প্রজন্মকে। ভোটকর্মী থেকে সাধারণ ভোটারের মৃত্যু, অস্তিত্ব সংকট, তীব্র অনিশ্চয়তার মধ্যে বঙ্গবাসী আবারও হবে গণতন্ত্রের সহ্যসিদ্ধ মহাতান্ত্রিক !

বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘এসআইআর’-এর প্রক্রিয়া শুধুমাত্র ‘অবৈধ ভোটার’ বা ‘মৃত ভোটার’-দের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার দীর্ঘকাল ধরে বহমান প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি বৃহৎ তথ্যানুসন্ধানের, ক্ষমতাসীন কেন্দ্র সরকারের জন্য বিশেষ এক ডেটাবেস তৈরির প্রক্রিয়াও। বাদ পড়া বহু লক্ষ নাগরিকদের প্রতি সহানুভূতি বিমুখ, বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার বিরুদ্ধে গড়ে তোলা এক বহুমাত্রিক বাধা। প্রথম নজরে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে, তা হলো তথ্য প্রকাশের ধরন। ভোটার তালিকাগুলো প্রকাশ করা হয়েছে অনুসন্ধান যোগ্য বা মেশিন-পঠনযোগ্য ফাইল হিসেবে নয়, বরং স্ক্যান করা পিডিএফ আকারে, যা কার্যত মুদ্রিত পাতার ফটোগ্রাফ। ফলে এ তথ্য খোঁজা যায় না, সার্চ করা যায় না, কোনো সফটওয়্যার দিয়ে বিশ্লেষণ করা তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে মানুষের পক্ষেও তা পড়া কঠিন হয়ে ওঠে। প্রতিটি পৃষ্ঠা যেন ইচ্ছাকৃতভাবে বিশ্লেষণ প্রতিরোধের জন্য তৈরি। প্রশ্ন উঠছে, তথ্য যখন প্রকাশ্য, কিন্তু ব্যবহারযোগ্য নয়, তখন সে তথ্যের প্রকৃত মালিকানা কার হাতে থাকে ?


প্রায় ১.৩৬ কোটি ভোটারকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ বিভাগে ফেলা হয়েছে। তাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি, কিন্তু তাঁদের ভোটাধিকার কার্যত স্থগিত রাখা হয়েছে। তাঁদের ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ বা ‘বিচারাধীন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।অর্থাৎ, তাঁদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবে কি না, তা নির্ভর করছে কোনো এক সম্পূরক তালিকার উপর।


সময়ের প্রেক্ষাপট এ প্রশ্নকে আরও জটিল করে তুলেছে। পশ্চিমবঙ্গে ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া শুরু থেকেই তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন তৃণমূল  শিবির অভিযোগ তুলেছে—এ প্রক্রিয়ায় বাছাই করে নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়ের ভোটারদের নাম সন্দেহের তালিকায় ফেলা হয়েছে বা বাদ দেওয়া হয়েছে, বিশেষত যাঁরা বিজেপি-র সমর্থক নন বলে মনে করা হয়। বামেদের দাবি, ভোটার তালিকার সংশোধন জরুরী, কিন্তু তা করতে হবে স্বচ্ছ পদ্ধতিতে, কোনো বৈধ ভোটারকে বাদ দেওয়া যাবে না। প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য জড়িয়ে ফেলা যাবে না। যদিও, বাংলার শাসক-বিরোধী দুই পক্ষের ‘স্যান্ড’-ই গোলমেলে, একপেশে স্বার্থান্বেষণের ফল। তালিকাচ্যুত প্রান্তিক ও সাধারণ গণের কাছে এর কোনো মূল্যই নেই, বিশ্বাসযোগ্যতাও কমছে। মালদহের ঘটনা তারই প্রমাণ।

বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে এক নতুন শব্দবন্ধ— ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ আর ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’। ২০২৬ সালের আগে ভারতীয় নির্বাচনী ব্যবস্থায় যার কোনো অস্তিত্ব ছিল না।  বর্তমান ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়ায় প্রত্যেক ভোটারকে ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে নিজের সংযোগ প্রমাণ করতে বলা হয়—সরাসরি বা পারিবারিক সূত্রে। সে ভিত্তিতে ভোটারদের তিন ভাগে ভাগ করা হয়— ‘ম্যাপড’, ‘আনম্যাপড’ ও ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’। কাগজে-কলমে এই তৃতীয় শ্রেণিটি তৈরি করা হয়েছে তথ্যের অসঙ্গতি ধরার জন্য— যেমন বাবা মায়ের নামের অমিল, বয়সের অস্বাভাবিক ব্যবধান, বা নথির অসঙ্গতি ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অত্যন্ত সাধারণ কারণে বহু ভোটার এই নব্য প্রান্তিক শ্রেণিতে পড়ে গিয়েছেন। নামের বানানে সামান্য পার্থক্য সফটওয়্যারকে বিভ্রান্ত করেছে। পুরনো ভোটার তালিকার নিম্নমানের স্ক্যান সমস্যাকে আরও বাড়িয়েছে। ফলে একজন ভোটার অযোগ্য হওয়ার জন্য নয়, বরং সফটওয়্যারের সীমাবদ্ধতার জন্যই ‘সন্দেহভাজন’ হয়ে উঠেছেন।

এতেই শেষ নয়। প্রক্রিয়ার মাঝপথে নির্বাচন কমিশন নতুন অ্যালগরিদম প্রয়োগ করে, যা আগে থেকেই ‘ম্যাপড’ হিসেবে চিহ্নিত ভোটারদেরও পুনরায় ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’-তে ফেলে। নিয়মের এই হঠাৎ পরিবর্তন নিয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি— না ভোটারদের, না সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের। ফলে গোটা প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। শ্রেণিবিভাগের পরিসরও বিস্ময়কর। প্রায় ১.৩৬ কোটি ভোটারকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ বিভাগে ফেলা হয়েছে। তাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি, কিন্তু তাঁদের ভোটাধিকার কার্যত স্থগিত রাখা হয়েছে। তাঁদের ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ বা ‘বিচারাধীন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, তাঁদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবে কি না, তা নির্ভর করছে কোনো এক সম্পূরক তালিকার উপর। সে প্রক্রিয়ায় নাম বাদ গেলে, কেন তা বাদ গেছে তার জবাবদিহি, বা কীভাবে নাম দেখা যাবে তা আজও পরিস্কার নয়।

‘ট্রাইব্যুনাল’-এর কথা বলা হলেছে বহু জেলা থেকে খবর এসেছে এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য স্থানীয় প্রশাসনিক ভবনগুলো থেকে পাওয়া যাচ্ছে না, কবে এ প্রক্রিয়া শুরু হবে তাও অজানা। কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারিত হয়নি। এর মধ্যেই নির্বাচনের ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। মানুষ ভোট দেবেন, নেতারা বিধায়ক হবেন, মন্ত্রী হবেন। ক্রিয়দাংশ মানুষ সিদ্ধান্ত নেবে ১০ কোটির বেশি মানুষের অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের, রুটি-রুজির একথায় জীবন-মৃত্যুর।

অচলায়তনের মুক্ত জানালা খুলবে কে! আচার্য অদীনপুণ্যরা আছেন, উপাচার্য ও অন্যান্য শিক্ষকরা আছেন। দিকে দিকে দর্পকরা কিলবিল করছে, প্রভুভক্তিতে দেওয়াল লিখছে, মিছিলে হাঁটছে, বোমা বাঁধছে, একে অপরের মাথা ফাটাচ্ছে। শোনপাংশুরা দূর থেকে দেখছেন সব। কেবল নেই পঞ্চক। যে কৌতূহলী, যে প্রশ্ন করতে ভালোবাসে, প্রতিষ্ঠানের কঠোর নিয়মে নিজেকে  অন্ধভক্তিতে মানিয়ে নিতে নারাজ। শীর্ষ আদালতের নির্দেশে  সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে বিচারিক আধিকারিক নিয়োগ করা হয়, ‘মামলা’র চাপ সামলাতে ভিন রাজ্য থেকে বিচারক ও আধিকারিক আনা হয়। তবুও, ৩২ লক্ষ মামলার নিষ্পত্তি হওয়া সত্ত্বেও প্রায় ৪০ শতাংশ নাম প্রথম সম্পূরক তালিকায় স্থান পায়নি।


