Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • এপ্রিল ২৬, ২০২৬

ভেসে যায় নধরের ভেলা, ভেসে যায় বেহুলা

অন্বেষা চক্রবর্তী
ভেসে যায় নধরের ভেলা, ভেসে যায় বেহুলা

সকলেরই নিজস্ব একটা ভেলা থাকে ৷ যারা ভাসতে জানে তারাই পারে ঐশ্বর্যের মাধুকরী থেকে নেমে এসে সেই ভেলায় ভেসে যেতে ৷ চালক শক্তির ঔদ্ধত্য নিয়ে আর যাই হোক ভেলা ভাসানো যায় না ৷  সমাজ আর সময়স্রোতের গতিজাড্যের বিপরীত বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে নধর ৷ তার কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই ৷ আছে কেবল দ্রিমি লয়ে মন্দাস্রোতের অতিধীর সফর ৷ নধর স্থিত ৷ স্থবির নয় ৷ ধীর ৷ অচল নয় ৷ ব্যর্থ ৷ কিন্তু নিষ্ক্রিয় নয় ৷

সিনেমার শুরুতে নীলসাদা আঁচলের নিরাপত্তা বিছিয়েছিলেন গল্প কথক। কালের গতির দৌড়ে প্রায় অচল সন্তানকে আজীবন বুকে আগলে বড়ো করে তুলেছে শ্রমজীবী মায়ের হাত ৷ ট্রাপিজের খেলা দেখাতে গিয়ে মারা যায় নধরের বাপ সেই কোন্ কালে ৷ সময়ের বিদ্রুপের মতোই তাই যেন অতিধীর মকচ্ছপ প্রাণীর বেশে জন্ম নিয়েছে নধর ৷ তবু সময়ের নিয়মই হলো পরিবর্তন ৷  চিরকালীনতার খণ্ডনই সময়ের চিরন্তন লীলা ৷ কালের নিয়মে নীলপাড় সাদা আঁচলের ছায়া সরে যায় একদিন, গতিরই অভিঘাতে ৷ নধরের মাথার ওপর পাথরের মতো পর পর নেমে আসতে থাকে কর্মদস্তুর সমাজের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। দুনিয়ার গতির চাকা পিষে দিতে চায় একাকী স্বতন্ত্র মানুষের স্লথ শরীরটা ৷ তাকে বাঁচিয়ে রাখার দায় তুলে নেয় সমাজ নিজের কাঁধে ৷ কারণ, বাঁচিয়ে না রাখলে যে মেরে ফেলা যায় না !

পোস্টমর্ডানিজম্-এর সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট্য হলো পণ্যায়ন ৷ বাজারের চাহিদার সাথে পাল্লা দিয়ে উত্তর-আধুনিকীকরণের পণ্যের ধরণও ৷ কেবল বস্তু নয়, বাজারে নিলাম হয় মানুষও ৷ তেমন করেই ‘বেঙ্গল সার্কাস’ এর কাছে বিক্রি হয়ে যায় নধরও ৷ খেলা দেখাতে নেমে পৃথিবীর সবচেয়ে ধীরগতির মানুষটি হারিয়েই ফেলে তার ‘মানুষ’ পরিচয় ৷ কেবল, বিক্রি হয়ে যাওয়া স্লথ দেহটির পাশে সূর্যাস্তের মতন জেগে থাকে শ্যামা ৷  প্রায় বন্ধ হতে বসা বেহুলা পালার নায়িকা…

সন্ধ্যা নামে ৷ হাওয়া বয় ৷ উড়ন্ত সাদা আঁচল এসে লাগে চোখে মুখে ৷ যৌনকামন্মত্ত নারীর কুচযুগের সামনে বসে পুরুষ অস্ফুটে ডেকে ওঠে- ‘মা’ ! শাড়ির আঁচল তুলে নিয়ে এঁটো মুখ মুছিয়ে দেয় সে ৷  গোটা মঞ্চ উথলে ওঠে বাৎসল্য আর মধুররসের অদ্ভুত সংমিশ্রণে ৷  অস্তাচলে বসে ভেলা বানায় পৃথিবীর প্রাচীনতম নারী ৷ নদীসম জীবন বয়ে যায় শুকনো খাতে ৷ মরা মাছ ভেসে ওঠে ডাঙায় ৷ শরীরী খিদেয় অতিষ্ঠ পেট মোচড় দিয়ে ওঠে৷ তৃষ্ণায় বুক খরা হয় ৷ মাটির মৃদঙ্গ সুর তোলে এ পৃথিবীর প্রথম শীৎকারধ্বনির ৷


গোটা মঞ্চ উথলে ওঠে বাৎসল্য আর মধুররসের অদ্ভুত সংমিশ্রণে ৷ অস্তাচলে বসে ভেলা বানায় পৃথিবীর প্রাচীনতম নারী ৷ নদীসম জীবন বয়ে যায় শুকনো খাতে ৷ মরা মাছ ভেসে ওঠে ডাঙায় ৷ শরীরী খিদেয় অতিষ্ঠ পেট মোচড় দিয়ে ওঠে ৷ তৃষ্ণায় বুক খরা হয় ৷ মাটির মৃদঙ্গ সুর তোলে এ পৃথিবীর প্রথম শীৎকারধ্বনির ৷


অপরদিকে রোজ জানালায় মুখ পেতে পরস্ত্রীর ঘরে নিজের স্বামীর চলে যাওয়া দেখেন সংলাপহীন রমনী ৷ ম্যানেজারের স্ত্রী ৷ আলুথালু বেশ আর ল্যাপ্টানো সিঁদুরে টিপে যেন বারবার জেগে ওঠে সন্তানহারা সনকার মুখ ! রোজসন্ধ্যায় রূপা-রহমানের যৌনতাকামী নাচ দেখতে উপচে পড়ে গ্রামের ভিড়। সার্কাস শেষে তাঁবুর ভিতর জেগে ওঠে সাতীনক্ষত্র ৷ মাছ খেতে চেয়ে মার খেতে হয় শ্যামাকে। রহমানের বাঁশির সুরে জট পড়ে যায়। চুঁয়ে পড়ে জল টপটপ করে, গলে পড়ে রমনীর সিঁদুর, কুকুরের সাথে খাবারের জন্য গতির প্রতিযোগিতায় নামতে হয় নধরকে… আশ্রয়হীনতার আকুতির নকশিকাঁথা বুনে চলে নধর শুরু থেকে শেষ অব্দি ৷

‘মোরো না মোরো না মা…’ চিতাপোড়ার শব্দের সাথে মিশে যায় সাত্যকির সুর ৷ জীবনের রক্ত মাংস আর কলসপাত্রের অস্থি মিলেমিশে সে এক নীলাভ ধূসর জগৎ ৷ সিনেমাটোগ্রাফিতে এ রং ধরা পড়েছে বিলকূল জীবন্ত উপাখ্যানের মতোই ৷ ভেলায় ভেসেছে যে জন সে জানে ডুবে যাওয়া ততটা সহজ নয়৷ আমাদের এই ভেসে থাকা জীবনে নধরের মতো আমাদেরও ভেলা থাক৷ বাঁধা থাক ঘাটের কিনারে৷ কেউ তা আবিষ্কার করুক৷ কারো থাক সেই অনাবিষ্কৃত সচ্ছলতা।

এ তো গেলো কাহিনী ৷  এবার আসা যাক কেন এই নির্মাণ, তাতে…

বেঙ্গল সার্কাসের ম্যানেজারের ঔদ্ধত্য আর একপেশে অত্যাচারের চিত্র বর্তমান পুঁজিবাদের একনায়কতন্ত্র ও পণ্যায়নের ধারক-বাহক৷ সর্বপরি যেন রাষ্ট্রযন্ত্রের আবছা প্রতিভূ, যাকে সবাই সমূলে উপড়ে ফেলতে চায়, কিন্তু পারেনা৷  সাধারণের মনের ভয়, নিরাপত্তার অভাব, খাদ্য বাসস্থানের দায়ে শিকলে বেঁধে আটকে রাখা দাসত্বের জীবন, রূপা, শ্যামা, রহমান শরীর পেতে দেখাতে থাকে বারবার।

পরিচালক, গল্পকার প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য্যের আগের ছবি ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’-র যামিনী যেখানে এক অদৃশ্য স্বপ্নের কল্পনার অতীত হয়ে থেকে যায় আজীবন, ঠিক সেই নাভিমূল থেকেই জন্ম নেয় নধর৷ বিপুল বিরাট এ জগতের গতিনিয়মের বিরুদ্ধে নিঃশব্দ অথচ অমোঘ বিদ্রোহ ঘোষণা করে নধর৷ বারবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, অযাচিত আস্ফালন, অহেতুক দৌড় আর আহাম্মকের  শব্দবাজির ফাঁপা হুংকারকে। যেখানে গিয়ে শেষ হয় আনুগত্যের গতি, ঠিক সেখান থেকেই উৎপন্ন হয় প্রত্যাখ্যানের ধারা৷ যে ধারাবাহিক স্রোতে ভেসে যায় নধরের ভেলা, ভেসে যায় বেহুলা…

পুনশ্চ : পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য ঘোষণা করেছেন, এ সিনেমা ব্যবসায়িক হলগুলিতে দেখানো হবে না। সিনেমার শরীরটাকে নধরের ভেলায় চাপিয়ে তাই ভেসে পড়েছেন নির্মাতারা। পথে দাঁড়াচ্ছেন স্রোতস্বিনীর পাড়ে, লাইব্রেরির ঘরে, নাট্যমঞ্চের কাছ থেকে একটুখানি সময় ধার করে নিয়ে। পরের শো : ১২ ও ১৮ মে কলকাতার জ্ঞানমঞ্চ।

♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!