গণতন্ত্রে তথ্য শুধু প্রকাশেই সীমাবদ্ধ, নাকি তা সহজে ব্যবহারযোগ্য হওয়া জরুরি ? পশ্চিমবঙ্গের ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া এমন বৃহত্তর প্রশ্নকেই সামনে এনে দিয়েছে— যেখানে ডেটা শুধু নাগরিকের অধিকারসম্মত তথ্য নয়, ক্ষমতা বিন্যাসের এক নতুন পরিমাপ, ক্ষমতাধরতের সপক্ষে ভোটারদের বিভ্রান্তি করার অন্যতম হাতিয়ার


খোদ কলকাতায়, ভবানীপুর ও বালিগঞ্জ— কেবল এই দুই কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা দেখা যায়, মোট ৩৯,৬০৪ জন ভোটার, অর্থাৎ, প্রায় ১১.২ শতাংশ কমিশনের ‘বিচারাধীন’। আরও একটি বিতর্কিত দিক সামনে এসেছে, ধর্মীয় ভিত্তিতে অসম বণ্টন। দুই কেন্দ্র মিলিয়ে সংখ্যালঘু ভোটারদের সংখ্যা যেখানে ৩৯.৫ শতাংশ, সেখানে ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’-এ তাঁদের অংশ ৬৬.৫ শতাংশ। ভবানীপুরে, যেখানে সংখ্যালঘু ভোটার মাত্র ২১.৯ শতাংশ, সেখানে ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’-এ তাঁদের অংশ ৫১.৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় প্রতি ৪ জন ভোটারের একজন এই তালিকায়। অন্যদিকে, সংখ্যাগরিষ্ঠ  ভোটারদের ক্ষেত্রে এই হার অনেক কম, প্রায় ১৭ জনে একজন। বালিগঞ্জে, যেখানে সংখ্যালঘু ভোটাররা সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠ (৫৪.৩ শতাংশ), সেখানে তিন-চতুর্থাংশ ‘বিচারাধীন’। মোট হিসাব বলছে, একজন সংখ্যালঘু ভোটারের এই অচলায়ন অবস্থায় পড়ার সম্ভাবনা একজন সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের তুলনায় ৩.১ গুণ বেশি। রাজধানিতে এরকম পরিস্থিতি হলে বাকি রাজ্যের অবস্থা সহজেই অনুমেয়।

অতএব প্রশ্নটি এখন আর কেবল প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতার নয়, বরং ভীষণরকম রাজনৈতিক। তথ্য যখন ‘প্রকাশ্য’, তখন তা ব্যবহারযোগ্য না হওয়ার অর্থ কী ? তবে কি গণতন্ত্রে তথ্য শুধু প্রকাশেই সীমাবদ্ধ, নাকি তা সহজে ব্যবহারযোগ্য হওয়া জরুরি ? পশ্চিমবঙ্গের ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া এমন বৃহত্তর প্রশ্নকেই সামনে এনে দিয়েছে— যেখানে ডেটা শুধু নাগরিকের অধিকারসম্মত তথ্য নয়, ক্ষমতা বিন্যাসের এক নতুন পরিমাপ, ক্ষমতাধরতের সপক্ষে ভোটারদের বিভ্রান্তি করার অন্যতম হাতিয়ার। এই মুহূর্তে কয়েক কোটি আমজনতাকে ঘিরে ধরেছে ‘তথ্য-রাক্ষস’, বিরাট বীভৎস মুখগহ্বর দিয়ে সে গিলে ফেলতে চায় মানুষের অস্তিত্ব, হাহাকারের মাঝে একটাই প্রশ্ন, ‘অচলায়তন ভাঙবে কে ?’

♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦

তথ্য ঋণ : অল্ট নিজউ


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!